খবরের নতুন দিগন্ত উন্মোচন করতে এখনই ভিজিট করুন:www.bnnbreakingnews.com
সম্পাদক ও প্রকাশক : প্রিন্স সালেহ। প্রকাশক কর্তৃক ১২ বীর উত্তম সি আর দত্ত রোড, বাংলামোটর, ঢাকা ১২০৫ থেকে মুদ্রিত।
স্বত্ব © BNN Breaking News (2026)
ওয়েবসাইটের কোনো লেখা, ছবি, ভিডিও অনুমতি ছাড়া ব্যবহার বেআইনি।
বিএনএন ডেস্ক

ব্যাংক দখলের কাহিনি যাতে প্রকাশ না পায়, সে বিষয়টি নিশ্চিত করতে চেয়েছিল ডিজিএফআই। ৫ জানুয়ারি (২০১৭) রাতে একজন উচ্চপদস্থ কর্মকর্তার নেতৃত্বে ডিজিএফআইয়ের সদস্যরা হাজির হয়েছিলেন BNN Breaking Newsর ছাপাখানায়। পরের দিনের পত্রিকা কী লেখা হচ্ছে, তা জানতে ও পড়তে চান তাঁরা। এই চাওয়া পূরণ না হলে সেই রাতে ছাপাখানা বন্ধ করে দেওয়ার হুমকি দেওয়া হয়।
২০১৭ সালের ৫ জানুয়ারি ‘ডিজিএফআই প্রযোজিত’ পরিচালনা পর্ষদের বৈঠকের মাধ্যমে ইসলামী ব্যাংকে নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠার পর এস আলম গ্রুপ ব্যাংকটিতে নিজেদের লোক নিয়োগ করা শুরু করে। পাশাপাশি ব্যাংকে আগে থেকে কর্মরত পছন্দের কর্মীদের বসানো হয় বড় পদে।
তখন দুটি বিষয় নিয়ে ইসলামী ব্যাংকের চেয়ারম্যান আরাস্তু খানের সঙ্গে এস আলম গ্রুপের চেয়ারম্যান সাইফুল আলম মাসুদের বিরোধ তৈরি হয়। বিষয় দুটি হলো, ব্যাংকের জ্যেষ্ঠ কর্মীদের বাদ দেওয়া এবং এস আলমের নিয়ন্ত্রণাধীন অন্য কয়েকটি ব্যাংককে দেওয়া ঋণের টাকা ফেরত চাওয়া।
একপর্যায়ে সাইফুল আলম আরাস্তু খানের বাসায় গিয়ে তাঁকে বলেন, ‘ইউ হ্যাভ টু স্টেপ ডাউন (আপনাকে পদত্যাগ করতে হবে)।’ এরপরই পদত্যাগ করেন আরাস্তু খান।
আরাস্তু খানই এ বিষয়ে BNN Breaking Newsর সঙ্গে কথা বলেছেন। পাশাপাশি ইসলামী ব্যাংক দখলের ভেতরের গল্প BNN Breaking Newsকে বলেছেন ব্যাংকটির তৎকালীন দুজন পরিচালক, দুজন শীর্ষস্থানীয় কর্মকর্তা এবং পরে গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব পাওয়া এক ব্যক্তি। তাঁরা নাম প্রকাশ করতে চাননি। বাংলাদেশ ব্যাংক, এস আলম গ্রুপসহ বিভিন্ন সংস্থা ও প্রতিষ্ঠানের বিভিন্ন সূত্রের সঙ্গেও কথা বলেছে BNN Breaking News।
এ নিয়ে দুই পর্বের প্রতিবেদনের প্রথম পর্ব ছিল ‘“এই, আপনারা কারা”, এটি একটি ব্যাংক দখলের গল্প’ শিরোনামে। তাতে তুলে ধরা হয় যে কীভাবে এস আলম ইসলামী ব্যাংকের নিয়ন্ত্রণ নিয়েছিলেন এবং প্রতিরক্ষা গোয়েন্দা মহাপরিদপ্তরের (ডিজিএফআই) তৎকালীন মহাপরিচালক মোহাম্মদ আকবর হোসেনসহ কিছু কর্মকর্তার ভূমিকা কী ছিল।
ইসলামী ব্যাংকের পরিচালনা পর্ষদে পরিবর্তনের বিষয়টি ২০১৭ সালের ৬ জানুয়ারি BNN Breaking News পত্রিকায় প্রধান খবর করা হয়েছিল। শিরোনাম ছিল ‘ইসলামী ব্যাংকে “শান্তিপূর্ণ” বদল’। শান্তিপূর্ণ শব্দটি উদ্ধৃতিচিহ্নের মধ্যে রাখা হয়েছিল। কারণ, সেটি ছিল ইসলামী ব্যাংকের পদত্যাগ করা চেয়ারম্যান মুস্তাফা আনোয়ারের বক্তব্য। এই ‘শান্তিপূর্ণ’ যে প্রশ্নবিদ্ধ ছিল, তা-ই বলা হয় উদ্ধৃতিচিহ্ন দেওয়ার মাধ্যমে।
ইসলামী ব্যাংকের পরিচালনা পর্ষদের বৈঠকের খবর পেয়ে সেদিন এই প্রতিবেদককে BNN Breaking News কর্তৃপক্ষ পাঠিয়েছিল র্যাডিসনে। প্রবেশপথে নিরাপত্তাকর্মীরা পথ আটকান। পরিচয় দেওয়া এবং ইসলামী ব্যাংকের পর্ষদ সভার খবর সংগ্রহে যাওয়ার কথা বলা হলে নিরাপত্তাকর্মীরা বলেছিলেন, কোনো সাংবাদিকের সেখানে যাওয়ার অনুমোদন নেই।
