১২ মে ২০২৬
preview
ভিনগ্রহীদের হামলা: প্রথম পর্ব

বিএনএন ডেস্ক

মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র সম্প্রতি তাদের গোপন ইউএফও নথি উন্মোচন করেছে, যা বিশ্বজুড়ে নতুন জল্পনার জন্ম দিয়েছে। মহাবিশ্বের বিশালতা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে: আমরা কি একা? নাকি ভিনগ্রহে বুদ্ধিমান প্রাণের অস্তিত্ব আছে? যদি তারা সত্যি থাকে এবং হলিউডের সিনেমার মতো হঠাৎ পৃথিবী আক্রমণ করে বসে, তাহলে কী পরিণতি হবে? এ বিষয়ে বিজ্ঞান কী বলে? ভিনগ্রহীরা কি আসলেই মানুষের জন্য হুমকি হতে পারে? জ্যোতির্বিজ্ঞানী ফিলিপ প্লেইট তাঁর ডেথ ফ্রম দ্য স্কাইজ!: দ্য সায়েন্স বিহাইন্ড দ্য এন্ড অব দ্য ওয়ার্ল্ড গ্রন্থে এই কৌতূহলোদ্দীপক প্রশ্নগুলোর বৈজ্ঞানিক ব্যাখ্যা দিয়েছেন। এই রোমাঞ্চকর বইটির কয়েকটি অধ্যায় নিয়মিত প্রকাশিত হচ্ছে, যা সূক্ষ্ম হাস্যরস ও নিগূঢ় বিজ্ঞানের মিশেলে লেখা। ভিনগ্রহীদের আক্রমণ সম্পর্কিত এই অধ্যায়টি অনুবাদ করেছেন কাজী আকাশ। এটি ষষ্ঠ অধ্যায়ের প্রথম অংশ।

সেই যন্ত্রটির নিজস্ব কোনো চেতনা বা মস্তিষ্ক নেই, অন্তত আমাদের মতো নয়। তবুও সে তার সম্মুখের উজ্জ্বল নক্ষত্রটিকে নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করছে। অত্যাধুনিক যন্ত্রপাতিতে সজ্জিত হয়ে, এটি অত্যন্ত ধৈর্যের সাথে তথ্য সংগ্রহ ও বিশ্লেষণ করছে। কয়েক সপ্তাহের অবিরাম পর্যবেক্ষণের পর ফলাফল হাতে এলো। নক্ষত্রটিকে ঘিরে ঘুরছে বেশ কয়েকটি বিশাল গ্যাসীয় গ্রহ, যাদের প্রত্যেকেরই রয়েছে বরফে ঢাকা উপগ্রহ। এসব বরফের নিচে জল থাকার সম্ভাবনা প্রবল। এছাড়াও, নক্ষত্রটির তিনটি ছোট পাথুরে গ্রহ রয়েছে, যেখানেও তরল জলের উপস্থিতি থাকতে পারে।  এই তিনটির মধ্যে মধ্যম আকারের গ্রহটিতে প্রাণের সুস্পষ্ট প্রমাণ মিলেছে। এর বায়ুমণ্ডলে প্রচুর পরিমাণে মুক্ত অক্সিজেন বিদ্যমান, যা প্রাণের উপস্থিতির এক প্রধান নির্দেশক। যদি যন্ত্রটির কোনো আবেগ থাকত, তবে এটি উচ্ছ্বসিত হয়ে উঠত! কিন্তু পরিবর্তে, এটি নিরবে তার পরবর্তী কার্যক্রমের জন্য প্রস্তুত হতে শুরু করেছে।  অত্যাধুনিক প্রযুক্তির সহায়তায় নভোযানটি সৌরজগতের দিকে তার গতি হ্রাস করতে শুরু করেছে। পূর্বে এটি প্রায় আলোর বেগে ছুটছিল, যা প্রায় এক বছর সময় নিয়ে কমানো হয়েছে। এই সময়ের মধ্যে এটি কয়েকবার নিজের গতিপথও পরিবর্তন করে লক্ষ্যবস্তুর দিকে অগ্রসর হয়েছে।

আমাদের সৌরজগতে ভিনগ্রহীদের সম্ভাব্য আস্তানা
অত্যাধুনিক কৌশল প্রয়োগ করে মহাকাশযানটি সৌরজগতের দিকে তার গতি কমিয়ে আনছে। পূর্বে এটি আলোর প্রায় সমবেগে চলতো, যা কমাতে প্রায় এক বছর লেগেছে।

