খবরের নতুন দিগন্ত উন্মোচন করতে এখনই ভিজিট করুন:www.bnnbreakingnews.com
সম্পাদক ও প্রকাশক : প্রিন্স সালেহ। প্রকাশক কর্তৃক ১২ বীর উত্তম সি আর দত্ত রোড, বাংলামোটর, ঢাকা ১২০৫ থেকে মুদ্রিত।
স্বত্ব © BNN Breaking News (2026)
ওয়েবসাইটের কোনো লেখা, ছবি, ভিডিও অনুমতি ছাড়া ব্যবহার বেআইনি।
বিএনএন ডেস্ক

দিল্লি অঞ্চলের কবি ও সাহিত্যিকগণ ফারসি, হিন্দি এবং এই ভাষাগুলির মিশ্রণে গঠিত উপভাষাগুলোর উন্মোচনে বিশাল ভূমিকা রেখেছেন। তাঁদের মধ্যে অনেকে ইতিহাসের পাতায় অমর হয়ে আছেন, আবার অনেকে রয়ে গেছেন বিস্মৃতির আড়ালে। মোগল সাম্রাজ্যের পতনের সেই অস্থির সময়ে এক প্রভাবশালী কবি ছিলেন জাফর জাতাল্লি, যিনি ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপটে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হওয়া সত্ত্বেও বেশিরভাগ ভাষাবিদ ও ইতিহাসবিদের কাছে অবহেলিতই থেকে গেছেন। জাতাল্লির রচনা শুধু যে বিপ্লবাত্মক ছিল তাই নয়, সেগুলোতে এক ধরনের মর্মপীড়া বা মানসিক আঘাতের উপাদানও ছিল।
উর্দু কাব্যধারায় ব্যঙ্গাত্মক বা তীব্র ক্ষোভপূর্ণ এই বৈশিষ্ট্যটি ‘শের-আশোবর’ (দুর্ভাগ্যের কবিতা) নামক একটি প্রধান ধারা থেকে উদ্ভূত হয়, যা তখনো ‘উর্দু’ নামে পরিচিত ছিল না। আওরঙ্গজেব আলমগীরের মৃত্যুর পর মোগল বংশের দুর্বল উত্তরাধিকারীদের শাসনামলে দিল্লি বারবার নাদির শাহ, আহমদ শাহ আবদালীর মতো আগ্রাসী লুটেরা বাহিনীর ভয়াবহ আক্রমণে ক্ষতবিক্ষত হয়েছিল। সে সময় দিল্লির এমন দুর্দশা কোনো নতুন বা ব্যতিক্রমী ঘটনা ছিল না। সম্ভবত এই পটভূমি থেকেই ‘শের-আশোবর’ ধারার কবিতার জন্ম।
আওরঙ্গজেব আলমগীরের সমসাময়িক কবি জাফর জাতাল্লিকে (১৬৫৮-১৭১৩ খ্রি.) এই ধারার প্রবর্তক হিসেবে ধরা হয়। তিনি দিল্লির কাছে নার্নাউল (বর্তমানে ভারতের হরিয়ানা রাজ্যে অবস্থিত) নামক একটি গ্রামে এক সৈয়দ পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন। তাঁর আসল নাম ছিল মীর মুহাম্মদ জাফর, আর ‘জাতাল্লি’ ছিল তাঁর ছদ্মনাম বা তখল্লুস। ‘জাতাল্লি’ শব্দের আভিধানিক অর্থ হলো ‘যে অনর্গল অর্থহীন কথা বলে’ অথবা ‘যে উদ্ভট বকবক করে’। এই নামকরণের মাধ্যমেই বোঝা যায়, তিনি তাঁর কবিতার প্রকৃতির বিষয়ে কতটা সচেতন ছিলেন।
