
মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প এবং চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিং আগামী ১৪ ও ১৫ মে বেইজিংয়ে বৈঠকে বসতে যাচ্ছেন। ইরান ও ইসরায়েল-যুক্তরাষ্ট্র উত্তেজনার কারণে কয়েক সপ্তাহ বিলম্বের পর এই গুরুত্বপূর্ণ সফরটি অনুষ্ঠিত হচ্ছে।
এই আলোচনায় মূলত দুই দেশের বাণিজ্যিক সম্পর্কের ওপর গুরুত্ব দেওয়া হবে। প্রায় এক দশকের মধ্যে কোনো মার্কিন প্রেসিডেন্টের এটিই প্রথম চীন সফর হতে যাচ্ছে।
সাম্প্রতিক দশকগুলোতে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র এবং চীন বিশ্বের শীর্ষ পরাশক্তি হিসেবে আবির্ভূত হয়েছে। বিশ্ব ব্যবস্থায় কে আধিপত্য বিস্তার করবে, তা নিয়ে দেশ দুটির মধ্যে দীর্ঘদিনের প্রতিদ্বন্দ্বিতা চলছে।
মাত্র ২৫ বছর আগে অধিকাংশ সূচকে আমেরিকা চীনের চেয়ে অনেক এগিয়ে ছিল। তবে বর্তমানে বেইজিং বিশ্বের অন্যতম প্রধান উৎপাদন কেন্দ্রে পরিণত হয়েছে এবং অনেক ক্ষেত্রে পশ্চিমা দেশগুলোকে ছাড়িয়ে যাচ্ছে।
এই তুলনামূলক বিশ্লেষণে আমরা অর্থনীতি, সামরিক শক্তি, প্রাকৃতিক সম্পদ এবং প্রযুক্তির নিরিখে দেশ দুটির বর্তমান অবস্থান তুলে ধরব।
বিশ্বের শীর্ষ বাণিজ্যিক শক্তি হিসেবে কার অবস্থান কোথায়?
বিশ্বব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, ২০০১ সালে যুক্তরাষ্ট্র ছিল বিশ্বের বৃহত্তম রপ্তানিকারক দেশ, যারা ৭২৯ বিলিয়ন ডলারের পণ্য রপ্তানি করেছিল। সেই সময় চীন ছিল চতুর্থ অবস্থানে এবং তাদের রপ্তানি আয় ছিল ২৬৬ বিলিয়ন ডলার, যা আমেরিকার তুলনায় মাত্র এক-তৃতীয়াংশ।
সেই সময়ে বিশ্বের মাত্র ৩০টি দেশ আমেরিকার চেয়ে চীনের সঙ্গে বেশি বাণিজ্য করত।
বর্তমানে চীন বিশ্বের শীর্ষ রপ্তানিকারক। তারা বছরে ৩.৫৯ ট্রিলিয়ন ডলারের পণ্য রপ্তানি করে, যেখানে যুক্তরাষ্ট্রের রপ্তানির পরিমাণ ১.৯ ট্রিলিয়ন ডলার। বর্তমানে বিশ্বের ১৪৫টি দেশ আমেরিকার তুলনায় চীনের সঙ্গে বেশি বাণিজ্যিক লেনদেন করে।

রপ্তানি বাণিজ্যে কে বেশি শক্তিশালী?
২০২৪ সালে চীন ৩.৫৯ ট্রিলিয়ন ডলারের পণ্য বিদেশে পাঠিয়েছে এবং ২.৫৮ ট্রিলিয়ন ডলারের পণ্য আমদানি করেছে। এর ফলে তাদের বাণিজ্য উদ্বৃত্ত দাঁড়িয়েছে ১ ট্রিলিয়ন ডলারের বেশি, যা বিশ্বের যেকোনো দেশের জন্য রেকর্ড।
চীনের প্রধান রপ্তানি পণ্যগুলোর তালিকায় রয়েছে:
রপ্তানির দিক থেকে যুক্তরাষ্ট্র বিশ্বে দ্বিতীয়। ২০২৪ সালে তারা ১.৯ ট্রিলিয়ন ডলারের পণ্য রপ্তানি করলেও আমদানি করেছে ৩.১২ ট্রিলিয়ন ডলারের পণ্য, যা বিশাল বাণিজ্য ঘাটতি তৈরি করেছে। গত বছর হোয়াইট হাউসে ফেরার পর ডোনাল্ড ট্রাম্প এই ঘাটতি কমাতেই বিভিন্ন দেশের ওপর উচ্চ হারে শুল্ক আরোপ করেছেন।
যুক্তরাষ্ট্রের প্রধান রপ্তানি পণ্যগুলোর তালিকায় রয়েছে:
যুক্তরাষ্ট্র ও চীন একে অপরের থেকে কী ধরনের পণ্য কেনাবেচা করে?

