খবরের নতুন দিগন্ত উন্মোচন করতে এখনই ভিজিট করুন:www.bnnbreakingnews.com
সম্পাদক ও প্রকাশক : প্রিন্স সালেহ। প্রকাশক কর্তৃক ১২ বীর উত্তম সি আর দত্ত রোড, বাংলামোটর, ঢাকা ১২০৫ থেকে মুদ্রিত।
স্বত্ব © BNN Breaking News (2026)
ওয়েবসাইটের কোনো লেখা, ছবি, ভিডিও অনুমতি ছাড়া ব্যবহার বেআইনি।
বিএনএন ডেস্ক

চায়ের সঙ্গে শিঙাড়ার এই গভীর সম্পর্কটি কবে থেকে শুরু হয়েছে, তা বলা কঠিন। আমার নিজেরও এই জুটির সঙ্গে পরিচয় কখন হয়েছিল, তা মনে নেই, মনে থাকার কথাও নয়। কেবল বিচ্ছিন্নভাবে মনে পড়ে চা-শিঙাড়ার সঙ্গে জড়িয়ে থাকা দিনগুলোর কথা। ডুবো তেলে ভাজা বাদামী শিঙাড়ার চৌহদ্দির মাঝে আলুর সঙ্গে মিশে থাকা কত শত স্মৃতি যে ঘাপটি মেরে ছিল, তা সেদিন একা একা চা-শিঙাড়া খেতে খেতে উপলব্ধি করেছিলাম। প্রতি কামড়ে ধোঁয়ার সঙ্গে সঙ্গে সেই সময়গুলোও যেন চোখের সামনে ভেসে উঠছিল।
এক সময় নিয়মিত খিলগাঁওয়ের ডাস্টবিনের বিপরীতে রাস্তার কোণে একটি রেস্তোরাঁয় দুই টাকা দামের ছোট আকারের শিঙাড়া খেতাম। দাদা টিউশন করিয়ে ফেরার পথে তা নিয়ে আসত, কখনো বাবা আনত, আবার কখনো শুক্রবার বাসায় আসা আত্মীয়ের হাতে থাকত সেই শিঙাড়া। রেস্তোরাঁর বিপরীতে ডাস্টবিন থাকায় এটি ‘ডাস্টবিনের দোকানের শিঙাড়া’ হিসেবেও পরিচিতি লাভ করেছিল। মা দুপুরে ওসব খেয়ে পেট ভরিয়ে ভাত না খাওয়ার জন্য মা বকাবকি করত। বিকেলে দুধ-চায়ের সঙ্গে খাওয়ার জন্য তা রেখে দিতে বলত। লোভী জিহ্বার নাগাল থেকে কদাচিৎ দু-একটি শিঙাড়া বেঁচে থাকত, যা শেষ পর্যন্ত চায়ের সঙ্গেই খাওয়া হতো। বাঙালি হিসেবে চা-শিঙাড়ার এই জমজমাট উপাখ্যান ব্যাখ্যার কোনো প্রয়োজন আছে বলে মনে হয় না।
গ্রামের বাড়িতে গেলেও শিঙাড়া খাওয়া হতো। তা সে কাছের গ্রামের বাজারই হোক, বা খানিকটা দূরের উপজেলার দোকান—শিঙাড়া সবসময়ই সঙ্গী ছিল। এটি প্রায় নিয়মে পরিণত হয়েছিল। উপজেলায় ভাইয়েরা দল বেঁধে গেলে কোনোবারই দোকানে বসে শিঙাড়া খাওয়ার ব্যতিক্রম ঘটেনি। কয়েক মাইল হেঁটে গিয়ে গরম গরম শিঙাড়া-চা, আর কখনো সঙ্গে বাড়তি পাওনা হিসেবে রসগোল্লা—এর স্বাদ ছিল অনন্য। সেখানে গেলে জেঠুর সঙ্গে দেখা হতো, আর তিনি আমাদের দেখামাত্র শিঙাড়া আনানোর নির্দেশ দিতেন। তিনি পৃথিবী ছেড়ে চলে যাওয়ার পর ওই রাস্তার দিকে তাকিয়ে আমরা ভাইয়েরা দীর্ঘশ্বাস ফেলতাম। কত মানুষ চলে যায়, কিন্তু যাত্রাপথের এক সাধারণ রাস্তার মোড়ে চিরস্থায়ী স্মৃতির জন্ম দিয়ে যায়।
বুয়েটে পড়তে এসেও শিঙাড়ার প্রতি ভালোবাসা কমেনি। প্রতিদিন বিকেলে ‘হালকা’ খাবারের নামে হলের ক্যান্টিনে যা খেতাম, তা ওজন বা ক্যালরি—কোনো হিসেবেই হালকা ছিল না। খাবারের মান ভালো না হলেও উপায় ছিল না। তাই আলুর চপ, ছোলা, চিকেন চপ ইত্যাদি খাবারের সঙ্গে তালিকায় শিঙাড়া আর দুধ-চা থাকত। এরও আগে কলেজের কথা আর না-ই বলি। ব্রেক শুরু হওয়ার এক মিনিটের মধ্যে ক্যান্টিনে পৌঁছাতে পারলেও শিঙাড়ার দেখা মিলত না। আমার দৃঢ় বিশ্বাস ছিল, শিঙাড়া খাওয়ার লোভে কিছু ছাত্র ব্রেকের আগের ক্লাসগুলোয় থাকত না। তবু ধাক্কাধাক্কির মধ্যে কখনো কখনো শিঙাড়া খাওয়ার সুযোগ মিলত। আহ, পরিশ্রমের পর পাওয়া শিঙাড়ার সে কী স্বাদ!
