খবরের নতুন দিগন্ত উন্মোচন করতে এখনই ভিজিট করুন:www.bnnbreakingnews.com
সম্পাদক ও প্রকাশক : প্রিন্স সালেহ। প্রকাশক কর্তৃক ১২ বীর উত্তম সি আর দত্ত রোড, বাংলামোটর, ঢাকা ১২০৫ থেকে মুদ্রিত।
স্বত্ব © BNN Breaking News (2026)
ওয়েবসাইটের কোনো লেখা, ছবি, ভিডিও অনুমতি ছাড়া ব্যবহার বেআইনি।
বিএনএন ডেস্ক

রাজধানীর মিরপুরের সনি সিনেমা হলের সামনে সরকারের কম দামি পণ্য বিক্রির ট্রাক আসার খবরে সেখানে জড়ো হন নিম্ন আয়ের মানুষ। মঙ্গলবার বেলা একটার দিকে সেখানে দেখা যায়, ১৫ বছর বয়সী কিশোর সাইফুল ইসলামের পায়ে তালাবদ্ধ একটি শিকল। এর অপর প্রান্ত ধরে দাঁড়িয়ে ছিলেন সত্তরোর্ধ্ব সালেহা বেগম। তাঁরা টিসিবির ট্রাক থেকে তেল ও ডাল কিনতে এসেছেন।
নানি-নাতার এই জুটি, সালেহা বেগম ও সাইফুল, জন্মগতভাবে বিশেষ চাহিদাসম্পন্ন। সাইফুল নিজে বুঝে চলতে পারে না, তাই পরিবারের সদস্যরা তাকে সবসময় শিকল দিয়ে বেঁধে রাখেন। বাড়িতে সাইফুলকে দেখাশোনার মতো কেউ না থাকায়, নিরুপায় হয়ে নানি সালেহা বেগম তাকে নিয়েই সরকারি সংস্থা টিসিবির ট্রাক থেকে পণ্য কিনতে এসেছেন। সালেহা বেগম মিরপুর-১ এলাকার একটি মেসে রান্নার কাজ করেন এবং তার বড় মেয়ে, যে সাইফুলের মা, তাকে সাহায্য করেন। সালেহার স্বামী আমির হোসেন সবজির দোকানে কর্মচারী হিসেবে কাজ করেন।
সালেহা বেগম জানান, তিনি ও তার স্বামী মিলে মাসে প্রায় ২৫ হাজার টাকা আয় করেন। এর সাথে তিন মাস পর পর পাওয়া ১ হাজার ৯০০ টাকা বয়স্ক ভাতা যোগ হয়। এই আয় দিয়ে সংসার চালানো কঠিন। সুযোগ পেলেই তিনি সাশ্রয়ী দামে পণ্য কিনতে টিসিবির ট্রাকের লাইনে দাঁড়ান।
বিশেষ চাহিদাসম্পন্ন সাইফুল পরিবারের কয়েকজন সদস্য ছাড়া অন্য কাউকে চেনে না এবং বাসার ঠিকানাও মনে রাখতে পারে না। এর আগে সে তিনবার হারিয়ে গিয়েছিল, সর্বশেষ সাবেক প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়ার জানাজার দিনে মিরপুর-১ থেকে হারিয়ে যাওয়ার পর নারায়ণগঞ্জ থেকে পুলিশ তাকে খুঁজে পায়। এই কারণে সালেহা বেগম সবসময় সাইফুলকে পায়ে শিকল দিয়ে বেঁধে রাখেন।
টিসিবির পণ্য কিনতে সাইফুলকে সঙ্গে নিয়ে সালেহা বেগম সকাল সাড়ে ১১টায় বাসা থেকে বের হন। প্রথমে সরকারি বাঙলা কলেজের দিকে গেলেও সেখানে ট্রাক না পেয়ে তিনি রিকশায় মিরপুর-২ এর দিকে রওনা হন। মিরপুর-২ যাওয়ার পথে সনি সিনেমা হলের সামনে মানুষের জটলা দেখে তিনি সেখানে নামেন।