আমেরিকা ও চীন একে অপরের গুরুত্বপূর্ণ ব্যবসায়িক অংশীদার। ২০২৫ সালে দেশ দুটি ৫০০ বিলিয়ন ডলারের বেশি মূল্যের পণ্য বিনিময় করেছে। তবে ট্রাম্পের দ্বিতীয় মেয়াদের শুরুতে পাল্টাপাল্টি শুল্ক আরোপের কারণে বাণিজ্যের পরিমাণ কিছুটা হ্রাস পেয়েছে।
বর্তমানে চীন থেকে আসা পণ্যের ওপর গড়ে ৩১.৬ শতাংশ মার্কিন শুল্ক কার্যকর রয়েছে। অন্যদিকে চীনও আমেরিকার কৃষি ও জ্বালানি পণ্যের ওপর ১০ শতাংশ থেকে শুরু করে বিভিন্ন হারে পাল্টা শুল্ক বসিয়েছে। এর মধ্যে গরুর মাংসের ওপর শুল্কের হার সর্বোচ্চ ৭৭ শতাংশে পৌঁছেছে।
এত উত্তেজনার পরেও যুক্তরাষ্ট্র এখনো চীনের প্রধান বাণিজ্যিক অংশীদার। তবে আমেরিকার জন্য চীন এখন তৃতীয় বৃহত্তম বাণিজ্যিক অংশীদার, যার আগে রয়েছে মেক্সিকো ও কানাডা।
২০২৪ সালে যুক্তরাষ্ট্র চীন থেকে ৪৫৩ বিলিয়ন ডলারের পণ্য আমদানি করেছে। এর মধ্যে প্রধান পণ্যগুলো হলো:

একই বছর চীন যুক্তরাষ্ট্র থেকে ১৪৫ বিলিয়ন ডলারের পণ্য আমদানি করেছে, যার মধ্যে উল্লেখযোগ্য ছিল:

কার ঋণের বোঝা কত বেশি?
যুক্তরাষ্ট্র ও চীন উভয় দেশই বিশাল ঋণের চাপে রয়েছে। আমেরিকার সরকারি ঋণ তাদের জিডিপির ১১৫ শতাংশ, আর চীনের ক্ষেত্রে তা জিডিপির ৯৪ শতাংশ। তবে ধারণা করা হয়, চীনের প্রকৃত ঋণের পরিমাণ সরকারি তথ্যের চেয়েও বেশি।
২০০৮ সালের বৈশ্বিক মন্দার পর আমেরিকার ঋণ দ্রুত বাড়তে থাকে, কারণ তখন ব্যাংকগুলোকে বাঁচাতে সরকার বিশাল অংকের প্রণোদনা দিয়েছিল।
চীনের ঋণ বৃদ্ধির ধারাটি ছিল ধারাবাহিক। ২০০০ সালে তা জিডিপির ২২ শতাংশ থাকলেও অবকাঠামো উন্নয়ন ও স্থানীয় সরকারের ঋণের কারণে এটি বর্তমানে অনেক উঁচুতে পৌঁছেছে।
করোনা মহামারির সময় উভয় দেশের ঋণ পরিস্থিতি আরও খারাপ হয়। আমেরিকা বেকার ভাতা ও ব্যবসায়িক ঋণে ট্রিলিয়ন ডলার ব্যয় করেছে, অন্যদিকে চীন বড় বড় অবকাঠামো প্রকল্পে প্রচুর বিনিয়োগ করেছে।
আমেরিকার জাতীয় ঋণ এখন ৩৯ ট্রিলিয়ন ডলার ছাড়িয়ে গেছে, যা দেশটির ইতিহাসে সর্বোচ্চ। বিপরীতে চীনের সঠিক ঋণের হিসাব পাওয়া বেশ কঠিন।
সামরিক খাতে কে বেশি ব্যয় করে?

