খবরের নতুন দিগন্ত উন্মোচন করতে এখনই ভিজিট করুন:www.bnnbreakingnews.com
সম্পাদক ও প্রকাশক : প্রিন্স সালেহ। প্রকাশক কর্তৃক ১২ বীর উত্তম সি আর দত্ত রোড, বাংলামোটর, ঢাকা ১২০৫ থেকে মুদ্রিত।
স্বত্ব © BNN Breaking News (2026)
ওয়েবসাইটের কোনো লেখা, ছবি, ভিডিও অনুমতি ছাড়া ব্যবহার বেআইনি।
বিএনএন ডেস্ক

মানব ইতিহাসের পাতায় কারাগার একটি অত্যন্ত প্রাচীন প্রথা। ইসলামের শুরুর সময় থেকেই এই ব্যবস্থার বিবর্তন ও ক্রমবিকাশ লক্ষ্য করা যায়। ইসলামের আদি যুগ থেকে পরবর্তী কয়েক শতকের জেল ব্যবস্থাপনা, সংস্কার, নিপীড়ন, মুক্তি ও জ্ঞানচর্চার ওপর ভিত্তি করে চার পর্বের ধারাবাহিক রচনার আজ প্রথম কিস্তি।
নবুয়ত যুগ থেকে শুরু করে উমাইয়া ও আব্বাসীয় শাসনকাল পর্যন্ত বন্দিশালা কীভাবে একটি পেশাদার প্রশাসনিক কাঠামোতে রূপ নিল, আজ আমরা সেই ইতিহাসই ফিরে দেখব।
ইসলামি ফিকহশাস্ত্রে জেলখানার মূল দর্শন কেবল সংকীর্ণ কোনো কক্ষে কাউকে আটকে রাখা নয়, বরং ব্যক্তির স্বাধীনভাবে চলাচলের অধিকারকে সীমিত করা। ইমাম ইবনে তাইমিয়ার মতে, শরয়ি পরিভাষায় বন্দিত্ব হলো ব্যক্তির নিজের ইচ্ছামতো বিচরণ থেকে বিরত রাখা, যা কোনো ঘর বা মসজিদেও হতে পারে (ইবনে তাইমিয়া, মাজমুউল ফাতাওয়া, ৩৫/৩৯৮, বৈরুত, ২০০৫)।
রাসুল (সা.)-এর যুগে নির্দিষ্ট কোনো কারাগার ভবন ছিল না। যুদ্ধবন্দী বা অপরাধীদের সাধারণত মসজিদের খুঁটিতে অথবা সাহাবিদের ঘরে রেখে নজরদারি করা হতো। যেমন—সুদাইর ইবনে সুমামাকে যখন বন্দি করা হয়, তখন তাকে মসজিদে নববির একটি পিলারে বেঁধে রাখা হয়েছিল। (সহিহ বুখারি, হাদিস: ৪৪২)
হজরত ওমর ইবনুল খাত্তাব (রা.) মক্কায় সফওয়ান ইবনে উমাইয়ার কাছ থেকে চার হাজার রৌপ্যমুদ্রার বিনিময়ে একটি বাড়ি ক্রয় করে সেটিকে সর্বপ্রথম স্থায়ী কারাগারে রূপান্তর করেন।
মুসলিম সাম্রাজ্যের বিস্তৃতির সঙ্গে সঙ্গে দ্বিতীয় খলিফা হজরত ওমর (রা.)-এর আমলে অপরাধীদের জন্য স্থায়ী বন্দিশালার প্রয়োজনীয়তা অনুভূত হয়। তিনি মক্কায় সফওয়ান ইবনে উমাইয়ার থেকে চার হাজার দিরহাম দিয়ে একটি বাড়ি কিনে সেটিকে প্রথম স্থায়ী জেলখানায় রূপ দেন।
এর মাধ্যমেই তিনি ইসলামি ইতিহাসে কারাগার ব্যবস্থার প্রবর্তক হিসেবে স্বীকৃত হন। (মুhammad ইবনুল ফারাজ তলায়ি, আকদিয়াতু রাসুলিল্লাহ, পৃষ্ঠা ১৫৪, ১৯৮৭)
পরবর্তীকালে হজরত আলি (রা.)-এর শাসনামলে কুফায় ‘নাফে’ নামক একটি বাঁশের তৈরি জেলখানা তৈরি করা হয়েছিল। তবে সেটি খুব একটা মজবুত না হওয়ায় বন্দিরা পালিয়ে যাওয়ার সুযোগ পেত। এরপর তিনি ‘আল-মুখায়্যাস’ নামে আরও একটি শক্তিশালী ও স্থায়ী বন্দিশালা নির্মাণ করেন। (ইবনুল আসির, আন-নিহায়া ফি গারিবিল হাদিস, ২/৮২, বৈরুত, ১৯৭৯)
উমাইয়া যুগে কারাগার ব্যবস্থার পরিধি বাড়লেও কিছু ক্ষেত্রে তা অত্যন্ত অমানবিক রূপ নিয়েছিল। ইরাকের শাসক হাজ্জাজ ইবনে ইউসুফের নাম এই ক্ষেত্রে উল্লেখযোগ্য। তার তৈরি ‘দিমাস’ ছিল অত্যন্ত ভয়াবহ। এটি ছিল ছাদহীন এক অন্ধকার কূপ, যেখানে বন্দিরা রোদ-বৃষ্টিতে পশুর মতো জীবন কাটাতে বাধ্য হতো।
শরয়ি পরিভাষায় বন্দিত্ব বলতে বোঝায় ব্যক্তির স্বাধীন চলাফেরাকে সীমাবদ্ধ করে দেওয়া, যা কোনো বাড়ি বা মসজিদেও হতে পারে।ইমাম ইবনে তাইমিয়া (রাহ.)
