১২ মে ২০২৬
preview
‘পুরো সকালটাই গ্যাসকে ঘিরে’: পাকিস্তানের জ্বালানি সংকট এখন রান্নাঘরে

বিএনএন ডেস্ক

করাচি, পাকিস্তান – ফারহাত কুরেশি তার জীবনের অধিকাংশ সময় ঘড়ির কাঁটার দিকে না তাকিয়েই রান্না করেছেন। কিন্তু ৬০ বছর বয়সে এসে এখন তার প্রতিটি সকাল শুরু হয় একটি দুশ্চিন্তা নিয়ে: রান্নার গ্যাস চলে যাওয়ার আগে তিনি কতটুকু কাজ শেষ করতে পারবেন?
করাচিতে তার বাড়িতে রান্নার গ্যাস কেবল সকাল, দুপুর এবং সন্ধ্যায় নির্দিষ্ট কিছু সময়ের জন্য পাওয়া যায়। যদি কোনোভাবে সেই সময় মিস হয়ে যায়, তবে রান্না পিছিয়ে যায়, খাবার পুনরায় গরম করতে হয় এবং সারাদিনের পরিকল্পনা বদলে যায়।
কুরেশি বলেন, “আমি আমার সারাজীবনে এমন পরিস্থিতি কখনও দেখিনি। আমার পুরো সকালটাই এখন গ্যাসের ওপর নির্ভর করে।”
২৮শে ফেব্রুয়ারি ইরানের ওপর হামলার পর থেকে পাকিস্তানের জ্বালানি সংকট আরও তীব্র হয়েছে। এর ফলে তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাসের (এলএনজি) পূর্বের উদ্বৃত্ত এখন ঘাটতিতে পরিণত হওয়ার উপক্রম হয়েছে। পাকিস্তানের এলএনজি আমদানি ২০২১ সালের ৮.২ মিলিয়ন টন থেকে কমে ২০২৫ সালের শেষের দিকে ৬.১ মিলিয়ন টনে নেমে এসেছে।
দেশীয় উৎপাদন হ্রাস পাওয়ার কারণে পাকিস্তানের জ্বালানি ব্যবস্থা আগে থেকেই চাপে ছিল, যার ওপর ইরান পরিস্থিতি আরও নেতিবাচক প্রভাব ফেলেছে। পাকিস্তান তাদের দৈনন্দিন গ্যাসের চাহিদার বড় অংশ নিজেদের গ্যাসক্ষেত্র থেকে মেটালেও, দীর্ঘমেয়াদী চুক্তির আওতায় কাতার ও আরব আমিরাত থেকে আমদানিকৃত এলএনজি দিয়ে বাকি ঘাটতি পূরণ করে। এই আমদানিকৃত এলএনজি দেশের প্রায় এক-চতুর্থাংশ বিদ্যুৎ উৎপাদনে ব্যবহৃত হয়।
যুদ্ধ শুরু হওয়ার পর এলএনজি সরবরাহ মারাত্মকভাবে কমে গেছে। পাকিস্তানের তেল ও গ্যাস নিয়ন্ত্রক কর্তৃপক্ষের (ওজিআরএ) তথ্যমতে, যেখানে প্রতি মাসে ৮ থেকে ১২টি জাহাজ আসত, মার্চ মাসে তা কমে মাত্র দুইটিতে দাঁড়িয়েছে। তবে সম্প্রতি কাতারের একটি এলএনজিবাহী জাহাজকে হরমুজ প্রণালি পার হতে দেখা গেছে, যা যুদ্ধের পর পাকিস্তানের দিকে আসা প্রথম জাহাজ।
পাকিস্তানের সাধারণ পরিবারগুলো এই সংকটের প্রভাব ভিন্নভাবে অনুভব করছে: বিশেষ করে নারীদের ওপর অতিরিক্ত পরিশ্রমের চাপ বেড়েছে। তাদের এখন অনেক ভোরে উঠতে হয়, দ্রুত রান্না শেষ করতে হয় এবং বিশ্রামের সময় কমিয়ে দিয়ে গ্যাসের সময়ের সাথে তাল মিলিয়ে চলতে হয়।
গ্যাসের এই নির্দিষ্ট সময়সূচি কুরেশির দৈনন্দিন জীবনযাত্রাকে আমূল বদলে দিয়েছে। স্বামী ও দুই সন্তানসহ চারজনের খাবারের ব্যবস্থা তাকে একাই করতে হয়, তাই গ্যাসের সময় মেনেই তাকে সারাদিনের পরিকল্পনা সাজাতে হয়।
