১২ মে ২০২৬
preview
ইশরাতের জীবনে অলৌকিক কিছুর প্রতীক্ষা...

বিএনএন ডেস্ক

ইশরাত জাহানের মস্তিষ্কে রক্তক্ষরণ হওয়ার পর চিকিৎসকরা আশা ছেড়ে দিয়েছিলেন। ইতালির একজন শল্যচিকিৎসক তার স্বামী সারওয়ার-ই আলমকে জানিয়েছিলেন, ইশরাত হয়তো আর বেশিদিন পৃথিবীতে নেই। কিন্তু সব আশঙ্কাকে মিথ্যে করে দিয়ে ইশরাত এখনও বেঁচে আছেন।

প্রায় চার বছর অতিক্রান্ত হলেও লন্ডনের একটি কেয়ার হোমের দুই কামরার কক্ষই এখন ইশরাতের পুরো পৃথিবী। নিজের শক্তিতে বিছানা ছেড়ে জানালার পাশে যাওয়ার ক্ষমতাও তার হারিয়ে গেছে। এখন হুইলচেয়ার আর সেবিকাদের সহায়তাই তার একমাত্র অবলম্বন।

সারওয়ার সামাজিক মাধ্যমে লিখেছেন, ইশরাত এক অবিশ্বাস্য জীবন অতিবাহিত করছেন। তিনি নিজে মুখে খাবার বা পানি গ্রহণ করতে পারেন না, এমনকি কথা বলার বা নড়াচড়া করার ক্ষমতাও তার নেই। কৃত্রিম নলের মাধ্যমে তাকে তরল খাবার দিয়ে বাঁচিয়ে রাখা হয়েছে, যার স্বাদ বা গন্ধ তিনি অনুভব করতে পারেন না।

সারওয়ার পেশায় একজন সাংবাদিক ও কবি। ২০১১ সাল থেকে তিনি সপরিবারে লন্ডনে বাস করছেন, তার আগে দীর্ঘ সময় ফ্রান্সে কাটিয়েছেন। এই দম্পতির তিন সন্তান—সানিয়া, সাহির ও সামির। বড় মেয়ে সানিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ে আইন পড়ছে, আর ছোটরা স্কুলে। মায়ের সান্নিধ্য ও মমতা ছাড়াই এই শিশুরা বড় হয়ে উঠছে।

সেদিনের সেই দুর্ঘটনা

২০২২ সালের ৬ মে তারিখটি তাদের জীবনের মোড় ঘুরিয়ে দেয়। সেদিন ইশরাত ব্রেইন হেমারেজের শিকার হন। সারওয়ার স্মৃতিচারণ করে বলেন, তখন ছোট ছেলে সামিরের বয়স ছিল মাত্র দুই বছর। ছেলেকে খাইয়ে নিজে খেতে বসার সময় হঠাৎ ইশরাত মেঝেতে পড়ে যান। এরপর দীর্ঘ আট ঘণ্টার অস্ত্রোপচার হলেও তার শারীরিক অবস্থার বিশেষ উন্নতি হয়নি।

হাসপাতাল থেকে তাকে বিশেষায়িত পুনর্বাসন কেন্দ্র এবং পরবর্তীতে একটি কেয়ার হোমে স্থানান্তর করা হয়। সেখানে দীর্ঘ চিকিৎসাতেও তার অবস্থার খুব সামান্যই পরিবর্তন লক্ষ্য করা গেছে।

২০২২ সালের ৬ মে হঠাৎ করেই ইশরাত মস্তিষ্কে রক্তক্ষরণের শিকার হন। ছোট ছেলেকে রাতের খাবার খাইয়ে নিজে খেতে বসার মুহূর্তে তিনি সোফা থেকে পড়ে জ্ঞান হারান। কুইন্স হাসপাতালে দীর্ঘ আট ঘণ্টার অস্ত্রোপচারের পর তার জীবন রক্ষা পেলেও শারীরিক সক্ষমতা ফিরে আসেনি।

