খবরের নতুন দিগন্ত উন্মোচন করতে এখনই ভিজিট করুন:www.bnnbreakingnews.com
সম্পাদক ও প্রকাশক : প্রিন্স সালেহ। প্রকাশক কর্তৃক ১২ বীর উত্তম সি আর দত্ত রোড, বাংলামোটর, ঢাকা ১২০৫ থেকে মুদ্রিত।
স্বত্ব © BNN Breaking News (2026)
ওয়েবসাইটের কোনো লেখা, ছবি, ভিডিও অনুমতি ছাড়া ব্যবহার বেআইনি।
বিএনএন ডেস্ক

প্রকৃতির অপরূপ সৌন্দর্যমণ্ডিত সুন্দরবন, যেখানে ম্যানগ্রোভ বন, লবণাক্ত পানির স্রোত আর গোলপাতার সারি এক আদিম পরিবেশ তৈরি করে। এই প্রাকৃতিক ঐশ্বর্যে মানুষের চলাচল ছিল সীমিত, আর সেখানে প্রযুক্তির ছোঁয়া পাওয়া ছিল এক প্রকার স্বপ্নের মতো। বিশেষ করে সুন্দরবনের অভ্যন্তরে অবস্থিত পর্যটন কেন্দ্রগুলোতে মোবাইল নেটওয়ার্কের দুর্বলতা ছিল একটি সাধারণ সমস্যা। তবে এখন সেই চিত্র পাল্টে যাচ্ছে। ইলন মাস্কের মালিকানাধীন স্পেসএক্সের স্যাটেলাইট ইন্টারনেট পরিষেবা স্টারলিংক সুন্দরবন অঞ্চলে যোগাযোগ ব্যবস্থায় এনেছে এক নতুন দিগন্ত।
দীর্ঘদিন ধরে সুন্দরবন ভ্রমণকারী পর্যটকদের একটি প্রধান অভিযোগ ছিল ইন্টারনেটের ধীরগতি। বনের ভেতরে মোবাইল টাওয়ারের স্বল্পতা এবং ঘন বনের কারণে সংকেত বাধাপ্রাপ্ত হওয়ায় সাধারণ 3G বা 4G ইন্টারনেট সেখানে খুব একটা কার্যকর ছিল না। স্টারলিংক এই সমস্যার একটি কার্যকরী সমাধান নিয়ে এসেছে। কোনো টাওয়ার বা ভূগর্ভস্থ কেবলের প্রয়োজন ছাড়াই সরাসরি স্যাটেলাইটের মাধ্যমে সুন্দরবন অঞ্চলে স্টারলিংকের ইন্টারনেট সেবা পাওয়া যাচ্ছে।
সুন্দরবনের নিকটবর্তী দাকোপে অবস্থিত জঙ্গলবাড়ি ম্যানগ্রোভ রিসোর্টের ব্যবস্থাপনা পরিচালক জাকারিয়া হোসাইন জানান, ‘গত কয়েক মাস ধরে সুন্দরবন সংলগ্ন দুটি রিসোর্টে আমরা স্টারলিংকের মাধ্যমে ইন্টারনেট সুবিধা পাচ্ছি। পূর্বে ইন্টারনেটের জন্য আমাদের অনেক সমস্যার সম্মুখীন হতে হতো। এখন আমরা আমাদের প্রাতিষ্ঠানিক কার্যক্রম থেকে শুরু করে বুকিং ব্যবস্থাপনা পর্যন্ত সবকিছু খুব সহজেই করতে পারছি। সবচেয়ে বড় কথা হলো, আমাদের অতিথিরা এখন বনের গভীরে থেকেও বিশ্বের যেকোনো প্রান্তে সংযুক্ত থাকতে পারছেন। আমরা মাঝে মাঝে ১৫০ এমবিপিএস পর্যন্ত গতি পাচ্ছি, যা সুন্দরবনের মতো প্রত্যন্ত অঞ্চলে ছিল অকল্পনীয়।’
সুন্দরবন যুব সংঘের সদস্য মো. জুয়েল বলেন, বর্তমানে অনেক তরুণ সুন্দরবন ভ্রমণে আসেন এবং তারা বেশ কয়েক দিন সেখানে অবস্থান করেন। স্টারলিংকের ইন্টারনেটের কারণে তাদের বনের আশেপাশে থাকার আগ্রহ উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে। ইন্টারনেটের মাধ্যমে ভিডিও আপলোড করা, অফিসের ছোটখাটো কাজ সম্পন্ন করা বা ঢাকার সাথে ই-মেইল যোগাযোগ স্থাপন করা এখন আর কোনো সমস্যাই নয়।