সামরিক ব্যয়ে যুক্তরাষ্ট্র এককভাবে বিশ্বের শীর্ষ। ২০২৫ সালে তারা সামরিক খাতে ৯৫৪ বিলিয়ন ডলার ব্যয় করেছে, যা চীনের ব্যয়ের তুলনায় প্রায় তিনগুণ। চীন এই খাতে আনুমানিক ৩৩৬ বিলিয়ন ডলার ব্যয় করেছে বলে ধারণা করা হয়।
পুরো বিশ্বের মোট সামরিক ব্যয়ের অর্ধেকের বেশি খরচ করে কেবল এই দুটি দেশ।
আকাশপথে শক্তি প্রদর্শনে আমেরিকা অনেক এগিয়ে, তাদের যুদ্ধবিমানের সংখ্যা চীনের চেয়ে তিনগুণ বেশি। তবে নৌপথে চীনের জাহাজের সংখ্যা বেশি হলেও গুণগত মান ও ফায়ারপাওয়ারে আমেরিকা এখনো এগিয়ে রয়েছে।

জ্বালানি ব্যবহারের দৌড়ে কে এগিয়ে?
এই শতাব্দীতে চীনের শিল্পায়ন ও উৎপাদন বৃদ্ধির সাথে সাথে দেশটির জ্বালানি চাহিদাও অবিশ্বাস্য গতিতে বেড়েছে।
বর্তমানে চীন বিশ্বের বৃহত্তম জ্বালানি ব্যবহারকারী দেশ। ২০২৪ সালে তারা ৪৮,৪৭৭ টেরাওয়াট-ঘণ্টা জ্বালানি ব্যবহার করেছে, যার সিংহভাগই এসেছে কয়লা থেকে।
জ্বালানি ব্যবহারে আমেরিকা বিশ্বে দ্বিতীয়। ২০২৪ সালে দেশটি ২৬,৩৪৯ টেরাওয়াট-ঘণ্টা জ্বালানি ব্যবহার করেছে, যার প্রধান উৎস ছিল পেট্রোলিয়াম বা তেল।
তবে নবায়নযোগ্য বা সবুজ জ্বালানি বিনিয়োগে চীন আমেরিকাকে অনেক পেছনে ফেলে দিয়েছে। ২০২৪ সালে চীন এই খাতে ২৯০ বিলিয়ন ডলার খরচ করেছে, যেখানে আমেরিকার ব্যয় ছিল মাত্র ৯৭ বিলিয়ন ডলার।

ভবিষ্যতের প্রযুক্তিতে কার নিয়ন্ত্রণ বেশি?
কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (AI) থেকে শুরু করে বৈদ্যুতিক গাড়ি—সব ক্ষেত্রেই চীন অত্যন্ত দ্রুতগতিতে অগ্রসর হচ্ছে, যদিও কিছু বিশেষ ক্ষেত্রে আমেরিকা এখনো নেতৃত্বে আছে।
এআই খাতে বিনিয়োগের দিক থেকে আমেরিকা এখনো শীর্ষে। ২০২৪ সালে মার্কিন কোম্পানিগুলো এই খাতে ১০৯ বিলিয়ন ডলার ব্যয় করেছে, যা প্রায় সারা বিশ্বের মোট ব্যয়ের সমান।
চ্যাটজিপিটি বা জেমিনির মতো বড় বড় এআই মডেল তৈরিতেও আমেরিকা চীনের চেয়ে দ্বিগুণ এগিয়ে। চীনের সবচেয়ে আলোচিত এআই মডেল হলো 'ডিপসিক' (DeepSeek)।
কম্পিউটার চিপ বা সেমিকন্ডাক্টর প্রযুক্তিতেও এনভিডিয়ার মতো প্রতিষ্ঠানের কারণে আমেরিকা সুবিধাজনক অবস্থানে রয়েছে। তবে উন্নত চিপ তৈরির জন্য উভয় দেশই মূলত তাইওয়ানের ওপর নির্ভরশীল।
বৈদ্যুতিক গাড়ির বাজারে চীন বিশাল বিপ্লব ঘটিয়েছে। ২০২৪ সালে চীনে বিক্রি হওয়া মোট গাড়ির অর্ধেকই ছিল ইলেকট্রিক, যেখানে আমেরিকায় এই হার ছিল মাত্র ১০ শতাংশ।
বিরল খনিজ সম্পদের ভাণ্ডার কার কাছে বেশি?

