বিএনএন ডেস্ক
বছরখানেক আগে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প হুঙ্কার দিয়েছিলেন যে, বিশাল বাণিজ্য শুল্ক আরোপের মাধ্যমে তিনি চীনকে বশীভূত করবেন। তবে আদালতের বিভিন্ন রায়ের কারণে তাঁর সেই পরিকল্পনা ভেস্তে যায়। বর্তমান পরিস্থিতিতে তিনি বেইজিং সফরে যাচ্ছেন। রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, চীনকে নতজানু করার অবস্থান থেকে ট্রাম্প এখন অনেকটাই সরে এসেছেন। তাঁর লক্ষ্য এখন সয়াবিন, গরুর মাংস কিংবা বোয়িং বিমানের মতো পণ্য বিক্রির কিছু সীমিত চুক্তিতে এসে ঠেকেছে। একই সঙ্গে ইরান সংকট সমাধানেও তিনি এখন বেইজিংয়ের সহযোগিতা কামনা করছেন।
বেইজিংয়ের গ্রেট হল অব দ্য পিপলে ট্রাম্প ও সি চিন পিংয়ের মধ্যকার এই গুরুত্বপূর্ণ বৈঠকটি অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে। দুই রাষ্ট্রপ্রধান ইউনেস্কো স্বীকৃত ঐতিহাসিক টেম্পল অব হেভেন পরিদর্শন করবেন এবং রাষ্ট্রীয় ভোজসভায় অংশ নেবেন। এছাড়া তাঁদের মধ্যে চা-চক্র ও মধ্যাহ্নভোজের সূচিও রয়েছে।
অধ্যাপক রেয়েসের মতে, ট্রাম্পের এখন পররাষ্ট্রনীতিতে একটি বড় সাফল্যের প্রয়োজন। তিনি বিশ্বকে দেখাতে চান যে তিনি কেবল বিশৃঙ্খলা সৃষ্টিতেই পারদর্শী নন, বরং বিশ্বজুড়ে স্থিতিশীলতা আনতেও সক্ষম। এর আগে দক্ষিণ কোরিয়ায় অনুষ্ঠিত এক সংক্ষিপ্ত বৈঠকে ট্রাম্প চীনা পণ্যের ওপর আরোপিত শুল্ক স্থগিত করেছিলেন এবং বিনিময়ে সি চিন পিং খনিজ সরবরাহ বন্ধের হুমকি থেকে সরে এসেছিলেন। তবে এর পর থেকে চীন অত্যন্ত কৌশলে ওয়াশিংটনের ওপর অর্থনৈতিক চাপ বজায় রেখেছে, অন্যদিকে ট্রাম্প ইরান যুদ্ধ ও অভ্যন্তরীণ আইনি জটিলতা নিয়ে ব্যস্ত থাকায় তাঁর জনপ্রিয়তা অনেকটাই হ্রাস পেয়েছে।
'এক হিসেবে বর্তমানে চীনের চেয়ে ট্রাম্পেরই চীনকে বেশি প্রয়োজন।'আলেজান্দ্রো রেয়েস, অধ্যাপক, হংকং বিশ্ববিদ্যালয়
আসন্ন এই বেইজিং সফরে দুই নেতা গ্রেট হল অব দ্য পিপলে আনুষ্ঠানিক বৈঠক করবেন এবং টেম্পল অব হেভেনে সময় কাটাবেন। তবে কর্মকর্তাদের মতে, এই সফর থেকে বিশাল কোনো অর্থনৈতিক অর্জনের সম্ভাবনা কম। মূলত কিছু বাণিজ্যিক চুক্তি ও ভবিষ্যৎ বাণিজ্য কাঠামোর রূপরেখা নিয়ে আলোচনার সম্ভাবনা রয়েছে। বাণিজ্য যুদ্ধের চলমান বিরতি আরও বাড়বে কি না, তা নিয়ে এখনো ধোঁয়াশা রয়েছে। ট্রাম্পের এই সফরে ইলন মাস্ক ও টিম কুকের মতো প্রভাবশালী ব্যবসায়ীরা তাঁর সঙ্গী হচ্ছেন।

ট্রাম্প সম্প্রতি জানিয়েছেন যে, বাণিজ্যিক আলোচনার পাশাপাশি তিনি তাইওয়ানে অস্ত্র বিক্রয় এবং হংকংয়ের কারাবন্দী সাংবাদিক জিমি লাইয়ের মুক্তির প্রসঙ্গটি উত্থাপন করবেন। এছাড়া চীনে দীর্ঘকাল বন্দী থাকা মার্কিন নাগরিকদের পরিবারও ট্রাম্পের ওপর চাপ সৃষ্টি করছে। ট্রাম্প বলেন, তিনি সি চিন পিংকে যথেষ্ট শ্রদ্ধা করেন এবং প্রতিদান হিসেবে সম্মান আশা করেন। উল্লেখ্য, ২০২৫ সালের এপ্রিলে ট্রাম্প সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে চীনের ওপর শুল্ক আরোপের মাধ্যমে কঠোর বার্তা দিয়েছিলেন।