বর্তমান সময়ে পর্যটনের ধরণ বদলেছে। মানুষ এখন ভ্রমণকালে নিজেদের কর্মক্ষেত্র থেকে সম্পূর্ণ বিচ্ছিন্ন থাকতে চায় না, বিশেষ করে যারা 'ওয়ারকেশন' বা কাজ করতে করতে ভ্রমণ করতে ভালোবাসেন। সুন্দরবনে স্টারলিংকের ব্যবহার এই ধরনের পর্যটকদের জন্য একটি আশীর্বাদস্বরূপ প্রমাণিত হয়েছে। একটি বিদেশি প্রতিষ্ঠানে কর্মরত উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা আলিমূল হাসান সম্প্রতি পরিবার সহ তিন দিনের জন্য সুন্দরবন ভ্রমণে এসেছিলেন। নিজের অভিজ্ঞতা বর্ণনা করতে গিয়ে তিনি বলেন, ‘সুন্দরবনের প্রাকৃতিক সৌন্দর্য অনবদ্য, কিন্তু এখানকার মোবাইল ইন্টারনেটের দুর্বলতার কারণে জরুরি ই-মেইল চেক করাও কঠিন হয়ে পড়ে। তবে এই রিসোর্টে এসে আমি বিস্মিত হয়েছি। এখানে তরুণ কর্মীরা নিজেদের উদ্যোগে স্টারলিংক ব্যবহার করছেন। আমি রিসোর্টে বসে গড়ে ৮০ থেকে ১২০ এমবিপিএস গতিতে ইন্টারনেট ব্যবহার করতে পেরেছি। ফলে বনের ভেতর থেকেও অফিসের কাজ সম্পন্ন করা বা পরিবারের সাথে ভিডিও কলে যুক্ত থাকতে কোনো অসুবিধা হয়নি।’
সুন্দরবন অঞ্চল প্রায়শই প্রাকৃতিক দুর্যোগের শিকার হয়। ঘূর্ণিঝড় বা জলোচ্ছ্বাসের সময় প্রথমেই ক্ষতিগ্রস্ত হয় মোবাইল টাওয়ার এবং বিদ্যুৎ সংযোগ। এর ফলে পুরো এলাকা যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ে, যা উদ্ধার অভিযান এবং ত্রাণ কার্যক্রমকে বাধাগ্রস্ত করে। সুন্দরবনে আগত নর্থ সাউথ বিশ্ববিদ্যালয়ের জনস্বাস্থ্য বিষয়ক গবেষক রুবিনা হক বলেন, স্টারলিংকের মতো স্যাটেলাইট ইন্টারনেট এই সংকটময় পরিস্থিতিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করতে পারে। কারণ, এই ব্যবস্থার জন্য স্থানীয় অবকাঠামোর উপর নির্ভর করতে হয় না। কেবল একটি বহনযোগ্য রিসিভার এবং পাওয়ার ব্যাকআপ থাকলেই যেকোনো দুর্যোগের মধ্যেও সারা বিশ্বের সাথে যোগাযোগ বজায় রাখা সম্ভব। সুন্দরবনের পার্শ্ববর্তী উপজেলাগুলোতে সীমিত পরিমাণে ব্রডব্যান্ড থাকলেও তার গতি ও নির্ভরযোগ্যতা নিয়ে পর্যটক এবং স্থানীয় বাসিন্দাদের মধ্যে সব সময়ই অসন্তোষ ছিল। স্টারলিংক সেই শূন্যতা পূরণ করে এক নতুন সম্ভাবনার দ্বার উন্মোচন করছে।
সুন্দরবনের প্রত্যন্ত অঞ্চলে ইন্টারনেটের এই সহজলভ্যতা কেবল পর্যটনেই সীমাবদ্ধ থাকছে না। স্থানীয় তরুণদের ফ্রিল্যান্সিং, অনলাইন শিক্ষা এবং ই-কমার্স ব্যবসায়ে এই উচ্চগতির ইন্টারনেট গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে শুরু করেছে। সুন্দরবন বিষয়ক গবেষকরা এখন স্টারলিংকের মাধ্যমে মূল্যবান তথ্য আদান-প্রদান করতে পারছেন। যদিও এর উচ্চমূল্যের কারণে স্টারলিংক এখনও সাধারণ মানুষের নাগালের বাইরে। যদি খরচ কিছুটা কমানো যায়, তবে প্রত্যন্ত সুন্দরবনে আরও নতুন নতুন সুযোগ সৃষ্টি হবে।
প্রচ্ছদ নিয়ে আরও পড়ুন








