
তাইপেই, তাইওয়ান – ইরানের যুদ্ধের আবহে আয়োজিত হতে যাওয়া একটি গুরুত্বপূর্ণ সম্মেলনে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের সাথে সাক্ষাতের সময় শি জিনপিং তাইওয়ান এবং মার্কিন শুল্কের বিষয়ে কিছু সুবিধা পাওয়ার আশা করছেন।
ট্রাম্প বুধবার সন্ধ্যায় তিন দিনের এক সফরে চীন পৌঁছাবেন। এটি ২০১৭ সালের পর কোনো মার্কিন নেতার প্রথম চীন সফর, যখন ট্রাম্প তার প্রথম মেয়াদের শুরুর দিকে দেশটিতে গিয়েছিলেন।
ট্রাম্পের অস্থির নীতিমালার বিপরীতে শি জিনপিংয়ের লক্ষ্যগুলো বেশ সুনির্দিষ্ট। বিশেষ করে বেইজিংয়ের জাতীয় নিরাপত্তা ও আঞ্চলিক অখণ্ডতার মতো দীর্ঘদিনের ‘মৌলিক স্বার্থগুলো’ নিয়ে তিনি বেশ অবিচল।
সেই তালিকার শীর্ষেই রয়েছে তাইওয়ান ইস্যু।
তাইওয়ান সরকার নিজেকে একটি স্বাধীন রাষ্ট্র মনে করলেও বেইজিং এই দ্বীপটিকে তাদের ভূখণ্ডের অবিচ্ছেদ্য অংশ হিসেবে গণ্য করে।
কয়েক দশক আগে যুক্তরাষ্ট্র আনুষ্ঠানিকভাবে তাইওয়ানের সঙ্গে সম্পর্ক ছিন্ন করলেও ১৯৭৯ সালের 'তাইওয়ান রিলেশনস অ্যাক্ট'-এর আওতায় এই স্বশাসিত অঞ্চলের প্রতিরক্ষায় সহায়তা করতে তারা প্রতিশ্রুতিবদ্ধ।
এই আইনের অধীনে ওয়াশিংটন তাইওয়ানকে বিলিয়ন বিলিয়ন ডলারের অস্ত্র সরবরাহ করেছে এবং সামরিক প্রশিক্ষণ ও গোয়েন্দা তথ্য বিনিময়ে সহযোগিতা করছে, যা বেইজিং তাদের অভ্যন্তরীণ বিষয়ে সরাসরি হস্তক্ষেপ বলে মনে করে।
মার্কিন সরকার আনুষ্ঠানিকভাবে স্বীকার করে যে চীন তাইওয়ানকে নিজেদের অংশ মনে করে, তবে ওয়াশিংটন এই বিষয়ে সরাসরি কোনো সমর্থন বা অসম্মতি প্রকাশ করে না।
চীন যদি শক্তি প্রয়োগ করে তাইওয়ান দখল করতে চায়, তবে যুক্তরাষ্ট্র সেখানে সামরিক হস্তক্ষেপ করবে কি না, সে বিষয়ে তারা ইচ্ছাকৃতভাবে এক ধরনের কৌশলগত অস্পষ্টতা বজায় রাখছে।
গত মাসে মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিওর সাথে ফোনালাপে চীনা পররাষ্ট্রমন্ত্রী ওয়াং ই স্পষ্ট করেছেন যে সম্মেলনে তাইওয়ান প্রসঙ্গ উত্থাপন করা হবে। তিনি এই বিষয়টিকে চীন-মার্কিন সম্পর্কের 'সবচেয়ে বড় ঝুঁকি' হিসেবে বর্ণনা করেছেন।
মঙ্গলবার ট্রাম্প সম্মেলনের উদ্দেশ্যে রওনা হওয়ার পর ওয়াশিংটনে অবস্থিত চীনা দূতাবাস আবারও সেই বার্তার পুনরাবৃত্তি করে। তারা তাইওয়ানকে তাদের চারটি 'রেড লাইন' বা অলঙ্ঘনীয় সীমানার মধ্যে প্রথম বলে ঘোষণা করেছে যা কোনোভাবেই অতিক্রম করা যাবে না।
বিশ্লেষকরা মনে করেন না যে চীনা চাপে যুক্তরাষ্ট্র তাইওয়ান বিষয়ে তাদের দীর্ঘদিনের অবস্থান পরিবর্তন করবে। তবে ট্রাম্প জানিয়েছেন, এবারের সম্মেলনে তাইওয়ানে অস্ত্র বিক্রির বিষয়টি থাকবে, যা একটি আটকে থাকা বিশাল অস্ত্র চুক্তির ভবিষ্যৎ নিয়ে সংশয় তৈরি করেছে।
এ বছরের শুরুতে মার্কিন কংগ্রেস প্রায় ১৪ বিলিয়ন ডলারের একটি অস্ত্র প্যাকেজ অনুমোদন দিলেও সেটি কার্যকর করতে ট্রাম্পের চূড়ান্ত সম্মতির প্রয়োজন।
