খবরের নতুন দিগন্ত উন্মোচন করতে এখনই ভিজিট করুন:www.bnnbreakingnews.com
সম্পাদক ও প্রকাশক : প্রিন্স সালেহ। প্রকাশক কর্তৃক ১২ বীর উত্তম সি আর দত্ত রোড, বাংলামোটর, ঢাকা ১২০৫ থেকে মুদ্রিত।
স্বত্ব © BNN Breaking News (2026)
ওয়েবসাইটের কোনো লেখা, ছবি, ভিডিও অনুমতি ছাড়া ব্যবহার বেআইনি।
বিএনএন ডেস্ক

চট্টগ্রামের সন্দ্বীপের অর্থনীতির মূল চালিকাশক্তি এখন রেমিট্যান্স। সত্তরের দশক থেকে শুরু হওয়া বিদেশযাত্রার ধারা আজও চলমান। বর্তমানে দ্বীপটির প্রায় প্রতিটি পরিবারেই একাধিক প্রবাসী সদস্য রয়েছেন, যা তাদের জীবনযাত্রার মান আমূল বদলে দিয়েছে। শুধু জীবনমানই নয়, প্রবাসী অর্থের ওপর ভিত্তি করে স্থানীয় পর্যায়ে নতুন নতুন ব্যবসাও গড়ে উঠছে।
সন্দ্বীপের সন্তোষপুর ইউনিয়নের উত্তর সন্তোষপুর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের পাশেই চোখে পড়ে চোখ ধাঁধানো একতলা একটি পাকা দালান। আধুনিক টাইলস ও নান্দনিক নকশায় তৈরি বাড়িটি যেন বদলে যাওয়া গ্রামের চিত্র ফুটিয়ে তুলছে। একসময় যেখানে টিনের আধাপাকা বাড়ির সংখ্যাই বেশি ছিল, আজ সেখানে সারি সারি অট্টালিকা। কৃষিপ্রধান এই জনপদের বাসিন্দাদের ভাগ্য বদলে দিয়েছে মূলত প্রবাসীদের পাঠানো অর্থ।
গ্রামের কৃষিজমির পাশে গড়ে উঠেছে আধুনিক কৃষি খামার। একসময় আরব আমিরাতে কাজ করা মনিরুজ্জামান দেশে ফিরে গড়ে তুলেছেন ‘সতেজ কৃষি খামার’, যেখানে ধান, মাছ, হাঁস ও সবজির সমন্বিত চাষাবাদ হচ্ছে। তাঁর এই উদ্যোগ কর্মসংস্থানের নতুন দুয়ার খুলে দিয়েছে।
সৌদিপ্রবাসী আরিফুল ইসলামের বাবা মো. ছুফিয়ান জানান, ১৯৮৫ সালে নিজে পাকিস্তানে গিয়ে তেমন সুবিধা করতে না পারলেও, আজ তাঁর দুই ছেলে বিদেশে গিয়ে সংসারের হাল ধরেছেন। টিনের ছাপরা ঘরের বদলে এখন তাঁরা পাকা বাড়িতে থাকছেন।
সন্তোষপুরের ৩ নম্বর ওয়ার্ডের চিত্রটি আরও স্পষ্ট। ইউপি সদস্য মো. আশরাফ জানান, মাত্র একটি ওয়ার্ডেরই অন্তত ৩০০ জন বাসিন্দা বিদেশে রয়েছেন। কয়েক দশকে এলাকাটি যে পরিমাণ দৃশ্যমান উন্নতি করেছে, তা কেবল রেমিট্যান্সের কল্যাণে সম্ভব হয়েছে।
অন্তর্বর্তী সরকারের সাবেক উপদেষ্টা ফাওজুল কবির খান ২০২৫ সালে সন্দ্বীপে আয়োজিত এক অনুষ্ঠানে মন্তব্য করেছিলেন যে, সন্দ্বীপের প্রবাসীরা দেশের মোট রেমিট্যান্সের ১৩ শতাংশ জোগান দেন। তিনি জানান, বাংলাদেশ ব্যাংকের কর্মকর্তাদের কাছ থেকে এই তথ্যটি তিনি শুনেছেন, যদিও সরকারিভাবে উপজেলাভিত্তিক কোনো পরিসংখ্যান নেই। তবে সন্দ্বীপের প্রবাসী আয়ের যে বিপুল প্রভাব রয়েছে, তা অনস্বীকার্য।
সন্দ্বীপের প্রায় প্রতিটি গ্রামেই পরিবর্তনের হাওয়া লেগেছে। জনশক্তি কর্মসংস্থান ও প্রশিক্ষণ ব্যুরোর (বিএমইটি) তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালেই ২ হাজার ৮০ জন সন্দ্বীপের বাসিন্দা কাজের সন্ধানে বিদেশে পাড়ি দিয়েছেন। মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন দেশের পাশাপাশি যুক্তরাজ্য, ইতালি, স্পেন ও যুক্তরাষ্ট্রের মতো দেশগুলোতেও সন্দ্বীপের বিশাল জনগোষ্ঠী কর্মরত।

