১২ মে ২০২৬
preview
দীর্ঘ ছাব্বিশ বছরের অপেক্ষার পর এক ঐতিহাসিক মুহূর্তের সাক্ষী বাংলাদেশ...

বিএনএন ডেস্ক

এক সাজানো গল্পের মতো ছিল সেই দিনটি। সূর্যাস্তের ক্ষণে গোধূলির আলো, সঙ্গে বৈশাখী সন্ধ্যার মনোরম বাতাস। ক্যামেরার চোখ তৈরি, প্রস্তুত ছিল মঞ্চও, শুধু দরকার ছিল একজন নায়ক।

নাহিদ রানাকে নিয়ে ছিল সকলেরই কৌতূহল ও উদ্দীপনা—তিনি কি এই ম্যাচের মূল তারকা হতে পারবেন? নাহিদ আসলেন, হাতে নিলেন বল, শুরু করলেন তার সেই পরিচিত দৌড়... বলটি ছুঁড়তেই শোনা গেল এক প্রবল চিৎকার, ‘আউট?’ এবং পরক্ষণেই নিশ্চিত হলো সেই মাহেন্দ্রক্ষণ—শাহিন শাহ আফ্রিদি সাজঘরে!

ক্যামেরার শাটার তখন দ্রুত চলছিলো—গ্যালারিতে উল্লাস, মাঠে জয় উদযাপনের শব্দ রেকর্ড করার প্রতিযোগিতা। এমন এক সময়ের জন্য অপেক্ষা যে দীর্ঘ ছাব্বিশ বছরের! হ্যাঁ, অবিশ্বাস্য হলেও সত্যি। ২৬ বছর এবং ১৫৭টি টেস্ট ম্যাচ পর এই প্রথম বাংলাদেশের একজন পেসার টেস্টের চতুর্থ ইনিংসে ৫ উইকেট শিকার করলেন।

স্মৃতিতে পিছিয়ে গেলে দেখা যায়, বাংলাদেশ প্রায়শই মাত্র একজন পেসার নিয়ে পুরো ম্যাচ খেলেছে। পেস বোলারদের ৫ উইকেট পাওয়াও যেন এক অধরা স্বপ্ন ছিল। এলোমেলো গতির বোলিংয়ে অনেকের পরিশ্রমই যেন বৃথা গেছে। তবে এই সময়ে যারা এমন দৃশ্যের সাক্ষী হয়েছেন, তাদের মধ্যে অন্যতম অভিজ্ঞ মুশফিকুর রহিমকে নাহিদ রানা যখন কোলে তুলে নিলেন, তখন যেন সবার মনে একটাই প্রশ্ন ছিল, ‘কে লিখলো এই অপূর্ব গল্প!’

এই গল্পের মূল চরিত্র কি শুধুই নাহিদ রানা? অধিনায়ক নাজমুল হোসেন সংবাদ সম্মেলনে এসে এ ধারণাকেই নাকচ করে দিয়ে গেলেন। তিনি বলেন, ‘নাহিদের কথা বলার আগে আমি তাসকিনের কথা বলতে চাই। চা বিরতির পর তাসকিনের শুরুটা ছিল দারুণ...।’ পেসারদের প্রশংসা করলেও তিনি মনে করিয়ে দেন যে, স্পিনাররা যদি গুরুত্বপূর্ণ তিনটি উইকেট না নিতো, তবে দলের জন্য পরিস্থিতি কঠিন হয়ে উঠতো।

তবে কিছুক্ষণ পরেই সেই অধিনায়কই আবার নাহিদের বিশেষত্ব তুলে ধরে বলেন, ‘আমরা সবাই জানি নাহিদ কতটা অসাধারণ এবং কত দ্রুত গতিতে বল করতে পারে। প্রতিপক্ষ যেভাবে ওর বিরুদ্ধে ভয়ে ছিল, সেটা দেখতে অবশ্যই ভালো লাগে।’

প্রতিপক্ষের ভয়? চলুন আরেকটি ঘটনার কথা বলি। মোহাম্মদ রিজওয়ান নাহিদের একটি বল ছেড়ে দিয়েছিলেন। সেই রিভার্স সুইং করা বলটি তার স্টাম্প ভেঙে দেয়। স্ক্রিনে প্রায় সঙ্গে সঙ্গেই ভেসে উঠলো বলের গতি—ঘণ্টায় ১৪৭.২ কিলোমিটার। সত্যিই কি কয়েক বছর আগেও এমন কিছু আমাদের কল্পনার মধ্যে ছিল?