ফারসি ও হিন্দি ভাষায় এবং ‘রেখতা’ শৈলীতে সুশিক্ষিত জাতাল্লি তাঁর কবিতায় মোগল শাসনের ক্রমক্ষয়িষ্ণু দশার কঠোর সমালোচনা করেছেন। তিনি নির্ভীক, ক্রুদ্ধ এবং প্রতিবাদী সুরে লিখে গেছেন, যার চূড়ান্ত মূল্য তাকে দিতে হয়েছিল। আওরঙ্গজেবের উত্তরসূরি ফররুখসিয়ার যখন সিংহাসনে আরোহণ করেন এবং নতুন মুদ্রা (সিক্কা) চালু করেন, সেই মুদ্রায় খোদিত একটি কবিতার তীব্র সমালোচনা করার অপরাধে জাতাল্লিকে মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হয়। মুদ্রায় সাধারণত সম্রাটের প্রশংসামূলক শ্লোক উৎকীর্ণ করার রীতি প্রচলিত ছিল। কিন্তু জাতাল্লি নিজের রচিত আরেকটি কবিতার মাধ্যমে সেটিকে তীব্র ব্যঙ্গ করেছিলেন।
ফররুখসিয়ার বাদশাহ হিসেবে অভিষিক্ত হওয়ার পর চালু করা সিক্কা টাকায় উৎকীর্ণ তাঁর প্রশস্তিটি ছিল:
সিক্কা জাদ আজ ফজল-ই হক বার সিম ও জার
পাদশাহ-ই বাহার-ও-বার ফররুখসিয়ার।
বাংলা অনুবাদ ছিল:
সত্য খোদার আশিসে বানালেন মুদ্রা সোনা ও রুপার
জমিন ও সাগরের বাদশাহ ফররুখসিয়ার।
—(অনুবাদ: লেখক)
জাতাল্লি এর প্যারোডি করে লিখেছিলেন:
সিক্কায়ে জাদ বার্গান্দুম ওয়া মথ ওয়া মাতার
বাদশাহ হ্যায় তসমা কাশ ফররুখসিয়ার
বাংলা অনুবাদ ছিল:
চালু করা মুদ্রাগুলো ডাল আর মটরদানার,
কারণ জুতোর ফিতে দিয়ে মানুষ মারেন বাদশাহ ফররুখসিয়ার।
—(অনুবাদ: লেখক)
জাতাল্লির এই বিদ্রূপাত্মক পঙ্ক্তিগুলো পাঠ করার পর ফররুখসিয়ার আদেশ দেন যে, এই দুর্বিনীত কবির গলায় সত্যি সত্যিই জুতার ফিতে পরিয়ে তাঁকে হত্যা করা হোক। জাতাল্লির কবিতা যথাযথভাবে বুঝতে হলে তাঁর সময়ের সামাজিক-রাজনৈতিক পরিস্থিতি গভীরভাবে উপলব্ধি করা জরুরি। আওরঙ্গজেবের প্রতি জাতাল্লির মনোভাব ছিল একই সাথে প্রেম ও ঘৃণার মিশ্রণ। যদিও তিনি তাঁর কবিতায় আওরঙ্গজেবের কঠোর সমালোচনা করেছেন, তবে পাশাপাশি তাঁর প্রশাসনিক দক্ষতার প্রশংসাও করেছেন। আওরঙ্গজেবের মৃত্যুর পর একের পর এক দুর্যোগ ও পতনের যুগ শুরু হয়। জাতাল্লির কবিতার উপাদানের তখন কোনো অভাব ছিল না। তিনি আলমগীরের পরবর্তী মোগল সম্রাটদের সমস্ত ব্যর্থতা, পরাজয় এবং অকৃতকার্যতাকে毫不 দ্বিধায় কঠিন ভাষায় বিদ্রূপ করেছেন।

নিজের রচনায় তীব্র শ্লেষ ও কঠোর সমালোচনার ব্যবহারের পক্ষে যুক্তি দিয়ে জাতাল্লি একবার বলেছিলেন: ‘জব গুস্সা হদ্ পার কর জায়ে তো আদমি গালিয়াঁ হি বকতা হ্যায়।’ এর বাংলা অর্থ হলো: যখন ক্রোধ সীমা অতিক্রম করে যায়, তখন মানুষ শুধু কটূক্তিই করে। —(অনুবাদ: লেখক)
