খবরের নতুন দিগন্ত উন্মোচন করতে এখনই ভিজিট করুন:www.bnnbreakingnews.com
সম্পাদক ও প্রকাশক : প্রিন্স সালেহ। প্রকাশক কর্তৃক ১২ বীর উত্তম সি আর দত্ত রোড, বাংলামোটর, ঢাকা ১২০৫ থেকে মুদ্রিত।
স্বত্ব © BNN Breaking News (2026)
ওয়েবসাইটের কোনো লেখা, ছবি, ভিডিও অনুমতি ছাড়া ব্যবহার বেআইনি।
বিএনএন ডেস্ক

ইরানে মার্কিন ও ইসরায়েলি বাহিনীর যৌথ অভিযান কোনো আকস্মিক ঘটনা নয়, বরং এটি মধ্যপ্রাচ্যের ভূ-রাজনৈতিক মানচিত্র বদলে দিতে ইসরায়েলের একটি সুদূরপ্রসারী পরিকল্পনার অংশ। কাতারভিত্তিক সংবাদমাধ্যম আল-জাজিরাকে দেওয়া এক বিশেষ সাক্ষাৎকারে কাতারের সাবেক প্রধানমন্ত্রী ও পররাষ্ট্রমন্ত্রী শেখ হামাদ বিন জাসিম আল-থানি এই মন্তব্য করেন।
অভিজ্ঞ এই কূটনীতিক ওই অঞ্চলের বর্তমান টালমাটাল পরিস্থিতি ও দ্রুত পরিবর্তনশীল সমীকরণ নিয়ে তাঁর নিজস্ব বিশ্লেষণ তুলে ধরেন।
শেখ হামাদ সতর্কবার্তা দিয়ে বলেন, হরমুজ প্রণালীকে কেন্দ্র করে সৃষ্ট অস্থিরতা এই যুদ্ধের সবচেয়ে মারাত্মক পরিণতি ডেকে আনতে পারে। তিনি ইসরায়েলি প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুর ‘বৃহত্তর ইসরায়েল’ গড়ার উচ্চাকাঙ্ক্ষা সম্পর্কেও সবাইকে সাবধান করেন। পাশাপাশি তিনি উপসাগরীয় দেশগুলোর নিরাপত্তা নিশ্চিতে একটি অভিন্ন ও ঐক্যবদ্ধ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা গড়ে তোলার ওপর গুরুত্বারোপ করেন।
মধ্যপ্রাচ্যে ঘনীভূত হওয়া সম্ভাব্য সংঘাত নিয়ে শেখ হামাদ গত বছরই সর্তক করেছিলেন। সামরিক হামলা ঠেকাতে তিনি ওই সময় উপসাগরীয় দেশগুলোকে ইরানের সাথে আলোচনার মাধ্যমে কূটনৈতিক সমাধান খোঁজার তাগিদ দিয়েছিলেন।
শেখ হামাদের মতে, ‘আমরা বর্তমানে এই অঞ্চলের একটি বড় ধরনের প্রশাসনিক ও ভৌগোলিক পুনর্গঠন প্রত্যক্ষ করছি।’ চলমান এই অস্থিরতা আগামী কয়েক দশকের জন্য মধ্যপ্রাচ্যের নতুন রূপরেখা তৈরি করে দেবে বলেও তিনি মনে করেন।
নেতানিয়াহুর চাল ও যুক্তরাষ্ট্রের ভুল সিদ্ধান্ত
আসন্ন সংঘাত নিয়ে গত বছরই সতর্ক করেছিলেন শেখ হামাদ। তিনি ইরান ইস্যুতে সংকট নিরসনে উপসাগরীয় দেশগুলোকে আরও সক্রিয় হতে বলেছিলেন যাতে যুদ্ধ এড়ানো যায়।
শেখ হামাদ মনে করেন, নেতানিয়াহুর নেতৃত্বাধীন ইসরায়েলের একটি কট্টরপন্থী দল উদ্দেশ্যপ্রণোদিতভাবে ইরানকে যুদ্ধের দিকে ঠেলে দিচ্ছে।
তাঁর বিশ্লেষণ অনুযায়ী, নব্বইয়ের দশকে ক্লিনটন প্রশাসন থেকে শুরু করে বর্তমান সময় পর্যন্ত এই গোষ্ঠীটি তেহরানের পারমাণবিক ইস্যুকে কেন্দ্র করে ওয়াশিংটনকে একটি বড় যুদ্ধে জড়ানোর চেষ্টা করে আসছে।