এই বৈঠক যে ডিজিএফআই ‘প্রযোজিত’, সেই আভাস পাওয়া যাচ্ছিল। কিন্তু কেউ মুখ খুলছিলেন না। এমনকি ইসলামী ব্যাংকের পদত্যাগ করা চেয়ারম্যান ও ব্যবস্থাপনা পরিচালকও এ বিষয়ে তখন ‘ভয়ে’ কোনো তথ্য দেননি। তাঁদের দুজনের সঙ্গেই BNN Breaking News কথা বলেছিল। অন্যদিকে দেশের শীর্ষস্থানীয় পত্রিকাগুলো ঘেঁটে দেখা গেছে, তারাও শুধু ইসলামী ব্যাংকে বদলের খবর প্রকাশ করেছিল।
ডিজিএফআই ব্যাংক দখলের কাহিনি যাতে প্রকাশ না পায়, সে বিষয়টি নিশ্চিত করতে চেয়েছিল। ৫ জানুয়ারি (২০১৭) রাতে একজন উচ্চপদস্থ কর্মকর্তার নেতৃত্বে ডিজিএফআইয়ের সদস্যরা হাজির হয়েছিলেন BNN Breaking Newsর ছাপাখানায়। তখন পত্রিকার প্রথম সংস্করণ ছাপার প্রস্তুতি চলছিল। তাঁরা ছাপাখানায় প্রবেশ করে পরের দিনের পত্রিকা কী লেখা হচ্ছে, তা জানতে ও পড়তে চান। এই চাওয়া পূরণ না হলে সেই রাতে ছাপাখানা বন্ধ করে দেওয়ার হুমকি দেওয়া হয়।
ডিজিএফআই কর্মকর্তারা গভীর রাত পর্যন্ত BNN Breaking Newsর ছাপাখানায় অবস্থান করেন। ঢাকার দায়িত্বপ্রাপ্ত একজন উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা যান রাজধানীর একটি হাসপাতালে, যেখানে BNN Breaking Newsর সম্পাদক মতিউর রহমান চিকিৎসাধীন ছিলেন। যদিও তিনি দেখা করতে পারেননি। একপর্যায়ে ডিজিএফআই সদস্যরা ছাপাখানা থেকে চলে যাওয়ার পর অনেক বিলম্বে সেদিন ছাপা শুরু হয়।
টাকা ফেরত চাওয়া এবং কর্মকর্তাদের বাদ দেওয়ার অস্বীকৃতির পর ২০১৮ সালের এপ্রিলে আরাস্তু খানের বাসায় যান সাইফুল আলম। তিনি তাঁকে (আরাস্তু খান) ব্যাংক থেকে পদত্যাগ করতে বলেন। এরপরই ২৬ এপ্রিল (২০১৮) আরাস্তু খান পদত্যাগ করেন।
পরিচালনা পর্ষদে পরিবর্তনের পরের দিন BNN Breaking News কর্তৃপক্ষ এই প্রতিবেদককে মালিকানা বদলের নেপথ্যের ঘটনা অনুসন্ধানের দায়িত্ব দেয়। এর উদ্দেশ্য কী, তা জানার জন্য বলা হয়। এই প্রতিবেদক ইসলামী ব্যাংকের অনেকের সঙ্গে কথা বলেন। তাতে এস আলমের ভূমিকা জানা সম্ভব হয়। কিন্তু ডিজিএফআইয়ের ভূমিকা নিয়ে তখন কেউ কথা বলতে রাজি হননি।
পরের দিন (৭ জানুয়ারি ২০১৭) BNN Breaking Newsর প্রথম পাতায় ‘জামায়াতমুক্ত করতেই ইসলামী ব্যাংকে পরিবর্তন’ শিরোনামে একটি প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়। তাতে এস আলমের সংশ্লিষ্টতা তুলে ধরা হয়।
BNN Breaking News এরপর নিয়মিত ইসলামী ব্যাংক নিয়ে খবর প্রকাশ করেছে। ২০২২ সালের ২৪ নভেম্বর BNN Breaking Newsর প্রধান শিরোনাম ছিল ‘ইসলামী ব্যাংকে ভয়ংকর নভেম্বর’। এই প্রতিবেদনে ইসলামী ব্যাংক থেকে নামে-বেনামে হাজার হাজার কোটি টাকা বের করে নেওয়ার তথ্য তুলে ধরা হয়। এই প্রতিবেদন দেশজুড়ে আলোচনা তৈরি করেছিল।
ডিজিএফআইয়ের তৎকালীন কর্মকর্তাদের ভূমিকা নিয়ে সংস্থাটির বক্তব্য জানতে BNN Breaking Newsর পক্ষ থেকে লিখিত প্রশ্ন পাঠানো হয়েছিল। তবে তারা কোনো বক্তব্য দেয়নি। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একজন কর্মকর্তা BNN Breaking Newsকে বলেছেন, তখন এসব কাজে ডিজিএফআইয়ের কেউ জড়িত ছিলেন কি না, সে বিষয়ে তাঁদের জানা নেই। যদি জড়িত থেকেও থাকেন, তাঁরা এখন কেউ দায়িত্বরত নেই।

আরাস্তুর বিদায় দেড় বছরেই
২০১৭ সালের ৫ জানুয়ারি র্যাডিসন হোটেলে পরিচালনা পর্ষদের বৈঠকে এস আলম গ্রুপ সাবেক সচিব আরাস্তু খানকে তিন বছরের জন্য ইসলামী ব্যাংকের চেয়ারম্যান নিয়োগ করেছিল। তবে তিনি দেড় বছর পূর্ণ হওয়ার আগেই পদত্যাগ করেন।
