১২ মে ২০২৬


যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে যুদ্ধবিরতি রক্ষায় পাকিস্তানের কূটনৈতিক তৎপরতা
বিএনএন ডেস্ক
ইসলামাবাদ ইরানের সামরিক বিমানগুলোকে মার্কিন হামলা থেকে বাঁচাতে আশ্রয় দেওয়ার অভিযোগ কঠোরভাবে প্রত্যাখ্যান করেছে, যদিও দুই দেশের মধ্যে মধ্যস্থতায় পাকিস্তানের ভূমিকা এখন ঝুঁকির মুখে রয়েছে।
মঙ্গলবার পাকিস্তানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের এই বিবৃতিটি এমন সময় এল যখন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প জানিয়েছেন যে যুদ্ধবিরতি এখন অত্যন্ত সংকটাপন্ন অবস্থায় রয়েছে এবং তিনি ইরানের সর্বশেষ শান্তি প্রস্তাবটিকে গুরুত্বহীন বলে নাকচ করে দিয়েছেন।
সিবিএস নিউজের এক প্রতিবেদনে দাবি করা হয়েছিল যে, ৮ এপ্রিলের যুদ্ধবিরতির পর ইরান তাদের আরসি-১৩০ রিকনেসান্স বিমানসহ বেশ কিছু সামরিক যান পাকিস্তানের নূর খান বিমান ঘাঁটিতে সরিয়ে নিয়েছে যাতে মার্কিন হামলা থেকে সেগুলো রক্ষা পায়।
পাকিস্তানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় এই প্রতিবেদনটিকে 'বিভ্রান্তিকর এবং উদ্দেশ্যপ্রণোদিত' বলে অভিহিত করেছে। তারা জানিয়েছে, বিমানগুলো ১১ এপ্রিল ইসলামাবাদে মার্কিন ও ইরানি কর্মকর্তাদের মধ্যে আলোচনার লজিস্টিক সহায়তার অংশ হিসেবে সেখানে এসেছিল এবং উভয় দেশের বিমানই সেই ঘাঁটি ব্যবহার করেছিল।
মন্ত্রণালয় আরও জানিয়েছে, পাকিস্তানে অবস্থানরত ইরানি বিমানগুলো যুদ্ধবিরতি চলাকালীন এসেছিল এবং এর সাথে কোনো সামরিক প্রতিরক্ষা বা গোপনীয় ব্যবস্থার সম্পর্ক নেই।
বিবৃতিতে বলা হয় যে, ওই ঘাঁটিতে কোনো বড় ধরনের বিদেশি সামরিক উপস্থিতি থাকলে তা গোপন রাখা অসম্ভব।
পাকিস্তান জোর দিয়ে বলেছে যে তারা সবসময় একটি নিরপেক্ষ ও দায়িত্বশীল মধ্যস্থতাকারী হিসেবে কাজ করেছে এবং এর বিপরীতে যেকোনো দাবি সম্পূর্ণ ভিত্তিহীন ও বাস্তবতাবিবর্জিত।
ওয়াশিংটনের অস্বস্তি
পাকিস্তানের এই ব্যাখ্যা ওয়াশিংটনের উদ্বেগ পুরোপুরি দূর করতে পারেনি।

সিএনএন-এর একটি প্রতিবেদনে বলা হয়েছে যে, ট্রাম্প প্রশাসনের কিছু কর্মকর্তা মনে করেন পাকিস্তান মার্কিনদের কাছে ইরানের অবস্থানকে বাস্তবের চেয়ে বেশি ইতিবাচকভাবে উপস্থাপন করছে এবং ইসলামাবাদ ট্রাম্পের অসন্তোষ যথাযথভাবে তেহরানকে জানাচ্ছে কি না তা নিয়ে সন্দেহ প্রকাশ করেছেন।
একজন পাকিস্তানি কর্মকর্তা জানিয়েছেন যে ইসলামাবাদ উভয় পক্ষের সাথে অত্যন্ত স্পষ্টভাবে কথা বলছে কারণ মধ্যস্থতার সাফল্যের জন্য নিরপেক্ষ থাকা জরুরি, কোনো নির্দিষ্ট এজেন্ডা বাস্তবায়ন নয়।
নাম প্রকাশ না করার শর্তে ওই কর্মকর্তা জানান, তাদের মূল লক্ষ্য হলো এই জটিল ও ঐতিহাসিক সংঘাতের সমাধান করা, সস্তা জনপ্রিয়তা বা প্রচার পাওয়া নয়।
ট্রাম্পের ঘনিষ্ঠ রিপাবলিকান সিনেটর লিন্ডসে গ্রাহাম পাকিস্তানের মধ্যস্থতাকারী ভূমিকার পূর্ণ পুনর্মূল্যায়নের আহ্বান জানিয়ে বলেছেন, সিবিএস-এর প্রতিবেদন সত্য হলে তিনি অবাক হবেন না।
