খবরের নতুন দিগন্ত উন্মোচন করতে এখনই ভিজিট করুন:www.bnnbreakingnews.com
সম্পাদক ও প্রকাশক : প্রিন্স সালেহ। প্রকাশক কর্তৃক ১২ বীর উত্তম সি আর দত্ত রোড, বাংলামোটর, ঢাকা ১২০৫ থেকে মুদ্রিত।
স্বত্ব © BNN Breaking News (2026)
ওয়েবসাইটের কোনো লেখা, ছবি, ভিডিও অনুমতি ছাড়া ব্যবহার বেআইনি।
বিএনএন ডেস্ক

১৯৩০ সালে মন্টেভিডিওর এক নিস্তেজ দুপুরে যে বিশ্বকাপ ফুটবল মহাযাত্রা শুরু হয়েছিল, তা আজ প্রায় একশ বছর পূরণের কাছাকাছি। এই দীর্ঘ যাত্রায় কখনও ছিল পেলে-গারিঞ্চার সাম্বা নৃত্যের মতো ছন্দময় খেলা, কখনও ম্যারাডোনার অসাধারণ ঐশ্বরিক জাদু, আবার কখনও জিনেদিন জিদান বা লিওনেল মেসির মতো কিংবদন্তিদের অমরত্ব লাভের প্রচেষ্টা—এসব মিলেই গড়ে উঠেছে ফুটবল রূপকথা। ইতিহাসের পাতা থেকে সেই সব উত্তেজনাপূর্ণ স্মৃতির ধুলো ঝেড়ে আবারও ফিরে দেখার আয়োজন—বিশ্বকাপের অতীত।
আন্তর্জাতিক ফুটবল সংস্থা ফিফার তৎকালীন সভাপতি জুলে রিমে'র মনেই প্রথম এমন একটি টুর্নামেন্টের ভাবনা আসে। ফিফার সদস্য দেশগুলোকে নিয়ে একটি বৈশ্বিক ফুটবল প্রতিযোগিতা আয়োজনের এই চিন্তাটি ১৯৩০ সালে বাস্তবে রূপ নেয়। প্রথম বিশ্বকাপ আয়োজনের দায়িত্ব পায় উরুগুয়ে। সেই বছরই তারা তাদের সংবিধান প্রণয়নের শতবার্ষিকী উদযাপন করছিল। এছাড়াও, তারা ১৯২৪ এবং ১৯২৮ সালের অলিম্পিক ফুটবলে স্বর্ণপদক জয়ী দল ছিল। এই সকল কারণে উরুগুয়েকে স্বাগতিক দেশ হিসেবে নির্বাচন করা হয়। অংশগ্রহণকারী দলগুলোর যাতায়াত এবং আবাসন ব্যয় বহন করার প্রতিশ্রুতিও এই সিদ্ধান্তে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে।
বিশ্বকাপ আয়োজনের দায়িত্ব উরুগুয়েকে দেওয়া হয়েছিল টুর্নামেন্টের মাত্র এক বছর আগে। ফলে স্বাগতিকদের তীব্র সময় স্বল্পতার মুখোমুখি হতে হয়। সব ম্যাচ একটি মাঠেই অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা ছিল। শ্রমিকরা আট ঘণ্টার শিফটে দিন-রাত কাজ করে বিখ্যাত ‘এস্তাদিও সেন্তেনারিও’ নির্মাণ করছিলেন। পরিস্থিতি এমন দাঁড়িয়েছিল যে টুর্নামেন্ট শুরু হওয়ার মাত্র পাঁচ দিন পর গ্যালারি সম্পূর্ণরূপে প্রস্তুত হয়! এক লাখ দর্শক ধারণক্ষমতার সেই বিশাল স্টেডিয়ামের প্রাথমিক ম্যাচগুলোতে দর্শকদের প্রবেশ করানো হয়েছিল অত্যন্ত সতর্কতার সঙ্গে।