ইবনে জাওজির বর্ণনা মতে, সেখানে কয়েদিদের খাবারের সঙ্গে বালু ও ছাই মিশিয়ে দেওয়া হতো, যার ফলে কিছুদিন পর বন্দিদের চেনা প্রায় অসম্ভব হয়ে পড়ত। (ইবনুল জাওজি, আল-মুনতাজাম, ৬/৩২২, ১৯৯২)
নিষ্ঠুরতার এই যুগে আশার আলো হয়ে আসেন খলিফা ওমর ইবনে আবদুল আজিজ (র.)। তিনি কারাগারকে কেবল শাস্তির জায়গা না রেখে একটি মানবিক সংশোধন কেন্দ্রে পরিণত করেন। তিনি প্রতিটি বন্দীর জন্য রাষ্ট্রীয় কোষাগার থেকে ভাতার ব্যবস্থা করেন এবং একটি বিধিবদ্ধ তালিকা বা ‘দিওয়ান’ তৈরি করেন। (ইবনে সাদ, আত-তাবাকাতুল কুবরা, ৫/৩৫০, ১৯৯০)
তাঁর উল্লেখযোগ্য সংস্কারগুলো ছিল:
অসুস্থ ও নিঃস্ব কয়েদিদের জন্য চিকিৎসার ব্যবস্থা করা।
ভয়ংকর অপরাধী ও সাধারণ ঋণগ্রস্তদের আলাদা রাখার ব্যবস্থা।
নারীদের জন্য নারী প্রহরীর অধীনে সম্পূর্ণ পৃথক জেলখানা নির্মাণ।
কারারক্ষী হিসেবে সৎ ও নির্লোভ ব্যক্তিদের নিয়োগ দেওয়া। (আবু ইউসুফ, কিতাবুল খারাজ, পৃষ্ঠা ১৫১, ১৯৭৯)
বাগদাদের ‘আল-মুতবিক’ ছিল একটি কেন্দ্রীয় এবং অত্যন্ত সুরক্ষিত জেলখানা। এটি মাটির নিচে নির্মিত হওয়ায় সেখানে সব সময় ঘুটঘুটে অন্ধকার থাকত।
আব্বাসীয় শাসনামলে কারাগার ব্যবস্থা আরও আধুনিক ও বিস্তৃত হয়। বাগদাদের ‘আল-মুতবিক’ ছিল একটি কেন্দ্রীয় ও অতি সুরক্ষিত জেল। এটি মাটির নিচে নির্মিত হওয়ার কারণে ছিল অত্যন্ত অন্ধকারাচ্ছন্ন।
খলিফা মুতাদিদ বিল্লাহ তাঁর রাজপ্রাসাদের ভেতর ‘আল-মাতামির’ নামক একটি সুরক্ষিত বন্দিশালা তৈরি করেন, যা ছিল ভূগর্ভস্থ এবং অনন্য স্থাপত্যশৈলীর নিদর্শন। (খতিব বাগদাদি, তারিখু বাগদাদ, ১/১০২, ১৯৯৭)
এই যুগেই অপরাধের ধরন অনুযায়ী জেলের আধুনিকায়ন শুরু হয়। তবে রাজনৈতিক ক্ষমতার লড়াইয়ে অনেক সময় বিরোধীদেরও এই কারাগারগুলোতে বন্দি থাকতে হয়েছে।
তৎকালীন উজির ইয়াকুব ইবনে দাউদ এই ভূগর্ভস্থ জেলের বিভীষিকা বর্ণনা করতে গিয়ে জানান যে, সেখানে দীর্ঘকাল থাকার ফলে তিনি তার দৃষ্টিশক্তি হারিয়ে ফেলেছিলেন। (তাবারি, তারিখুল উমাম ওয়াল মুলুক, ৮/১৬২, ১৯৬৭)
ইসলামি ইতিহাসের শুরুর কয়েক শতাব্দীতে কারাগার ব্যবস্থা নমনীয়তা থেকে কঠোরতা এবং পরবর্তীতে সংস্কারের মাধ্যমে এক পূর্ণাঙ্গ প্রশাসনিক রূপ লাভ করে। এই বন্দিশালাগুলোই পরবর্তীকালে অনেক বরেণ্য ইমাম ও মনীষীর জীবন সংগ্রামের সাক্ষী হয়ে থাকে।
আগামী পর্বে আমরা আলোচনা করব জেলখানার অন্ধকার দিক, বন্দিদের অধিকার ও ফিকহি দৃষ্টিভঙ্গি নিয়ে।
প্রচ্ছদ নিয়ে আরও পড়ুন