মঙ্গলবার দুপুর একটা নাগাদ যখন এই প্রতিবেদকের সঙ্গে সালেহা বেগমের কথা হয়, তখনো টিসিবির নির্ধারিত ট্রাক সেখানে এসে পৌঁছায়নি। প্রায় আড়াই শ নারী-পুরুষ টিসিবির ট্রাকের অপেক্ষায় সারিবদ্ধভাবে দাঁড়িয়ে ছিলেন। তবে বেলা দুইটা পর্যন্ত ট্রাক না আসায় অনেকে হতাশা নিয়ে ফিরে যান।
বেলা আড়াইটার দিকে টিসিবির একটি ট্রাক সনি সিনেমা হলের মোড় ঘুরে মিরপুর হার্ট ফাউন্ডেশনের বিপরীত পাশে থামলে অপেক্ষারত মানুষেরা সেদিকে ছুটতে শুরু করে। এতে সকাল থেকে দাঁড়িয়ে থাকা মানুষের সারি বিশৃঙ্খল হয়ে পড়ে এবং ধাক্কাধাক্কি শুরু হয়।
এই বিশৃঙ্খল পরিস্থিতির মধ্যে সালেহা বেগম যখন শিকল বাঁধা সাইফুলকে নিয়ে সেখানে পৌঁছান, তখন তিনি নারীদের বা পুরুষদের কোনো সারিতেই দাঁড়াতে পারছিলেন না। নিরুপায় হয়ে তিনি ট্রাকের এক পাশে প্রায় আধা ঘণ্টা দাঁড়িয়ে থাকেন। উপস্থিত কিছু মানুষের অনুরোধে বিশেষ বিবেচনায় তাকে লাইন ছাড়াই পণ্য বিক্রি করা হয়।

সালেহা বেগম জানান, বাড়িতে রান্নার তেল নেই। দোকান থেকে দুই লিটার তেল কিনতে ৪০০ টাকা লাগে, কিন্তু টিসিবির ট্রাক থেকে নিলে ২৬০ টাকায় কেনা যায়। এভাবে তেল, চিনি ও ডাল মিলিয়ে প্রায় ৪০০ টাকা সাশ্রয় হয়। এই কারণেই তিনি এখানে এসেছেন।
গত রমজানে শেষবার টিসিবির তেল ও ডাল কিনেছিলেন সালেহা। এরপর আজই প্রথম এসেছেন। তিনি বলেন, শিকল ধরে বেশিক্ষণ লাইনে দাঁড়ানো যায় না, আবার সাইফুলকে ছেড়ে দেওয়াও যায় না। অনেক সময় মানবিক কারণে তাকে আগে পণ্য দেওয়া হয়।
সনি সিনেমা হলের পাশের ফুটপাতে চা বিক্রেতা সোলাইমান ইসলাম জানান, ছোটবেলা থেকেই সাইফুল বুদ্ধিপ্রতিবন্ধী। সে মাঝে মাঝে তার নানি সালেহা বেগমের সাথে এখানে আসে। মাঝে হারিয়ে যাওয়ার পর থেকেই তাকে শেকল দিয়ে বেঁধে রাখা হয়।
সালেহা বেগম নিজেও অসুস্থ। সম্প্রতি কোমরে ব্যথা পাওয়ায় ভারী কাজ করতে পারেন না। তিনি বিএনপি সরকারের 'ফ্যামিলি কার্ড'-এর কথা শুনেছেন, তবে এই কার্ড কীভাবে পাওয়া যায় বা কারা পায়, সে সম্পর্কে তার কোনো ধারণা নেই। কিছুটা আক্ষেপের সুরে সালেহা বেগম বলেন, 'মোগো ভাগ্য খারাপ। কাউকে বলে লাভ নেই। যতক্ষণ পারি কষ্ট করি, তাতে দুগগা ভাত তো খাওয়া যায়। মাঝেমইধ্যে টান পড়লে টিসিবির ট্রাকের পিছে দাঁড়াই।' এই কথা বলেই তিনি দীর্ঘশ্বাস ফেলেন।
প্রচ্ছদ নিয়ে আরও পড়ুন