মোট ১৩টি দেশ সেই আসরে অংশগ্রহণ করেছিল—দক্ষিণ আমেরিকা থেকে সাতটি, উত্তর আমেরিকা থেকে দুটি এবং ইউরোপ থেকে মাত্র চারটি দেশ। সে সময়ে অন্যান্য মহাদেশ থেকে দক্ষিণ আমেরিকায় ভ্রমণ করা বর্তমানের মতো সহজ ছিল না। মহামন্দার সেই চরম অর্থনৈতিক সংকটের কালে আটলান্টিক পাড়ি দেওয়া ছিল এক বিলাসিতা। ইতালি আয়োজক হতে চেয়েছিল, কিন্তু সুযোগ না পেয়ে ক্ষোভে অংশ নেয়নি। অবশেষে রাজা দ্বিতীয় ক্যারোলের প্ররোচনায় রোমানিয়া এবং ফিফার অন্যতম প্রতিষ্ঠাতা দেশ হিসেবে ফ্রান্স অংশগ্রহণ করে। তাদের সাথে যোগ দেয় বেলজিয়াম ও যুগোস্লাভিয়া। ইউরোপীয় দলগুলো 'কোন্তে ভার্দে' নামের একটি বাষ্পচালিত জাহাজে চড়ে তিন সপ্তাহ সমুদ্রপথে যাত্রা করে উরুগুয়েতে পৌঁছায়। অবাক করা বিষয়, ফিটনেস বজায় রাখার জন্য ফুটবলাররা জাহাজের ডেকের ওপরই দৌড়াদৌড়ি করতেন! এমনকি মিশরের দল ভূমধ্যসাগরে ঝড়ের কবলে পড়ে সংযোগকারী জাহাজ ধরতে না পারায় বিশ্বকাপে অংশ নিতে পারেনি।
টুর্নামেন্টের প্রথম দিনেই মাঠে নেমেছিল ফ্রান্স ও যুক্তরাষ্ট্র। মেক্সিকোকে ৪-১ গোলে পরাজিত করে প্রথম বিশ্বকাপ গোলদাতা হিসেবে ইতিহাসে নাম লেখান ফ্রান্সের লুসিঁয়ে লরাঁ। অন্যদিকে, বেলজিয়ামকে ৩-০ গোলে হারিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের জিম ডগলাস বিশ্বকাপের প্রথম ক্লিনশিট অর্জন করেন। অবশেষে সেমিফাইনালের টিকিট পায় আর্জেন্টিনা, উরুগুয়ে, যুক্তরাষ্ট্র এবং যুগোস্লাভিয়া। উভয় সেমিফাইনালেই লাতিন আমেরিকার দুই শক্তিশালী দল ৬-১ ব্যবধানে জয়লাভ করে। উরুগুয়ে যুগোস্লাভিয়ার বিরুদ্ধে এবং আর্জেন্টিনা যুক্তরাষ্ট্রের বিরুদ্ধে জয়ী হয়।
ফুটবল বিশ্ব সাক্ষী হলো ‘স্প্যানিশ ভাষী’ দুটি দেশের ফাইনালের, যা এখন পর্যন্ত একমাত্র ঘটনা!

ফাইনালের মূল খেলা শুরুর আগেই মন্টেভিডিওর পরিবেশ ছিল বেশ উত্তপ্ত। খুনের হুমকির আশঙ্কায় আর্জেন্টিনা দলের ফুটবলারদের পুলিশি প্রহরায় রাখা হয়েছিল। অন্যদিকে, রেফারি জন ল্যাঞ্জেনাস তো জীবনবিমা না করে মাঠে নামতেই অস্বীকার করেন! ফাইনালের বল নির্বাচন নিয়ে এক চরম বিশৃঙ্খলা দেখা দেয়। আর্জেন্টিনা নিজেদের দেশের বল ব্যবহার করতে চায়, আর উরুগুয়ে চায় ইংল্যান্ড থেকে আনা তাদের পছন্দের বল। অবশেষে টস করা হয়। প্রথমার্ধে আর্জেন্টিনার বল ব্যবহার করা হয়, এবং বিরতির পর উরুগুয়ের বল। আশ্চর্যের বিষয় হলো, প্রথমার্ধে আর্জেন্টিনা ২-১ গোলে এগিয়ে থাকলেও, দ্বিতীয়ার্ধে নিজেদের বলে উরুগুয়ে ৩ গোল দিয়ে ৪-২ ব্যবধানে জয়ী হয়ে প্রথম বিশ্বকাপ চ্যাম্পিয়নের খেতাব অর্জন করে!
উরুগুয়ের হোসে নাসাজ্জির নাম বিশ্বকাপ ইতিহাসের পাতায় স্বর্ণাক্ষরে লেখা থাকবে। এই অসাধারণ ডিফেন্ডারকে ‘দ্য গ্র্যান্ড মার্শাল’ নামে ডাকা হতো। তিনি ছিলেন বিশ্বকাপ জয়ী প্রথম অধিনায়ক। তবে, ট্রফি হাতে তাঁর কোনো আনুষ্ঠানিক ছবি পাওয়া যায় না। একটি ছবিতে দেখা যায়, ফিফার তৎকালীন সভাপতি জুলে রিমে উরুগুয়ে ফুটবল ফেডারেশনের তখনকার সভাপতি পল জুদের হাতে ট্রফি তুলে দিচ্ছেন। উরুগুয়েতে পরের দিনটিকে জাতীয় ছুটি ঘোষণা করা হয়েছিল। এদিকে, একই দিনে বুয়েনস আইরেসে উরুগুয়ের দূতাবাসে ক্ষুব্ধ আর্জেন্টাইন সমর্থকরা হামলা চালায়।

সেই প্রথম বিশ্বকাপের অংশগ্রহণকারীদের মধ্যে কি আজও কেউ জীবিত আছেন? দুঃখজনকভাবে, কেউই নেই। ওই বিশ্বকাপের শেষ জীবিত খেলোয়াড় ছিলেন আর্জেন্টিনার ফ্রান্সিসকো ভারালো। ২০১০ সালে তিনি ১০০ বছর বয়সে না-ফেরার দেশে পাড়ি জমান।
প্রচ্ছদ নিয়ে আরও পড়ুন




