খবরের নতুন দিগন্ত উন্মোচন করতে এখনই ভিজিট করুন:www.bnnbreakingnews.com
সম্পাদক ও প্রকাশক : প্রিন্স সালেহ। প্রকাশক কর্তৃক ১২ বীর উত্তম সি আর দত্ত রোড, বাংলামোটর, ঢাকা ১২০৫ থেকে মুদ্রিত।
স্বত্ব © BNN Breaking News (2026)
ওয়েবসাইটের কোনো লেখা, ছবি, ভিডিও অনুমতি ছাড়া ব্যবহার বেআইনি।
বিএনএন ডেস্ক

বিদেশের মাটিতে বাংলা ভাষা ও সংস্কৃতির যে নিভৃত অথচ বলিষ্ঠ ধারা প্রবাহিত, তার অন্যতম প্রধান অবলম্বন হলেন জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলাম। তাঁর বিদ্রোহ, ভালোবাসা, সমতা ও মানবতাবাদের দর্শন কেবল সাহিত্যিক সম্পদ নয়; এটি প্রবাসী বাঙালিদের আত্মপরিচয়, আত্মমর্যাদা এবং সাংস্কৃতিক পরিচিতির এক গভীর উৎস।
এই মূল্যবোধকে ধারণ করে দীর্ঘকাল ধরে কাজ করে যাচ্ছে ক্যালিফোর্নিয়াভিত্তিক প্রবাসী সাংস্কৃতিক গোষ্ঠী ‘তরঙ্গ অব ক্যালিফোর্নিয়া’। তারা নজরুল সাহিত্যকে কেবল স্মরণীয় করে রাখতেই নয়, বরং আন্তর্জাতিক শিক্ষাজগতে সুপ্রতিষ্ঠিত করার উদ্দেশ্যে নিরলসভাবে কাজ করে চলেছে।
সম্প্রতি ক্যালিফোর্নিয়ার বারব্যাংকে একটি বিশেষ সাংস্কৃতিক পর্ব ‘নজরুল লিগ্যাসি’ আয়োজিত হয়। তরঙ্গ-এর তত্ত্বাবধানে এই অনুষ্ঠানটি ছিল নজরুলের সাহিত্য, গান ও দর্শনের প্রতি নিবেদিত এক গভীর শ্রদ্ধাঞ্জলি।
তরঙ্গ অব ক্যালিফোর্নিয়ার সভাপতি শিপার চৌধুরীর পরিচালনায় এবং আম্বারীন রহমান ও জায়িদ হকের সঞ্চালনায় অনুষ্ঠানের প্রারম্ভে শিশুশিল্পী শেহজীন রহমান বাঁশিতে জাতীয় সংগীত ‘আমার সোনার বাংলা’ বাজিয়ে শোনায়। এতে পুরো সমাবেশ কক্ষে এক আবেগপূর্ণ আবহের সৃষ্টি হয়।
এই আয়োজনে শিশুদের উপস্থিতি ছিল বিশেষ আকর্ষণীয়। গান, কবিতা, নাচ এবং সিম্পোজিয়ামের (আলোচনা সভা) মাধ্যমে তারা অনুষ্ঠানটিকে জীবন্ত করে তোলে। শিশু সিম্পোজিয়ামের অংশে এনজেলা আহসান উপস্থাপনা করে এবং এতে মানহা রায়ান, মেহভেশ, মুনিশা ও আবরার মাহাদি অংশগ্রহণ করে।
এছাড়াও আলভিনা ইসলাম, টানি ইসলাম, অনিন্দিতা সাহা, মাহি ইসলাম, অনুপম সাহা, সুপর্ণা সাহা সহ আরও অনেকে গান, কবিতা ও নৃত্য পরিবেশন করেন। নজরুল বিশেষজ্ঞ গুলশান আরা, আজফার ও কাজী বেলাল এই আয়োজনের বিশেষ অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন।

