১২ মে ২০২৬
preview
সুদানের সংকট বর্তমানে যে পর্যায়ে রয়েছে তা বিশ্ববাসীর কাছে এখনও যথাযথভাবে প্রকাশিত হয়নি

বিএনএন ডেস্ক

যুদ্ধ শুরু হওয়ার পর সম্প্রতি আমি প্রথমবারের মতো খার্তুম সফরে গিয়েছিলাম। আমি নিজের চোখে দেখলাম যে সেখানকার ভয়াবহতা সম্পর্কে বিশ্ব এখনো অন্ধকারে রয়েছে। সুদানের রাজধানীর রাস্তাগুলোতে যুদ্ধের যে ধ্বংসযজ্ঞ দেখলাম তা বর্ণনাতীত; একসময়ের সাত মিলিয়ন জনসংখ্যার এই শহরটি এখন প্রায় ভুতুড়ে জনপদে পরিণত হয়েছে।
শহরের ভবনগুলো হয় মাটির সাথে মিশে গেছে নতুবা কামানের গোলায় মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে, আর যেগুলো দাঁড়িয়ে আছে সেগুলোতে অসংখ্য বুলেটের দাগ। ইসলামিক রিলিফে আমার ৩০ বছরের কর্মজীবনে আমি আগে কখনো এমন বিশাল ধ্বংসলীলা দেখিনি।
দুর্গম যোগাযোগ ব্যবস্থা এবং ভৌগোলিক দূরত্বের কারণে সুদানের এই জটিল যুদ্ধ পরিস্থিতি আন্তর্জাতিক মহলে যতটা মনোযোগ পাওয়ার কথা ছিল, ততটা পায়নি।
এখন পর্যন্ত দেশটিতে ৫৮ হাজার মৃত্যুর নথিভুক্ত তথ্য থাকলেও ধারণা করা হচ্ছে মৃতের প্রকৃত সংখ্যা ১ লাখ ৫০ হাজার ছাড়িয়ে গেছে। অবকাঠামো পুরোপুরি ধ্বংস হয়ে যাওয়ায় এবং কোটি কোটি মানুষ বাস্তুচ্যুত হওয়ায় হতাহতের সঠিক তথ্য সংগ্রহ করা প্রায় অসম্ভব।
মানুষ শুধু যুদ্ধের আঘাতেই মরছে না, বরং ক্ষুধা ও কলেরার মতো মহামারীতেও প্রাণ হারাচ্ছে। সুদান বর্তমানে বিশ্বের সবচেয়ে বড় খাদ্য সংকটের মুখোমুখি; দেশটির ৬২ শতাংশ মানুষ বর্তমানে ভয়াবহ অনাহারে দিন কাটাচ্ছে এবং দুর্ভিক্ষ দ্রুত ছড়িয়ে পড়ছে।
স্থানীয়ভাবে পরিচালিত লঙ্গরখানাগুলো এই ক্ষুধা নিবারণে বড় ভূমিকা রাখলেও তহবিলের অভাবে গত ছয় মাসে প্রায় ৪২ শতাংশ লঙ্গরখানা বন্ধ হয়ে গেছে। আমাদের সাম্প্রতিক গবেষণায় দেখা গেছে যে ৮৪৪টি রান্নাঘরের মধ্যে একটি বড় অংশই এখন অর্থের অভাবে সাহায্য করতে পারছে না।
বর্তমানে বৈশ্বিক অস্থিরতা ও সরবরাহ ব্যবস্থার সংকটের কারণে সুদানে খাদ্য ও জ্বালানির দাম দ্বিগুণ হয়ে গেছে, যা সাধারণ মানুষের জীবনকে আরও দুর্বিষহ করে তুলছে এবং তাদের অন্ধকারের দিকে ঠেলে দিচ্ছে।
দারফুর ও কর্ডোফানের মতো অঞ্চলগুলোতে মানুষ ড্রোন হামলা ও ভয়াবহ নৃশংসতার হাত থেকে বাঁচতে ঘরবাড়ি ছেড়ে পালাচ্ছে। প্রতিকূল পরিস্থিতির মাঝেও আমাদের কর্মীরা সেখানে যেভাবে বাস্তুচ্যুতদের সহায়তা করছেন তা সত্যিই অকল্পনীয়।
এমনকি খার্তুম এবং দেশের পূর্বাঞ্চলে যেখানে নিরাপত্তার কিছুটা উন্নতি হয়েছে এবং পরিবারগুলো ফিরতে শুরু করেছে, সেখানকার সামগ্রিক পরিস্থিতিও অত্যন্ত শোচনীয়।
প্রায় ১৩ লাখ মানুষ তাদের ভিটেমাটিতে ফিরে এসেছে ঠিকই, কিন্তু সেখানে তাদের জন্য কোনো কাজ নেই, পর্যাপ্ত খাবার নেই এবং জীবনধারণের জন্য প্রয়োজনীয় কোনো পরিষেবাও অবশিষ্ট নেই। যুদ্ধ পুরো অর্থনীতিকে চুরমার করে দিয়েছে।
