বিএনএন ডেস্ক
চলতি বছর আবদুর রহমান মেমোরিয়াল ফেলোশিপ অ্যাওয়ার্ডের জন্য নির্বাচিত হয়েছেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অণুজীববিজ্ঞান বিভাগের শিক্ষার্থী নাবিলা খানম এবং চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের জেনেটিক ইঞ্জিনিয়ারিং ও বায়োটেকনোলজি বিভাগের শিক্ষার্থী ফারিহা আহমেদ রাইসা।
গত ১০ মে, রবিবার মেরুল বাড্ডায় ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয়ের নতুন ক্যাম্পাসে বিজয়ীদের হাতে এই সম্মাননা তুলে দেওয়া হয়। গ্লোবাল নেটওয়ার্ক অব বাংলাদেশি বায়োটেকনোলোজিস্ট (জিএনওবিবি) এই ফেলোশিপ প্রদান করে। তাদের শিক্ষাগত অসাধারণত্ব, নতুন উদ্ভাবন এবং সমাজের প্রতি দায়বদ্ধতার স্বীকৃতিস্বরূপ এই পুরস্কার দেওয়া হয়েছে।
অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন মরহুম আবদুর রহমানের পুত্র আমিনুর রহমান, যিনি যুক্তরাষ্ট্রের কমিউনিটি কলেজ অব ফিলাডেলফিয়ার এভিপি ও প্রধান নির্বাহী। এছাড়াও জিএনওবিবির ফিন্যান্স অ্যান্ড লিগ্যাল অ্যাফেয়ার্স বিভাগের প্রধান এবং ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অণুজীববিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক মুহাম্মদ মঞ্জুরুল করিম, জিএনওবিবির কোষাধ্যক্ষ ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের উদ্ভিদবিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক মোহাম্মদ নুরুল ইসলাম, জিএনওবিবির শিক্ষা বিভাগের প্রধান ও ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয়ের জীবপ্রযুক্তি বিভাগের অধ্যাপক এবং স্কুল অব লাইফ সায়েন্সের অ্যাসিস্ট্যান্ট ডিন অধ্যাপক অপর্না ইসলাম, এবং জিএনওবিবির কার্যনির্বাহী কমিটির শিক্ষা শাখার সদস্য ও ইন্ডিপেন্ডেন্ট ইউনিভার্সিটি বাংলাদেশের লাইফ সায়েন্স বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক সাবরিনা এম ইলিয়াস উপস্থিত ছিলেন।
জিএনওবিবির সভাপতি ও ইউজিসি অধ্যাপক জেবা ইসলাম সেরাজ, মরহুম আবদুর রহমানের পুত্র এবং জিএনওবিবির সাধারণ সম্পাদক ও জাপানের ইওয়াতে ইউনিভার্সিটির অধ্যাপক আবিদুর রহমান, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাণরসায়ন ও অনুপ্রাণ বিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক মোহাম্মদ রিয়াজুল ইসলামসহ অন্যান্য জিএনওবিবি সদস্য এবং কার্যনির্বাহী কমিটির সদস্যবৃন্দ অনুষ্ঠানে ভার্চুয়ালি যুক্ত ছিলেন।