বিদেশে নজরুলচর্চাকে আরও জোরদার করার লক্ষ্যে অনুষ্ঠানে কিছু গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত ঘোষণা করা হয়। এর মধ্যে অন্যতম হলো ‘কাজী নজরুল ইসলাম এন্ডোমেন্ট ফান্ড’-এর আওতায় দুটি বৃত্তি চালু করা। এ বছর ক্যালিফোর্নিয়া স্টেট ইউনিভার্সিটি নর্থরিজে (সিএসইউএন) এই বৃত্তি প্রদান শুরু হয়েছে।
২ মে তরঙ্গ-এর আয়োজিত অনুষ্ঠানে বিশ্ববিদ্যালয়ের মিডল ইস্টার্ন স্টাডিজ বিভাগের চেয়ারপারসন খানম শেখ আনুষ্ঠানিকভাবে দুই বৃত্তিপ্রাপ্ত শিক্ষার্থীর সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দেন। আয়োজকদের মতে, এটি কেবল আর্থিক সহযোগিতা নয়, বরং বিদেশে বেড়ে ওঠা নতুন প্রজন্মকে নজরুলের সাহিত্য, দর্শন এবং মানবতাবাদী ভাবনার সাথে সংযুক্ত করার একটি কার্যকর প্রয়াস।

আয়োজনে জানানো হয়েছে যে, ক্যালিফোর্নিয়া স্টেট ইউনিভার্সিটি নর্থরিজে কাজী নজরুল ইসলামের সাহিত্যকে কেন্দ্র করে সেমিস্টারভিত্তিক একটি পাঠক্রম চালুর সম্ভাবনা নিয়ে আলোচনা চলছে। এটি কার্যকর হলে পশ্চিমা উচ্চশিক্ষা অঙ্গনে বাংলা সাহিত্য ও নজরুল গবেষণার ক্ষেত্রে এক উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি হবে।
এছাড়াও, নজরুল চর্চাকে আরও প্রসারিত করতে যুক্তরাষ্ট্রের বিভিন্ন উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে একাডেমিক সহযোগিতা বৃদ্ধির পরিকল্পনা গ্রহণ করা হয়েছে।
সাংস্কৃতিক কার্যক্রমের পাশাপাশি বিদেশে মানবিক সহায়তাকে আরও সুসংগঠিত করতে ‘হোপ অ্যান্ড স্মাইল হিউম্যানিটারিয়ান অর্গানাইজেশন অব লস অ্যাঞ্জেলেস’ নামে একটি নতুন উদ্যোগের ঘোষণা দেওয়া হয়। একইসাথে, বাংলাদেশের জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলাম বিশ্ববিদ্যালয়ের (ত্রিশাল) সাথে শিক্ষামূলক ও গবেষণা সংক্রান্ত সহযোগিতার বিষয়টিও আলোচনা করা হয়েছে।

তরঙ্গ অব ক্যালিফোর্নিয়ার সভাপতি শিপার চৌধুরী ব্যাখ্যা করেন, ২০০২ সালে তাঁদের সংগঠন কাজী নজরুল ইসলাম সম্মেলন সফলভাবে সম্পন্ন করে। এর পরেই সিদ্ধান্ত নেওয়া হয় কিভাবে পশ্চিমা বিশ্বে নজরুলের সাহিত্যকর্মকে আরও ব্যাপকভাবে ছড়িয়ে দেওয়া যায়।
তিনি উল্লেখ করেন, সেই সময় ক্যালিফোর্নিয়া স্টেট ইউনিভার্সিটি নর্থরিজের হিউম্যানিটিজ বিভাগের সাথে আলোচনা করে ইতিবাচক সাড়া পাওয়া যায়। প্রাথমিকভাবে ১ হাজার ৭০০ ডলার দিয়ে একটি স্থায়ী তহবিল (এন্ডোমেন্ট ফান্ড) গঠন করা হয়েছিল, যা বর্তমানে ১ লাখ ৫০ হাজার ডলারে পৌঁছেছে।
প্রতি বছর দেশ-বিদেশ থেকে নজরুল গবেষকরা সিএসইউএনের লেকচারশিপ কর্মসূচিতে যোগদান করেন। শিক্ষার্থীরা সেখানে নজরুলের সমৃদ্ধ সাহিত্য ভাণ্ডার সম্পর্কে জ্ঞান অর্জন করেন এবং শিক্ষাগত ক্রেডিট লাভ করেন।