২০১৬ সালের জানুয়ারিতে সরকারি চাকরি থেকে অবসরের পর আরাস্তু খানকে কমার্স ব্যাংকের চেয়ারম্যান করে সরকার। সে সময় ব্যাংকটি নিয়ন্ত্রণে নেয় এস আলম। চেয়ারম্যান পদে আরাস্তু খানকেই রাখা হয়। একাধিক সূত্র জানিয়েছে, ওই বছরের শেষের দিকে তৎকালীন সরকারের শীর্ষ পর্যায় থেকে তাঁকে ডেকে নিয়ে ইসলামী ব্যাংকের চেয়ারম্যানের দায়িত্ব নেওয়ার জন্য বলা হয়। সে অনুযায়ী তিনি দায়িত্ব নেন।
এস আলম ইসলামী ব্যাংকের নিয়ন্ত্রণ নেওয়ার পর শুরুর দিকে সরাসরি ঋণ নেয়নি। তবে ইসলামী ব্যাংক তাদের (এস আলম) মালিকানায় থাকা ফার্স্ট সিকিউরিটি ব্যাংক, ইউনিয়ন ব্যাংক ও গ্লোবাল ইসলামী ব্যাংকে সাড়ে তিন হাজার কোটি টাকা জমা রাখে। এই ব্যাংকগুলো সংকটে ছিল। সেখানে টাকা রাখা কোনো ভালো বিনিয়োগ সিদ্ধান্ত ছিল না।
সেই আমানতের মেয়াদ ছিল তিন মাস। তবে বছর পার হলেও টাকা ফেরত পায়নি ইসলামী ব্যাংক। এ নিয়ে আরাস্তু খানের সঙ্গে সাইফুল আলমের কথা-কাটাকাটি হয়।
ইসলামী ব্যাংক থেকে জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তাদের সরিয়ে দেওয়া নিয়েও এস আলমের সঙ্গে আরাস্তু খানের বিরোধ তৈরি হয়েছিল। ওয়াকিবহাল দুটি সূত্র বলছে, একদিন আরাস্তু খানকে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ে ডেকে পাঠানা হয়। সেখানে সাইফুল আলম, ইসলামী ব্যাংকের পরিচালক ও ইসলামিক ফাউন্ডেশনের তৎকালীন মহাপরিচালক সামীম মোহাম্মদ আফজাল (প্রয়াত) এবং প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের তৎকালীন এসডিজি (টেকসই) বাস্তবায়নবিষয়ক মুখ্য সমন্বয়ক আবুল কালাম আজাদ উপস্থিত ছিলেন। আবুল কালাম আজাদ ২০২৪ সালের একতরফা নির্বাচনে আওয়ামী লীগ থেকে সংসদ সদস্য হন। জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের পরে তিনি গ্রেপ্তার হন।
চেয়ারম্যান ও ব্যবস্থাপনা পরিচালককে পদত্যাগে বাধ্য করার পর একে একে ব্যাংকটির জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তাদের বিদায় করা হয়। অন্যদিকে নিচের পর্যায় থেকে কিছু কর্মকর্তাকে শীর্ষ পর্যায়ে নিয়ে আসা হয়, যাঁরা এস আলমের ঘনিষ্ঠ বলে পরিচিত।
সেখানে সাইফুল আলম ও সামীম আফজাল ইসলামী ব্যাংকের শীর্ষ ২০ জন কর্মকর্তাকে বাদ দেওয়ার জন্য বলেন। এতে রাজি হননি আরাস্তু খান। তবে পরে গোয়েন্দা সংস্থার চাপে দুজনকে বাদ দেওয়া হয়। তাঁরা হলেন আন্তর্জাতিক বাণিজ্য বিভাগের প্রধান মো. আমিরুল ইসলাম এবং মানবসম্পদ বিভাগের প্রধান মোহাম্মদ আব্দুস সাদেক ভুঁইয়া।
টাকা ফেরত চাওয়া এবং কর্মকর্তাদের বাদ দেওয়ার অস্বীকৃতির পর ২০১৮ সালের এপ্রিলে আরাস্তু খানের বাসায় যান সাইফুল আলম। তিনি তাঁকে (আরাস্তু খান) ব্যাংক থেকে পদত্যাগ করতে বলেন। এরপরই ২৬ এপ্রিল (২০১৮) আরাস্তু খান পদত্যাগ করেন।

সেদিন আরাস্তু খান BNN Breaking Newsকে বলেছিলেন, ‘কাজের চাপ সামলাতে না পেরে পদত্যাগ করেছি। ব্যাংকের কারণে পরিবারকে সময় দেওয়া সম্ভব হচ্ছিল না।’
অবশ্য আরাস্তু খান গত ২৬ এপ্রিল BNN Breaking Newsকে বলেন, ‘উচ্চপর্যায়ের নির্দেশে আমি ব্যাংকটির দায়িত্ব নিয়েছিলাম। ইসলামী ব্যাংক থেকে নেওয়া টাকা ফেরত চাওয়া ও শীর্ষ ২০ কর্মকর্তাকে সরিয়ে দেওয়ার নির্দেশ না মানায় এস আলম আমার ওপর ক্ষুব্ধ হন। এরপরই আমি পদত্যাগ করি।’