শুধুমাত্র খার্তুমেই প্রায় ২০০টি স্কুল বর্তমানে অকেজো হয়ে পড়ে আছে; যার অনেকগুলোই ধ্বংসপ্রাপ্ত অথবা বাস্তুচ্যুত মানুষের আশ্রয়কেন্দ্র হিসেবে ব্যবহৃত হচ্ছে। অধিকাংশ হাসপাতাল হয় ধ্বংস হয়ে গেছে নতুবা লুটপাটের শিকার হয়ে আংশিক সচল আছে। বিদ্যুৎ পরিষেবা দিনে মাত্র কয়েক ঘণ্টার জন্য পাওয়া যায়।
সুদানের খার্তুমে আমাদের ইসলামিক রিলিফ টিম বর্তমানে শিক্ষা প্রতিষ্ঠান ও স্বাস্থ্যসেবা কেন্দ্রগুলো পুনরায় সচল করতে কাজ করছে। একইসাথে তারা ভয়াবহ যুদ্ধের ট্রমা কাটিয়ে উঠতে সাধারণ মানুষকে মানসিক সহায়তা প্রদান করছে। তবে সেখানকার মানুষের বর্তমান চাহিদার তুলনায় আমাদের এই কার্যক্রম খুবই সামান্য।
আমি সেখানে এমন অনেক মানুষের সাথে দেখা করেছি যাদের জীবনযুদ্ধের গল্প অত্যন্ত করুণ। আয়েশা নামের এক নারী আমাকে জানিয়েছেন কীভাবে তিনি তার চার সন্তানকে হারিয়েছেন। তিনি তার নাতি-নাতনিদের নিয়ে দীর্ঘ পাঁচ দিন পায়ে হেঁটে গাদারিফ শহরের এক শরণার্থী শিবিরে পৌঁছেছেন। সেখানে প্রতিটি মানুষেরই এমন যন্ত্রণাদায়ক অভিজ্ঞতা রয়েছে।
রাজধানীর বর্তমান আপেক্ষিক স্থিতিশীলতা যে কোনো সময় ভেঙে পড়ার শঙ্কায় দিন কাটাচ্ছে সাধারণ মানুষ। গত এক মাসে বেশ কিছু রাজ্যে লড়াইয়ের তীব্রতা বেড়েছে এবং খার্তুমেও সম্প্রতি ড্রোন হামলার ঘটনা ঘটেছে।
সুদানের সাধারণ মানুষের মনে এখন সবচেয়ে বড় ভয়ের কারণ হলো, দেশটির পশ্চিমাঞ্চলে চলতে থাকা এই অন্তহীন যুদ্ধ হয়তো আফ্রিকার অন্যতম বৃহত্তম এই রাষ্ট্রটিকে দুই ভাগে বিভক্ত করে ফেলবে।
যুদ্ধের তিন বছর পূর্তি উপলক্ষে গত মাসে বার্লিনে বিশ্ব নেতারা একটি গুরুত্বপূর্ণ সম্মেলনে মিলিত হয়েছিলেন। কিন্তু দুর্ভাগ্যবশত, সেখানেও সুদানে টেকসই শান্তি প্রতিষ্ঠা কিংবা বেসামরিক নাগরিকদের নিরাপত্তার বিষয়ে কোনো কার্যকর রাজনৈতিক অগ্রগতি দেখা যায়নি।
আন্তর্জাতিক সরকারগুলোর উচিত এখনই যুদ্ধবিরতি কার্যকর করতে জোরালো রাজনৈতিক উদ্যোগ নেওয়া এবং মানবিক সহায়তা যেন সবার কাছে পৌঁছাতে পারে তা নিশ্চিত করা। এটা অত্যন্ত দুঃখজনক যে, বিদেশ থেকে আসা অনেক সাহায্য বা সম্পদ শান্তি ফেরানোর বদলে উল্টো যুদ্ধকে আরও দীর্ঘায়িত করছে।
সুদানের সাধারণ মানুষ কেবল চায় যুদ্ধের অবসান ঘটুক, তারা যেন সসম্মানে নিজ গৃহে ফিরতে পারে এবং ভয়হীন জীবন কাটাতে পারে। তাদের এই সামান্য চাওয়াটুকু পূরণ করা কি খুব বেশি কঠিন?
এই নিবন্ধে প্রকাশিত মতামতগুলো সম্পূর্ণভাবে লেখকের ব্যক্তিগত অভিমত।

তথ্যসূত্র: আল-জাজিরা


সম্পাদক ও প্রকাশক : প্রিন্স সালেহ। প্রকাশক কর্তৃক ১২ বীর উত্তম সি আর দত্ত রোড, বাংলামোটর, ঢাকা ১২০৫ থেকে মুদ্রিত।

ফোন : +88 01919237299, +8801640754545, ই-মেইল: princesalehbd@gmail.com