উর্দু ভাষা তখন একটি পরিবর্তনের মধ্য দিয়ে যাচ্ছিল; মৌখিক ও লিখিত উভয় ক্ষেত্রেই নতুন নতুন শব্দ প্রবেশ করছিল। সমাজের শিক্ষিত অভিজাত শ্রেণী তখনও ফারসি ব্যবহার করত, কিন্তু অল্প কিছু কবি-সাহিত্যিক খসরুর ধারা অনুসরণ করে হিন্দি ও ফারসির মিশ্রিত একটি ভাষা নিয়ে পরীক্ষা-নিরীক্ষা চালাচ্ছিলেন। এই ভাষাকে তখন 'রেখতা' বলা হতো। একটি সম্মানজনক ভাষা হিসেবে ‘উর্দু’ নামটি তখনও প্রচলিত বা সর্বজনীনভাবে গৃহীত হয়নি। জাতাল্লি তাঁর জীবন্ত রচনায় এই পরিস্থিতি চমৎকারভাবে তুলে ধরে লিখেছেন:
‘অগরসে হুমা কুদাও কর্করতস্ত
বা হিন্দি-দাশিন্দি জুবান
ওয়া লেকিন কিসি নে ভলি ইয়েহ্ কহি
জিসে পিছু চাহে, সুহাগন ওয়হি।’
এর বাংলা ভাবার্থ হলো:
যদিও এটাকে মনে হয় যেন আবর্জনা
এই হিন্দি ছোটলোকের ভাষা
তবু কেউ কেউ বলে থাকে
যাকে তুমি ভালোবাসো
সে-ই তোমার বধূ হবে।
—(অনুবাদ: লেখক)
নিজের কবিতায় কঠোর ব্যঙ্গবিদ্রূপ এবং তীক্ষ্ণ সমালোচনার ব্যবহারের কারণ ব্যাখ্যা করতে গিয়ে জাতাল্লি বলেছেন:
‘জব গুস্সা হদ্ পার কর জায়ে
তো আদমি গালিয়াঁ হি বকতা হ্যায়।’
বাংলায় এর অর্থ:
রাগ যখন সীমা অতিক্রম করে যায়
তখন লোকে তো শুধু গালাগালিই দেয়।
—(অনুবাদ: লেখক)
আওরঙ্গজেবের জীবদ্দশায় যতজন উত্তরাধিকারী সিংহাসনে বসেছিলেন, জাতাল্লি তাঁদের কাউকেই ক্ষমা করেননি। আওরঙ্গজেবের পরবর্তী প্রথম শাসক বাহাদুর শাহ সম্পর্কে জাতাল্লি তাঁর কাব্যগ্রন্থ ‘গাণ্ডুনামা’য় লিখেছেন:
‘বাদশাহি হ্যায় বাহাদুর শাহ কি
বনবনাকর গাঁড় মারাওয়া খেলিয়ে।
পির সে, বাপ সে, উস্তাদ সে
চুপ চুপ আকর গাঁড় মারাওয়া খেলিয়ে।’
বাংলায় এর অর্থ:
বাহাদুর শাহের রাজত্ব শুরু হয়েছে,
আসেপাশে ঘুরে যৌন ক্রিয়ায় মেতে ওঠো।
চুপিচুপি এসে পীর, বাবা,
শিক্ষকের সাথে যৌন ক্রিয়ায় লিপ্ত হও।
—(অনুবাদ: লেখক)
অযোগ্য ক্ষমতাধরদের চরমতম ভাষায় আক্রমণ করতে গিয়ে জাতাল্লি অনেক সময়েই ভদ্রতা ও শালীনতার সীমা অতিক্রম করে গেছেন। তবে তাঁর গভীর মানসিক যন্ত্রণা বিবেচনা করলে এটি অপ্রত্যাশিত বা অনাকাঙ্ক্ষিত মনে হয় না। জাতাল্লির কণ্ঠস্বরকে মৃত্যুর মাধ্যমে স্তব্ধ করা হলেও তাঁর কাব্যধারা তাঁর উত্তরসূরি হাতিম, মির্জা রফি সওদা, মীর তকি মীর প্রমুখের কবিতায় অনুরণিত হয়েছে। এই ধারার শেষ এবং সবচেয়ে উজ্জ্বল দুই প্রতিনিধি ছিলেন স্বয়ং শেষ মোগল সম্রাট বাহাদুর শাহ জাফর এবং তাঁর শাহী দরবারের শ্রেষ্ঠ রত্ন মির্জা আসাদুল্লাহ্ খান গালিব। দিল্লির ক্রমক্ষয়, দুর্ভাগ্য ও দুর্দশা তাঁদের সকলের কবিতায় প্রাণবন্ত হয়ে উঠেছে।