বিরল খনিজ সম্পদের দিক থেকে চীন বিশ্বের অপ্রতিদ্বন্দ্বী শক্তি। বিশ্বের মোট খনিজ মজুদের প্রায় অর্ধেকই রয়েছে চীনের মাটির নিচে।
শুধু উত্তোলনেই নয়, এই খনিজগুলো প্রক্রিয়াজাতকরণের ক্ষেত্রেও চীন একক আধিপত্য বজায় রেখেছে, যা তাদের বিশ্ব প্রযুক্তিতে বিশেষ ক্ষমতা দিয়েছে।
আধুনিক স্মার্টফোন, বৈদ্যুতিক গাড়ি এবং উন্নত সামরিক সরঞ্জাম তৈরির জন্য এই ১৭টি বিরল ধাতব উপাদান অত্যন্ত অপরিহার্য।
যুক্তরাষ্ট্রের খনিজ মজুদের পরিমাণ চীনের তুলনায় অত্যন্ত সামান্য। ফলে আধুনিক প্রযুক্তি পণ্য তৈরির জন্য আমেরিকাকে পুরোপুরি চীনের ওপর নির্ভর করতে হয়।
পরিবেশগত কড়াকড়ি ও উচ্চ ব্যয়ের কারণে আমেরিকা এই খাতে পিছিয়ে থাকলেও চীন পরিবেশগত ঝুঁকি উপেক্ষা করেই উৎপাদন চালিয়ে যাচ্ছে, যা তাদের এই বাজারে শীর্ষে রেখেছে।
বিরল খনিজ রপ্তানি নিয়ে দুই দেশের মধ্যে টানাপোড়েন চলছে, যা আসন্ন দ্বিপাক্ষিক বৈঠকে আলোচনার অন্যতম বিষয় হতে পারে।
গত বছর চীন খনিজ রপ্তানি কমিয়ে দিলে ট্রাম্প ১০০ শতাংশ শুল্ক আরোপের হুমকি দিয়েছিলেন। ছয় মাস আগে একটি সাময়িক চুক্তির মাধ্যমে চীন সেই কড়াকড়ি কিছুটা শিথিল করে।

তারা কোন কোন আন্তর্জাতিক সংস্থার সদস্য?
যুক্তরাষ্ট্র ও চীন উভয়ই জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদ, ডব্লিউটিও, আইএমএফ এবং জি-২০-এর মতো প্রভাবশালী সংস্থাগুলোর সদস্য।
চীন এছাড়াও ব্রিকস (BRICS) এবং এসসিও (SCO)-এর মতো শক্তিশালী জোটের নেতৃত্ব দিচ্ছে।
অন্যদিকে যুক্তরাষ্ট্র ন্যাটো (NATO), জি-৭ এবং ফাইভ আইজ-এর মতো সামরিক ও অর্থনৈতিক জোটের প্রধান শক্তি।

দেশ দুটির অর্থনৈতিক মডেলের মধ্যে পার্থক্য কী?
চীনের অর্থনীতি মূলত রাষ্ট্র-নিয়ন্ত্রিত। এখানে সরকার দীর্ঘমেয়াদী পরিকল্পনার মাধ্যমে অবকাঠামো ও শিল্প খাতে বিপুল বিনিয়োগ করে থাকে।
ট্রাম্পের 'আমেরিকা ফার্স্ট' মডেলে শুল্ক আরোপ, কর ছাড় এবং দেশীয় উৎপাদন বাড়ানোর ওপর জোর দেওয়া হয়। তিনি চীনের ওপর নির্ভরতা কমিয়ে আমেরিকার নিজস্ব বাজারকে শক্তিশালী করার নীতি গ্রহণ করেছেন।
তথ্যসূত্র: আল-জাজিরা