অনুষ্ঠানটি সঞ্চালনা করেন অধ্যাপক সাবরিনা এম ইলিয়াস। স্বাগত বক্তব্যে ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক অপর্ণা ইসলাম বলেন, ‘ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয় সর্বদা তরুণ প্রজন্মকে, বিশেষ করে যারা জীবপ্রযুক্তি নিয়ে ভাবছে, তাদের এগিয়ে নিতে সহায়তা করে। জিএনওবিবির এই উদ্যোগে আমরা শুরু থেকেই আছি। আমাদের মূল লক্ষ্য হলো স্বাস্থ্য, কৃষি এবং পরিবেশের উন্নয়নে জৈবপ্রযুক্তির শক্তিকে কাজে লাগানো এবং এই খাতে দেশের সক্ষমতা আরও বৃদ্ধি করা।’

জিএনওবিবির সভাপতি অধ্যাপক জেবা ইসলাম সেরাজ জানান, ‘দ্বিতীয়বারের মতো এই ফেলোশিপ প্রদান করা হচ্ছে। মরহুম আবদুর রহমানের পরিবারের প্রতি আমরা কৃতজ্ঞ যে তারা জিএনওবিবির সঙ্গে যৌথভাবে মাস্টার্স পর্যায়ের শিক্ষার্থীদের জন্য এই ফেলোশিপ চালু করেছেন। এই ফেলোশিপ শিক্ষার্থীদের গবেষণার কাজে অত্যন্ত সহায়ক হচ্ছে। আমরা দেখেছি, শিক্ষার্থীরা ইতোমধ্যে চমৎকার কাজ করছে এবং তাদের কাজের উপর সুন্দর উপস্থাপনা দিয়েছে। আমি অত্যন্ত আশাবাদী যে, এই সুন্দর উদ্যোগটি ভবিষ্যতে আরও সাফল্য লাভ করবে।’
আমিনুর রহমান বলেন, ‘আমার বাবা মরহুম আবদুর রহমান ছিলেন একজন শিক্ষানুরাগী ও অত্যন্ত বন্ধুবৎসল মানুষ। ছোটবেলা থেকেই আমি দেখেছি, আমাদের পড়াশোনার প্রতি তাঁর ছিল অসীম আগ্রহ ও উৎসাহ। মূলত বাবা-মায়ের আগ্রহের কারণেই আমাদের বাড়িতে বইয়ের সমাহার থাকত, যেখানে রবীন্দ্র-নজরুল থেকে শুরু করে তলস্টয় বা ডেল কার্নেগির মতো লেখকদের বইও থাকত। তিনি পাঠ্যবই বা বাইরের বই, যেকোনো ধরনের বই পড়ার ক্ষেত্রে আমাদের অনেক স্বাধীনতা দিতেন, যা আমার শৈশবকে সমৃদ্ধ করেছে। বাবা হিসেবে তিনি হয়তো কিছুটা কঠোর ছিলেন এবং অনেক বিষয়ে আমাদের বারণ করতেন, কিন্তু কিছু শেখার জন্য বা বই কেনার জন্য তাঁকে কখনো 'না' বলতে শুনিনি। তিনি প্রায়ই আমাদের সাথে তাঁর জীবনের গুরুত্বপূর্ণ মুহূর্তগুলোর গল্প বলতেন। তিনি সবসময় স্বীকার করতেন যে, জীবনে উন্নতি করার জন্য সঠিক সময়ে সঠিক সুযোগ পাওয়াটা কতটা জরুরি।’

এরপর ফেলোশিপ অ্যাওয়ার্ডপ্রাপ্ত দুই শিক্ষার্থীর হাতে চেক তুলে দেন অতিথিবৃন্দ। পরবর্তীতে, অ্যাওয়ার্ডপ্রাপ্ত শিক্ষার্থী নাবিলা খানম তাঁর গবেষণা সম্পর্কে বিস্তারিত বলেন। তিনি বিশেষ এক ধরনের ব্যাকটেরিয়া থেকে প্রাপ্ত বেগুনি রঙের প্রাকৃতিক পিগমেন্ট ভায়োলেসিন নিয়ে কাজ করছেন। বর্তমানে সুপারবাগ ব্যাকটেরিয়া চিকিৎসা ক্ষেত্রে এক বড় হুমকি, কারণ সাধারণ অ্যান্টিবায়োটিক তাদের উপর কাজ করে না। নাবিলা এই উপাদানটি ক্ষতিকর জীবাণুর বিরুদ্ধে কতটা কার্যকর হতে পারে, তা নিয়ে গবেষণা করছেন। ল্যাবরেটরিতে তিনি পরীক্ষা করছেন যে এই উপাদানটি ব্যাকটেরিয়ার বৃদ্ধি থামাতে এবং তাদের আত্মরক্ষার প্রতিরোধ ব্যবস্থা ভাঙতে পারে কিনা। এছাড়াও, ভায়োলেসিন মানবদেহের জন্য কতটা নিরাপদ, তা জানতে ইঁদুরের উপরও পরীক্ষা চালানো হচ্ছে। তাঁর লক্ষ্য হলো, ভবিষ্যতে এই ভায়োলেসিন থেকে সুপারবাগের বিরুদ্ধে লড়াই করার মতো একটি নতুন ও শক্তিশালী ওষুধ তৈরি করা।’
