খবরের নতুন দিগন্ত উন্মোচন করতে এখনই ভিজিট করুন:www.bnnbreakingnews.com
সম্পাদক ও প্রকাশক : প্রিন্স সালেহ। প্রকাশক কর্তৃক ১২ বীর উত্তম সি আর দত্ত রোড, বাংলামোটর, ঢাকা ১২০৫ থেকে মুদ্রিত।
স্বত্ব © BNN Breaking News (2026)
ওয়েবসাইটের কোনো লেখা, ছবি, ভিডিও অনুমতি ছাড়া ব্যবহার বেআইনি।
বিএনএন ডেস্ক

১৯৯০ দশকের গোড়ার দিকে কাতার গুরুতর অর্থনৈতিক সংকটে পড়েছিল, যেখানে উচ্চ ঋণ এবং কম রাজস্ব দেশের আর্থিক ব্যবস্থায় বড় চাপ সৃষ্টি করে। এই অবস্থা থেকে মুক্তি পেতে দেশটি প্রাকৃতিক গ্যাসের উপর বিশাল বিনিয়োগের ঝুঁকি নেয়।
কাতার তার উপকূলবর্তী গ্যাসক্ষেত্রগুলোর উন্নয়নে মনোযোগ দেয় এবং তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস (এলএনজি) উৎপাদন ও জাহাজযোগে বিশ্বব্যাপী রপ্তানির ব্যবস্থা গ্রহণ করে।
এই যুগান্তকারী সিদ্ধান্তের ফলস্বরূপ রাস লাফান নামক একটি উপকূলীয় শিল্পনগরীর পত্তন হয়। রাজধানী দোহা থেকে প্রায় এক ঘণ্টার দূরত্বে অবস্থিত এই শহরটি তিন দশকের মধ্যে বিশ্বের বৃহত্তম এলএনজি রপ্তানিকারক কেন্দ্রে পরিণত হয়, যা কাতারকে বিশ্বের অন্যতম ধনী দেশে রূপান্তরিত করেছে।
তবে গত ১৮ মার্চ কাতারের সেই সাফল্যের ধারায় বড় ধরনের আঘাত আসে। ইরান-ইসরায়েল-যুক্তরাষ্ট্রের চলমান সংঘাতের জেরে ইরানের ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র রাস লাফানের মূল গ্যাস কমপ্লেক্সে হামলা চালায়। এর ফলে বিশ্বব্যাপী এলএনজি সরবরাহের প্রায় ১৭ শতাংশ স্থগিত হয়ে যায়।
এই ক্ষতির ফলে রাষ্ট্রীয় সংস্থা কাতার এনার্জির বছরে প্রায় ২ হাজার কোটি ডলার রাজস্ব হারানোর আশঙ্কা দেখা দিয়েছে। একই সাথে চীনসহ এশিয়ার প্রধান বাজারগুলোতে সরবরাহ ব্যাহত হচ্ছে। ধারণা করা হচ্ছে, ক্ষতিগ্রস্ত অবকাঠামো মেরামত করতে তিন থেকে পাঁচ বছর সময় লাগতে পারে।
যুক্তরাষ্ট্রের কলাম্বিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের সেন্টার অন গ্লোবাল এনার্জি পলিসির জ্যেষ্ঠ গবেষক ক্যারেন ইয়াং মন্তব্য করেন, এই হামলা কেবল বিশ্ব জ্বালানি বাজারের জন্যই একটি বড় ধাক্কা নয়, এটি উপসাগরীয় দেশগুলোর জন্যও উদ্বেগের কারণ। এই দেশগুলো মনে করছে যে চলমান সংঘাতের কারণে তারা মারাত্মক ঝুঁকির সম্মুখীন।

কাতার এনার্জির প্রধান নির্বাহী সাদ আল-কাবি বলেছেন যে, এবারের ক্ষয়ক্ষতি এই অঞ্চলকে ১০ থেকে ২০ বছর পিছিয়ে দেবে।