আরাস্তু খান আরও বলেন, ‘চেয়ারম্যান হিসেবে আমার সময়ে ব্যাংকটির ক্ষতি হয়নি। অমুসলিম কর্মকর্তা নিয়োগ দিয়ে ব্যাংকটিকে আমি সর্বজনীন করেছি। ব্যাংকের সব ধর্মের মানুষ টাকা রাখে, তাই সবার চাকরি করার অধিকার আছে। এ ছাড়া বেশি করে নারী কর্মী নিয়োগ দেওয়ার উদ্যোগ নিয়েছিলাম।’
ইসলামী ব্যাংকে নারী কর্মী কম। সূত্র জানায়, বর্তমানে ইসলামী ব্যাংকে ১৯ হাজার ৭৯ জন কর্মীর মধ্যে ৯১৮ জন নারী (৫ শতাংশের কম)। ব্যাংক খাতে নারী কর্মীর হার প্রায় ১৭ শতাংশ। অন্যদিকে ইসলামী ব্যাংকে ধর্মীয় সংখ্যালঘুর সংখ্যা ৩৬।
‘টু বিলিয়ন ডলার ম্যান’
চেয়ারম্যান ও ব্যবস্থাপনা পরিচালককে পদত্যাগে বাধ্য করার পর একে একে ব্যাংকটির জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তাদের বিদায় করা হয়। অন্যদিকে নিচের পর্যায় থেকে কিছু কর্মকর্তাকে শীর্ষ পর্যায়ে নিয়ে আসা হয়, যাঁরা এস আলমের ঘনিষ্ঠ বলে পরিচিত। তাঁরা সবাই একসময় ইসলামী ব্যাংকের চট্টগ্রামের খাতুনগঞ্জ শাখায় কর্মরত ছিলেন। এই শাখার ঋণগ্রহীতা এস আলম।
যেমন মিফতাহ উদ্দিন ছিলেন খাতুনগঞ্জ শাখায় কর্মরত। তাঁর বাড়ি চট্টগ্রামের বাঁশখালীতে। ইসলামী ব্যাংকে এস আলমের নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠার দিনই তাঁকে সহকারী ভাইস প্রেসিডেন্ট পদে পদোন্নতি দেওয়া হয়। এরপর দেড় বছরের মধ্যে তিনি আরও চারটি পদোন্নতি পান। ২০২০ সালের ডিসেম্বরে হয়ে যান নির্বাহী ভাইস প্রেসিডেন্ট এবং এই পুরোটা সময় তিনি খাতুনগঞ্জ শাখার দায়িত্বেই ছিলেন। পরে তাঁকে প্রধান কার্যালয়ে এনে উপব্যবস্থাপনা পরিচালক করা হয়। বড় ঋণ অনুমোদনের দায়িত্ব পান তিনি।
ইসলামী ব্যাংকের একাধিক কর্মকর্তা বলেছেন, হাবিবুর রহমান ‘দুই বিলিয়ন ডলার ম্যান’ নামে পরিচিত। তিনি বৈদেশিক বাণিজ্যের আড়ালে দুই বিলিয়ন ডলার পাচারে সহায়তা করেছেন বলে অভিযোগ রয়েছে। তাঁকে নিয়ে ইসলামী ব্যাংকে অসন্তোষ তৈরি হয়েছিল।
এমন আরেকজন কর্মকর্তা হলেন মোহাম্মদ সাব্বির। মালিকানা পরিবর্তনের দিনই তাঁকে পদোন্নতি দিয়ে বানানো হয় ভাইস প্রেসিডেন্ট এবং খাতুনগঞ্জ শাখায় বদলি করা হয়। পরে দফায় দফায় পদোন্নতি পেয়ে তিনিও উপব্যবস্থাপনা পরিচালক হন। তিনি মিফতাহ উদ্দিনের আগে বড় ঋণ অনুমোদনের দায়িত্বে ছিলেন।
মিফতাহ ও সাব্বিরকে পদোন্নতি দেওয়া হয় ব্যাংকের নিজস্ব নীতিমালা লঙ্ঘন করে। উপব্যবস্থাপনা পরিচালক পদে নিয়োগের ক্ষেত্রে অন্তত ২০ বছরের অভিজ্ঞতা থাকার কথা ছিল। তাঁদের সেই অভিজ্ঞতা ছিল না।
মোহাম্মদ হাবিবুর রহমান নামের এক কর্মকর্তা মালিকানা পরিবর্তনের দিন পদোন্নতি পেয়ে অ্যাসিস্ট্যান্ট ভাইস প্রেসিডেন্ট হন। ২০১৯ ও ২০২০ সালে তিনটি পদোন্নতি এবং ২০২১ সালে একটি পদোন্নতি দিয়ে তাঁকে আন্তর্জাতিক সেবা বিভাগের দায়িত্ব দেওয়া হয়।
ইসলামী ব্যাংকের একাধিক কর্মকর্তা বলেছেন, হাবিবুর রহমান ‘দুই বিলিয়ন ডলার ম্যান’ নামে পরিচিত। তিনি বৈদেশিক বাণিজ্যের আড়ালে দুই বিলিয়ন ডলার পাচারে সহায়তা করেছেন বলে অভিযোগ রয়েছে। তাঁকে নিয়ে ইসলামী ব্যাংকে অসন্তোষ তৈরি হয়েছিল। ২০২৩ সালের নভেম্বরে তাঁকে এস আলমের নিয়ন্ত্রণাধীন এসআইবিএল ব্যাংকের উপব্যবস্থাপনা পরিচালক পদ দিয়ে ইসলামী ব্যাংক থেকে সরানো হয়।