তবে বিশ্লেষকদের মতে, এই বিতর্কের ফলে ইসলামাবাদের অবস্থানের খুব বেশি ক্ষতি হওয়ার সম্ভাবনা কম।
ইউনিভার্সিটি অফ লাহোর-এর নিরাপত্তা বিষয়ক কেন্দ্রের উপ-পরিচালক সৈয়দ আলী জিয়া জাফরি বলেন, অবিশ্বাসের এই পরিবেশে যুদ্ধবিরতি নিশ্চিত করা পাকিস্তানের জন্য একটি বড় সাফল্য ছিল।
তিনি মনে করেন, যেহেতু তেহরান ও ওয়াশিংটন এখনো পাকিস্তানের ওপর নির্ভর করছে, তাই এই অভিযোগগুলোর প্রভাব সীমিত থাকবে।
জাফরি আরও বলেন, যতক্ষণ উভয় পক্ষ ইসলামাবাদকে নির্ভরযোগ্য মনে করবে, ততক্ষণ এমন সংবাদ প্রভাব ফেলবে না। তবে বহুমুখী এই যুদ্ধে পরিস্থিতি ঘোলাটে করার জন্য অনেক পক্ষ কাজ করছে।
আলোচনায় অচলাবস্থা
সাম্প্রতিক উত্তেজনার মূল কারণ হলো পাকিস্তানের মাধ্যমে পাঠানো ইরানের একটি শান্তি প্রস্তাব ওয়াশিংটন কর্তৃক প্রত্যাখ্যান।
ইরানি সংবাদমাধ্যম জানায়, তাদের শর্তের মধ্যে ছিল যুদ্ধের ক্ষতিপূরণ প্রদান, হরমুজ প্রণালীর ওপর পূর্ণ সার্বভৌমত্ব, নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার এবং আটকে রাখা সম্পদ মুক্তি। তবে পারমাণবিক আলোচনা পরে করার কথা বলা হয়েছে।
ডোনাল্ড ট্রাম্প তার সোশ্যাল মিডিয়া প্ল্যাটফর্মে ইরানের এই প্রস্তাবকে 'সম্পূর্ণ অগ্রহণযোগ্য' বলে বর্ণনা করেছেন।
ওভাল অফিসে তিনি বলেন যে যুদ্ধবিরতি এখন এমন পর্যায়ে যেখানে বাঁচার সম্ভাবনা মাত্র এক শতাংশ।
ইরানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র ইসমাইল বাঘাই ট্রাম্পের এই মন্তব্য প্রত্যাখ্যান করে বলেন, তাদের প্রস্তাবটি ছিল অত্যন্ত যৌক্তিক এবং উদার।
ইরানের প্রধান আলোচক এবং পার্লামেন্ট স্পিকার মোহাম্মদ বাঘের গালিবফ কঠোর হুঁশিয়ারি দিয়ে বলেছেন যে কোনো হামলার জবাব দিতে তাদের সেনাবাহিনী প্রস্তুত।
তিনি সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে লিখেছেন যে, ইরানের জনগণের অধিকার সম্পর্কিত ১৪ দফার প্রস্তাব মেনে নেওয়া ছাড়া অন্য কোনো বিকল্প নেই।
উভয় পক্ষের মূল মতপার্থক্যগুলো এখনো আগের মতোই রয়ে গেছে।
ওয়াশিংটন চায় ইরান তাদের পারমাণবিক কর্মসূচি পুরোপুরি বন্ধ করুক এবং তাদের কাছে থাকা সমৃদ্ধ ইউরেনিয়ামের মজুদ সমর্পণ করুক।
অন্যদিকে তেহরান বলছে, আগে নিষেধাজ্ঞা এবং ১৩ এপ্রিল থেকে কার্যকর হওয়া নৌ-অবরোধ প্রত্যাহার করতে হবে, তারপরই পারমাণবিক আলোচনা সম্ভব।
১২ এপ্রিল ইসলামাবাদে সরাসরি আলোচনা শেষ হওয়ার পর থেকে পাকিস্তান দুই দেশের মধ্যে বার্তার আদান-প্রদানকারী হিসেবে কাজ করছে।
৪ মে পাকিস্তানের উপ-প্রধানমন্ত্রী ও পররাষ্ট্রমন্ত্রী ইশাক দার এবং ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাগচির মধ্যে এই মধ্যস্থতা নিয়ে কথা হয়।
একই দিনে মার্কিন বাহিনীর হাতে আটক ইরানি জাহাজ এমভি তুসকার ২২ জন ক্রুকে পাকিস্তানের মাধ্যমে ইরানে পাঠানো হয়, যাকে পাকিস্তান একটি আস্থা বাড়ানোর পদক্ষেপ হিসেবে বর্ণনা করেছে।