অবশেষে আকাঙ্ক্ষিত লক্ষ্যবস্তুটি দৃষ্টিগোচর হলো: এক মাইলেরও বেশি চওড়া একটি ধাতব গ্রহাণু। মহাকাশযানটি সতর্কতার সাথে গ্রহাণুটির পাশ দিয়ে উড়ে গেল এবং ঠিক সেই মুহূর্তে কয়েক মিটার চওড়া একটি ছোট বাক্স তার দিকে নিক্ষেপ করল।

সেই বাক্সটি ছিল একটি ক্ষুদ্র মহাকাশযান, যার অভ্যন্তরে ছিল একটি ছোট রকেট ইঞ্জিন। ইঞ্জিনটি সক্রিয় করে এটি নিজের গতি আরও হ্রাস করল এবং সাবলীলভাবে গ্রহাণুটির পৃষ্ঠে অবতরণ করল। অবতরণের সাথে সাথে এটি তার প্রধান জাহাজে একটি সংকেত পাঠাল—সব ঠিক আছে। কিন্তু প্রধান জাহাজ কোনো প্রত্যুত্তর দিল না। বরং, সেটি তার গতি বাড়িয়ে তালিকার পরবর্তী নক্ষত্রের দিকে যাত্রা শুরু করল, যেখানে পৌঁছাতে হয়তো আরও কয়েক দশক লেগে যাবে।

অন্যদিকে, গ্রহাণুর বুকে অবতরণকারী সেই ক্ষুদ্র মহাকাশযানটির একটি দ্বার উন্মোচিত হলো। ভেতর থেকে একটি ছোট মাকড়সা বেরিয়ে এল, তারপর আরেকটি, এবং তারপর আরেকটি। এভাবেই মোট বারোটি রোবট মাকড়সা গ্রহাণুর পৃষ্ঠে হামাগুড়ি দিতে শুরু করল। এগুলি ধাতু, সিরামিক এবং কার্বন ফাইবারের এক অভিনব ও উন্নত মিশ্রণে গঠিত। বেরিয়ে আসার পরপরই তারা কাজে লেগে পড়ল। তারা মাটি খনন করতে, ধাতু গলিয়ে নতুন উপাদান তৈরি করতে শুরু করল। তাদের কোনো ক্লান্তি নেই, নেই কোনো অনুভূতি। দিনরাত অবিরাম কাজ করে এক মাস পর তারা সম্পূর্ণ প্রস্তুত হলো।

ভিনগ্রহীদের অস্তিত্ব কি সত্যি?
ওই ক্ষুদ্র বাক্সটি প্রকৃতপক্ষে একটি ছোট আকারের মহাকাশযান। এতে একটি ক্ষুদ্র রকেট ইঞ্জিন সংযুক্ত রয়েছে, যা সক্রিয় করে সে তার গতি আরও কমিয়ে নিয়ে অতি সতর্কতার সাথে গ্রহাণুর পৃষ্ঠে অবতরণ করল।

ছত্রাকের বীজাণু ছড়ানোর মতোই, গ্রহাণুটির পৃষ্ঠে হাজার হাজার ক্ষুদ্র বিস্ফোরণ ঘটল। প্রতিটি বিস্ফোরণের প্রভাবে এক মিটার ব্যাসের এক-একটি ধাতব গোলক ছিটকে বের হয়ে এলো। এই গোলকগুলি পূর্বে নির্ধারিত গ্রহ ও উপগ্রহগুলির দিকে ধাবিত হতে শুরু করল। প্রতিটি ধাতব গোলকের অভ্যন্তরে একশটিরও বেশি রোবট মাকড়সা লুকানো ছিল।

এই যান্ত্রিক মাকড়সাগুলির প্রোগ্রামিং অত্যন্ত উন্নত, তবে তাদের প্রধান উদ্দেশ্য খুবই সরল: যা কিছু সামনে পাবে, তা দিয়েই আরও নতুন মাকড়সা তৈরি করো। পর্যাপ্ত সংখ্যক মাকড়সা তৈরি হয়ে গেলে, আরও বড় প্রধান মহাকাশযান বানাতে হবে। সেগুলিকে মহাকাশে উৎক্ষেপণ করে এই চক্রটি আবার নতুন করে শুরু করতে হবে। 

লক্ষ লক্ষ বছর ধরে এমন অভিযানের মধ্য দিয়ে তাদের এই প্রোগ্রামিং আরও নিখুঁত হয়েছে। উপাদান নিয়ে তাদের কোনো বাছবিচার নেই; চোখের সামনে যা পাবে, তা দিয়েই তারা কাজ চালিয়ে নিতে পারে। প্রতিটি মাকড়সা মাত্র কয়েক ঘণ্টার মধ্যে নিজের অনুলিপি তৈরির সব সরঞ্জাম প্রস্তুত করতে পারে। এরপর সেই নতুন অনুলিপিগুলোও নিজেদের আরও অনুলিপি তৈরি করতে শুরু করে। একবার কোনো গ্রহে এই মাকড়সাগুলো নামলে, মাত্র কয়েক দিনের মধ্যেই তারা পুরো গ্রহটি দখল করে নিতে পারে। গ্রহের সবকিছু—হ্যাঁ, আক্ষরিক অর্থেই সবকিছু—তারা ভেঙে নতুন মাকড়সা ও মহাকাশযানে রূপান্তরিত করে ফেলে।

