বিএনএন ডেস্ক

নিশ্ছিদ্র নিরাপত্তা ব্যবস্থা। কোনো প্রকার ছবি তোলা নিষিদ্ধ। এমনকি সব সিসিটিভি ক্যামেরাও বন্ধ করে দেওয়া হয়। এরপর দুপুরের ঠিক আগে তিনি উপস্থিত হন। এটি সেই বিশেষ একদিনের সফরেরই বিবরণ।
সেদিন সকাল থেকেই ইসলামী ব্যাংকের প্রধান কার্যালয়ে এক থমথমে এবং অস্বাভাবিক নীরবতা বিরাজ করছিল। ব্যাংকের জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তাদের আগের দিনই কড়া নির্দেশ দেওয়া হয়েছিল যে, সকাল সাড়ে নয়টার মধ্যে অবশ্যই দাপ্তরিক পোশাকে উপস্থিত থাকতে হবে এবং কেউ কোনো ছবি তুলতে পারবেন না। একের পর এক বন্ধ করে দেওয়া হয় ব্যাংকের সব সিসিটিভি ক্যামেরা। মোতায়েন করা হয় অতিরিক্ত নিরাপত্তা কর্মী। ব্যাংকের ভেতরে তখন গুঞ্জন—সশরীরে উপস্থিত হচ্ছেন ‘তিনি’।
দুপুরের কিছু আগে কালো গাড়ির একটি বিশাল বহর মতিঝিলে ইসলামী ব্যাংকের সদর দপ্তরের সামনে এসে থামে। গাড়ি থেকে তিনি নামলেন, সঙ্গে ছিলেন তার দুই ছেলে, জামাতা এবং অত্যন্ত ঘনিষ্ঠ সহকারীরা। ২০১৭ সালে ব্যাংকটির দখল নেওয়ার পর এটি ছিল সেখানে তার বিরল উপস্থিতির একটি ঘটনা।
শেষমেশ ছেলেই হলেন চেয়ারম্যান
২০১৭ সালে একটি বিশেষ সংস্থার প্রত্যক্ষ সহায়তায় চট্টগ্রামের এস আলম গ্রুপ ইসলামী ব্যাংকের নিয়ন্ত্রণ নেয়। দখলের পরপরই সাবেক সচিব আরাস্তু খানকে চেয়ারম্যানের পদে বসানো হয়। তবে এস আলমের সঙ্গে মনোমালিন্যের কারণে দেড় বছরের মাথায় তিনি পদত্যাগ করলে ২০১৮ সালের এপ্রিলে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক নাজমুল হাসানকে দায়িত্ব দেওয়া হয়। এই সময়কালে ব্যাংকটিতে ভয়াবহ ঋণ অনিয়ম, নিয়োগ জালিয়াতি ও অর্থ পাচারের ব্যাপক অভিযোগ ওঠে। পরবর্তীতে ২০২৩ সালের ১৮ জুন নাজমুল হাসানকে সরিয়ে এস আলমের ছেলে আহসানুল আলমকে চেয়ারম্যান করা হয়, যার বয়স তখন ছিল ৩০ বছরেরও কম। দায়িত্ব পাওয়ার পর তিনি মাত্র দুটি সভায় অনলাইনে যোগ দিয়েছিলেন।

রহস্যে ঘেরা সেই ভ্রমণ
২০১৭ সালে ব্যাংকটির দখল নিলেও এস আলম সাধারণত সেখানে যেতেন না। তার ব্যক্তিগত সচিব আকিজ উদ্দিন এবং ব্যাংকে থাকা তার অনুসারীরাই মূলত প্রতিষ্ঠানটি পরিচালনা করতেন।
ব্যাংকটির বেশ কয়েকজন উর্ধ্বতন কর্মকর্তা জানিয়েছেন যে, মালিকানা নেওয়ার পর তিনি সব মিলিয়ে মাত্র তিন দিন সেখানে গিয়েছিলেন। প্রতিবারই তার আসার আগে পুরো ব্যাংকের সিসিটিভি ক্যামেরা বন্ধ রাখা হতো। জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তাদের আগে থেকেই দাপ্তরিক পোশাক পরার বিষয়ে সতর্ক করে ইমেইল পাঠানো হতো। একই সঙ্গে নিরাপত্তা এতটাই জোরদার করা হতো যেন কেউ ছবি তুলতে না পারে বা তার মুখোমুখি হতে না পারে।
২০২৩ সালের ৪ জুলাই ছিল তেমনই একটি দিন। সেদিন তার ছেলে আহসানুল আলমকে চেয়ারম্যানের চেয়ারে বসানোর আনুষ্ঠানিকতা সম্পন্ন করতে এস আলম সশরীরে ব্যাংকে যান। দিনটি ছিল মঙ্গলবার এবং সেদিন পরিচালনা পর্ষদের একটি সভা ছিল। এর আগে আহসানুল আলম অনলাইনে সভা করলেও সেদিনই তিনি প্রথম সশরীরে ব্যাংকে উপস্থিত হন।
এর আগে ৩ জুলাই ব্যাংকের অবকাঠামো বিভাগের প্রধান বেলাল হোসেন একটি ইমেইলের মাধ্যমে জানান যে, শীর্ষ পর্যায়ের ব্যবস্থাপকেরা ব্যাংক পরিদর্শন করবেন। তাই ৪ জুলাই সকাল সাড়ে ৯টার মধ্যে সবাইকে যথাযথ পোশাকে থাকতে বলা হয় এবং ছবি তোলার ওপর কঠোর নিষেধাজ্ঞা জারি করা হয়।