এ এম শহীদুল আরমান নামের এক কর্মকর্তাকে ২০১৭, ২০১৯, ২০২০ ও ২০২২ সালে পদোন্নতি দেওয়া হয়। এরপর তাঁকে ব্যবস্থাপনা পরিচালকের কার্যালয়ে পদায়ন করা হয়। ইসলামী ব্যাংকের একাধিক কর্মকর্তা বলছেন, তাঁর মাধ্যমে এস আলম গ্রুপ থেকে বার্তা আসত। সেই বার্তা অনুযায়ী কাজ করতে হতো ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক মুহাম্মদ মুনিরুল মওলাকে। দুর্নীতির মামলায় মুনিরুল মওলা এখন কারাগারে।
ব্যাংকটির অতিরিক্ত ব্যবস্থাপনা পরিচালক মোহাম্মদ কায়সার আলী ব্যাংকটির মালিকানা পরিবর্তনের সময় ছিলেন খাতুনগঞ্জ শাখার ব্যবস্থাপক। সেদিনই তাঁকে পদোন্নতি দিয়ে এক্সিকিউটিভ ভাইস প্রেসিডেন্টএবং একই বছরের ২২ অক্টোবর সিনিয়র এক্সিকিউটিভ ভাইস প্রেসিডেন্ট করা হয়। এক বছর পর করা হয় উপব্যবস্থাপনা পরিচালক (ডিএমডি)। ২০১৯ সালের জুলাইয়ে তাঁকে অতিরিক্ত এমডি হিসেবে পদোন্নতি দেওয়া হয়। এদিকে ২০২৩ সালের এপ্রিলে ইসলামী ব্যাংকের ডিএমডি পদে যোগ দেন এস আলমের পিএস আকিজ উদ্দিন।
জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের পর এই কর্মকর্তারা আর ব্যাংকে যাননি। তাঁরা আত্মগোপনে রয়েছেন।
বড় বড় পদে নিজেদের লোক বসানোর পাশাপাশি এস আলম ইসলামী ব্যাংকে অনেক কর্মী নিয়োগ দেওয়া শুরু করে, যাঁরা ছিলেন চট্টগ্রামের পটিয়ার বাসিন্দা। এস আলম গ্রুপের চেয়ারম্যান সাইফুল আলমের বাড়ি পটিয়ায়।

ইসলামী ব্যাংকের মানবসম্পদ বিভাগের নথিপত্রে দেখা যায়, ২০১৬ সালে ব্যাংকটিতে ১২ হাজার ৭০০ জনের মতো কর্মী ছিলেন। ২০২৪ সালে তা বেড়ে হয় প্রায় ২৪ হাজার। এস আলমের সময়ে ব্যাংকটিতে ১০ হাজারের মতো কর্মী নিয়োগ করা হয়। জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের পর ব্যাংকটির মানবসম্পদ বিভাগের নিরীক্ষায় উঠে আসে, এস আলমের সময়ে নিয়োগপ্রাপ্ত ব্যক্তিদের মধ্যে ৭০ শতাংশ চট্টগ্রামের এবং ৪৫ শতাংশ পটিয়ার। বড় অংশের নিয়োগ হয়েছিল কোনো বিজ্ঞপ্তি ও পরীক্ষা ছাড়া।
জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের পর প্রায় পাঁচ হাজার কর্মীর নিয়োগ বাতিল করা হয়। তাঁরা এখন নিয়মিত আন্দোলন করছেন। যদিও তাঁদের অনেকের শিক্ষাগত যোগ্যতার সনদ ছিল জাল। অনেককে পরীক্ষায় বসতে বলা হলেও তাঁরা অংশ নেননি।
ইসলামী ব্যাংকের পরিচালনা পর্ষদেও নিজেদের পছন্দমতো লোক বসিয়েছিল এস আলম। ২০১৭ থেকে ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট পর্যন্ত ব্যাংকটির মনোনীত পরিচালক ও স্বতন্ত্র পরিচালকদের মধ্যে রয়েছেন বর্তমান রাষ্ট্রপতি মো. সাহাবুদ্দিন, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক নাজমুল হাসান (পরে ইসলামী ব্যাংকের চেয়ারম্যান হন), চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক সালেহ জহুর ও সেলিম উদ্দিন, সাবেক সেনা কর্মকর্তা আবদুল মতিন, সাবেক পুলিশ কর্মকর্তা আবদুল মাবুদ, সাবেক ব্যাংকার জয়নাল আবেদিন, আবু আসাদ, খুরশিদ উল আলম ও জিল্লুর রহমান, হিসাববিদ মোহাম্মদ সোলায়মান ও মোহাম্মদ নাসির উদ্দিন, ফশিউল আলম, বোরহান উদ্দিন আহমেদ, মোহাম্মদ সিরাজুল করিম, কাজী শহীদুল আলম, মোহাম্মদ কামরুল হাসান, কামাল হোসেন গাজী প্রমুখ।
ইসলামী ব্যাংকে ২০১৭ থেকে শুরু করে ২০২৪ সালের আগস্টে রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের আগপর্যন্ত ব্যবস্থাপনা পরিচালক ছিলেন আবদুল হামিদ মিঞা (২০১৭-২০১৮), মাহবুব-উল আলম (২০১৮-২০২০) ও মুহাম্মদ মনিরুল মওলা (২০২০-২৫)।
সাত ব্যাংকের নিয়ন্ত্রণ
আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে শুধু ইসলামী ব্যাংক নয়; মোট সাতটি ব্যাংক ও একটি আর্থিক প্রতিষ্ঠানের নিয়ন্ত্রণ ছিল এস আলমের হাতে। ইসলামী ব্যাংক ছাড়া বাকিগুলো হলো সোশ্যাল ইসলামী ব্যাংক (এসআইবিএল), ফার্স্ট সিকিউরিটি ইসলামী ব্যাংক, ইউনিয়ন ব্যাংক, আল-আরাফাহ্ ইসলামী ব্যাংক, গ্লোবাল ইসলামী ব্যাংক ও কমার্স ব্যাংক এবং আভিভা ফাইন্যান্স (আগের নাম রিলায়েন্স ফাইন্যান্স)।
নামে–বেনামে শেয়ার কিনে এসব ব্যাংকের নিয়ন্ত্রণ নেওয়া হয়। ব্যাংক কোম্পানি আইন অনুযায়ী, কোনো ব্যাংকের ১০ শতাংশের বেশি শেয়ার একটি পরিবারের কাছে থাকার সুযোগ নেই। বেনামে থাকা শেয়ার বাজেয়াপ্তযোগ্য।
আমাকে বাসা থেকে তুলে ডিজিএফআইয়ের কার্যালয়ে সাইফুল আবেদীনের কক্ষে নেওয়া হয়। এরপর পদত্যাগপত্রে সই নেওয়া হয়।রেজাউল হক, এসআইবিএলের সাবেক চেয়ারম্যান
এসআইবিএলকে দখল করা হয় ইসলামী ব্যাংকের কায়দায়। ২০১৭ সালে এসআইবিএলের শেয়ার কেনে এস আলম। ওই বছরের ৩০ অক্টোবর ব্যাংকটির চেয়ারম্যান মেজর (অব.) মো. রেজাউল হক, নির্বাহী কমিটির চেয়ারম্যান আনিসুল হক, ব্যবস্থাপনা পরিচালক শহিদ হোসেন ও কোম্পানি সচিব হুমায়ুন কবিরকে বাসা থেকে তুলে নিয়ে যাওয়া হয় ডিজিএফআইয়ের কার্যালয়ে। সেখানে তাঁদের পদত্যাগপত্রে সই করতে বাধ্য করা হয়। তখন সংস্থাটির মহাপরিচালক ছিলেন মেজর জেনারেল মো. সাইফুল আবেদীন।
রেজাউল হক সম্প্রতি BNN Breaking Newsকে বলেন, ‘আমাকে বাসা থেকে তুলে ডিজিএফআইয়ের কার্যালয়ে সাইফুল আবেদীনের কক্ষে নেওয়া হয়। এরপর পদত্যাগপত্রে সই নেওয়া হয়।’
একাধিক সূত্র জানিয়েছে, ডিজিএফআইয়ের মহাপরিচালকের কার্যালয়ে তখন সাইফুল আলম, তাঁর ভাই আবদুস সামাদ (লাবু) ও জামাতা বেলাল আহমেদ উপস্থিত ছিলেন।
এসআইবিএলের মালিকানা হস্তান্তরে পরিচালনা পর্ষদের সভা হয়েছিল ঢাকার গুলশানের ওয়েস্টিন হোটেলে। ওই সভায়ও ছিলেন সাইফুল আলম। তখন চেয়ারম্যান করা হয় চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক উপাচার্য আনোয়ারুল আজিম আরিফকে (প্রয়াত)। নতুন ব্যবস্থাপনা পরিচালক হিসেবে নিয়োগ দেওয়া হয় ফার্স্ট সিকিউরিটি ইসলামী ব্যাংকের অতিরিক্ত ব্যবস্থাপনা পরিচালক কাজী ওসমান আলীকে। এ ছাড়া নির্বাহী কমিটির নতুন চেয়ারম্যান করা হয় এনআরবি গ্লোবাল ব্যাংকের ভাইস চেয়ারম্যান বেলাল আহমেদকে।
ব্যাংকটিতে নতুন যাঁরা পরিচালক হন, তাঁদের একজন ছিলেন ডিজিএফআইয়ের সাবেক মহাপরিচালক মোল্লা ফজলে আকবরের স্ত্রী জেবুন্নেছা আকবর। মোল্লা ফজলে আকবর এস আলমের মালিকানাধীন ইউনিয়ন ব্যাংকের চেয়ারম্যান ছিলেন।
আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর ব্যাংক দুটির পর্ষদ পুনর্গঠন করে বাংলাদেশ ব্যাংক। পাঁচটি ব্যাংক একীভূত করার পদক্ষেপ নেওয়া হয়, যার দুটি ইউনিয়ন ব্যাংক ও এসআইবিএল। ডিজিএফআইয়ের যেসব কর্মকর্তা ব্যাংক দখলের মাঠ সাজিয়ে দিয়েছিলেন, ইসলামী ব্যাংকের যেসব পরিচালক ও ব্যাংক কর্মকর্তা এস আলমকে নামে-বেনামে হাজার হাজার কোটি টাকা ঋণ নেওয়ার সুযোগ দিয়েছেন, তাঁদের বেশির ভাগ রয়েছেন ধরাছোঁয়ার বাইরে। সাইফুল আলমও পরিবারসহ বিদেশে।
কত টাকা ঋণ
নিয়ন্ত্রণে থাকা সাতটি ব্যাংক ও একটি আর্থিক প্রতিষ্ঠান এবং অন্যান্য ব্যাংক থেকে বিপুল পরিমাণ টাকা নামে-বেনামে ঋণ নিয়েছে এস আলম গ্রুপ।
জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের পর ক্ষমতাচ্যুত প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার পরিবার ও ১১টি শিল্পগোষ্ঠীর বিরুদ্ধে টাকা পাচার ও অনিয়মের অভিযোগ তদন্তে ‘যৌথ তদন্ত দল’ গঠন করা হয়। ১১টি গ্রুপের মধ্যে অন্যতম এস আলম।
বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, শিল্পগোষ্ঠীটির প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ ঋণের পরিমাণ ২ লাখ ২৫ হাজার ৩০ কোটি টাকা। এস আলমের সম্পদের খোঁজ ও উদ্ধারে দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে ইসলামী ব্যাংককে।
বাংলাদেশ ব্যাংকে গত ১০ মার্চ গভর্নর মোস্তাকুর রহমানের সভাপতিত্বে একটি সভা হয়। এতে ক্ষতিগ্রস্ত ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালকেরা যোগ দেন। সভায় তুলে ধরা হয়, এস আলম গ্রুপের কারণে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে ইসলামী ব্যাংক। পাশাপাশি জনতা ব্যাংক, রূপালী ব্যাংক, ইউসিবি, সাউথইস্ট ব্যাংক, প্রিমিয়ার ব্যাংক, মার্কেন্টাইল ব্যাংক, কমার্স ব্যাংকও ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, শিল্পগোষ্ঠীটির প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ ঋণের পরিমাণ ২ লাখ ২৫ হাজার ৩০ কোটি টাকা। এস আলমের সম্পদের খোঁজ ও উদ্ধারে দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে ইসলামী ব্যাংককে। এস আলমের অর্থ উদ্ধারে ১০টি অপ্রকাশযোগ্য চুক্তি বা এনডিএ স্বাক্ষরিত হবে। ইতিমধ্যে তিনটি সম্পন্ন হয়েছে।
ইসলামী ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক ওমর ফারুক খান গত ২১ ফেব্রুয়ারি BNN Breaking Newsকে বলেন, এস আলমের কাছ থেকে টাকা উদ্ধারে বহুমুখী উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। তবে কোনো টাকা আদায় হচ্ছে না। তিনি আরও বলেন, ‘আমরা চারটি প্রতিষ্ঠান নিয়ে নিরীক্ষা করেছিলাম। বিদেশি একটি প্রতিষ্ঠানও ব্যাংক থেকে টাকা নেওয়ার বিষয়টি নিরীক্ষা করে। সেই প্রতিষ্ঠানকে বিদেশে পাচার করা অর্থ ফিরিয়ে আনতে দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে। আশা করি, এর মাধ্যমে কিছু অর্থ ফেরত আনা সম্ভব হবে। তবে সেটা সময়সাপেক্ষ।’
এস আলম নামে ও বেনামে যত টাকা নিয়েছে, তার সব বিষয় দেশি-বিদেশি নিরীক্ষা প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে বের হয়েছে। বাংলাদেশ ব্যাংকও উদ্ঘাটন করেছে। যার পরিপ্রেক্ষিতে আদালতে মামলা হয়েছে, এটি বিচারাধীন বিষয়।আলতাফ হোসেন, ইসলামী ব্যাংকের ভারপ্রাপ্ত ব্যবস্থাপনা পরিচালক
এদিকে দেশের কয়েকটি পত্রিকায় ৩ মে এস আলম গ্রুপের নামে বিজ্ঞাপন দিয়ে প্রকাশিত একটি প্রতিবাদপত্রে বলা হয়েছে, উদ্দেশ্যমূলকভাবে অন্যান্য ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানের ঋণকে এস. আলম গ্রুপের নামে উপস্থাপন করা হচ্ছে। এটা কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়। এস আলম গ্রুপ একটি পরিবারভিত্তিক শিল্পগোষ্ঠী এবং সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানের দায়ের প্রকৃত পরিমাণ যথাযথভাবে নির্ধারিত ও প্রমাণযোগ্য।
এস আলম আরও বলেছে, স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন থেকে যায়, যদি দায় দ্বিগুণের বেশি হয়ে থাকে, তবে সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের নাম, মালিকানা ও দায়ের পরিমাণ প্রকাশে বাধা কোথায়?