সারওয়ার জানান, লন্ডনে এই কেয়ার হোমে থাকার খরচ বছরে প্রায় এক কোটি টাকা। ডা. প্যাট্রিক নামে একজন সহৃদয় চিকিৎসকের সহায়তায় কিছু দাতব্য সংস্থা ইশরাতের পাশে দাঁড়ায়, যার ফলে তাকে এই উন্নত সেবার আওতায় রাখা সম্ভব হয়েছে।

এর আগে ২০১৬ সালেও একবার ইশরাত অসুস্থ হয়েছিলেন। সেবার সুস্থ হলেও দ্বিতীয়বার এই অসুস্থতা তাকে মানসিকভাবে ভেঙে ফেলে। দীর্ঘ চিকিৎসা ও কাউন্সেলিংয়ের পরও তিনি স্বাভাবিক জীবনে ফিরতে পারেননি।

‘সন্তানদের কাছে আমিই বাবা, আমিই মা’

বিগত চার বছরের সংগ্রামের কথা বলতে গিয়ে সারওয়ার আবেগপ্রবণ হয়ে পড়েন। তিনি বলেন, মাঝেমধ্যে সন্তানদের নিয়ে স্ত্রীকে দেখতে যান। কিন্তু সন্তানদের মন ভালো রাখতে তিনি বাসায় ফিরে মিথ্যা করে বলেন যে মা সুস্থ হয়ে যাচ্ছে।

সারওয়ারের মতে, সন্তানদের মানসিক বিকাশের স্বার্থে এই সত্য গোপন করা ছাড়া তার আর কোনো উপায় নেই। তিনি এখন সন্তানদের কাছে একইসাথে বাবা ও মায়ের ভূমিকা পালন করছেন।

ঈদের মতো উৎসবের দিনগুলোতেও সারওয়ার সন্তানদের নিয়ে কেয়ার হোমে হাজির হন। সবাই একই রঙের পোশাক পরে ইশরাতের পাশে সময় কাটান। কেয়ার হোমের কর্মীরা ইশরাতকে সাজিয়ে দেন, কিন্তু তিনি কোনো কিছুতেই সাড়া দেন না। পার্থিব কোনো আনন্দই যেন তাকে ছুঁতে পারে না।

উৎসবের দিনগুলোতে কেয়ার হোমেই এই পরিবারের মিলনমেলা বসে। কিন্তু ইশরাত থাকেন নির্বাক। সারওয়ার বলেন, সন্তানরা বড় হচ্ছে কিন্তু ইশরাতের সময় যেন এক জায়গায় থমকে আছে। শুধু তিনি যে নিশ্বাস নিচ্ছেন, এটাই পরিবারের কাছে বড় সান্ত্বনা।

ফেসবুক পোস্টে সারওয়ার লিখেছেন, কেয়ার হোম থেকে ফেরার সময় সন্তানরা এক অদ্ভুত নীরবতায় ডুবে থাকে। তাদের সেই নীরব কষ্টের ভাষা সারওয়ার বোঝেন, কিন্তু করার কিছু থাকে না। প্রতিটি বিদায়বেলায় তারা একটাই আশা করেন—হয়তো কোনো অলৌকিক ঘটনায় ইশরাত আবার সুস্থ হয়ে কথা বলবেন।

স্মৃতির পাতায় ইশরাত

ঢাকার এক সম্ভ্রান্ত পরিবারে জন্ম নেওয়া ইশরাত গার্হস্থ্য অর্থনীতি কলেজ থেকে শিশু মনোবিজ্ঞানে পড়াশোনা করেছেন। ২০০৪ সালে সারওয়ারের সাথে তার বিবাহ হয় এবং এরপর তারা প্রবাস জীবনে পাড়ি জমান।

প্যারিস থেকে লন্ডন—দীর্ঘ প্রবাস জীবনে তারা একে অপরের সঙ্গী ছিলেন। তিনটি সন্তানের জন্ম ও লালন-পালনের মধ্য দিয়ে তাদের সুখের সংসার গড়ে উঠেছিল।

সারওয়ার জানান, ছোট ছেলের জন্মের সময়ও এক অলৌকিক পরিস্থিতি তৈরি হয়েছিল, যখন তিনি নিজেই চিকিৎসকের পরামর্শে বাড়িতে ইশরাতের প্রসব সম্পন্ন করেছিলেন। অসুস্থ হওয়ার পর ইশরাতের মা-বাবাও মারা গেছেন, কিন্তু সেই দুঃসংবাদ তাকে জানানো সম্ভব হয়নি।

