বিএনএন ডেস্ক
হজ পালনের জন্য প্রস্তুতি অত্যন্ত জরুরি। যত সুচারুভাবে প্রস্তুতি নেওয়া হবে, হজ সম্পাদন করা তত নির্বিঘ্ন ও সুন্দর হবে। প্রস্তুতির দুটি প্রধান দিক আছে—একটি বাইরের, অন্যটি ভেতরের (আত্মিক)। হজ এজেন্সি নির্বাচন, টিকিট, ভিসা, ভ্রমণ ও বাসস্থানের ব্যবস্থা করা বাহ্যিক প্রস্তুতির অংশ। এই ধরনের ব্যবস্থাপনায় কোনো ত্রুটি থাকলে হয়তো সাময়িকভাবে শারীরিক অসুবিধা হতে পারে, কিন্তু এতে হজের মূল ইবাদতের ওপর তেমন কোনো বিরূপ প্রভাব পড়ে না। যেমন, একটি ঘরে চারজনের বদলে পাঁচজন থাকলে কিছুটা অসুবিধা হতে পারে, তবে এতে হজের মূল বিধান বা স্তম্ভগুলো ক্ষতিগ্রস্ত হয় না।
পবিত্র কোরআনে আল্লাহ ঘোষণা করেছেন, 'হজে যাওয়ার পূর্বে তোমরা পাথেয় সংগ্রহ করো। আর জেনে রাখো, উত্তম পাথেয় হলো তাকওয়া বা আল্লাহভীতি।'<সুরা বাকারা, আয়াত: ১৯৭
মূল সমস্যা দেখা দেয় অন্য ক্ষেত্রে। ওমরাহর চারটি কাজ এবং হজের নয়টি কাজ—এই মোট তেরোটি আমলের মধ্যে কোনো একটিতে ভুল হলে আপনার হজ বা ওমরাহ অসম্পূর্ণ থেকে যেতে পারে।
দীর্ঘ পনেরো বছরের হজ প্রশিক্ষকের অভিজ্ঞতা থেকে আমি হাজিদের উপদেশ দিই—শারীরিক বা বাহ্যিক প্রস্তুতির চেয়ে আধ্যাত্মিক ও ইবাদতের প্রস্তুতিতে অধিক মনযোগী হোন। বাহ্যিক কোনো ঘাটতি পূরণ করা সম্ভব হলেও ইবাদতের ভুলত্রুটি সংশোধন করা প্রায়শই কঠিন হয়ে দাঁড়ায়।
আল্লাহ তাআলা ইরশাদ করেছেন, 'হজের সফরে যাওয়ার পূর্বে তোমরা পাথেয় সংগ্রহ করো; আর জেনে রেখো, সর্বশ্রেষ্ঠ পাথেয় বা প্রস্তুতি হলো আল্লাহভীতি বা তাকওয়া।' (সুরা বাকারা, আয়াত: ১৯৭)
তাকওয়া বলতে আল্লাহকে ভয় করা বোঝায়। মহানবী (সা.) নিজের বুকের বাম দিকে ইঙ্গিত করে তিনবার বলেছেন, 'তাকওয়া এখানে।' (সহিহ মুসলিম, হাদিস: ২৫৬৪) এর অর্থ হলো, হৃদয়ের পবিত্রতাই প্রকৃত তাকওয়া।
হজ ও ওমরাহর জন্য আমরা ইহরামের পোশাক পরিধান করে থাকি। অনেকে ভুল করে মনে করেন যে শুধু সাদা রঙের দুটি পোশাক পরাই বুঝি ইহরাম। কিন্তু প্রকৃতপক্ষে ইহরাম হলো নিয়ত করা এবং তালবিয়া পাঠ করা। কেবল পোশাক পরলে ইহরাম কার্যকরী হয় না।
ইহরামের শুভ্র বস্ত্র পরিধান করলে মানুষকে যেন ফেরেশতার মতো পবিত্র দেখায়। তবে যদি অন্তর আল্লাহর স্মরণে পরিশুদ্ধ না হয়, তবে কেবল পোশাকের মাধ্যমে প্রকৃত বিশুদ্ধ মানুষ হওয়া যায় না। একারণে ইহরাম বাঁধার পূর্বে আলেম সমাজ তওবার আমল করার প্রতি গুরুত্ব আরোপ করেন।
যদি লক্ষ্য সুনির্দিষ্ট থাকে, তাহলে মিনার তাঁবুতে তীব্র উষ্ণতা, আরাফাতের প্রখর সূর্যালোক অথবা মুজদালিফায় উন্মুক্ত আকাশের নিচে রাত কাটানোও আপনার কাছে এক অসাধারণ শান্তির অভিজ্ঞতা মনে হবে।