ইসরায়েল ইরানের সাউথ পার্স গ্যাসক্ষেত্রে বোমা হামলা চালানোর পর ইরান প্রতিশোধমূলক আক্রমণ করে। এই গ্যাসক্ষেত্রটি কাতারের নর্থ ডোম ক্ষেত্রের সীমান্তবর্তী, যা বিশ্বের বৃহত্তম প্রাকৃতিক গ্যাসের মজুদ ধারণ করে।
চলমান এই সংঘর্ষে এখন পর্যন্ত উপসাগরীয় অঞ্চলের প্রায় ৫ হাজার ৮০০ কোটি ডলারের সমপরিমাণ ক্ষতি হয়েছে বলে একটি হিসাব থেকে জানা যায়।
আন্তর্জাতিক জ্বালানি সংস্থার তথ্যমতে, ২৮ ফেব্রুয়ারি যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল ইরানে আক্রমণ শুরু করার পর থেকে ৮০টিরও বেশি স্থাপনায় হামলা হয়েছে। এর এক-তৃতীয়াংশের বেশি স্থাপনা মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। কাতারের পাশাপাশি বাহরাইন, কুয়েত, সৌদি আরব এবং সংযুক্ত আরব আমিরাতেও ক্ষতির খবর পাওয়া গেছে, যা পুরো অঞ্চলকে এক বিশাল অর্থনৈতিক বিপর্যয়ের মুখে ঠেলে দিয়েছে।
যুদ্ধ পরিস্থিতির কারণে বিশ্বব্যাংক ইতিমধ্যেই মধ্যপ্রাচ্যের চলতি বছরের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির পূর্বাভাস ১.৮ শতাংশে নামিয়ে এনেছে। পূর্বে ২০২৬ সালের জন্য ৪ শতাংশ প্রবৃদ্ধির পূর্বাভাস দেওয়া হয়েছিল। সংস্থাটি একই সাথে দীর্ঘমেয়াদী অর্থনৈতিক ক্ষতির আশঙ্কার কথাও জানিয়েছে।

বিশ্বব্যাংকের প্রতিবেদন অনুযায়ী, কাতার ও কুয়েত সবচেয়ে বেশি অর্থনৈতিক সংকোচনের মুখোমুখি হতে পারে। এর বিপরীতে, সৌদি আরব ও সংযুক্ত আরব আমিরাত তুলনামূলকভাবে বেশি স্থিতিশীল অবস্থায় রয়েছে, কারণ তারা তেল রপ্তানির জন্য হরমুজ প্রণালীর উপর সম্পূর্ণভাবে নির্ভরশীল নয়।
আঞ্চলিক গবেষণা প্রতিষ্ঠান খালিজ ইকোনমিকসের পরিচালক জাস্টিন আলেকজান্ডার বলেছেন যে, এই যুদ্ধ উপসাগরীয় দেশগুলির উপর গুরুতর প্রভাব ফেলছে। তবে, সংঘাত চলমান থাকায় ক্ষয়ক্ষতির সম্পূর্ণ চিত্র এখনো সঠিকভাবে নিরূপণ করা কঠিন।
আলেকজান্ডার আরও উল্লেখ করেন, যুদ্ধ আজ শেষ হলেও স্বাভাবিক অবস্থায় ফিরতে দীর্ঘ সময় লাগবে। অর্থাৎ, এই যুদ্ধের দীর্ঘস্থায়ী পরিণতি ভোগ করতে হবে। অর্থনীতি কেবল জ্বালানি অবকাঠামোর ক্ষতির মাধ্যমেই প্রভাবিত হয় না, এর প্রভাব আরও ব্যাপক।
হরমুজ প্রণালী বন্ধ হয়ে যাওয়ায় তেল ও গ্যাস রপ্তানি উল্লেখযোগ্যভাবে কমে গেছে, যা সংকটকে আরও গভীর করেছে। সাধারণত বিশ্বের মোট তেল ও এলএনজির প্রায় ২০ শতাংশ এই প্রণালী দিয়ে পরিবাহিত হয়।