ভিনগ্রহে মানবীয় অভিযান
মাত্র কয়েক ঘন্টার মধ্যেই প্রতিটি মাকড়সা নিজেদের প্রতিরূপ তৈরির প্রয়োজনীয় সমস্ত সরঞ্জাম তৈরি করে নিতে পারে। এরপর সেই নতুন প্রতিরূপগুলিও নিজেদের আরও অসংখ্য প্রতিরূপ তৈরি করতে শুরু করে।

নিকটবর্তী ও আকারে অপেক্ষাকৃত ছোট হওয়ায় মঙ্গল গ্রহই প্রথমে ধ্বংসের শিকার হলো। মঙ্গলের শিলায় প্রচুর পরিমাণে লোহা থাকায় মাকড়সাগুলির কাজ আরও সহজ হয়ে যায়। মাত্র কয়েক ঘণ্টার মধ্যে লক্ষ লক্ষ নতুন মাকড়সা কাঁচামালের সন্ধানে চারদিকে ছড়িয়ে পড়ল। তাদের কাছে এই কাঁচামালই ছিল পুষ্টির উৎস।

কয়েক দিনের মধ্যেই পৃথিবীর পতন ঘটে। প্রথম মাকড়সাগুলি অস্ট্রেলিয়ায় অবতরণ করে। যা কিছু তাদের দৃষ্টিগোচর হলো, সবকিছুই তারা গ্রাস করতে শুরু করল। পাথর, ধাতু, গ্যাস—প্রয়োজনে সবকিছুই তারা ব্যবহার করতে পারে। জল, উদ্ভিদ, এমনকি রক্তমাংসের প্রাণীও তাদের খাদ্য হতে পারে। মানুষের বেঁচে থাকার আর কোনো সম্ভাবনা ছিল না।

পৃথিবীর শক্তিশালী দূরবীক্ষণ যন্ত্রগুলি কয়েক মাস ধরে মহাকাশ থেকে আসা সেই মূল মহাকাশযানের তীব্র আলোর প্রতি নজর রাখছিল বটে, কিন্তু সেখান থেকে কোনো প্রতিক্রিয়া মেলেনি। মাকড়সাগুলি যখন পৃথিবীতে অবতরণ করল, তখন প্রতিরোধের জন্য অনেক দেরি হয়ে গেছে। কোনো দেশের সরকারের হাতেই বাধা দেওয়ার মতো যথেষ্ট সময় ছিল না।

মাকড়সাগুলি সমগ্র পৃথিবীতে ছড়িয়ে পড়ল। দুই সপ্তাহেরও কম সময়ের মধ্যে পৃথিবীতে আর কোনো প্রাণের অস্তিত্ব অবশিষ্ট রইল না। সমগ্র পৃথিবী এক বিশাল রোবট কারখানায় রূপান্তরিত হলো। এক বছরের মধ্যে পৃথিবীর আকাশে আলোর ঝলকানি দেখা গেল। হাজার হাজার নতুন মূল মহাকাশযান মহাকাশে উড়ে গেল। এদের প্রতিটিই সেই প্রথম মূল মহাকাশযানের নিখুঁত অনুলিপি। আর সেই প্রথম মূল মহাকাশযানটিও হয়তো কোটি কোটি বছর আগে নির্মিত অন্য কোনো মূল মহাকাশযানের প্রতিরূপ ছিল। সেই আদি মূল মহাকাশযানটি সম্ভবত অনেক আগেই বিনষ্ট হয়েছে, কারণ তার ভেতরের সমস্ত ধারক শূন্য হয়ে গিয়েছিল। কিন্তু তার বংশধররা এখনো জীবিত আছে এবং সমগ্র গ্যালাক্সি জুড়ে ছড়িয়ে পড়ছে।

ভিনগ্রহী কল্পকথা
মাকড়সাগুলি দ্রুত সমগ্র পৃথিবীতে বিস্তার লাভ করল। দু'সপ্তাহের মধ্যে পৃথিবীতে প্রাণের সমস্ত চিহ্ন বিলুপ্ত হয়ে গেল। পুরো পৃথিবীটাই একটি সুবিশাল রোবট কারখানায় রূপান্তরিত হলো।