তার কাছে রান্না এখন কয়েকটি খণ্ডকালীন শিফটে ভাগ করা একটি কঠিন কাজ। করাচির অধিকাংশ বাড়িতে গ্যাস পাওয়া যায় সকাল ৬টা থেকে ৯:৩০টা পর্যন্ত, দুপুরে প্রায় দুই ঘণ্টা এবং সন্ধ্যায় ৬টা থেকে ৯:৩০টা পর্যন্ত। আপাতদৃষ্টিতে সময়টি যথেষ্ট মনে হলেও, গ্যাসের চাপ এতটাই কম থাকে যে রান্না শেষ করতে দীর্ঘ সময় লেগে যায়।
তিনি আক্ষেপ করে বলেন, “প্রয়োজনের সময় গ্যাস না পাওয়াটা অত্যন্ত বিরক্তিকর। এভাবে বেঁচে থাকা সত্যিই ক্লান্তিকর হয়ে উঠেছে।”
কুরেশি আরও জানান, “সন্ধ্যায় আমি পরিবারকে সময় দিতে চাই বা অন্যান্য কাজ করতে চাই। কিন্তু যেহেতু ৬টায় গ্যাস আসে, তাই আমাকে দ্রুত রান্নাঘরের কাজ শেষ করতে দৌড়াতে হয়।”
২০২৪ সালের একটি গবেষণা প্রতিবেদন অনুযায়ী, পাকিস্তানে গৃহস্থালির যাবতীয় অবৈতনিক কাজগুলো মূলত নারীরাই করে থাকেন, যাকে প্রায়ই কোনো অর্থনৈতিক গুরুত্ব দেওয়া হয় না। সমীক্ষায় দেখা গেছে, নারীরা প্রতিদিন গড়ে তিন ঘণ্টা এ জাতীয় পারিশ্রমিকহীন কাজ করেন, যার সিংহভাগ ব্যয় হয় রান্নাঘরে।
‘সঠিকভাবে আহার করার সুযোগ নেই’
২৪ বছর বয়সী শিক্ষিকা লাইবা জাহিদ জানান, তার পুরো দিনটি এখন সকালের নাস্তা, দুপুরের খাবার এবং রাতের খাবারের জন্য নির্ধারিত গ্যাসের সময়ের ওপর ভিত্তি করে বিভক্ত হয়ে গেছে।
তিনি বলেন, “আমাদের রাতের খাবারের সময় এখন স্থির। আমাদের খুব দ্রুত রাতের খাবার খেয়ে নিতে হয়। কারণ রাত ৯টার পর গ্যাসের চাপ অনেক কমে যায়, তাই ৮:৩০টার মধ্যে আমাদের রান্না শেষ নিশ্চিত করতে হয়।”
জাহিদ যখন দুপুর ২টায় কাজ থেকে ফেরেন, তখন হাতে খুব কম সময় থাকে। গ্যাস চলে যাওয়ার আগেই তাকে তড়িঘড়ি করে খাবার গরম করতে হয়।
তিনি জানান, “গ্যাস চলে গেলে খাবার মাইক্রোওয়েভে গরম করতে হয়, যা খাবারকে শুকিয়ে ফেলে। ফলে আমি তৃপ্তি সহকারে একবেলা খাবারও খেতে পারি না।”
এমনকি বিকেলে এক কাপ চা পানের অভ্যাসটিও এখন গ্যাসের অভাবের কারণে বাদ দিতে হয়েছে। জাহিদ বলেন, “চা এখন আমার জীবন থেকে হারিয়ে গেছে।”
তার মতে, এই সংকটের কারণে সবচেয়ে বড় আপস করতে হচ্ছে পর্যাপ্ত ঘুম এবং বিশ্রামের ক্ষেত্রে।
জাহিদ বলেন, “নিশ্চয়ই আমার রুটিন এখন গ্যাসের সময়ের দ্বারা নিয়ন্ত্রিত হচ্ছে। কখন খাব তা গ্যাসই ঠিক করে দিচ্ছে।”
বাইরে যাওয়া বা বন্ধুদের সাথে দেখা করার সময়ও তাকে গ্যাসের সময়সূচির কথা মাথায় রাখতে হয়। তিনি জানান, সবসময় বাইরে খাওয়া সম্ভব নয় কারণ পাঁচজনের পরিবারের জন্য এটি অনেক ব্যয়বহুল।
বিশ্বব্যাংকের এক জরিপ অনুসারে, ২০২৪ সালে অর্ধেকেরও কম পাকিস্তানি পরিবার রান্নার জন্য পরিচ্ছন্ন জ্বালানি ব্যবহারের সুযোগ পেয়েছে। শহরাঞ্চলে পাইপলাইনের প্রাকৃতিক গ্যাস প্রধান জ্বালানি হিসেবে ব্যবহৃত হলেও, উচ্চমূল্যের কারণে এলপিজি সিলিন্ডার কেবল বিকল্প হিসেবে রাখা হয়।