পুরস্কারপ্রাপ্তির এই আনন্দঘন মুহূর্তে নাবিলা খানমের পাশে ছিলেন তাঁর মা। বিশ্ব মা দিবসে মেয়ের এই অর্জনে তিনি বলেন, ‘ছোটবেলা থেকেই নাবিলা বিভিন্ন মেধাবৃত্তি পেত। আমি সবসময় ওকে বলতাম, এই ছোট ছোট সাফল্যগুলোই তোমার উন্নতির সোপান। আজ ওর এই বড় অর্জনে আমি ভাষা হারিয়ে ফেলেছি। নাবিলার বাবা আজ বেঁচে থাকলে সবচেয়ে বেশি খুশি হতেন। আমি চাই নাবিলা ওর মেধা দিয়ে আরও অনেক দূর এগিয়ে যাক।’
পুরস্কারপ্রাপ্ত শিক্ষার্থী ফারিহা আহমেদ রাইসা তাঁর অনুভূতি ব্যক্ত করতে গিয়ে প্রথমেই জিএনওবিবি এবং মরহুম আবদুর রহমানের পরিবারের প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেন। তিনি সুডোমোনাস অ্যারুজিনোসা নামক এক ব্যাকটেরিয়া নিয়ে কাজ করছেন, যা হাসপাতালে ছড়িয়ে পড়া সংক্রমণের জন্য দায়ী। সবচেয়ে উদ্বেগের বিষয় হলো, এই ব্যাকটেরিয়া খুব দ্রুত এমন রূপ ধারণ করতে পারে যে কোনো ওষুধ বা অ্যান্টিবায়োটিক এর বিরুদ্ধে কার্যকর থাকে না।
তিনি বলেন, ‘বাংলাদেশে আমাদের মতো শিক্ষার্থীদের জন্য গবেষণার পথটি খুব একটা সহজ নয়। ল্যাবরেটরিতে প্রয়োজনীয় যন্ত্রপাতির অভাব এবং গবেষণার উপকরণের অতিরিক্ত দাম প্রায়শই বড় বাধা হয়ে দাঁড়ায়। তখন আমাদের সবসময় ভাবতে হয়, কীভাবে কম সময়ে এবং অল্প খরচে কাজ সম্পন্ন করা যায়। আমি বর্তমানে থিসিসের কাজে ইঁদুর নিয়ে গবেষণা করছি, যার লালন-পালন ও রক্ষণাবেক্ষণ বেশ ব্যয়বহুল। এই ফেলোশিপের অর্থ আমার গবেষণার সেই খরচ মেটাতে এবং কাজকে এগিয়ে নিতে বড় সহায়ক হবে। একটি কঠিন প্রতিযোগিতার মাধ্যমে এমন সম্মানজনক সুযোগ পেয়ে আমি এবং আমার মা-বাবা অত্যন্ত আনন্দিত।’

মরহুম আবদুর রহমানের স্মৃতিকে চিরস্থায়ী করার লক্ষ্যে এই বিশেষ গবেষণা ফেলোশিপটি চালু করা হয়েছে। এর প্রধান উদ্দেশ্য হলো, যারা এমএস পর্যায়ে গবেষণা করতে আগ্রহী, তাদের প্রয়োজনীয় উপকরণ এবং স্বীকৃতি প্রদান করা। এর মাধ্যমে ভবিষ্যৎ প্রজন্মের মধ্যে নেতৃত্ব এবং গবেষণার আগ্রহ বাড়ানোর চেষ্টা করা হয়।
সম্পাদক ও প্রকাশক : প্রিন্স সালেহ। প্রকাশক কর্তৃক ১২ বীর উত্তম সি আর দত্ত রোড, বাংলামোটর, ঢাকা ১২০৫ থেকে মুদ্রিত।
ফোন : +88 01919237299, +8801640754545, ই-মেইল: princesalehbd@gmail.com