অন্তর্বর্তী সরকারের সাবেক উপদেষ্টা ফাওজুল কবির খান গত বছর এক অনুষ্ঠানে সন্দ্বীপের প্রবাসী আয় সম্পর্কে বলেছিলেন, দেশের মোট রেমিট্যান্সের একটি উল্লেখযোগ্য অংশ আসে এই উপজেলা থেকে। তিনি জানান, তথ্য-উপাত্তের অভাব থাকলেও সন্দ্বীপের মানুষ যে পরিমাণ বৈদেশিক মুদ্রা দেশে পাঠাচ্ছেন, তা দেশের অর্থনীতিতে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
রেমিট্যান্স বিশেষজ্ঞ ও বিআইবিএমের অধ্যাপক প্রশান্ত কুমার ব্যানার্জি জানান, বাংলাদেশের ৪৯৫টি উপজেলার মধ্যে রেমিট্যান্স পাঠানোর তালিকায় সন্দ্বীপের অবস্থান শীর্ষে থাকবে। আনুষ্ঠানিক পরিসংখ্যানের সীমাবদ্ধতা থাকলেও দেশটির অর্থনীতিতে সন্দ্বীপের অবদান যে বিশাল, সে বিষয়ে কোনো সন্দেহ নেই। হারামিয়া এলাকার মতো গ্রামেও এমন পরিবার আছে, যাদের অন্তত ৬৩ জন সদস্য কাতারে কর্মরত আছেন।
মাইটভাঙ্গা ইউনিয়নে অবস্থিত দোতলা বাড়িগুলো দেখলে মনে হয় এটি কোনো অভিজাত এলাকা। দুবাইপ্রবাসী শাহাদাত হোসেনের নকশাদার স্তম্ভ আর ঝুলবারান্দা সংবলিত বাড়িটি এলাকাটির চিত্র বদলে দিয়েছে। প্রবাসীদের বিনিয়োগে গড়ে ওঠা এসব আধুনিক বাড়ি সন্দ্বীপের নতুন পরিচিতি তৈরি করেছে।
আধুনিক আবাসন ও বাণিজ্য
মাইটভাঙ্গার প্রতিটি মোড়ে গড়ে উঠছে নান্দনিক সব অট্টালিকা। দুবাই কিংবা যুক্তরাষ্ট্রপ্রবাসী মালিকদের এসব বাড়ি এলাকার সৌন্দর্য বাড়িয়ে দিয়েছে। ব্যবসায়ী জিয়াউল আহসান জানান, প্রবাসীদের পাঠানো অর্থে স্থানীয় গ্রামীণ অর্থনীতি বেশ চাঙা। নিত্যপণ্যের দোকান থেকে শুরু করে খাবারের দোকান—সবই এখন প্রবাসী পরিবারের চাহিদা মেটাতে ব্যস্ত।