জাতাল্লির রচনার সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য দিক হলো ভাষার অভিনব ব্যবহার। উর্দু ওয়ালি ডেকানির গজলের মাধ্যমে ভারতে জন্ম নিয়েছিল—এই দাবিকে জাতাল্লির লেখা প্রশ্নবিদ্ধ করে। কাব্যজগতে ডেকানির আগমন ঘটে ১৭০০ সালের কাছাকাছি সময়ে। কিন্তু এর অনেক আগে থেকেই জাতাল্লির লেখায় উর্দুতে তাঁর দক্ষতার প্রমাণ পাওয়া গেছে। জাতাল্লি ফারসি ও উর্দুকে একটি চমৎকার এবং অনন্য পদ্ধতিতে মিশ্রিত করেছিলেন। অনেক সময় একই পংক্তিতে তিনি ফারসি ও উর্দু পাশাপাশি ব্যবহার করেছেন। তাঁর গদ্য ও কবিতা উভয়ই উর্দু রচনার চমৎকার উদাহরণ, যদিও এই ভাষা ‘উর্দু’ নামটি পেয়েছে আরও অনেক পরে। ভাষার উপর তাঁর দক্ষতা ছিল অসাধারণ মেধার দ্যুতিতে পূর্ণ। তাঁর অদ্ভুত ও অপ্রথাগত ভাষাশৈলী সত্ত্বেও তাঁর লেখাকে অগ্রাহ্য করা কঠিন ছিল। উর্দু ভাষার বিকাশে জাতাল্লির অবদান ছিল একজন প্রতিভাবান অগ্রদূতের মতো।
দিল্লির শাহী রাজপরিবার জাতাল্লির প্রতি যথেষ্ট সতর্ক থাকত। আওরঙ্গজেবের জন্য তাঁর মনে কিছুটা শ্রদ্ধা ছিল। জাতাল্লি জন্মগতভাবে একজন বুদ্ধিমান ব্যক্তি ছিলেন। কেউ যদি তাঁকে বা তাঁর বক্তব্যকে তুচ্ছতাচ্ছিল্য করত বা উপেক্ষা করত, তখনই তিনি তাদের বিরুদ্ধে লিখতে উৎসাহিত হতেন, যা সম্ভবত বাদশাহদের ভয়ের কারণ ছিল।
যদিও ফারসি ভাষায় ব্যঙ্গাত্মক রচনার পাশাপাশি কামোত্তেজক লেখারও দীর্ঘ ঐতিহ্য ছিল, উর্দু ভাষা তখনও সেই স্বীকৃতি লাভ করেনি বা ততটা শক্তি সঞ্চয় করতে পারেনি। জাতাল্লি যখন লিখতে শুরু করেন, তখন উর্দু আকস্মিকভাবে বা অনানুষ্ঠানিকভাবে ব্যবহৃত হতো। জাতাল্লিই এই ভাষাকে তাঁর নিয়মিত ব্যবহারের মাধ্যমে গুরুত্ব দেন।
জাতাল্লি নির্ভয়ে লেখালেখি করেছেন। সময়ের সাথে সাথে বেড়ে চলা নিপীড়নের তীব্রতা তুলে ধরতে তিনি তাঁর লেখায় ক্রমশ কঠোর থেকে কঠোরতম শব্দ ব্যবহার করেছেন। নিরপেক্ষ সত্যের বিচারে বলা যায়, জাতাল্লির কাজ ছিল রাজনৈতিক, এবং তা কখনোই অশ্লীল বা কামোত্তেজক ছিল না। আর তাঁর ভাষা, যা আপাতদৃষ্টিতে রাস্তার অভদ্র ভাষা দিয়ে তৈরি মনে হলেও, তার অন্তর্নিহিত অর্থ প্রচলিত গালির অর্থের চেয়ে অনেক বেশি গভীর ও ব্যাপক ছিল। জাতাল্লি স্পষ্টভাষী ও খোলামেলা ছিলেন, তবে তা হালকা চালে এবং কৌতুকপূর্ণ মনোভাবের সাথে করতেন।