এই হরমুজ প্রণালী উপসাগরীয় দেশগুলোর অর্থনীতির জন্য অপরিহার্য। সৌদি আরব এখন পূর্ব-পশ্চিম পাইপলাইন ব্যবহার করে ইয়ানবু বন্দরে তেল পাঠাতে বাধ্য হচ্ছে। সংযুক্ত আরব আমিরাত ফুজাইরাহ পাইপলাইন ব্যবহার করে হরমুজ প্রণালী এড়িয়ে যাওয়ার চেষ্টা করছে। তবে, স্বাভাবিক সময়ে হরমুজ দিয়ে যে পরিমাণ জ্বালানি পরিবহন করা হয়, বিকল্প ব্যবস্থায় তার অর্ধেকেরও কম পরিবহন করা সম্ভব হচ্ছে।
আন্তর্জাতিক জ্বালানি সংস্থার প্রধান এই পরিস্থিতিকে 'ইতিহাসের সবচেয়ে বড় জ্বালানিসংকট' হিসেবে অভিহিত করেছেন। অন্যদিকে, কাতারের অর্থমন্ত্রী সতর্ক করেছেন যে ইরান যুদ্ধের সম্পূর্ণ অর্থনৈতিক প্রভাব এখনো অনুধাবন করা যায়নি।
কুয়েত বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক এবং চ্যাটহ্যাম হাউসের ফেলো বাদের আল সাইফ মনে করেন, এই সংকটের ফলে কাতার, কুয়েত এবং বাহরাইনের মতো দেশগুলো ট্যাংকার জাহাজের বিকল্প হিসেবে পাইপলাইন নেটওয়ার্ক গড়ে তুলতে উৎসাহিত হতে পারে।
আল সাইফ আরও বলেন, তেল ও গ্যাস পরিবহনের জন্য তারা কেবল একটি পথের উপর নির্ভর করতে পারে না। আজ ইরান হুমকি সৃষ্টি করেছে; ভবিষ্যতে অন্য কোনো বাহ্যিক হুমকিও আসতে পারে।

অন্যান্য খাতে প্রভাব
এই অর্থনৈতিক সংকট কেবল জ্বালানি খাতের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়; বরং ভ্রমণ ও পর্যটন খাতেও বড় ধরনের আঘাত হেনেছে। উপসাগরীয় অঞ্চলের কয়েকটি দেশের অর্থনৈতিক বৈচিত্র্যকরণের অন্যতম প্রধান ভিত্তি এই খাত।
ওয়ার্ল্ড ট্রাভেল অ্যান্ড ট্যুরিজম কাউন্সিল গত মার্চ মাসে জানিয়েছে যে, যুদ্ধ শুরু হওয়ার পর থেকে মধ্যপ্রাচ্য প্রতিদিন প্রায় ৬০ কোটি ডলার পর্যটন আয় হারিয়েছে।
গত কয়েক দশকে সংযুক্ত আরব আমিরাত নিজেদেরকে বিশ্ব পর্যটনের কেন্দ্রে পরিণত করতে প্রচুর অর্থ ও সময় বিনিয়োগ করেছে। এই যুদ্ধে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত উপসাগরীয় দেশগুলির মধ্যে এটি অন্যতম। দুবাইয়ে হোটেলের আগাম বুকিং কমে যাওয়া, ব্যাপক হারে কক্ষ বাতিল এবং গ্রাহক সংখ্যা হ্রাস পাওয়ার মতো লক্ষণগুলো থেকে বোঝা যায় যে পরিস্থিতি অনুকূল নয়। এর ফলস্বরূপ অনেকে চাকরি হারাচ্ছে বা তাদের বেতনবিহীন ছুটিতে পাঠানো হচ্ছে।
আর্থিক ব্যবস্থাতেও বড় ধরনের চাপের ইঙ্গিত দেখা যাচ্ছে। গত মাসে ডোনাল্ড ট্রাম্প বলেছিলেন যে, ডলার সংকট মোকাবিলায় যুক্তরাষ্ট্র সংযুক্ত আরব আমিরাতসহ উপসাগরীয় মিত্রদের জন্য মুদ্রা বিনিময়ের সুবিধা বাড়ানোর কথা বিবেচনা করছে।