সংগ্রাম ও বেঁচে থাকা

মায়ের অনুপস্থিতিতে বড় মেয়ে সানিয়া এখন পরিবারের হাল ধরেছে। ১৫ বছর বয়স থেকেই সে তার ভাইদের মায়ের মমতায় আগলে রেখেছে। সারওয়ার বলেন, মেয়ে পাশে না থাকলে হয়তো আমি ভেঙে পড়তাম। নিজের ব্যক্তিগত জীবনের কথা না ভেবে তিনি সন্তানদের ভবিষ্যৎ আর স্ত্রীর সেবায় নিজেকে নিয়োজিত রেখেছেন।

ছোট ছেলেটি তার মায়ের কোনো স্মৃতি মনে করতে পারে না, যা সারওয়ারকে ভীষণ পীড়া দেয়। তবুও তিনি হাল ছাড়েননি। পেশাগত কাজের পাশাপাশি সন্তানদের সময় দেওয়া এবং স্ত্রীর সুস্থতার জন্য অপেক্ষা করাই এখন তার জীবনের মূল লক্ষ্য।

পরিচরর্যাকারীরা মাঝেমধ্যে ইশরাতকে হুইলচেয়ারে করে বাইরে নিয়ে যান। তাকে শপিং মল, পার্ক এমনকি সিনেমা হলেও নিয়ে যাওয়া হয়েছে। তার প্রিয় বাংলা সিনেমা দেখিয়ে তাকে কিছুটা আনন্দ দেওয়ার চেষ্টা করা হয়।

সামান্য উন্নতিতে বড় আশা

ইশরাতের শারীরিক অবস্থার খুব সামান্য উন্নতিও সারওয়ারের মনে বড় আশার সঞ্চার করে। ২০২২ সালের জুনে যখন তিনি ভেন্টিলেটর ছাড়াই শ্বাস নিতে শুরু করেন, তখন সারওয়ার সেটিকে বড় বিজয় হিসেবে দেখেছিলেন।

চিকিৎসকের পরামর্শে সন্তানদের ছবি দেখালে ইশরাতের চোখের মণি নড়াচড়া করতে দেখা যায়। এছাড়া এ বছরের মার্চে তিনি নড়বড়ে হাতে ‘ঈদ মোবারক’ লিখতে পেরেছেন, যা দেখে পরিবারের সবাই আনন্দিত। কেয়ার হোমে কেমন আছেন—এমন প্রশ্নেও টিক চিহ্নের মাধ্যমে সাড়া দিতে শিখছেন তিনি।

সারওয়ার 'অপেক্ষা' নামে একটি কবিতায় লিখেছেন, তিনি এমন এক দিনের আশায় আছেন যেদিন সব দুঃখ মুছে যাবে এবং নতুন আলোয় তার পৃথিবী ভরে উঠবে।

স্মৃতি ও লড়াই

ইশরাত এখন ছোট ছোট কাজ করতে শিখছেন। হাতে কলম ধরে এলোমেলো অক্ষরে সন্তানদের নাম লেখা বা ঈদের শুভেচ্ছা জানানো—এসবই সারওয়ারের কাছে অনেক বড় কিছু।

তাকে মাঝেমধ্যে কেয়ার হোমের বাইরে খোলা বাতাসে নিয়ে যাওয়া হয়। ইশরাতের খিঁচুনি এখন আগের চেয়ে কিছুটা নিয়ন্ত্রণে। সারওয়ার বিশ্বাস করেন, যে ইশরাত মৃত্যুকে জয় করে ফিরে এসেছেন, তিনি একদিন নিশ্চয়ই পুরোপুরি সুস্থ হয়ে উঠবেন।


সম্পাদক ও প্রকাশক : প্রিন্স সালেহ। প্রকাশক কর্তৃক ১২ বীর উত্তম সি আর দত্ত রোড, বাংলামোটর, ঢাকা ১২০৫ থেকে মুদ্রিত।

ফোন : +88 01919237299, +8801640754545, ই-মেইল: princesalehbd@gmail.com