বিএনএন ডেস্ক
যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের সাথে সংঘাত এড়াতে ইরানের কূটনৈতিক প্রচেষ্টা জোরদার হলেও অভ্যন্তরীণ বাজারে অস্থিরতা থামছে না। নতুন এক প্রতিবেদনে দেখা গেছে, ইরানে দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতি এখন নিয়ন্ত্রণের বাইরে, যা সাধারণ মানুষের খাদ্যনিরাপত্তাকে চরম সংকটে ফেলেছে। দেশটির প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ান এক বৈঠকে দেশের বর্তমান কঠিন পরিস্থিতি ও সীমাবদ্ধতা সম্পর্কে জনগণকে বাস্তব ধারণা রাখার আহ্বান জানিয়েছেন।
রাষ্ট্রীয় সংবাদমাধ্যমে তিনি উল্লেখ করেন যে, এ ধরণের পরিস্থিতিতে জনগণের দুর্ভোগ হওয়া অস্বাভাবিক নয়। তবে জাতীয় ঐক্য এবং জনসচেতনতার মাধ্যমেই এই সংকট কাটিয়ে ওঠা সম্ভব বলে তিনি মনে করেন।
ইরানের পরিসংখ্যান কেন্দ্রের (এসসিআই) তথ্যানুসারে, পারস্য ক্যালেন্ডারের প্রথম মাসেই মূল্যস্ফীতির হার গত বছরের তুলনায় ৭৩.৫ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়েছে। এমনকি মাসিক ভিত্তিতেও এর হার ৫ শতাংশ বেড়েছে। অন্যদিকে দেশটির কেন্দ্রীয় ব্যাংকের মতে, একই সময়ে মূল্যস্ফীতি ছিল ৬৭ শতাংশ।
উভয় প্রতিষ্ঠানের তথ্যে কিছুটা পার্থক্য থাকলেও এটি স্পষ্ট যে দেশটিতে মুদ্রাস্ফীতি অত্যন্ত দ্রুতগতিতে বাড়ছে। গত কয়েক বছরে বিশ্বের সবচেয়ে বেশি মূল্যস্ফীতি হওয়া দেশগুলোর তালিকায় ইরান এখন অন্যতম। তেহরানের এক বাসিন্দা আক্ষেপ করে বলেন, নিত্যপ্রয়োজনীয় অনেক জিনিস এখন সাধারণ মানুষের ক্রয়ক্ষমতার বাইরে চলে গেছে, যা গত এক মাস আগেও তাদের সামর্থ্যের মধ্যে ছিল। আয়ের বড় অংশই এখন ব্যয় হচ্ছে শুধু জীবনধারণের নূন্যতম খাবার কিনতে।

খাদ্যপণ্যের দামে বড় ধাক্কা
পরিসংখ্যান অনুযায়ী, খাদ্যপণ্যের মূল্যস্ফীতি ১১৫ শতাংশে পৌঁছেছে। বিশেষ করে ভোজ্যতেলের দাম বেড়েছে ৩৭৫ শতাংশ এবং মুরগির মাংসের দাম ১৯১ শতাংশ পর্যন্ত বৃদ্ধি পেয়েছে। এ ছাড়া চাল ও শিশুখাদ্যের দামও সাধারণ মানুষের জন্য দুঃসহ হয়ে উঠেছে।
তেহরানের একজন ব্যবসায়ী জানান, কাঁচামালের দাম দ্বিগুণ হয়ে যাওয়ায় তারা পণ্যের দাম বাড়াতে বাধ্য হচ্ছেন। সরকারিভাবে রান্নার তেলের অবৈধ মূল্যবৃদ্ধি রোধের নির্দেশ দেওয়া হলেও বর্তমান অর্থনৈতিক পরিস্থিতিতে তার বাস্তবায়ন নিয়ে সংশয় রয়েছে। এর ওপর ইরানি মুদ্রার মান রেকর্ড পরিমাণ কমেছে; বর্তমানে এক ডলারের বিপরীতে খোলাবাজারে ১৭ লাখ ৭০ হাজার রিয়াল খরচ করতে হচ্ছে, যা গত এক বছরের ব্যবধানে দ্বিগুণ দরপতন।
সরকারি ভর্তুকি ও ‘ষড়যন্ত্র’ তত্ত্ব
সরকার বাজার নিয়ন্ত্রণে ভর্তুকি ও ভাউচার ব্যবস্থা চালু করার চেষ্টা করলেও তা প্রয়োজনের তুলনায় খুবই সামান্য। মাসে মাথাপিছু এই সহায়তার পরিমাণ ১০ ডলারের নিচে। প্রেসিডেন্ট পেজেশকিয়ান এই অস্বাভাবিক মূল্যবৃদ্ধির জন্য যুদ্ধ পরিস্থিতিকে দায়ী করেছেন।
তবে ইরানের পার্লামেন্টে থাকা কট্টরপন্থী সদস্যরা এবং বিপ্লবী গার্ডস সংশ্লিষ্ট মিডিয়াগুলো এই মূল্যস্ফীতিকে ‘শত্রুর ষড়যন্ত্র’ হিসেবে দেখছে। তাদের দাবি, সামরিকভাবে সুবিধা করতে না পেরে বহির্বিশ্ব এখন ইরানের বাজার ব্যবস্থায় নাশকতা চালিয়ে অর্থনৈতিক প্রতিশোধ নিতে চাইছে। তারা জনগণকে এই ‘ষড়যন্ত্রের ফাঁদে’ না পড়ার আহ্বান জানিয়েছেন।

অর্থনৈতিক সংকটের সাথে পাল্লা দিয়ে বাড়ছে প্রযুক্তিগত সীমাবদ্ধতা। নিরাপত্তার কারণ দেখিয়ে দেশটিতে প্রায় আড়াই মাস ধরে ইন্টারনেট সেবা কার্যত বন্ধ করে রাখা হয়েছে। এর ফলে মুখ থুবড়ে পড়েছে দেশটির ডিজিটাল অর্থনীতি ও স্টার্টআপ খাত।
ইন্টারনেটভিত্তিক ব্যবসায়ী সংগঠনের মতে, সরকারের এই সিদ্ধান্তের ফলে দেশের উদীয়মান প্রযুক্তি খাত এখন ধ্বংসের দ্বারপ্রান্তে। একদিকে পশ্চিমা নিষেধাজ্ঞা এবং নৌ অবরোধ, অন্যদিকে অভ্যন্তরীণ অব্যবস্থাপনা ও ইন্টারনেট বিচ্ছিন্নতা—সব মিলিয়ে ইরানের সাধারণ মানুষ ও ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীরা এক ভয়াবহ অনিশ্চয়তার মুখে পড়েছেন।
সম্পাদক ও প্রকাশক : প্রিন্স সালেহ। প্রকাশক কর্তৃক ১২ বীর উত্তম সি আর দত্ত রোড, বাংলামোটর, ঢাকা ১২০৫ থেকে মুদ্রিত।
ফোন : +88 01919237299, +8801640754545, ই-মেইল: princesalehbd@gmail.com