যুক্তরাষ্ট্রপ্রবাসীর বাড়ির সদস্য শফিউল আযম জানান, তাঁর পরিবারের সাত সদস্য আমেরিকায় রয়েছেন। তিনিও সেখানে যাওয়ার প্রক্রিয়ায় আছেন। এদিকে, স্থানীয় আকবরহাটের পোশাকের দোকানগুলোতে ভালো ব্র্যান্ডের শাড়ি ও পোশাকের চাহিদা প্রচুর। ব্যবসায়ীরা জানান, এখানকার অন্তত ৮০ শতাংশ ক্রেতাই প্রবাসী পরিবারের সদস্য।
সন্দ্বীপের মানুষের বিদেশ যাওয়ার ইতিহাস অনেক দীর্ঘ। ব্রিটিশ আমল থেকেই বাণিজ্যিক জাহাজে নাবিক হিসেবে কাজ করার মধ্য দিয়ে যে বিদেশযাত্রার শুরু, পরবর্তী সময়ে আশির দশকে তা প্রবাসী স্রোতে পরিণত হয়।
মুন্সীরহাটসহ এলাকার বিকাশ এজেন্টরা জানান, তাদের দৈনিক লেনদেনের বেশির ভাগই প্রবাসী পরিবারের অর্থ সংক্রান্ত। ব্যাংকিং খাতের তথ্য অনুযায়ী, স্থানীয় ব্যাংকগুলোর মোট লেনদেনের প্রায় ৬০ শতাংশই রেমিট্যান্স কেন্দ্রিক। স্ট্যান্ডার্ড ইসলামী ব্যাংকের শাখা ব্যবস্থাপক পারভেজ-উর-রহমান এই তথ্য নিশ্চিত করেছেন।

বিদেশের পথে যেভাবে
ইতিহাসবিদদের মতে, সন্দ্বীপের মানুষদের বিদেশমুখী হওয়ার বিষয়টি দীর্ঘদিনের চর্চা। ‘সন্দ্বীপ সন্দর্শন’ ও ‘সন্দ্বীপের ইতিহাস’ গ্রন্থগুলোতে দেখা যায়, লস্কর বা নাবিক হিসেবে প্রথম প্রজন্মের যাত্রার মাধ্যমেই আন্তর্জাতিক বাজারে সন্দ্বীপের শ্রমশক্তির প্রবেশ ঘটে। আশির দশকে মধ্যপ্রাচ্যের বাজার এবং পরে পশ্চিমা বিশ্বে যাওয়ার ঝোঁক দ্বীপটিকে প্রবাসী নির্ভর অর্থনীতিতে পরিণত করে।
'দেশের প্রায় ৪৯৫টি উপজেলার মধ্যে প্রবাসী আয়ের দিক থেকে সন্দ্বীপ ওপরের দিকেই থাকবে। যদিও আনুষ্ঠানিক কোনো পরিসংখ্যান নেই, তবুও সন্দ্বীপ যে রেমিট্যান্সের এক বড় উৎস, তা নিশ্চিতভাবে বলা যায়।'অধ্যাপক প্রশান্ত কুমার ব্যানার্জি, রেমিট্যান্স বিশেষজ্ঞ ও বিআইবিএমের অধ্যাপক।
প্রতারণার ঝুঁকি
বিদেশ যাওয়ার ক্ষেত্রে পর্যাপ্ত দক্ষতার অভাব এবং দালালদের প্রতারণার শিকার হয়ে অনেকের স্বপ্ন ধূলিসাৎ হচ্ছে। আরিফ হোসেনের মতো অনেকে সর্বস্ব খুইয়ে দ্রুত দেশে ফিরতে বাধ্য হচ্ছেন। প্রবাসীকল্যাণ ব্যাংকের কর্মকর্তা তানজিম উল হক সতর্ক করে বলেন, ভুয়া ভিসা ও প্রতারণামূলক চুক্তিপত্র থেকে সাবধান থাকতে হবে। পাশাপাশি বিদেশগামীদের প্রশিক্ষণের ওপর জোর দেওয়া প্রয়োজন।

সন্দ্বীপ সরকারি কারিগরি প্রশিক্ষণকেন্দ্রের অধ্যক্ষ মুহাম্মদ শরফুদ্দিন জানান, দক্ষ শ্রমিক তৈরির লক্ষ্য নিয়ে তারা কাজ করছেন। গত বছর এই কেন্দ্র থেকে ৭৫০ জন প্রশিক্ষণ নিয়েছেন। বর্তমানে তিন শতাধিক শিক্ষার্থী বিভিন্ন গ্রেডে প্রশিক্ষণ নিচ্ছেন, যাতে ভবিষ্যতে তারা বৈধ পথে ও দক্ষতা নিয়ে বিদেশে যেতে পারেন।
প্রচ্ছদ নিয়ে আরও পড়ুন