ফারসি ভাষায় যাঁরা লিখতেন, তাঁদের রচনা মূলত অভিজাত শ্রেণীর পাঠকদের মধ্যেই সীমাবদ্ধ ছিল। কিন্তু জাতাল্লি যেহেতু তাঁর লেখায় স্থানীয় সাধারণ মানুষের ব্যবহৃত ভাষা ব্যবহার করতেন, তাই তাঁর কবিতা সাধারণ্যে জনপ্রিয়তা লাভ করেছিল। তিনি তাঁর সাহিত্যকর্মকে শুধু বিত্তবানদের মধ্যে আটকে রাখেননি। তাঁর চিন্তা ও লেখায় নিপীড়িত জনসাধারণের অনুভূতির প্রতিচ্ছবি দেখা যেত, আর তাই সবাই সহজেই তাঁর লেখার সাথে একাত্ম হতে পারত।
অন্যদিকে, দিল্লির শাহী রাজপরিবারকে জাতাল্লির সঙ্গে বেশ সতর্কভাবে আচরণ করতে হতো। আওরঙ্গজেবের প্রতি তাঁর কিছুটা শ্রদ্ধা-ভক্তি ছিল। আসলে জাতাল্লি যথেষ্ট বুদ্ধিমান ছিলেন। তাঁকে বা তাঁর বক্তব্যকে কেউ তুচ্ছতাচ্ছিল্য করলে বা উপেক্ষা করলে তবেই তিনি তাদের বিরুদ্ধে লিখতে উদ্বুদ্ধ হতেন, যা সম্ভবত বাদশাহরা ভয় পেতেন। তাঁরা জানতেন, জাতাল্লি রেগে গেলে তাঁর লেখনী খারাপের চেয়েও খারাপ হয়ে যেতে পারত। এসব থেকে মনে হয়, শাহী দরবার এবং সাধারণ নাগরিক সমাজও ভয়ে হলেও জাতাল্লিকে কিছুটা সম্মান দিত। তবে শেষ পর্যন্ত তারা তাঁকে একজন উন্মাদ কবি হিসেবেই দেখত। রাজধানীর সাহিত্যিক মহলে একজন কবি বা লেখক হিসেবে তিনি কখনোই তাঁর প্রকৃত সম্মান বা স্বীকৃতি পাননি এবং শেষ পর্যন্ত এই লেখার কারণেই তাঁকে প্রাণদণ্ড ভোগ করতে হয়েছিল। ফলে সহজেই বোঝা যায়, সমকালীন শাসকেরা জাতাল্লির লেখাকে কখনোই ভালো চোখে দেখেনি।
জাতাল্লি ছিলেন একজন অত্যন্ত সচেতন কবি। তাঁর চারপাশের জগতে ঘটে যাওয়া প্রতিটি ঘটনার প্রতিক্রিয়ায় তিনি কলম ধরেছেন, যেগুলোকে প্রতিবাদী বা রাজনৈতিক রচনা বলা যায়। তবে প্রতিবাদ বা রাজনীতি ছাড়াও তাঁর অনেক কবিতা রয়েছে। উদাহরণস্বরূপ, তিনি বিয়ে এবং বিয়ের আসরে দাম্পত্য কলহ নিয়েও বেশ কিছু দ্বিভাষী কবিতা রচনা করেছিলেন। কিন্তু তাঁর রচনাবলীর সিংহভাগই ছিল স্পষ্টতই রাজনৈতিক ও সামাজিক ব্যঙ্গাত্মক। অনুমান করা হয়, জাতাল্লি নিজেকে একজন প্রতিবাদী কবি হিসেবেই দেখতেন। তিনি তাঁর নিজস্ব পন্থায় শাসকগোষ্ঠীর অন্যায়-অবিচারগুলোকে তুলে ধরেছেন, ক্ষমতার অপব্যবহার নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন এবং একজন প্রতিবাদী হিসেবেই সর্বোচ্চ শাস্তি বরণ করে নিয়েছেন।