এই কার্যক্রম পর্যবেক্ষণের জন্য বিভিন্ন সময়ে বাংলাদেশ থেকে যুক্তরাষ্ট্রে এসেছিলেন নজরুল ইনস্টিটিউটের তৎকালীন পরিচালক রশীদ হায়দার, সহকারী পরিচালক রিয়াজউদ্দিন স্তালিন, শিল্পী ফেরদৌস আরা, নীলা তাপসী, খিলখিল কাজী এবং সাংবাদিক শাইখ সিরাজ সহ অন্যান্য গুণীজন। প্রয়াত অধ্যাপক রফিকুজ্জামানও এই উদ্যোগকে উৎসাহ ও পরামর্শ প্রদান করে অনুপ্রাণিত করেছেন।
এছাড়াও উইনস্টন ল্যাংলি, জুন ম্যাকড্যানিয়েল, নীলা ভট্টাচার্য, গুলশান আরা, নাসিরুদ্দিন, ফিলিস হারমান, মোহাম্মদ ওমর ফারুক, মোহিত উল আলম প্রমুখ নজরুল গবেষণায় অবদান রেখেছেন। তাঁদের গবেষণা প্রবন্ধগুলো নজরুল ইনস্টিটিউটের জার্নালের (৭ম খণ্ড) অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে।
শিপার চৌধুরী প্রকাশ করেন যে, তাঁদের পরবর্তী প্রধান লক্ষ্য হলো ২০২৭-২৮ শিক্ষাবর্ষ থেকে বিশ্ববিদ্যালয়ে কাজী নজরুল ইসলামের সাহিত্যকর্মের উপর ভিত্তি করে একটি পূর্ণাঙ্গ সেমিস্টার প্রবর্তন করা। এই বিষয়ে হিউম্যানিটিজ বিভাগের সাথে আলোচনা বর্তমানে চলমান। প্রতি বছর এই সেমিস্টার পরিচালনার জন্য আনুমানিক ২০ হাজার ডলারের প্রয়োজন হবে। যেহেতু স্থায়ী তহবিলের আয় থেকে এই সম্পূর্ণ খরচ মেটানো সম্ভব নয়, তাই স্থানীয় কমিউনিটির সহায়তায় ব্যয়ভার বহন করার পরিকল্পনা রয়েছে।
তিনি আরও উল্লেখ করেন যে, সাবেক রাষ্ট্রদূত শমসের মবিন চৌধুরী সরকারিভাবে স্থায়ী তহবিলে ৫০ হাজার ডলার অনুদান দেওয়ার ঘোষণা দিয়েছিলেন। সেই সময়ে সাবেক প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়াও এতে অনুমোদন দিয়েছিলেন। তবে রাজনৈতিক পরিস্থিতির পরিবর্তনের কারণে সেই পরিকল্পনা আর বাস্তবায়িত হয়নি।

সাংস্কৃতিক আয়োজনে মাহবুবুল হক, মালিকা হক, আহমেদ বশির, নৌরিন রহমান, মোহাম্মদ রাইস, উম্মে রাইস, তারিক চৌধুরী, মামুন খান, শিল্পী ইসলাম, পাপড়ি সরকারসহ আরও অনেকে পরিবেশনা উপস্থাপন করেন। অনুষ্ঠানটি সফল করতে সমাজসেবী সৈয়দ নাসির জেবুল, মুনিরুল ইসলাম, আবদুল মুনিম, বদরুল আলম মাসুদসহ অনেকে সার্বিক সহযোগিতা প্রদান করেন।
সৈয়দ নাসির জেবুল উল্লেখ করেন, এই আয়োজনে শিশুদের সক্রিয় অংশগ্রহণই এর প্রধান শক্তি। তাদের মাধ্যমেই নজরুলের বিদ্রোহ, প্রেম ও মানবতাবাদের দর্শন ভবিষ্যতে আরও ব্যাপকভাবে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে পৌঁছাবে। ‘নজরুল লিগ্যাসি’ কেবল একটি সাংস্কৃতিক আয়োজন নয়, এটি বিদেশে বাংলা ভাষা, সাহিত্য এবং জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলামের মানবতাবাদী আদর্শ প্রসারে এক দীর্ঘমেয়াদী আন্দোলনের প্রতীক।
প্রচ্ছদ নিয়ে আরও পড়ুন








