খবরের নতুন দিগন্ত উন্মোচন করতে এখনই ভিজিট করুন:www.bnnbreakingnews.com
সম্পাদক ও প্রকাশক : প্রিন্স সালেহ। প্রকাশক কর্তৃক ১২ বীর উত্তম সি আর দত্ত রোড, বাংলামোটর, ঢাকা ১২০৫ থেকে মুদ্রিত।
স্বত্ব © BNN Breaking News (2026)
ওয়েবসাইটের কোনো লেখা, ছবি, ভিডিও অনুমতি ছাড়া ব্যবহার বেআইনি।
বিএনএন ডেস্ক

বর্তমান বিশ্বে একদিকে যেমন ধনিক শ্রেণির নিয়ন্ত্রণে থাকা পুতুল সরকারের আধিপত্য স্পষ্ট, তেমনি অন্যদিকে সাধারণ মানুষকে কেন্দ্র করে রাজনীতির এক নতুন রূপরেখাও ফুটে উঠছে। দীর্ঘদিনের প্রতিষ্ঠিত রাজনৈতিক শক্তির বাইরে গিয়ে ভোটাররা এখন নতুন মুখ বা রাজনৈতিক 'আউটসাইডার'দের ওপর ভরসা রাখছেন।
ভিন্ন ভিন্ন আদর্শ ধারণ করলেও এসব নতুন আন্দোলনের মধ্যে কিছু অভিন্ন বৈশিষ্ট্য রয়েছে। ক্রমবর্ধমান জীবনযাত্রার ব্যয়, অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তা এবং সরাসরি জনসংযোগের কৌশল তাদের একে অপরের কাছাকাছি নিয়ে এসেছে। গত দুই-তিন বছরে বিশ্বজুড়ে অনুষ্ঠিত বিভিন্ন নির্বাচনে এই নতুন ধারার বিজয় লক্ষ করা যাচ্ছে। নিচে এর কিছু দৃষ্টান্ত তুলে ধরা হলো:
হাঙ্গেরি (২০২৬): এক ঐতিহাসিক পরিবর্তনের মধ্য দিয়ে পিটার মাজিয়ার ও তার দল তিসজা পার্টি ভিক্টর অরবানের ১৬ বছরের কর্তৃত্ববাদী শাসনের সমাপ্তি ঘটিয়েছে। একদা অরবানের ঘনিষ্ঠ সহচর মাজিয়ার ক্ষমতার অন্দরমহল থেকে বেরিয়ে তার বিরুদ্ধেই লড়াইয়ে নামেন। পুরনো ব্যবস্থা পরিবর্তনের জন্য তিনি ক্ষমতার ভেতরের অভিজ্ঞতাকে কাজে লাগিয়ে দুর্নীতি ও ভঙ্গুর অর্থনীতির ইস্যুতেই বেশি গুরুত্ব দেন।
শ্রীলঙ্কা (২০২৪): ভয়াবহ অর্থনৈতিক ধসের পর লঙ্কান ভোটাররা অনুঢ়া কুমারা দিশানায়েকে ও তার দল এনপিপির ওপর আস্থা রেখেছেন। কয়েক দশক ধরে চলে আসা পারিবারিক শাসন ও বংশতান্ত্রিক রাজনীতির বিরুদ্ধে এটি ছিল জনগণের এক কড়া বার্তা। দিশানায়েকের মূল প্রতিশ্রুতি ছিল অর্থনৈতিক পুনরুদ্ধার, স্বচ্ছতা নিশ্চিত করা ও দুর্নীতি নির্মূল করা। এর ফলে মাত্র চার বছরের ব্যবধানে তার দলের আসন সংখ্যা তিন থেকে বেড়ে ১৫৯-এ উন্নীত হয়েছে।
নেপাল (২০২৫–২৬): রাষ্ট্রীয় স্বতন্ত্র পার্টি (আরএসপি) মূলত তরুণ প্রজন্মের এক জাগরণ। র্যাপার থেকে রাজনীতিতে আসা বালেন্দ্র শাহর মতো ব্যক্তিত্বদের নেতৃত্বে চলা এই দলটি প্রথাগত জ্যেষ্ঠ নেতৃত্বকে পেছনে ফেলে দিয়েছে। মূলত প্রযুক্তিগত জ্ঞান এবং দুর্নীতিবিরোধী অবস্থান তরুণদের ব্যাপকভাবে আকৃষ্ট করেছে।