যখন বাড়িই কর্মস্থল
জ্বালানি সংকটের প্রভাব পড়েছে শেফ ফাতিমা হাফিজের খাবারের ব্যবসায়, যা তিনি ঘর থেকে পরিচালনা করেন। পাইপলাইনে গ্যাস না থাকলে তাকে অনেক চড়া দামে এলপিজি সিলিন্ডার কিনতে হয়।
তিনি বলেন, “কখনও কখনও আমাকে অর্ডার বাতিল করতে হয় কারণ সিলিন্ডারে রান্না করা অত্যন্ত ব্যয়বহুল হয়ে পড়ে। লোডশেডিং এবং গ্যাসের অভাব আমাকে চরম দুর্ভোগে ফেলেছে।”
হাফিজ জানান, গ্যাসের সময়সূচির কারণে তাকে অনেক ভোরে কাজ শুরু করতে হয়। এর ওপর আবার বিদ্যুৎ বিভ্রাট পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তোলে।
তিনি বলেন, “যদি বিদ্যুৎ এবং গ্যাস দুটিই না থাকে, তবে আমরা জেনারেটরও চালাতে পারি না কারণ সেটি গ্যাসের ওপর নির্ভরশীল। আমাদের ইউপিএস থাকলেও সেটি চার্জ করার জন্য বিদ্যুতের প্রয়োজন হয়।”
অর্ডার বাতিল করা ব্যবসার জন্য ক্ষতিকর বলে মনে করেন হাফিজ। তিনি বলেন, “কারও কাছ থেকে অর্ডার নেওয়ার পর তা সময়মতো সরবরাহ করতে না পারাটা গ্রাহকদের অসন্তুষ্ট করে, যা মোটেও কাম্য নয়।”
৪৭ বছর বয়সী শাবানা হাসান ঘরে একটি বিউটি পার্লার চালান। তার কাছে গ্যাস ও বিদ্যুৎ সংকট সমানভাবে পীড়াদায়ক।
তিনি বলেন, “লোডশেডিং এখন বড় সমস্যা। বিদ্যুৎ না থাকলে আমি গ্রাহকদের এমন হেয়ারস্টাইল করে দিই যেখানে বৈদ্যুতিক যন্ত্রের প্রয়োজন হয় না।”
তবে এর ফলে তার ব্যবসা ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। সোলার প্যানেল থাকলেও তা দিয়ে হেয়ার স্ট্রেইটনার বা কার্লিং রড চালানো সম্ভব হয় না।
করাচি বিশ্ববিদ্যালয়ের মনোবিজ্ঞানের ছাত্রী সিমালহ জাফর বাকাই জানান, এই সংকট তার পড়াশোনা এবং ঘুমের ঘণ্টার ওপর সরাসরি প্রভাব ফেলছে।
২২ বছর বয়সী সিমালহ বলেন, “আমার পুরো রুটিন এখন গ্যাস আর লোডশেডিংয়ের ওপর নির্ভর করে সাজাতে হয়।”
তিনি সারাক্ষণ পরিবারের সবার কাছে গ্যাসের খবর নিতে থাকেন যে গ্যাস কখন আসবে বা কখন যাবে। তার মতে, অন্য কিছু নিয়ে ভাবার সুযোগই এখন আর নেই।
ফারহাত কুরেশি সেই দিনগুলোর কথা মনে করেন যখন গ্যাসের কোনো অভাব ছিল না এবং সারাদিন ধরে রান্নার পরিকল্পনা করতে হতো না। আগে তিনি দুপুরের মধ্যেই সারাদিনের কাজ শেষ করে ফেলতেন, যা এখন সম্ভব হচ্ছে না।
তিনি উপসংহারে বলেন, “আমাদের ব্যক্তিগত ও দৈনন্দিন জীবন দারুণভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। এতে গৃহিণীদের হাড়ভাঙা পরিশ্রম আগের চেয়ে কয়েকগুণ বেড়ে গেছে।”

তথ্যসূত্র: আল-জাজিরা


সম্পাদক ও প্রকাশক : প্রিন্স সালেহ। প্রকাশক কর্তৃক ১২ বীর উত্তম সি আর দত্ত রোড, বাংলামোটর, ঢাকা ১২০৫ থেকে মুদ্রিত।

ফোন : +88 01919237299, +8801640754545, ই-মেইল: princesalehbd@gmail.com