ছবি যা বলছে
সাধারণ কর্মকর্তাদের ছবি তোলার অনুমতি না থাকলেও এস আলমের অনুগতরা একজন বিশেষ ক্যামেরাম্যান ঠিক করে রেখেছিলেন। তিনি ক্যানন ৫ডি মার্ক থ্রি ক্যামেরা নিয়ে সেদিন ছবি তোলার কাজ করেন। সেই সফরের কিছু ছবি সংগৃহীত হয়েছে।
ছবিগুলোতে দেখা যায়, দুপুর ১২টার কিছু পরে এস আলম ব্যাংকে প্রবেশ করছেন। তার সঙ্গে ছিলেন দুই ছেলে আহসানুল ও আশরাফুল, জামাতা বেলাল আহমেদ এবং পিএস আকিজ উদ্দিন। তৎকালীন এমডি মনিরুল মাওলাসহ শীর্ষ কর্মকর্তারা তাদের ফুল দিয়ে অভ্যর্থনা জানান।
এরপর দুপুর ১২টা ২৬ মিনিটে ব্যাংকের পর্ষদ সভাকক্ষে কেক কেটে নতুন চেয়ারম্যানের অভিষেক উদযাপন করা হয়। এস আলম নিজেই তার ছেলে আহসানুল আলমকে চেয়ারম্যানের চেয়ারে বসিয়ে দেন এবং উপস্থিত সবাই হাততালি দিয়ে তাকে স্বাগত জানান। এরপর বিভিন্ন বিভাগের প্রধানরা ফুল দিয়ে নতুন চেয়ারম্যানকে বরণ করেন। সভায় বাংলাদেশ ব্যাংকের পক্ষ থেকে নিযুক্ত প্রশাসকও উপস্থিত ছিলেন। পুরো প্রক্রিয়াটি আধা ঘণ্টার মধ্যে শেষ হয়। বেলা একটার দিকে সোশ্যাল ইসলামী ব্যাংকের এমডি জাফর আলম এসে নতুন চেয়ারম্যানকে শুভেচ্ছা জানান।

ব্যাংকের একজন জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা জানান, সেদিন নিরাপত্তা ব্যবস্থা এতই কড়াকড়ি ছিল যে অনেককে মোবাইল ফোন সাথে রাখতে দেওয়া হয়নি। ব্যাংকের নিজস্ব গার্ড ছাড়াও গোয়েন্দা সংস্থার সদস্যরা সেখানে তৎপর ছিলেন। লিফট থেকে নামার সময় একজন কৌতূহলী কর্মচারী ছবি তোলার চেষ্টা করলে তাকে সাথে সাথে ঢাকার বাইরে বদলি করে দেওয়া হয়।
এস আলমের সেই সফরটি অনেকের জন্যই ছিল অস্বস্তিকর। ব্যাংকটি দখল করার পর তিনি তার নিজস্ব লোক দিয়ে প্রায় এক লাখ কোটি টাকার বেশি ঋণ হিসেবে বের করে নেন। এছাড়া নিয়ম বহির্ভূতভাবে হাজার হাজার লোক নিয়োগ দেওয়া হয়, যার ফলে ব্যাংকটির খেলাপি ঋণের পরিমাণ আকাশচুম্বী হয়েছে এবং পুরো দেশের অর্থনীতি সংকটের মুখে পড়েছে।
প্রচ্ছদ নিয়ে আরও পড়ুন









খবরের নতুন দিগন্ত উন্মোচন করতে এখনই ভিজিট করুন:www.bnnbreakingnews.com
সম্পাদক ও প্রকাশক : প্রিন্স সালেহ। প্রকাশক কর্তৃক ১২ বীর উত্তম সি আর দত্ত রোড, বাংলামোটর, ঢাকা ১২০৫ থেকে মুদ্রিত।
স্বত্ব © BNN Breaking News (2026)
ওয়েবসাইটের কোনো লেখা, ছবি, ভিডিও অনুমতি ছাড়া ব্যবহার বেআইনি।