কাতারও এই উদ্যোগে সমর্থন দিয়েছে। মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও কাতারের প্রধানমন্ত্রীর সাথে মিয়ামিতে বৈঠক করেছেন, যেখানে কাতার পাকিস্তানের নেতৃত্বাধীন মধ্যস্থতায় সহযোগিতার প্রতিশ্রুতি দিয়েছে।
জাফরি মনে করেন, মার্কিন নৌ-অবরোধের পর যুদ্ধবিরতি কার্যত লঙ্ঘিত হয়েছে, যদিও উভয় পক্ষই পূর্ণমাত্রার যুদ্ধ এড়ানোর চেষ্টা করছে।
তিনি মনে করেন বড় কোনো যুদ্ধ এখনই শুরু না হলেও হরমুজ প্রণালীতে ছোটখাটো সংঘাত বা হয়রানি বাড়তে পারে।
মধ্যপ্রাচ্য বিষয়ক বিশেষজ্ঞ মুহানাদ সালুমও এই মতকে সমর্থন করেছেন।
তার মতে, আগামী কয়েক দিনে হরমুজ প্রণালীতে ইরানি গার্ডদের বিরুদ্ধে সীমিত আকারে সামরিক ব্যবস্থা নেওয়া হতে পারে যাতে তারা বড় হামলার সুযোগ না পায়।
সালুম মার্কিন জ্বালানি সচিবের মন্তব্যের দিকে ইঙ্গিত করে বলেন, যুক্তরাষ্ট্র এখন শাসনব্যবস্থা পরিবর্তনের চেয়ে হরমুজ প্রণালী সচল রাখার দিকেই বেশি নজর দিচ্ছে।
ভবিষ্যৎ পরিস্থিতি
ট্রাম্প এই সপ্তাহে চীন সফরে গিয়ে প্রেসিডেন্ট শি জিনপিংয়ের সাথে ইরান সংকট নিয়ে আলোচনা করবেন বলে আশা করা হচ্ছে, যাতে চীন তেহরানের ওপর প্রভাব খাটায়।
গত সপ্তাহে ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রীও বেইজিং সফর করেছিলেন এবং চীন সেখানে একটি কূটনৈতিক সমাধানের আহ্বান জানিয়েছিল।
ইরানি পররাষ্ট্রমন্ত্রী ভারতে ব্রিকস সম্মেলনে অংশ নেবেন যেখানে সৌদি আরব ও মিশরের প্রতিনিধিদের সাথেও আলোচনার সম্ভাবনা রয়েছে।
জাফরি মনে করেন ট্রাম্প এখন বেইজিংয়ে আলোচনার ক্ষেত্রে কিছুটা দুর্বল অবস্থানে আছেন এবং চীন হয়তো ট্রাম্পের হরমুজ সংকট সমাধানে খুব একটা সহায়ক হবে না।
তিনি বলেন, ইরান কেবল সাময়িক যুদ্ধবিরতি নয় বরং একটি বড় ধরনের স্থায়ী চুক্তিতে পৌঁছাতে চায়।
যেকোনো নতুন কূটনৈতিক পথ তৈরি হলেও পাকিস্তানের গুরুত্ব বজায় থাকবে বলে বিশ্লেষকরা মনে করেন।
কারণ হিসেবে তারা বলছেন, উভয় দেশই ইসলামাবাদের সাথে নিয়মিত যোগাযোগ বজায় রাখছে।
সালুমের মতে, মধ্যস্থতায় যত বেশি দেশ যুক্ত হবে, শান্তির সম্ভাবনা ততটাই বাড়বে এবং এতে যুদ্ধবিরতি স্থিতিশীল হওয়ার সুযোগ থাকে।
এদিকে ইসরায়েলি প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু এক সাক্ষাৎকারে বলেছেন যে ইরান সংকট এখনো অমীমাংসিত।
তিনি হুঁশিয়ারি দিয়ে বলেছেন, আলোচনার মাধ্যমে ইরানের পারমাণবিক সক্ষমতা দূর করা না গেলে ইসরায়েল ও যুক্তরাষ্ট্র সামরিক পথে হাঁটবে।
কাতারের সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হামাদ বিন জসিম আল থানি এ বিষয়ে একটি কঠোর সতর্কবার্তা দিয়েছেন।
তিনি বলেন, হরমুজ প্রণালীতে সামরিক তৎপরতা বৃদ্ধি পাওয়া হবে সবচেয়ে ভয়াবহ পরিস্থিতি এবং এই সংকট যুদ্ধবিরতির চেয়েও দীর্ঘস্থায়ী হতে পারে।
তথ্যসূত্র: আল-জাজিরা

সম্পাদক ও প্রকাশক : প্রিন্স সালেহ। প্রকাশক কর্তৃক ১২ বীর উত্তম সি আর দত্ত রোড, বাংলামোটর, ঢাকা ১২০৫ থেকে মুদ্রিত।
ফোন : +88 01919237299, +8801640754545, ই-মেইল: princesalehbd@gmail.com