খবরের নতুন দিগন্ত উন্মোচন করতে এখনই ভিজিট করুন:www.bnnbreakingnews.com
সম্পাদক ও প্রকাশক : প্রিন্স সালেহ। প্রকাশক কর্তৃক ১২ বীর উত্তম সি আর দত্ত রোড, বাংলামোটর, ঢাকা ১২০৫ থেকে মুদ্রিত।
স্বত্ব © BNN Breaking News (2026)
ওয়েবসাইটের কোনো লেখা, ছবি, ভিডিও অনুমতি ছাড়া ব্যবহার বেআইনি।
বিএনএন ডেস্ক

আমার হাসপাতালে প্রায় এক মাস ধরে একজন বয়স্ক নারী চিকিৎসাধীন রয়েছেন। তিনি ভয়াবহ ব্রেন স্ট্রোকে আক্রান্ত হয়েছিলেন, তবে দীর্ঘ এক মাসেও তাঁর শারীরিক অবস্থার উল্লেখযোগ্য কোনো উন্নতি লক্ষ্য করা যায়নি। আমরা সাধ্যমতো সবরকম চিকিৎসা দিয়েছি। এখন আমরা পরামর্শ দিচ্ছি তাঁকে কোনো পুনর্বাসন কেন্দ্রে (রিহ্যাব) স্থানান্তরের জন্য। কারণ, এই অবস্থায় হাসপাতালে থাকা তাঁর স্বাস্থ্যের জন্য উপকারের চেয়ে ক্ষতির আশঙ্কাই বেশি। রোগীর চার সন্তান এই বাস্তবতাকে মেনে নিলেও তাঁর বড় মেয়ে তা কোনোভাবেই মেনে নিতে পারছেন না। তিনি পেশায় একজন আইনজীবী এবং আমি জানতে পেরেছি যে তিনি দত্তক নেওয়া সন্তান। কিন্তু তাঁর মা তাঁকে নিজের বড় ছেলের মতোই সমান আইনি অধিকার দিয়ে গেছেন। অন্য ভাইবোনেরা আমাদের কথায় সায় দিলেও এই বড় মেয়েটি নারাজ।
সেদিন ছিল এক বর্ষণমুখর দিন। সপ্তাহের প্রথম কাজের দিনে ওই রোগী আমার দায়িত্বে ছিলেন না, আজই প্রথম তাঁকে দেখতে যাওয়ার কথা। সকাল থেকেই সেবিকারা আমাকে বার্তা পাঠাচ্ছিলেন যে রোগীর মেয়ে দীর্ঘক্ষণ ধরে অপেক্ষা করছেন। আমি অন্য রোগীদের দেখা শেষ করে বিকেলের দিকে যখন অঝোর ধারায় বৃষ্টি হচ্ছিল, তখন তাঁর কক্ষে গেলাম।
রোগীর কক্ষে গিয়ে দেখি তাঁর বড় মেয়ে বসে আছেন। আমাকে দেখতেই তিনি কিছুটা ক্ষোভের সুরে বললেন যে সারা দিন পর এখন আমার সময় হলো কি না। তিনি অভিযোগ করলেন তাঁর মায়ের সঠিক যত্ন হচ্ছে না। আমি দেখলাম রোগী নিথর অবস্থায় বিছানায় পড়ে আছেন। পরীক্ষা-নিরীক্ষা শেষে আমি তাঁকে বারান্দায় এসে কথা বলার অনুরোধ জানালাম।
আমরা বৃষ্টির ছাঁট থেকে সুরক্ষিত একটি বারান্দায় বসলাম। আমি তাঁকে তাঁর মায়ের বর্তমান শারীরিক অবস্থা সম্পর্কে বিস্তারিত জানালাম। তিনি মন দিয়ে সব শুনলেন এবং তারপর নিজের জীবনের কিছু ব্যক্তিগত স্মৃতিচারণ শুরু করলেন। সেই সময়ের জন্য ওই রোগীর মা-ই ছিলেন আমার দিনের শেষ রোগী।
বিদেশের মাটিতে আপনার জীবনের না বলা গল্প, অভিজ্ঞতা বা ছবি লিখে পাঠাতে পারেন আমাদের ই-মেইল ঠিকানায়। যোগাযোগের মাধ্যম: dp@prothomalo.com