নিউইয়র্ক সিটি (২০২৫): আবাসন সংকট ও গণপরিবহনের মতো জীবনমুখী ইস্যুকে সামনে রেখে মেয়র নির্বাচনে জয়ী হয়েছেন জোহরান মামদানি। সাশ্রয়ী জীবনযাত্রার প্রতিশ্রুতি দিয়ে তিনি কর্মজীবী ও তরুণ ভোটারদের সংগঠিত করতে সক্ষম হয়েছেন।
নেদারল্যান্ডস (২০২৩): গির্ট ওয়াইল্ডার্স ও তার দল পিভিভি অভিবাসনবিরোধিতার প্রথাগত অবস্থান থেকে সরে এসে জীবনযাত্রার ব্যয়ের ওপর গুরুত্ব দিয়ে সবাইকে চমকে দিয়েছেন। যদিও তারা ডানপন্থী হিসেবে পরিচিত, তবুও মুদ্রাস্ফীতি ও আবাসন সংকটে অতিষ্ঠ ভোটাররা তাদের দিকেই ঝুঁকেছেন।
ক্ষমতাসীনরা কীভাবে নিজেদের অবস্থান পোক্ত করে এবং কেন একসময় জনরোষের মুখে পড়ে, তা বিশ্লেষণ করতে গবেষক লিয়াম বার্ন জনতোষণবাদী নেতাদের তিনটি প্রধান বৈশিষ্ট্যের কথা বলেছেন:
১. তোষণ ও শাসন: এই কৌশলে বিরোধী পক্ষ বা জনগণকে মানসিকভাবে দমন করে ক্ষমতার ‘অনিবার্যতা’ প্রতিষ্ঠা করা হয়।
২. স্বৈরতান্ত্রিক কাঠামো: রাষ্ট্রীয় ও রাজনৈতিক প্রতিষ্ঠানগুলোকে এমনভাবে সাজানো হয় যাতে নেতার ক্ষমতা নিরঙ্কুশ থাকে।
৩. সম্পদ আহরণ: রাষ্ট্রের সম্পদ ব্যবহার করে ব্যক্তিগত বা দলীয় স্বার্থ উদ্ধার।
এই ত্রুটিগুলোকে কাজে লাগিয়েই নতুন রাজনৈতিক শক্তিগুলো জনতোষণের রাজনীতিকে চ্যালেঞ্জ জানাচ্ছে। সফল প্রচারণার ক্ষেত্রে বেশ কিছু কৌশল স্পষ্ট:
২০২৪ সালের ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থান বাংলাদেশে দীর্ঘদিনের স্বৈরতান্ত্রিক তোষণচক্রকে চূর্ণ করেছে। আগামী দিনে বাংলাদেশেও নেপালের আরএসপির মতো শক্তিশালী একটি তৃতীয় পক্ষের উত্থানের জোরালো সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে।
তৃণমূল পর্যায়ে নিবিড় সংযোগ: গণমাধ্যম এড়িয়ে সফল রাজনৈতিক শক্তিগুলো ভোটারদের সঙ্গে সরাসরি যোগাযোগ স্থাপন করে। যেমন মাজিয়ার হাঙ্গেরির ৯৫ শতাংশ এলাকা চষে বেড়িয়েছেন, যা যেকোনো ডিজিটাল প্রচারণার চেয়ে বেশি কার্যকরী হয়েছে।
সংস্কৃতি যুদ্ধের পরিবর্তে জনজীবনের ইস্যু: সফল বিকল্প নেতারা বিভাজনমূলক পরিচয়ের রাজনীতির চেয়ে সাধারণ মানুষের অর্থনৈতিক চাহিদার ওপর বেশি মনোযোগ দেন।