শি জিনপিং এই বৈঠককে কাজে লাগিয়ে ট্রাম্পকে তাইওয়ানে অস্ত্র বিক্রি কমাতে অথবা পুরোপুরি স্থগিত করতে রাজি করানোর চেষ্টা করবেন বলে মনে করেন তাইপেই-ভিত্তিক বিশ্লেষক উইলিয়াম ইয়াং।
ট্রাম্প যদি তাইওয়ানে অস্ত্র বিক্রির ক্ষেত্রে কোনো ছাড় দেন, তবে সেটি রোনাল্ড রিগ্যানের আমল থেকে চলে আসা বেইজিংয়ের সাথে পরামর্শ না করার দীর্ঘদিনের নীতির পরিপন্থী হবে।
চুক্তিটি বাতিল বা শিথিল করা হলে তা তাইওয়ানিজ প্রেসিডেন্ট উইলিয়াম লাই চিং-তের জন্য বড় ধাক্কা হবে, যিনি বর্তমানে প্রতিরক্ষা ব্যয় নিয়ে বিরোধীদের সঙ্গে তীব্র রাজনৈতিক লড়াই করছেন।
ইয়াং বলেন, বেইজিং প্রথমে ট্রাম্পের সিদ্ধান্তকে প্রভাবিত করতে চায় যাতে ভবিষ্যতে লাই প্রশাসনের জন্য অতিরিক্ত প্রতিরক্ষা বরাদ্দ পাওয়া অনেক বেশি কঠিন হয়ে পড়ে।
চীন-মার্কিন দ্বিপাক্ষিক কাঠামো পুনরুদ্ধার
গত ১৮ মাসের চরম অস্থিরতার পর শি জিনপিং সম্পর্ক স্বাভাবিক করতে আগ্রহী। উল্লেখ্য যে, এই সময়ে ট্রাম্প বিশ্বের দ্বিতীয় বৃহত্তম অর্থনীতির দেশটির সঙ্গে দ্বিতীয় দফায় বাণিজ্য যুদ্ধে জড়িয়েছিলেন।
এই দ্বন্দ্বে উভয় পক্ষই একে অপরের ওপর চড়া শুল্ক আরোপ করেছিল, যা একপর্যায়ে ১০০ শতাংশ ছাড়িয়ে যায়। মে মাসে সাময়িক বিরতির আগে তারা রপ্তানি নিয়ন্ত্রণের মতো নানা শাস্তিমূলক ব্যবস্থাও গ্রহণ করেছিল।
গত অক্টোবরে দক্ষিণ কোরিয়ায় শেষ বৈঠকে শি এবং ট্রাম্প বাণিজ্য যুদ্ধে এক বছরের বিরতিতে সম্মত হয়েছিলেন, যদিও নির্দিষ্ট কিছু শুল্ক ও রপ্তানি নিয়ন্ত্রণ বহাল রাখা হয়েছিল।
গত মাসে যুক্তরাষ্ট্র বেশ কিছু চীনা প্রতিষ্ঠানের ওপর নতুন করে নিষেধাজ্ঞা দিয়েছে। এসব প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে ইরানের তেল কেনা এবং ড্রোন ও মিসাইল তৈরিতে তেহরানকে সহায়তার অভিযোগ আনা হয়েছে।
এ মাসের শুরুর দিকে বেইজিং একটি আদেশ জারি করে তাদের দেশীয় প্রতিষ্ঠানগুলোকে মার্কিন নিষেধাজ্ঞা উপেক্ষা করার নির্দেশ দিয়েছে।
বেইজিং-ভিত্তিক বিশ্লেষক ফেং চুচেং জানিয়েছেন, ২০২৯ সাল পর্যন্ত ট্রাম্পের মেয়াদের বাকি সময়ে বেইজিং এক ধরনের নিশ্চয়তা ও স্থিতিশীলতা চায়, যাতে তারা নিজেদের অর্থনৈতিক পরিকল্পনাগুলো সঠিকভাবে সাজাতে পারে।
ফেংয়ের মতে, যুক্তরাষ্ট্র চীন ও তার বাণিজ্যিক অংশীদারদের ওপর ঠিক কী পরিমাণ শুল্ক প্রয়োগ করবে, তা আগে থেকে বুঝতে পারা বেইজিংয়ের জন্য অত্যন্ত জরুরি।
বেইজিংয়ের রেনমিন বিশ্ববিদ্যালয়ের বিশেষজ্ঞ ওয়াং ওয়েন বলেন, চীন এখন শান্তি, পারস্পরিক শ্রদ্ধা এবং সবার জন্য লাভজনক একটি সহযোগিতামূলক সম্পর্কের দিকে ফিরতে চায়।
ওয়াং আশা প্রকাশ করেন যে, এই দ্বিপাক্ষিক বৈঠকটি চীনের প্রতি মার্কিন নীতিকে পুনরায় এই তিনটি মূল আদর্শে ফিরিয়ে আনবে।