বিশেষজ্ঞদের ধারণা, যদি ওয়াশিংটন ও বেইজিংয়ের মধ্যে কোনো বড় চুক্তি হয়, তবে চীন তাইওয়ানের ওপর আধিপত্য বিস্তারের ক্ষেত্রে আরও বেপরোয়া হয়ে উঠতে পারে। এমনকি সামরিক শক্তি প্রয়োগের সম্ভাবনাও উড়িয়ে দেওয়া যায় না। এতে এশীয় অঞ্চলের দেশগুলোর মধ্যে নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ আরও বাড়বে।
চীনের বিরল খনিজ রপ্তানিতে কড়াকড়ি আরোপের পর পশ্চিমা দেশগুলোর শিল্পখাতে বড় ধরনের ঝুঁকি তৈরি হয়। এই চাপই মূলত ট্রাম্পকে আলোচনার টেবিলে বসতে বাধ্য করে। এর মাঝে ট্রাম্প ভেনেজুয়েলা ইস্যু, গ্রিনল্যান্ড নিয়ে ন্যাটোর সঙ্গে টানাপোড়েন এবং ইরানের সাথে যুদ্ধে জড়িয়ে পড়েন, যা বিশ্বজুড়ে জ্বালানি সংকট ও অস্থিরতা তৈরি করেছে। সাম্প্রতিক জরিপ বলছে, অধিকাংশ মার্কিন নাগরিক ইরানের সাথে এই যুদ্ধ সমর্থন করেন না। তাই ট্রাম্প এখন ইরানের ঘনিষ্ঠ বন্ধু চীনের মাধ্যমে একটি শান্তিপূর্ণ সমাধান খুঁজছেন।
সাবেক মার্কিন নিরাপত্তা উপদেষ্টা ম্যাট পটিংগারের মতে, চীন হয়তো আমেরিকার শক্তি খর্ব করতে চায়, কিন্তু দীর্ঘস্থায়ী যুদ্ধের অর্থনৈতিক প্রভাব তাদেরও ভাবিয়ে তুলছে। সি চিন পিংয়ের মূল লক্ষ্য হলো তাইওয়ান ইস্যু। বিশেষজ্ঞরা আশঙ্কা করছেন, কোনো চুক্তির বিনিময়ে আমেরিকা যদি তাইওয়ান ইস্যুতে নমনীয় হয়, তবে আঞ্চলিক নিরাপত্তা বিঘ্নিত হতে পারে। সাংহাইয়ের অধ্যাপক উ জিনবো মনে করেন, ট্রাম্পের উচিত তাইওয়ানের বিচ্ছিন্নতাবাদী এজেন্ডাকে সমর্থন না করার বিষয়টি স্পষ্ট করা।

একটি নামমাত্র যুদ্ধবিরতি
চীন চায় ট্রাম্প প্রশাসন যেন প্রযুক্তি রপ্তানি এবং উন্নত চিপ তৈরির যন্ত্রপাতির ওপর থেকে নিষেধাজ্ঞা তুলে নেয়। বেইজিং ইতিমধ্যে এমন আইন করেছে যাতে বিদেশি কোম্পানিগুলো চীন থেকে কারখানা সরিয়ে নিতে ভয় পায়। এদিকে মার্কিন জনগণের মধ্যেও চীনের সাথে সুসম্পর্ক বজায় রাখার আগ্রহ বাড়ছে; ২০২৪ সালের এক জরিপে দেখা গেছে ৫৩ শতাংশ মার্কিন নাগরিক বেইজিংয়ের সাথে সহযোগিতামূলক সম্পর্কের পক্ষে।
সব মিলিয়ে বিশ্লেষকদের মত হলো, ট্রাম্প যদি এই সফরের মাধ্যমে অন্তত বিদ্যমান উত্তেজনা কমিয়ে বাণিজ্য যুদ্ধের বিরতি কিছুটা দীর্ঘ করতে পারেন, তবে সেটিকেই তিনি বড় ধরনের সাফল্য হিসেবে জনগণের সামনে তুলে ধরবেন। শুধুমাত্র বর্তমান স্থিতিশীলতা ধরে রাখাকেই ট্রাম্প নিজের জন্য একটি বিজয় হিসেবে দাবি করার চেষ্টা করবেন।
সম্পাদক ও প্রকাশক : প্রিন্স সালেহ। প্রকাশক কর্তৃক ১২ বীর উত্তম সি আর দত্ত রোড, বাংলামোটর, ঢাকা ১২০৫ থেকে মুদ্রিত।
ফোন : +88 01919237299, +8801640754545, ই-মেইল: princesalehbd@gmail.com