নেতানিয়াহু মার্কিন প্রশাসনকে বিশ্বাস করাতে সক্ষম হয়েছেন যে, এই যুদ্ধ হবে অত্যন্ত সংক্ষিপ্ত এবং কয়েক সপ্তাহের মধ্যেই ইরানি শাসনব্যবস্থার পতন ঘটবে।শেখ হামাদ বিন জাসিম আল থানি, কাতারের সাবেক প্রধানমন্ত্রী ও পররাষ্ট্রমন্ত্রী
পূর্ববর্তী মার্কিন প্রশাসনগুলো, এমনকি ট্রাম্পের প্রথম মেয়াদকালেও ইরানের সঙ্গে সরাসরি যুদ্ধে জড়াতে দ্বিধা ছিল। কিন্তু শেখ হামাদের মতে, নেতানিয়াহু ওয়াশিংটনকে একটি কাল্পনিক ও ভুল ধারণার জালে আটকাতে সফল হয়েছেন।
শেখ হামাদ বলেন, ‘তিনি (নেতানিয়াহু) মার্কিন নেতাদের বুঝিয়েছেন যে সংঘাত হবে খুব দ্রুতগতির এবং খুব অল্প সময়েই তেহরানের পতন হবে।’
কাতার এই সাবেক প্রধানমন্ত্রী ওয়াশিংটনের সামরিক শক্তির ওপর অতি-নির্ভরশীলতার সমালোচনা করে বলেন, ‘যুক্তরাষ্ট্রের প্রকৃত শক্তি বলপ্রয়োগের মধ্যে নয়, বরং তা এড়িয়ে প্রভাব বিস্তারের সামর্থ্যের মধ্যে নিহিত।’

শেখ হামাদ বলেন, বর্তমান যুদ্ধের বাস্তবতা শেষ পর্যন্ত সব পক্ষকেই আলোচনার টেবিলে বসতে বাধ্য করেছে। তিনি মনে করেন, ওমানের মধ্যস্থতায় জেনেভায় যে কূটনৈতিক উদ্যোগ নেওয়া হয়েছিল, তা যদি আর মাত্র দুই সপ্তাহ সময় পেত, তবে বর্তমান বিপর্যয় হয়তো এড়ানো যেত।
হামাদের পর্যবেক্ষণ হলো, এই সংঘাতের সবচেয়ে বড় সুবিধাভোগী খোদ নেতানিয়াহু। তাঁর মতে, নেতানিয়াহু এই বিশৃঙ্খলাকে কাজে লাগিয়ে ‘গ্রেটার ইসরায়েল’ বা বৃহত্তর ইসরায়েলের এজেন্ডা বাস্তবায়ন করতে চান, যার মূল উদ্দেশ্য হলো প্রতিবেশী দেশগুলোর সীমানা দখল করে ইসরায়েলের পরিধি বাড়ানো।
উপসাগরীয় দেশগুলো যেখানে যুদ্ধের বিপক্ষে অবস্থান নিয়েছিল, সেখানে মার্কিন স্বার্থে আঘাত হানার অজুহাতে ইরানের চালানো হামলার কঠোর সমালোচনা করেছেন শেখ হামাদ।
হরমুজ প্রণালী: বিশ্ব অর্থনীতির নতুন ঝুঁকি
তেহরানের রণকৌশল নিয়ে শেখ হামাদ বলেন, ইরান যুদ্ধের শুরুর ধাক্কা সামলে নিয়েছে এবং এখন তারা এক বিশেষ কৌশলগত সুবিধা অর্জনের অপেক্ষায় আছে। যার মূল কেন্দ্রে রয়েছে হরমুজ প্রণালী।
এই জলপথকে যুদ্ধের হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করাকে ‘চরম বিপজ্জনক’ হিসেবে বর্ণনা করেছেন তিনি। শেখ হামাদ জানান, ইরান এখন এই আন্তর্জাতিক জলপথকে তাদের নিজেদের অংশ হিসেবে দাবি করছে, যা পারমাণবিক কর্মসূচির চেয়েও বিশ্ব অর্থনীতির জন্য বড় হুমকি হয়ে দাঁড়িয়েছে।
তাঁর মতে, ওয়াশিংটন নয় বরং এই প্রণালী সংকটে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে উপসাগরীয় রাষ্ট্রগুলো।