নিচে উদ্ধৃত পঙ্ক্তিগুলো থেকে জাতাল্লির সমসাময়িক বিশ্বের প্রতি তাঁর ক্ষোভ ও হতাশা উপলব্ধি করা যায়। এখানে তিনি সমাজের বৃহত্তর চিত্রটিকে সাধারণ মানুষের দৈনন্দিন জীবনের সাথে যুক্ত করেছেন এবং দেখিয়েছেন কীভাবে নিপীড়ক রাষ্ট্রীয় ক্ষমতা তাদের জীবনযাত্রাকে প্রভাবিত করে।
দুর্ভাগ্যজনকভাবে, জাতাল্লির ‘গাণ্ডুনামা’ বা তাঁর অন্যান্য রচনার কোনো অনুবাদ সহজলভ্য নয়। এমনকি দেবনাগরী হরফে হিন্দিতেও এগুলোর অনুবাদ হয়নি। এছাড়াও, তাঁর পাণ্ডুলিপির সংখ্যাও খুব কম। জানা যায়, ইংল্যান্ডের বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয় ও গ্রন্থাগার এবং দিল্লির জওহরলাল নেহরু বিশ্ববিদ্যালয়ে জাতাল্লির লেখার কিছু মাইক্রোফিল্ম সংরক্ষিত আছে।
গয়া ইখলাস আলম সে
আজব ইয়েহ্ দৌর আয়া হ্যায়
ডরে হ্যায় খালাক জালিম সে
আজব ইয়েহ্ দৌর আয়া হ্যায়
না ইয়ারোঁ মে রহি ইয়ারি
না ভাইয়োঁ মে ওয়াফাদারি
মহব্বত উঠ গয়ে সারি
আজব ইয়েহ্ দৌর আয়া হ্যায়
সিপাহি হক নহিঁ পাওয়েঁ
নি উঠ-উঠ চৌকিয়াঁ যাওয়েঁ
কর্জ বানিয়োঁ সে লে খাওয়েঁ
আজব ইয়েহ্ দৌর আয়া হ্যায়
বাংলায় এর অর্থ:
পৃথিবী থেকে বিশ্বস্ততা উধাও হয়ে গেছে,
এক অদ্ভুত সময় এসেছে।
সবাই অত্যাচারীদের ভয় পাচ্ছে,
এক অদ্ভুত সময় এসেছে।
বন্ধুদের মাঝে আর বন্ধুত্ব নেই,
ভাইদের মধ্যে নেই কোনো বিশ্বস্ততা।
সকল প্রকার ভালোবাসা বিলীন হয়ে গেছে,
এক অদ্ভুত সময় এসেছে।
সৈনিকরা তাদের প্রাপ্য পাচ্ছে না,
এবং অস্থিরভাবে দৌড়াদৌড়ি করছে।
মহাজনদের কাছ থেকে ঋণ নিয়ে জীবিকা নির্বাহ করছে,
এক অদ্ভুত সময় এসেছে।
—(অনুবাদ: লেখক)
দুর্ভাগ্যক্রমে, জাতাল্লির ‘গাণ্ডুনামা’ অথবা তাঁর অন্যান্য লেখার কোনো সঠিক অনুবাদ পাওয়া যায় না। এমনকি দেবনাগরী অক্ষরে হিন্দিতেও এগুলোর অনুবাদ করা হয়নি। এছাড়া, তাঁর লেখার পাণ্ডুলিপির সংখ্যাও বেশ কম। জানা গেছে, ইংল্যান্ডের বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয় ও পাঠাগারে এবং দিল্লির জওহরলাল নেহরু বিশ্ববিদ্যালয়ে জাতাল্লির লেখার কিছু মাইক্রোফিল্ম সংরক্ষিত আছে। পূর্বে দিল্লি বিশ্ববিদ্যালয়ের গ্রন্থাগারে কিছু পাণ্ডুলিপি ছিল, তবে কয়েক বছর আগে সেগুলো হারিয়ে গেছে। শোনা যায়, এলাহাবাদ বিশ্ববিদ্যালয়েও জাতাল্লির লেখার কিছু পাণ্ডুলিপি বিদ্যমান।
প্রচ্ছদ নিয়ে আরও পড়ুন