এর আগে বাংলাদেশ আরও পঁচিশবার টেস্ট জিতেছে। নিউজিল্যান্ডকে মাউন্ট মঙ্গানুইতে হারানো, এমনকি দুই বছর আগে রাওয়ালপিন্ডিতে এই পাকিস্তানকেই পরপর দু’বার হারানোর স্মৃতিও রয়েছে। তবুও এই জয়টি বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ। কেন? কারণ, প্রতিপক্ষ দলের অধিনায়কও ম্যাচের শেষে স্বীকার করেছেন যে, সত্যি বলতে পঞ্চম দিনেও উইকেটটি খেলার জন্য বেশ ভালো ছিল। এমন একটি উইকেটে পাকিস্তানকে বাংলাদেশ যেভাবে হারিয়েছে, তা এক কথায় ছিল ‘অনায়াস জয়’ বা ‘একতরফা’ জয়।

কখনো তাইজুল আবদুল্লাহ ফজলকে আউট করে এনে দেন গুরুত্বপূর্ণ ব্রেক থ্রু, কখনো তাসকিন কিংবা মেহেদী হাসান মিরাজ এসে চাপ সৃষ্টি করেন, আর নাহিদ রানা দারুণভাবে কাজটি শেষ করেন। স্লিপে দাঁড়িয়ে যখন নাজমুল তার রাজশাহীর সতীর্থকে সহজ আঞ্চলিক ভাষায় বলেন, ‘মামুর বেটা একটা উইকেট এনে দে…’, তখন নাহিদ সেটি ঠিকই এনে দেন।

তাকে কি কোনো কিছু শিখিয়ে দিতে হয়? নাজমুল হেসে উত্তর দেন, ‘খুব কমই পরামর্শ দিতে যাই। আগে হয়তো কিছুটা বেশি দরকার হতো। এখন সে ধীরে ধীরে শিখছে এবং নিজেকে তৈরি করছে। মাঝে মাঝে আমি তাকে নিজের মতো ছেড়ে দেই, কারণ নিজের বোঝাপড়া থেকে কাজ করলে ভবিষ্যতে তা আরও বেশি কাজে আসবে।’

নাহিদের সামনে এক উজ্জ্বল ভবিষ্যৎ অপেক্ষা করছে। বাংলাদেশের টেস্ট ক্রিকেটের যাত্রাপথেও উন্নতির লক্ষণ স্পষ্ট। যদিও এই পথচলায় কঠিন সময় বা কখনো থেমে যাওয়ার মতো পরিস্থিতিও আসতে পারে। তবে নাজমুলের দৃঢ় বিশ্বাস, অচিরেই সারা বিশ্বে একটি বার্তা পৌঁছে যাবে—‘বাংলাদেশ এখন টেস্ট ক্রিকেটও দারুণ খেলে...’

এ ধরনের সাফল্যের জন্য আরও অনেক স্মরণীয় ম্যাচের প্রয়োজন হবে। আড়াই দশকের দীর্ঘ অপেক্ষা যেন আর ফিরে না আসে। ইবাদত হোসেনের হাত ধরে যে যাত্রা শুরু হয়েছিল, তাসকিন আহমেদ সেটিকে এগিয়ে নিয়ে যাচ্ছেন, আর সেই রিলে রেসের পতাকা এবার ভয় ধরানো বোলার নাহিদের হাতেও পৌঁছে গেছে। এই যাত্রায় বাংলাদেশ হয়তো কখনো দ্বিতীয় হবে, কখনো তৃতীয়, আর কে জানে, হয়তো একদিন প্রথমও! এ তো সবে শুরু মাত্র!

নাজমুল বিনয়ের সঙ্গে বললেন, 'আমাকে ক্ষমা করে দেবেন'।


সম্পাদক ও প্রকাশক : প্রিন্স সালেহ। প্রকাশক কর্তৃক ১২ বীর উত্তম সি আর দত্ত রোড, বাংলামোটর, ঢাকা ১২০৫ থেকে মুদ্রিত।

ফোন : +88 01919237299, +8801640754545, ই-মেইল: princesalehbd@gmail.com