ইসরায়েল ও যুক্তরাষ্ট্রের হামলার জবাবে ইরান যখন পাল্টা আক্রমণ করেছে, তখন তাদের লক্ষ্যবস্তু ছিল এই অঞ্চলের জ্বালানি ও বেসামরিক অবকাঠামো।
শেখ হামাদ ইরানের এই কর্মকাণ্ডের নিন্দা জানিয়ে বলেন, উপসাগরীয় দেশগুলো এই যুদ্ধের বিরুদ্ধে থাকা সত্ত্বেও তেহরান তাদের ওপর হামলা চালিয়েছে। এর ফলে ওই অঞ্চলে ইরানের রাজনৈতিক সমর্থন ও বিশ্বাসযোগ্যতা কমেছে। তবে ভৌগোলিক কারণে প্রতিবেশী হিসেবে একসঙ্গে থাকতেই হবে, তাই তিনি ইরানের সঙ্গে একটি সমন্বিত ও গঠনমূলক আলোচনার আহ্বান জানিয়েছেন।
‘গালফ ন্যাটো’ গঠনের প্রস্তাবনা
শেখ হামাদ মনে করেন, বাইরের কোনো শত্রু নয় বরং অভ্যন্তরীণ বিভাজনই উপসাগরীয় দেশগুলোর জন্য বড় হুমকি।
এই সংকট কাটাতে তিনি ‘গালফ ন্যাটো’ নামক একটি সামরিক ও রাজনৈতিক জোট গঠনের প্রস্তাব দেন। তাঁর পরিকল্পনা অনুযায়ী, সৌদি আরব হবে এই জোটের মূল শক্তি।
ইউরোপীয় ইউনিয়নের উদাহরণ টেনে তিনি বলেন, শক্তিশালী প্রাতিষ্ঠানিক আইনের মাধ্যমে এই জোট পরিচালনা করতে হবে যেখানে সবার জন্য নিয়ম সমান হবে।
মার্কিন সামরিক ঘাঁটিগুলোর ভূমিকা স্বীকার করলেও তিনি সতর্ক করে বলেন, আমেরিকা এখন এশিয়ায় চীনের প্রভাব সামলাতে বেশি আগ্রহী। তাই ভবিষ্যতে মার্কিন নিরাপত্তা ছত্রছায়ার ওপর পুরোপুরি নির্ভর না করে তুরস্ক, পাকিস্তান ও মিসরের মতো আঞ্চলিক দেশগুলোর সঙ্গে দীর্ঘমেয়াদী কৌশলগত জোট গড়ার পরামর্শ দেন তিনি।
নেতানিয়াহুর কৌশল ও মধ্যপ্রাচ্যের পরিবর্তন
সিরিয়া প্রসঙ্গে শেখ হামাদ বাশার আল-আসাদ সরকারের পতনকে ইতিবাচক হিসেবে দেখছেন। তিনি জানান, বহু আগে ব্যক্তিগতভাবে আসাদকে জনগণের দাবি মানার পরামর্শ দিয়েছিলেন তিনি।
সিরিয়ার নতুন নেতৃত্বের কৌশলগত অবস্থানের প্রশংসা করে শেখ হামাদ বলেন, তারা ইসরায়েলি উসকানি এড়িয়ে দেশ পুনর্গঠনে মনোযোগ দিচ্ছে, যা অত্যন্ত সময়োপযোগী সিদ্ধান্ত। দীর্ঘ গৃহযুদ্ধের পর এখন সিরিয়ার প্রধান কাজ হওয়া উচিত অর্থনৈতিক উন্নতি ও প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কার।
সাক্ষাৎকারে শেখ হামাদ একটি অজানা কূটনৈতিক তথ্য ফাঁস করেন। তিনি জানান, ৯০-এর দশকের শেষ দিকে বিল ক্লিনটন প্রশাসনের একটি গোপন বার্তা নিয়ে কাতারি প্রতিনিধি হিসেবে তিনি তেহরান গিয়েছিলেন। সেখানে প্রস্তাব ছিল যে ইরান তাদের পারমাণবিক কর্মসূচি রাশিয়ার কাছে হস্তান্তর করবে অথবা আন্তর্জাতিক নিয়ন্ত্রণে রাখবে। তবে কাতার কেবল বার্তাবাহক হওয়া সত্ত্বেও তেহরান দোহাকে মার্কিন মদতপুষ্ট হিসেবে সন্দেহ করেছিল।
প্রচ্ছদ নিয়ে আরও পড়ুন