এরও আগে যখন সরকারি স্কুলে পড়তাম, তখন টিফিনে সপ্তাহে একদিন বা দুই সপ্তাহে একদিন শিঙাড়া আসত। সে কী আনন্দ ছিল আমাদের!
বরিশাল অঞ্চলে শিঙাড়ার মধ্যে বোম্বাই মরিচ দেওয়ার প্রচলন দেখেছি। হয়তো অন্য কিছু জায়গাতেও দেয়, জানি না, তবে ঢাকায় বেশিরভাগ জায়গাতেই দিতে দেখিনি। সেই বোম্বাইয়ে ঝাল কমবেশি যা-ই হোক না কেন, তার ঘ্রাণ ছিল অসামান্য। আর সেই স্বাদ-ঘ্রাণের আকর্ষণে একের পর এক শিঙাড়া চলে যেত মুখের অতল গহ্বরে। অ্যাসিডিটির সমস্যা হবে তো পরে দেখা যাবে! অ্যাসিডিটির প্রভাব বাড়াতে দুধ-চায়ের চেয়ে ভালো আর কী আছে! বাড়ি ফেরার দিন বরিশাল শহরে আত্মীয়দের বাসায় বা মাঝেমধ্যে বিখ্যাত সকাল-সন্ধ্যা রেস্তোরাঁতেও শিঙাড়া ছিল পছন্দের তালিকার প্রথম দিকের খাবার। একবার সোনা মামার বাসার কথা মনে পড়ে। সকালে ভরপেট পরোটা-ভাজি খেয়েও কিছুক্ষণ পর শিঙাড়া হাজির হওয়ায় ভরা পেটকে আবার পূর্ণ করতে খেয়ে নিয়েছিলাম গোটা দুয়েক বড় শিঙাড়া। নোয়া মামা সেদিন বাসায় এসেছিল, এটাও স্পষ্ট মনে পড়ে। নোয়া মামা নেই প্রায় ১১ বছর হলো। কত স্মৃতি, কত কথা আমরা ভুলে যাই, অথচ হাজার হাজার শিঙাড়া খাওয়ার মাঝে এই স্মৃতি আজও টিকে আছে।
দূর প্রবাসে জীবনের নানা গল্প, বিভিন্ন আয়োজনের খবর, ছবি ও লেখা পাঠাতে পারেন পাঠকেরা। ইমেইল: dp@prothomalo.com
কলেজ/বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্যান্টিনে, রেস্তোরাঁয় একা বা দল বেঁধে চা-শিঙাড়ার কোনো বিকল্প পাওয়া মুশকিল। তাই তো মনে হয় বাঙালির অজস্র স্মৃতির মাঝে আড্ডার প্রতীক হিসেবে টিকে থাকে এই চা আর শিঙাড়া।
দেশ থেকে হাজার মাইল দূরে চলে আসায় অনেক খাবার পাওয়াই কঠিন হয়ে পড়ে। টাটকা শিঙাড়ার মতো নানা খাবারের জন্য মন আকুল হলেও তা সামলে নিতে শিখতে হয়। মাসির বাসায় বেড়াতে গেলে ঘরে তৈরি শিঙাড়া খাওয়া হলেও নিয়মিত খাওয়ার সুযোগ তো আর হয় না। তবে গত বছর থেকে সেই দুঃখ কিছুটা লাঘব হয়েছে মূল ক্যাম্পাসের কাছে একটি ভারতীয় রেস্তোরাঁর আবির্ভাব ঘটায়। সেখানে নিয়মিত যাওয়া আসা শুরু হয়। মোটামুটি যুক্তরাষ্ট্রে আমার প্রিয় শিঙাড়ার (যদিও তারা এটিকে সমুচা বলে) তালিকায় এটি এখন পর্যন্ত এক নম্বরে আছে। চা-শিঙাড়ার এই যুগলবন্দি আমরা সবাই মিলে বা একা গিয়েও অসংখ্যবার উপভোগ করেছি।
প্রতিটি কামড় যেন আমাকে কয়েক বছর পিছিয়ে নিয়ে যায়। খাবারের স্বাদ বদলায়, দাম বদলায়, স্থান বদলায়, কিন্তু এ সবকিছু কীভাবে যেন সঙ্গের সময়টাকেও ধরে রাখে।
মাত্র দুই টাকা (এখন ডলার) মূল্যের শিঙাড়া আর দুধ-চা এত পরম যত্নে এত স্মৃতি ধরে রাখতে পারে, কে জানত!
*লেখক: অংকন ঘোষ দস্তিদার, শিক্ষার্থী, ইউনিভার্সিটি অব ইলিনয় আরবানা-শ্যাম্পেইন
প্রচ্ছদ নিয়ে আরও পড়ুন