এই ধরনের ব্যবস্থার মাধ্যমে কেন্দ্রীয় ব্যাংকগুলো সহজে মার্কিন ডলার পেতে পারে, যদিও সংযুক্ত আরব আমিরাত এই প্রস্তাবকে খুব বেশি গুরুত্ব দিচ্ছে না। যুক্তরাষ্ট্রে দেশটির রাষ্ট্রদূত ইউসুফ আল ওতাইবা মন্তব্য করেন যে, তাদের আর্থিক সহায়তার প্রয়োজন, এমন ধারণা বাস্তবতার ভুল ব্যাখ্যা।
সংযুক্ত আরব আমিরাত একই সাথে ওপেক থেকে বেরিয়ে যাওয়ার ঘোষণা দিয়েছে। এর ফলে দেশটি তেল রপ্তানি বাড়ানোর ক্ষেত্রে আরও বেশি স্বাধীনতা লাভ করেছে। বিশ্বের মোট তেল সরবরাহের প্রায় ৩৭ শতাংশ নিয়ন্ত্রণকারী এই জোটে আমিরাত ছিল চতুর্থ বৃহত্তম উৎপাদক।
বৃহত্তর মধ্যপ্রাচ্যের দিকে তাকালে দেখা যায়, গাজা, লেবানন এবং সিরিয়ার অর্থনীতি পুনর্গঠনে তেল সমৃদ্ধ উপসাগরীয় দেশগুলোর আর্থিক সহায়তা অত্যন্ত জরুরি। কিন্তু সেই দেশগুলো এখন নিজেরাই ক্ষতির মুখে।
জাস্টিন আলেকজান্ডার বলেছেন যে, এই পরিস্থিতিতে লেবানন ও সিরিয়ার মতো দেশগুলোর পক্ষে হয়তো প্রচুর সহায়তা ও বিনিয়োগ পাওয়া সহজ হবে না।

অর্থনৈতিক কাঠামোতে প্রভাব
এই সংঘাতের ফলে উপসাগরীয় দেশগুলির অর্থনৈতিক বৈচিত্র্যকরণের কর্মসূচিতেও প্রভাব পড়তে পারে। তেলের উপর নির্ভরতা কমাতে তারা কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, ক্রীড়া এবং বিনোদন খাতে শত শত কোটি ডলার বিনিয়োগ করেছে।
সৌদি আরব ও সংযুক্ত আরব আমিরাত নিজেদেরকে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ও প্রযুক্তির আঞ্চলিক কেন্দ্র হিসেবে গড়ে তোলার জন্য বিশাল বিনিয়োগ করেছে, যার প্রধান লক্ষ্য দক্ষ জনশক্তি আকর্ষণ করা।
কিছু বিশ্লেষক প্রশ্ন তুলছেন যে, এই পরিস্থিতিতে উপসাগরীয় দেশগুলো যুক্তরাষ্ট্রে তাদের বিনিয়োগ কমাতে পারে কিনা। বাদের আল সাইফ বলেন, এটি সম্ভব যে উপসাগরীয় দেশগুলো যুক্তরাষ্ট্রে ট্রিলিয়ন ও বিলিয়ন ডলার বিনিয়োগের যে প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল, তা নিয়ে কিছু দেশ নতুন করে বিবেচনা করবে।
বিশ্লেষকরা আশঙ্কা করছেন যে, ইরানের সাথে সংঘাত নিরসনে স্থায়ী চুক্তি না হলে এবং হরমুজ প্রণালী খোলা রাখার নিশ্চয়তা না মিললে অর্থনৈতিক চাপ আরও বাড়তে পারে।
তারা মনে করেন, এই পরিস্থিতিতে উপসাগরীয় দেশগুলোকে দীর্ঘমেয়াদী অস্থিতিশীলতার জন্য প্রস্তুত থাকতে হবে। যদি কোনো সমঝোতা না হয়, তাহলে এই অঞ্চলে দীর্ঘ সময় ধরে সংঘাত চলতে পারে, এমনকি তার তীব্রতা কম হলেও।
প্রচ্ছদ নিয়ে আরও পড়ুন








