খবরের নতুন দিগন্ত উন্মোচন করতে এখনই ভিজিট করুন:www.bnnbreakingnews.com
সম্পাদক ও প্রকাশক : প্রিন্স সালেহ। প্রকাশক কর্তৃক ১২ বীর উত্তম সি আর দত্ত রোড, বাংলামোটর, ঢাকা ১২০৫ থেকে মুদ্রিত।
স্বত্ব © BNN Breaking News (2026)
ওয়েবসাইটের কোনো লেখা, ছবি, ভিডিও অনুমতি ছাড়া ব্যবহার বেআইনি।
বিএনএন ডেস্ক

একটিমাত্র রঙ, সুসংহত রেখা এবং সুবিশাল শূন্যতার মধ্যে স্থাপিত এক সূক্ষ্ম অথচ প্রাণবন্ত চিত্র—এটিই ‘অপরাজিতা’। এই ছবিটি যেন নিছক দৃশ্যের চেয়ে এক গভীরতর রূপক হিসেবেই বেশি অনুভবযোগ্য। চিত্রের এমন সরলীকরণকে শিল্পীর নিজস্ব দৃষ্টিভঙ্গির সারাংশ হিসেবেও দেখা যায়। শিল্পী সম্ভবত বিষয়বস্তুর বাহ্যিক জটিলতা ভেঙে তার অন্তর্নিহিত স্পন্দনে পৌঁছাতে আগ্রহী। তাই এই চিত্রকর্মটি শুধু একটি ফুল বা অবয়বের নিছক উপস্থাপন না হয়ে, তা নীরবতা, একাকীত্ব ও স্থিতির এক বিমূর্ত উপলব্ধিতে পরিণত হয়। এমনকি, শিল্পী ‘অপরাজিতা’কে অবিচল শক্তির প্রতীক বা প্রতিকূলতার মুখেও হার না মানার প্রতিরূপ হিসেবে ফুটিয়ে তুলেছেন, যা আমাদের চিন্তার জগতে গভীর রেখাপাত করে।

এখানে আমরা ইফ্ফাত আরা দেওয়ানের ‘অপরাজিতা’ শিরোনামের চিত্রকর্মটি নিয়ে আলোচনা করছি। ১৯৯৭ সালে আঁকা এই বিশেষ ছবির নাম অনুসারেই বর্তমান প্রদর্শনীর নাম ‘অপরাজিতা’ রাখা হয়েছে। এই প্রদর্শনীতে ১৯৯৭ সাল থেকে ২০২৬ সাল পর্যন্ত নির্মিত বিভিন্ন শিল্পকর্ম উপস্থাপিত হয়েছে। শিল্পকর্মগুলোর শিরোনামেও ভিন্নতা লক্ষণীয়—যেমন ‘কিছু অভিমান’, ‘যদি ভুলে যাও মোরে’, ‘আজি বিজন ঘরে’, ‘ভালো যদি বাস সখী’, ‘এসো আমার ঘরে’, ‘দ্বীপ নেমে মোর বাস্তবায়নে’। এসব শিরোনাম থেকে রবীন্দ্রনাথের ভাব-ভাবনার জগতের প্রভাব স্পষ্ট বোঝা যায়।
‘অপরাজিতা’য় যে গভীরতা ও সারবত্তা খোঁজার প্রবণতা দেখা যায়, তা তাঁর পরবর্তী কাজগুলোতেও নিরবচ্ছিন্নভাবে বিদ্যমান। বিশেষ করে, প্যাস্টেল রঙে আঁকা তাঁর ফুলদানি ও ফুলের চিত্রগুলো শিল্পীর নিজস্ব শৈলীর পরিচয় বহন করে। এই ফুলগুলো বাস্তবতার হুবহু প্রতিচ্ছবি নয়, বরং স্মৃতিতে ভেসে থাকা বিভিন্ন চিহ্নের মতো। নানা আকারের ফুলদানির স্থিরতা এবং ফুলের ক্ষণস্থায়ী সজীবতা একত্রিত হয়ে তাঁর চিত্রকর্মের এক বিশেষ কাব্যিক সৌন্দর্য তৈরি করেছে।