হজ একটি জীবন পরিবর্তনকারী ইবাদত। মহানবী (সা.) উল্লেখ করেছেন যে, তিনটি কাজের মাধ্যমে মানুষের জীবনের পাপ মোচন হয়ে এক উজ্জ্বল জীবনের যাত্রা শুরু হয়; এর মধ্যে অন্যতম হলো হজ। (সহিহ মুসলিম, হাদিস: ১২১)
যে ব্যক্তি 'হজে মাবরুর' (আল্লাহ কর্তৃক গৃহীত হজ) পালন করবে, তার জন্য পুরস্কার হিসেবে রয়েছে জান্নাত। (সহিহ বুখারি, হাদিস: ১৭৭৩)
অন্য একটি হাদিসে বর্ণিত আছে যে, যে ব্যক্তি হজ পালনের সময় অশালীন ও ভুল কাজ থেকে নিজেকে বিরত রাখবে, সে তার সফর শেষে এমন নিষ্পাপ অবস্থায় বাড়িতে ফিরবে যেন সে সদ্য ভূমিষ্ঠ হয়েছে। (সহিহ বুখারি, হাদিস: ১৫২১)
হজযাত্রীদের প্রধান উদ্দেশ্য হওয়া উচিত একটি মাবরুর হজ অর্জন করা। যদি এই লক্ষ্য স্থির থাকে, তবে মিনার তাঁবুতে অত্যধিক গরম, আরাফাতের তীব্র সূর্যতাপ অথবা মুজদালিফায় খোলা আকাশের নিচে রাত্রিযাপনও আপনার কাছে অনাবিল শান্তির অনুভূতি দেবে।
পবিত্র কোরআনে হজ পালনের সময় তিনটি কাজ থেকে বিরত থাকার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে: কলহ-বিবাদ করা, অপ্রয়োজনীয় আলোচনা করা এবং অশ্লীল কার্যকলাপে লিপ্ত হওয়া। (সুরা বাকারা, আয়াত: ১৯৭)
এই তিনটি কারণে একজন হাজীর হজ ত্রুটিপূর্ণ হয়ে যেতে পারে। হজের এই পবিত্র যাত্রা একমাত্র আল্লাহর সন্তুষ্টি লাভের উদ্দেশ্যে। এখানে পার্থিব সুনাম বা মোহের কোনো স্থান নেই।
দেখা যায় যে, এটিই অন্যতম অবহেলিত ইবাদত। আমরা প্রায়শই গল্পগুজবে মশগুল হয়ে তালবিয়া পাঠের কথা ভুলে যাই। ইহরাম পরিহিত অবস্থায় নিরন্তর তালবিয়া উচ্চারণ করে নিজেকে সর্বদা আল্লাহর স্মরণে সজাগ রাখা উচিত।
হজযাত্রার প্রতিটি পর্যায়ে শয়তান হাজিদের বিপথে চালিত করার চেষ্টা করে। খাবারের গুণগত মান অথবা ছোটখাটো কোনো অব্যবস্থাপনা নিয়ে মনে অসন্তোষ সৃষ্টি করে সে ইবাদত থেকে দূরে সরিয়ে রাখতে চায়। এই প্ররোচনাকে অতিক্রম করতে হবে। হজের এই পবিত্র যাত্রার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ইবাদত হলো 'তালবিয়া' (লাব্বাইক আল্লাহুম্মা লাব্বাইক...)।
পর্যবেক্ষণে দেখা গেছে, এটিই সবচেয়ে বেশি অবহেলিত আমল। আমরা প্রায়শই গল্পগুজবে মেতে উঠে তালবিয়া পাঠ ভুলে যাই। ইহরাম বাঁধা অবস্থায় সব সময় তালবিয়া পাঠের মাধ্যমে নিজেকে আল্লাহর স্মরণে সজাগ রাখা অত্যাবশ্যক।
গাজী সানাউল্লাহ রাহমানী: হজ প্রশিক্ষক ও টেলিভিশন আলোচক।
সম্পাদক ও প্রকাশক : প্রিন্স সালেহ। প্রকাশক কর্তৃক ১২ বীর উত্তম সি আর দত্ত রোড, বাংলামোটর, ঢাকা ১২০৫ থেকে মুদ্রিত।
ফোন : +88 01919237299, +8801640754545, ই-মেইল: princesalehbd@gmail.com