সহমর্মিতার রাজনীতি: শুধু সমালোচনা নয়, বরং জনদুর্ভোগের কথা শুনে সুনির্দিষ্ট ও উন্নত নীতি প্রস্তাব করাই এখনকার রাজনীতির মূলমন্ত্র।
আকর্ষণীয় যোগাযোগ: গতানুগতিক বয়ানের বদলে বর্তমান প্রজন্মের ভোটাররা একটি আশাব্যঞ্জক ও গতিশীল রাজনৈতিক বার্তা প্রত্যাশা করে।
বিশ্বের রাজনৈতিক পরিবর্তনের হাওয়া লেগেছে ভারতেও। ২০২৪ সালের নির্বাচনে বিজেপির বিশাল লক্ষ্যমাত্রা অর্জিত না হওয়া তারই প্রমাণ। এর পেছনে চারটি কারণ কাজ করেছে:
১. অজেয় তত্ত্বে ফাটল: বিজেপি একক সংখ্যাগরিষ্ঠতা হারিয়েছে, যা প্রমাণ করে কোনো দলই অজেয় নয়। হাইপ্রোফাইল নেতা বা ক্যারিশমার চেয়ে জনরায় অনেক বেশি শক্তিশালী।
২. পরিচয় বনাম রুটির রাজনীতি: ধর্মীয় আবেগের চেয়ে মানুষ এখন কর্মসংস্থান ও নিত্যপণ্যের দামের দিকে বেশি নজর দিচ্ছে। অযোধ্যায় বিজেপির হার তারই প্রতিফলন।
৩. সংবিধান ও অধিকারের সুরক্ষা: অধিকার হারানোর ভয় দলিত ও অনগ্রসর ভোটারদের মধ্যে বিজেপিবিরোধী মনোভাব তৈরি করেছে।
৪. সরাসরি জবাবদিহি: জনকল্যাণমূলক প্রকল্পের মাধ্যমে সরাসরি সুফল পাওয়া ভোটাররা এখন আর কেবল ফাঁপা বুলিতে বিশ্বাসী নয়।
বাংলাদেশ ২০২৪ সালের গণ-অভ্যুত্থানের পরবর্তী ধাপ পার করছে, যা দীর্ঘস্থায়ী স্বৈরতন্ত্রকে চ্যালেঞ্জ জানিয়ে একটি নতুন ধারার তৃতীয় শক্তির জন্য জমি তৈরি করেছে।
প্রথাগত দলগুলোর ওপর বিরক্ত তরুণ প্রজন্ম এখন স্বচ্ছতা ও প্রশাসনিক দক্ষতাসম্পন্ন নেতৃত্বের সন্ধান করছে। আগামী দিনে মুদ্রাস্ফীতি ও দুর্নীতি মোকাবিলায় সক্ষম এবং অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতার পথে তৃণমূলের সঙ্গে সংযোগ স্থাপনকারী নেতারাই সফল হবেন। হাঙ্গেরির মাজিয়ার ইফেক্ট বা নেপালের আরএসপির মতো বাংলাদেশেও এমন কারিগরিভাবে দক্ষ ও জনতুষ্টির ঊর্ধ্বে থাকা নেতৃত্ব প্রয়োজন।
নেপাল, শ্রীলঙ্কা, ভারত বা বাংলাদেশের সাম্প্রতিক রাজনৈতিক চিত্র বলছে, জনজীবনের মান উন্নয়নই এখন রাজনীতির প্রধান আদর্শ।
ডান বা বামের পুরনো সমীকরণ ছাপিয়ে ভোটাররা এখন এমন নেতা খুঁজছেন যিনি বর্তমান অকার্যকর ব্যবস্থা ভেঙে নতুন সমাধান দিতে পারবেন। তোষণ ও ভয়ভীতির রাজনীতি থেকে বেরিয়ে এসে জনগণের মৌলিক ইস্যুগুলো নিয়ে যারা লড়বে, শেষ পর্যন্ত তারাই জয়ী হবে।
সৈয়দ হাসিবউদ্দীন হোসেন রাষ্ট্র সংস্কার আন্দোলনের কর্মী
ই-মেইল: hasibh@gmail.com
প্রচ্ছদ নিয়ে আরও পড়ুন








