বিএনএন ডেস্ক
লক্ষ্মীপুর জেলা কারাগারের প্রধান ফটকে এক হৃদয়বিদারক দৃশ্যের অবতারণা হয়। একটি প্রিজন ভ্যান থেকে এক নারীকে নামানো হলো, যাঁর কোলে ছিল মাত্র দেড় বছরের এক শিশু। জেলের গেটের বাইরে দাঁড়িয়ে ছিল তাঁর অন্য দুই স্কুলপড়ুয়া সন্তান। সন্তানদের দিকে শেষবার তাকিয়ে তিনি কারান্তরালে প্রবেশ করেন। মায়ের জেলে যাওয়ার সংবাদ শুনে দুই ভাইবোন বিদ্যালয় থেকেই সরাসরি কারা ফটকে ছুটে এসেছিল তাকে একবার দেখার জন্য।
গত সোমবার বিকেলে লক্ষ্মীপুর জেলা কারাগারের সামনে এই দৃশ্য দেখে উপস্থিত সাধারণ মানুষ আবেগপ্রবণ হয়ে পড়েন। কারাগারে পাঠানো ওই নারীর নাম ফারহানা আক্তার। একটি মারামারির মামলায় তাকে অভিযুক্ত করা হয়েছে। আদালতের নির্দেশে ছোট শিশুটি মায়ের সঙ্গে থাকলেও, বাড়িতে একা হয়ে পড়েছে তাঁর অন্য দুই সন্তান।
পুলিশ ও স্থানীয়দের বর্ণনা অনুযায়ী, সাহাপুর গ্রামের বাসিন্দা ইসমাইল হোসেনের সঙ্গে আফতাব উদ্দিন ভূঁইয়ার জমিজমা নিয়ে পুরনো বিরোধ ছিল। এই শত্রুতার জেরে গত ৯ এপ্রিল ইসমাইলের বাড়িতে হামলার ঘটনা ঘটে, যেখানে পরিবারের নারী সদস্যরাও আঘাতপ্রাপ্ত হন। আহতদের উদ্ধার করে স্থানীয় হাসপাতালে চিকিৎসা দেওয়া হয়।
এই ঘটনার একটি ভিডিও সামাজিক মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ার পর ইসমাইল হোসেন মামলা করলে পুলিশ আফতাব উদ্দিনকে গ্রেপ্তার করে। পরবর্তীতে আফতাবের ভাই মাহাতাব উদ্দিন বাদী হয়ে ফারহানা আক্তারসহ ১০ জনের বিরুদ্ধে পাল্টা মামলা করেন। সেই মামলায় গতকাল ফারহানা আক্তার লক্ষ্মীপুর চিফ জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট আদালতে আত্মসমর্পণ করলে বিচারক তাঁর জামিন নামঞ্জুর করে কারাগারে পাঠানোর আদেশ দেন। একই সঙ্গে জহির উদ্দিন নামে আরেকজনকেও জেলে পাঠানো হয়।

আদালতের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তা দেলোয়ার হোসেন জানান, বিচারক শাহ জামালের নির্দেশে আসামি ফারহানা ও জহিরকে জেলহাজতে পাঠানো হয়েছে। ঘটনার পর প্রিজন ভ্যানে থাকা মায়ের কোলে শিশু এবং ফটকের বাইরে দুই সন্তানের ছবি ইন্টারনেটে ছড়িয়ে পড়লে তা নিয়ে ব্যাপক আলোচনা শুরু হয়।
আসামিপক্ষের আইনজীবী মহসিন কবির বলেন, ফারহানার সঙ্গে তাঁর দুগ্ধপোষ্য শিশুটি থাকলেও বড় দুই সন্তান, যারা দ্বিতীয় ও পঞ্চম শ্রেণিতে পড়ে, তারা এখন অভিভাবকহীন। ওই দুই শিশুর পরীক্ষা চলছিল এবং পরীক্ষা শেষ করেই তারা মাকে দেখতে কারাফটকে আসে। আইনজীবী আরও দাবি করেন যে, মামলাটি উদ্দেশ্যপ্রণোদিত এবং তিনি আসামির জামিনের জন্য বিশেষ আবেদন করবেন।
ফারহানা আক্তারের স্বামী ইসমাইল হোসেন উদ্বেগ প্রকাশ করে বলেন, তাঁদের তিনটি সন্তানের মধ্যে সবচেয়ে ছোটটি মায়ের সাথে কারাগারে আছে। কিন্তু বাড়িতে থাকা অন্য দুই সন্তান মানসিকভাবে বিপর্যস্ত হয়ে পড়েছে। হঠাৎ করে মাকে ছাড়া থাকতে হওয়ায় তারা দিশেহারা।
এদিকে বাদীপক্ষের আইনজীবী জসিম উদ্দিনের দাবি, ফারহানা আক্তার লোহার রড দিয়ে বাদীর মাথায় গুরুতর আঘাত করেছিলেন। ন্যায়বিচারের স্বার্থে বাদী মামলা করেছেন এবং আদালত সার্বিক দিক বিবেচনা করেই জামিন আবেদন নাকচ করে আসামিদের কারাগারে পাঠানোর নির্দেশ দিয়েছেন।
মামলার বাদী মাহাতাব উদ্দিন ভূঁইয়া জানান, আসামিদের হামলায় তিনি গুরুতর আহত হয়ে বেশ কয়েক দিন হাসপাতালে চিকিৎসাধীন ছিলেন। তবে মগজ বের হয়ে যাওয়ার প্রাথমিক তথ্যের বিষয়ে তিনি পরে সংশোধন করে বলেন যে, চিকিৎসকদের মতে সেটি চর্বি ছিল।
লক্ষ্মীপুর জেলা কারাগারের ভারপ্রাপ্ত জেলার নুর মোহাম্মদ সোহেল ঘটনার সত্যতা নিশ্চিত করে জানান, আদালতের নির্দেশে দেড় বছর বয়সী শিশু সিয়ামসহ তার মা ফারহানা আক্তারকে কারাগারে রাখা হয়েছে। বর্তমানে তারা জেল কর্তৃপক্ষের অধীনে রয়েছেন।
সম্পাদক ও প্রকাশক : প্রিন্স সালেহ। প্রকাশক কর্তৃক ১২ বীর উত্তম সি আর দত্ত রোড, বাংলামোটর, ঢাকা ১২০৫ থেকে মুদ্রিত।
ফোন : +88 01919237299, +8801640754545, ই-মেইল: princesalehbd@gmail.com