তিনি বলতে শুরু করলেন, যখন তাঁর বয়স মাত্র ১০ বছর, তখন তিনি রাস্তায় থাকতেন। তিনি একজন পথশিশু ছিলেন। একদিন এক ব্যক্তি একটি অদ্ভুত পরীক্ষা করছিলেন; তিনি একটি শিশুর হাতে খাবারের বক্স দিয়ে বললেন সেটি রাস্তায় ফেলে দিলে তাকে ১০ ডলার দেওয়া হবে। ক্ষুধার্ত মেয়েটি দেখল খাবারটি ফেলে দিয়ে সেই শিশুটি টাকা নিয়ে চলে গেল। ক্ষুধার জ্বালায় তিনি যখন সেই ফেলে দেওয়া খাবারগুলো কুড়িয়ে খেতে চাইলেন, তখন এক নারী দৌড়ে এসে তাঁকে বাধা দিলেন। তিনি বললেন রাস্তার খাবার খেলে অসুখ হবে। এরপর সেই নারী তাঁকে একটি দোকানে নিয়ে গিয়ে পেট ভরে খাবার খাওয়ালেন এবং নিজের কাছে রাখার প্রস্তাব দিলেন। তিনি কথা দিয়েছিলেন যে ভালো না লাগলে তিনি যেকোনো সময় চলে যেতে পারবেন। সেই নারীই তাঁকে পরবর্তী সময়ে নিজের সন্তান হিসেবে গ্রহণ করেন।
পরবর্তীতে তিনি জানতে পারেন যে তাঁর মা ছিলেন শহরের এক খ্যাতনামা আইনজীবী। তিনি তাঁর কথা রেখেছিলেন এবং নিজের চারটি সন্তান হওয়ার পরেও এই পালিত মেয়েকে সমান অধিকার দিয়েছিলেন। মেয়েটি অনেক অবাধ্যতা করেছেন, এমনকি জেলেও গিয়েছেন, কিন্তু মা কখনও তাঁর ওপর থেকে ভরসা হারাননি। মায়ের অনুপ্রেরণাতেই তিনি আইন বিষয়ে পড়াশোনা শেষ করেন। কিন্তু দুর্ভাগ্যবশত, যেদিন তিনি তাঁর কর্মজীবন শুরু করে মাকে গর্বিত করতে চেয়েছিলেন, সেদিনই মা কোমায় চলে গেলেন। আমি তাঁকে বোঝালাম যে একজন মানুষকে এভাবে কৃত্রিমভাবে বাঁচিয়ে রেখে কষ্ট দেওয়া ঠিক হবে কি না। তাঁর মা আগেই একটি নির্দেশনামা (অ্যাডভান্স ডিরেকটিভ) দিয়ে গিয়েছিলেন যে তিনি চলে যেতে চাইলে যেন তাঁকে আটকানো না হয়।

পরদিন আমরা একটি বিশেষ প্রযুক্তি ব্যবহার করে রোগীর কথা বোঝার চেষ্টা করলাম। মেয়েটি তাঁর মায়ের সামনে গিয়ে আকুতি জানালেন। হঠাৎ দেখা গেল সেই লিপ রিডার বা প্রযুক্তির সহায়তায় মা সংকেত দিচ্ছেন—তিনি জানতেন তাঁর মেয়ে একদিন সফল হবে এবং এখন তিনি শান্তিতে বিদায় নিতে চান। মুহূর্তের মধ্যেই মনিটরে অ্যালার্ম বাজতে শুরু করল, হার্ট রেট শূন্য হয়ে গেল। আমি যখন মেয়েটিকে জিজ্ঞেস করলাম আমরা কি হৃদস্পন্দন ফেরানোর চেষ্টা করব, তিনি চোখের জল মুছে না বলে দিলেন। তিনি আর তাঁর মাকে কষ্ট দিতে চাইলেন না। সব ভাইবোন তখন একে অপরকে জড়িয়ে ধরে সান্ত্বনা দিচ্ছিলেন।
সব শেষে আমি যখন বারান্দায় একা দাঁড়ালাম, আমার নিজের মায়ের কথা খুব মনে পড়ল। তিনি আমার থেকে অনেক দূরে আছেন। ইচ্ছে করছিল একবার গিয়ে তাঁর হাতটা শক্ত করে ধরি। পৃথিবীর সব মায়েদের জন্য আমার অন্তহীন ভালোবাসা। তাঁরা যেন সর্বদা সুখে ও শান্তিতে থাকেন এবং আমাদের মাথার ওপর ছায়া হয়ে বিরাজ করেন।
শান্ত হোক এই পৃথিবী, আর প্রতিটি মা তাঁর সন্তানের ভালোবাসায় সিক্ত থাকুন। ভালোবাসি মা।
প্রচ্ছদ নিয়ে আরও পড়ুন