আর এখন, এরকম আরও হাজার হাজার মূল মহাকাশযান গভীর মহাকাশের দিকে এগিয়ে চলেছে। যখন এই অভিযান প্রথম শুরু হয়েছিল, তখন পৃথিবীতে মানবজাতির কোনো অস্তিত্বই ছিল না। আদিম মানুষের পূর্বপুরুষেরা হয়তো তখন কেবল আফ্রিকার অরণ্যে বিচরণ করত। তাদেরই বংশধরেরা একদা সমগ্র পৃথিবী শাসন করেছিল। কিন্তু সেই রাজত্বকাল ছিল অত্যন্ত সংক্ষিপ্ত। পৃথিবীর সেই কোটি কোটি মানুষ এখন আর নেই; তারা সবাই এখন অগণিত ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র ধাতব মাকড়সা ও মহাকাশযানে রূপান্তরিত হয়েছে।

তাদের দ্বারা নির্মিত সেই মহাকাশযানগুলি দূরবর্তী নক্ষত্রগুলির দিকে ছুটে চলেছে। মানবজাতির নক্ষত্র ছোঁয়ার স্বপ্ন এভাবেই একদিন পূরণ হলো; তবে ঠিক সেভাবে নয়, যেভাবে মানুষ কল্পনা করেছিল।

ক্রমশ…

ফিলিপ প্লেইট-এর ডেথ ফ্রম দ্য স্কাইজ!: দ্য সায়েন্স বিহাইন্ড দ্য এন্ড অফ দ্য ওয়ার্ল্ড গ্রন্থ অবলম্বনে

বিশেষ দ্রষ্টব্য

১. বিজ্ঞানীরা অনুমান করেন যে, সৌরজগতের বৃহস্পতির উপগ্রহ ইউরোপা এবং শনির উপগ্রহ এনসেলাডাসে বিশাল তরল জলের সমুদ্র লুকানো আছে। যদিও এটি এখনো শুধু ধারণাই বটে! তবে অচিরেই এই বিষয়ে সুনির্দিষ্ট প্রমাণ পাওয়া যেতে পারে। ২০২৩ সালের ১৪ এপ্রিল ইউরোপীয় মহাকাশ সংস্থা 'জুস মিশন' উৎক্ষেপণ করেছে, যার প্রধান লক্ষ্য হলো বৃহস্পতি এবং তার তিনটি বিশাল বরফাবৃত উপগ্রহ (গ্যানিমিড, ক্যালিস্টো এবং ইউরোপা) নিয়ে গবেষণা করা। এই মিশনে প্রাণ ধারণের উপযোগী পরিবেশ আছে কি না, তা যাচাই করা হবে। ২০২৪ সালের অক্টোবরে নাসা বৃহস্পতির উপগ্রহ ইউরোপার উদ্দেশে 'ইউরোপা ক্লিপার মিশন' পাঠিয়েছে। এই মিশনে নভোযানটি ইউরোপার উপর দিয়ে প্রায় ৫০ বার উড়ে যাবে এবং এর বরফের পুরুত্ব ও নিচের জলের লবণাক্ততা পরিমাপ করবে। ২০৩০ সালের এপ্রিলে এটি বৃহস্পতির কাছে পৌঁছাবে। একই সাথে, ২০২৮ সালে শনির উপগ্রহ টাইটানের উদ্দেশে পাঠানো হবে নাসার 'ড্রাগনফ্লাই মিশন'। এই মিশনে টাইটানে প্রাণের রাসায়নিক উপাদানগুলির উপস্থিতি পরীক্ষা করা হবে। সুতরাং, যা এখন বিজ্ঞানীরা কেবল ‘অনুমান করছেন’, আগামী দশকে তা হয়তো বাস্তবে পরিণত হবে।

২. বর্তমানে জেমস ওয়েবের মতো অত্যাধুনিক টেলিস্কোপ ব্যবহার করে বিজ্ঞানীরা দূর মহাকাশে নজর রাখছেন বটে। কিন্তু ভিনগ্রহীদের এমন আক্রমণ প্রতিহত করার মতো কোনো প্রস্তুতি বা প্রযুক্তি এখনো মানবজাতির হাতে নেই।

ভিনগ্রহী প্রসঙ্গ


সম্পাদক ও প্রকাশক : প্রিন্স সালেহ। প্রকাশক কর্তৃক ১২ বীর উত্তম সি আর দত্ত রোড, বাংলামোটর, ঢাকা ১২০৫ থেকে মুদ্রিত।

ফোন : +88 01919237299, +8801640754545, ই-মেইল: princesalehbd@gmail.com