শিল্পীর কাজের অন্যতম প্রধান বৈশিষ্ট্য হলো বিষয়বস্তুর সরলীকরণ। তিনি ক্যানভাসকে সম্পূর্ণভাবে ভরে না তুলে অনেক সময় শূন্য স্থানকেই ছবির এক সক্রিয় ও অপরিহার্য অংশ হিসেবে ব্যবহার করেন। এই শান্ত শূন্যতা দর্শককে মুহূর্তের জন্য স্থির করে তোলে। সেখানে চোখ যা প্রত্যক্ষ করে, তার চেয়েও গভীর কিছু উপলব্ধিতে আসে। এই ধারাটি অনেকটা সংগীতের বিরতির মতো—যেখানে নীরবতা বা না-বাজানো অংশও সুরের মতোই তাৎপর্যপূর্ণ। একজন সংগীতশিল্পী হিসেবে ইফ্ফাত আরা দেওয়ানের অভিজ্ঞতা তাঁর চিত্রকলার ভাষায় এই সূক্ষ্ম ছন্দময়তা যোগ করেছে।

কোমল সুর, ধূসর পরিবেশ এবং একক বা সীমিত রঙের ব্যবহার—এসব মিলিয়ে তাঁর ছবিতে এক স্বপ্নময় অভ্যন্তরীণ জগৎ সৃষ্টি হয়। এখানে আলোর তীব্রতা থাকে না, বরং এক ছায়াময় স্নিগ্ধতা বিরাজ করে। সফট প্যাস্টেলের গুঁড়ো রঙগুলো যেন ক্যানভাসে এসে ধীরে ধীরে মিলিয়ে যায়, ঠিক যেমন কোনো গানের শেষ রেশ দীর্ঘ প্রতিধ্বনি হয়ে মনের গভীরে অনুরণিত হয়। আবার কিছু কিছু শিল্পকর্মে তীব্র উজ্জ্বলতা—যেমন সাদা জমিনের ওপর লাল রঙের ফোঁটা—একটি অদম্য সত্তার পরিচয় দেয়।

এই প্রখ্যাত রবীন্দ্রসংগীতশিল্পী, তাঁর সঙ্গীতের মতোই, চিত্রকর্মের ক্ষেত্রেও বাহ্যিক বিবরণের পরিবর্তে আত্মিক অনুভূতিকে অধিক প্রাধান্য দিয়েছেন। এর ফলস্বরূপ, তাঁর চিত্রকর্মগুলো কেবল চোখ দিয়ে ‘দেখা’ যায় না, বরং তা হৃদয়ের গভীর থেকে অনুভব করতে হয়। তাঁর শিল্পের অনন্যতা ঠিক এই অনুভূতির গভীরতার মধ্যেই প্রোথিত।

এ কারণে ‘অপরাজিতা’ প্রদর্শনীকে শুধুমাত্র একটি সাধারণ শিল্প প্রদর্শন বলা যায় না, এটি শিল্পীর বহু বছরের আত্মিক সাধনার এক অবিরাম প্রতিধ্বনি।
আধুনিক শিল্পের বৈচিত্র্যময় প্রকাশভঙ্গি এবং কৌশলগত জটিলতার মাঝে ইফ্ফাত আরা দেওয়ানের শিল্পকর্ম এক শান্ত, ধীর এবং আত্মমগ্ন অভিজ্ঞতার সৃষ্টি করে। তিনি দর্শককে চমকে দিতে চান না, বরং তাদের ধ্যানমগ্ন এক অনুভূতির জগতে প্রবেশ করাতে চান। ফলস্বরূপ, ‘অপরাজিতা’ প্রদর্শনী নিছকই একটি শিল্প প্রদর্শন নয়, বরং এটি শিল্পীর বহু বছরের গভীর আত্মিক সাধনার এক নিরবচ্ছিন্ন প্রতিচ্ছবি।
শিল্পাঙ্গনের তত্ত্বাবধানে গ্যালারি দ্য ইলিউশনসে ১ মে থেকে শুরু হওয়া এই প্রদর্শনীটি ২০২৬ সালের ১৬ মে পর্যন্ত দর্শকদের জন্য উন্মুক্ত থাকবে।
প্রচ্ছদ নিয়ে আরও পড়ুন