বিষয়টি নিয়ে ইসলামী ব্যাংকের ভারপ্রাপ্ত ব্যবস্থাপনা পরিচালক আলতাফ হোসেন ৩ মে রাতে মুঠোফোনে BNN Breaking Newsকে বলেন, ‘এস আলম নামে ও বেনামে যত টাকা নিয়েছে, তার সব বিষয় দেশি-বিদেশি নিরীক্ষা প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে বের হয়েছে। বাংলাদেশ ব্যাংকও উদ্ঘাটন করেছে। যার পরিপ্রেক্ষিতে আদালতে মামলা হয়েছে, এটি বিচারাধীন বিষয়।’

ইসলামী ব্যাংক এখন
বার্ষিক প্রতিবেদন অনুযায়ী, ২০১৬ সালে ইসলামী ব্যাংকের মুনাফা ছিল প্রায় ৪৪৭ কোটি টাকা। ২০২৫ সালে তা নেমেছে ১৩৭ কোটি টাকায়। তখন খেলাপি ঋণের হার ছিল ৪ দশমিক ২৫ শতাংশ, যা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৪৯ শতাংশে। ব্যাংকটির ৯২ হাজার কোটি টাকার বেশি ঋণ এখন খেলাপি।
ব্যাংকটির শেয়ার মালিকানায় বিদেশি বিনিয়োগকারীদের হিস্যা ৬৩ শতাংশ থেকে কমে ১৭ দশমিক ৯১ শতাংশে (মার্চ, ২০২৬) নেমেছে। অন্যদিকে অন্তর্বর্তী সরকারের আমলে প্রায় ৮২ শতাংশ শেয়ারের সঙ্গে এস আলমের সংশ্লিষ্টতা থাকায় তা জব্দ করে বাংলাদেশ ব্যাংক।
ইসলামী ব্যাংক নিয়ে আবার আলোচনা তৈরি হয়েছে ব্যাংকের চেয়ারম্যান এম জুবায়দুর রহমান ও ব্যবস্থাপনা পরিচালক ওমর ফারুক খান ছুটিতে যাওয়ার পরে। জুবায়দুর এক মাসের ছুটিতে এখন বিদেশে। ওমর ফারুক দেশে। ১২ এপ্রিল ইসলামী ব্যাংকের পরিচালনা পর্ষদের সভায় তাঁদের ছুটি অনুমোদিত হয়।
ওমর ফারুক ১৫ দিনের ছুটি চেয়েছিলেন। বাংলাদেশ ব্যাংকের পরামর্শে তাঁকে ৪৯ দিনের ছুটিতে পাঠানো হয়।
ইসলামী ব্যাংকের দুটি সূত্র বলছে, জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের পর ব্যাংকটিতে জামায়াতে ইসলামী–ঘনিষ্ঠ ব্যক্তিরা শক্তিশালী হয়েছেন। চাকরিচ্যুত কয়েকজন কর্মকর্তাকে ফিরিয়ে এনে বড় পদে বসানো হয়েছে। ব্যাংকটি যাতে আবার জামায়াতের নিয়ন্ত্রণে না যায়, সে জন্যই চেয়ারম্যান ও ব্যবস্থাপনা পরিচালককে আপাতত ছুটিতে পাঠানো হয়েছে।

বিষয়টি নিয়ে ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদের প্রথম অধিবেশনে গত ৩০ এপ্রিল বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য ও স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ বলেন, ব্যাংক দখল আওয়ামী লীগ আমলে যেমন হয়েছে, তেমনি অন্তর্বর্তী সরকারের আমলেও হয়েছে। তিনি বলেন, ‘কেউ ইন্টেলিজেন্স ব্যবহার করে হোটেলে ডেকে নিয়ে করেছে। আবার কেউ সরাসরি নারায়ে তাকবির, আল্লাহু আকবর বলে নেমে গেছে। দখল হয়েছে, স্টাইলটা ছিল একটু ভিন্ন।’
এদিকে বিএনপি সরকার ব্যাংক রেজোল্যুশন অধ্যাদেশের (২০২৫) সংশোধনীতে কিছু টাকা পরিশোধ করে এবং অঙ্গীকারনামা দিয়ে পুরোনো মালিকদের ফেরার সুযোগ করে দিয়েছে। এই অধ্যাদেশ সংসদে পাস করেছে বিএনপি সরকার। ঘটনাটি দেশে বিতর্ক তৈরি করেছে।
জাতীয় সংসদে ২১ এপ্রিল সংসদ সদস্য হাসনাত আবদুল্লাহ জানতে চান, সরকারের সঙ্গে এস আলম গ্রুপের কোনো সমঝোতা হয়েছে কি না?
জবাবে অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী বলেন, বিএনপির রাজনীতিতে অর্থনৈতিক কার্যক্রমের মধ্যে কারও সঙ্গে সমঝোতা করার কোনো সুযোগ নেই। কাউকে ফিরে আসার সুযোগ দিতে ব্যাংক রেজোল্যুশন আইনে সংশোধনী আনা হয়নি। সংশোধনীর জের কত দূর গড়ায়, তা স্পষ্ট হবে আগামী দিনগুলোয়।
প্রশ্ন উঠতে পারে, এই ‘ব্যাংক লুটে’ আপনার কী আসে যায়? মনে রাখবেন, ডলারের মূল্যবৃদ্ধি, রিজার্ভ কমে যাওয়া এবং আপনার সংসার খরচ বেড়ে যাওয়া—এসবের সঙ্গে পরোক্ষভাবে ‘ব্যাংক লুটের’ সম্পর্ক রয়েছে। (শেষ)
প্রচ্ছদ নিয়ে আরও পড়ুন