বেইজিংয়ের জন্য এই মুহূর্তটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। সেখানে ট্রাম্পের ভাবমূর্তি এখন আর কেবল একজন ব্যবসায়িক অংশীদারের মতো নয়, বরং তাকে এখন অনেক বেশি আক্রমণাত্মক ও নিয়ন্ত্রণহীন প্রতিপক্ষ হিসেবে দেখা হচ্ছে।
বিশ্লেষক হাং মনে করেন, এই বিদ্যমান ঝুঁকিগুলো কমাতে চীন-মার্কিন সম্পর্ককে পুনরায় একটি স্থিতিশীল ভিত্তির ওপর দাঁড় করানো প্রয়োজন।
হাংয়ের মতে, বেইজিংয়ের প্রধান অগ্রাধিকার এখন কেবল ছাড় আদায় নয়, বরং প্রতিকূল কৌশলগত অবস্থান বদলে আলোচনাকে এমন একটি কাঠামোয় নিয়ে আসা যা তারা সহজে নিয়ন্ত্রণ করতে পারবে।
সম্মেলনে শি জিনপিং সম্ভবত মার্কিন কৃষিপণ্য এবং বোয়িং বিমান আমদানির পরিমাণ বাড়াতে রাজি হবেন। এছাড়া অর্থনৈতিক সম্পর্ক তদারকির জন্য ট্রাম্পের প্রস্তাবিত 'বোর্ড অব ট্রেড' ও 'বোর্ড অব ইনভেস্টমেন্ট' গঠনের পরিকল্পনায় সমর্থন দিতে পারেন।
তবে ফেং মনে করেন, যুক্তরাষ্ট্র বড় কোনো রাজনৈতিক সুবিধা না দিলে চীন বিরল খনিজ বা 'রেয়ার আর্থ' খাতের একাধিপত্য নিয়ে কোনো আপস করবে না।
ইরান যুদ্ধ নিয়ে আলোচনার ডাক
ইরান ও ইসরায়েল যুদ্ধ পরিস্থিতি এবারের সম্মেলনে বিশেষ গুরুত্ব পাবে।
যদিও চীন এই যুদ্ধে সরাসরি পক্ষ নয়, তবে হরমুজ প্রণালী বন্ধ হয়ে যাওয়ায় এবং যুদ্ধের প্রভাবে তারা অর্থনৈতিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে, কারণ বিশ্বের এক-পঞ্চমাংশ জ্বালানি এই পথেই সরবরাহ করা হয়।
সিংহুয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষক জোডি ওয়েন বলেন, সংঘাতের শুরু থেকেই বেইজিং শান্তি আলোচনা ও পূর্ণাঙ্গ যুদ্ধবিরতির আহ্বান জানিয়ে আসছে এবং শি এই বৈঠকে ট্রাম্পের কাছে সেই বার্তারই পুনরাবৃত্তি করবেন।
ওয়েন বলেন, শি ডোনাল্ড ট্রাম্পকে বলবেন যে এই যুদ্ধ বিশ্ব অর্থনীতিসহ এশিয়া ও যুক্তরাষ্ট্রের ওপর ব্যাপক নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে, তাই সংকট নিরসনে সংলাপ অপরিহার্য।
মঙ্গলবার ট্রাম্প জানিয়েছেন যে এই সংঘাত মেটাতে তার চীনের 'সহায়তার' প্রয়োজন নেই, যদিও হোয়াইট হাউস আগে থেকেই হরমুজ প্রণালী খুলে দিতে ইরানকে চাপ দেওয়ার জন্য বেইজিংকে অনুরোধ করে আসছিল।
যুদ্ধ শুরুর পর থেকে শি এবং তার শীর্ষ কূটনীতিকরা বিশ্বের ডজনখানেক নেতার সঙ্গে দেখা করেছেন এবং নেপথ্যে একটি মধ্যস্থতাকারীর ভূমিকা পালন করার চেষ্টা করছেন।
২০১৬ সাল থেকে ইরানের সাথে চীনের একটি 'কৌশলগত অংশীদারিত্ব' রয়েছে এবং তারা ইরানের উত্তোলিত তেলের ৮০ শতাংশেরও বেশি ক্রয় করে থাকে।
গবেষক জোডি ওয়েন মনে করেন, শি মধ্যস্থতাকারী ছাড়া অন্য কোনো ভূমিকায় এই ইস্যুতে জড়াতে রাজি হবেন না, যা মূলত চীনের দীর্ঘদিনের বৈদেশিক নীতির সাথে সংগতিপূর্ণ।
তিনি আরও বলেন, চীনের পররাষ্ট্রনীতির মূল ভিত্তিই হলো অন্যের অভ্যন্তরীণ বিষয়ে 'হস্তক্ষেপ না করা'। এটিই তাদের মূল আদর্শ।
তথ্যসূত্র: আল-জাজিরা