বিএনএন ডেস্ক
প্ল্যান ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ, বাংলাদেশ আবহাওয়া অধিদপ্তর এবং BNN Breaking Newsর আয়োজনে ‘বজ্রপাতের ঝুঁকি হ্রাস: কমিউনিটিভিত্তিক আগাম সতর্কবার্তা’ বিষয়ক একটি গোলটেবিল বৈঠক ২০২৬ সালের ৩০শে এপ্রিল তারিখে সিলেটের একটি হোটেলে অনুষ্ঠিত হয়।
মো. সারওয়ার আলম

জেলা প্রশাসক, সিলেট
সিলেট অঞ্চলে প্রতি বছর, বিশেষ করে এপ্রিল-মে মাসে বজ্রপাতে অনেক প্রাণহানি ঘটে। যদিও এটি পুরোপুরি বন্ধ করা সম্ভব নয়, তবে অনেকাংশে কমানো যেতে পারে। সম্প্রতি একদিনেই বেশ কয়েকজনের মৃত্যু এই জরুরি বিষয়টি আমাদের সামনে তুলে ধরেছে। আমাদের দেশে দুই থেকে চার ঘণ্টা আগে আগাম সতর্কবার্তা দেওয়ার ব্যবস্থা থাকলেও তা মানুষের কাছে কার্যকরভাবে পৌঁছায় না। অনেক সময় আমিও সেই বার্তা পাই না। অথচ সময়মতো তথ্য পেলে ঝুঁকিপূর্ণ এলাকা থেকে মানুষকে সরিয়ে নেওয়া সম্ভব হতো। এখানে মূল ঘাটতি হলো বার্তা পৌঁছানো এবং মানুষকে সচেতন করে তোলা। গ্রাম পর্যায়ে, কৃষক ও শ্রমজীবী মানুষদের সহজ ভাষায় বোঝাতে হবে যে কোন পরিস্থিতিতে কোথায় থাকা নিরাপদ।
কমিউনিটিভিত্তিক বিভিন্ন মাধ্যমে এই সতর্কবার্তা পৌঁছে দেওয়া জরুরি—স্থানীয় নেতৃত্ব, সামাজিক ও রাজনৈতিক নেটওয়ার্ক সহ সকল মাধ্যম ব্যবহার করতে হবে। একই সঙ্গে মানুষকে উদ্বুদ্ধ করতে হবে, কারণ কেউ ইচ্ছাকৃতভাবে ঝুঁকিতে থাকে না; তারা বাস্তবতার তাগিদে মাঠে বা হাওরে কাজ করে।
পাশাপাশি ঝুঁকি কমাতে আশ্রয়কেন্দ্র নির্মাণ এবং বজ্রনিরোধক স্থাপনে কাজ করা প্রয়োজন। এটি একদিনে সম্ভব না হলেও, পরিকল্পিতভাবে শুরু করলে কয়েক বছরের মধ্যে দৃশ্যমান পরিবর্তন আসবে। আগাম সতর্কবার্তা কার্যকরভাবে পৌঁছানো, আশ্রয়ব্যবস্থা গড়ে তোলা এবং ব্যাপক জনসচেতনতা তৈরি—এই তিনটি বিষয় একসাথে বাস্তবায়ন করতে পারলে বজ্রপাতজনিত ক্ষয়ক্ষতি উল্লেখযোগ্যভাবে কমানো সম্ভব।

কান্ট্রি ডিরেক্টর, প্ল্যান ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ
প্ল্যান ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ বজ্রপাতকে সামগ্রিক দুর্যোগ ব্যবস্থাপনার একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ হিসেবে অগ্রাধিকার দিয়ে কাজ করছে। যেহেতু সিলেট ও সুনামগঞ্জ অঞ্চলে বজ্রপাতের ঝুঁকি বেশি, তাই আমরা এই দুটি অঞ্চলে কাজ শুরু করছি। ছোট পরিসরে হলেও কৌশলগতভাবে এগোতে পারলে বড় পরিবর্তন আনা সম্ভব। কমিউনিটি রেডিও, মোবাইল প্ল্যাটফর্ম, স্থানীয় স্বেচ্ছাসেবী এবং দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা কমিটির মাধ্যমে আমরা মে-জুন মাসে হাওর অঞ্চলের মানুষের কাছে আগাম বার্তা পৌঁছে দিতে পারি।
আগামী জুলাই মাস থেকে আমরা সুনামগঞ্জের দোয়ারাবাজারে স্পনসরশিপ কমিউনিটি ফান্ডিংয়ের মাধ্যমে আনুষ্ঠানিকভাবে কাজ শুরু করব। দীর্ঘ মেয়াদে অন্তত ১৮ বছর একটি কমিউনিটির সাথে ধারাবাহিকভাবে কাজ করার পরিকল্পনা আমাদের রয়েছে। যেখানে শিশু, কিশোর ও যুবকদের সম্পৃক্ত করে দুর্যোগ-সচেতনতা বাড়ানো হবে। এই সময়ে আমরা শিক্ষা, স্বাস্থ্য, দুর্যোগ ও জলবায়ু—এই সকল বিষয় সমন্বিত করে কাজ করতে চাই। আকস্মিক বন্যা, খরা, বজ্রপাত সহ চলমান বহুবিধ দুর্যোগকে একসাথে বিবেচনায় নিয়ে আমরা কাজ করতে ইচ্ছুক।
বাংলাদেশ আবহাওয়া অধিদপ্তরের পরামর্শে আমরা ইতিমধ্যেই স্কুলগুলোতে মেট ক্লাব (Meteorology Club) গঠনে কাজ করছি। জাতীয় যুবনীতিমালার আওতায় উপজেলা পর্যায়ের যুব সংগঠনগুলোকেও আমরা যুক্ত করছি। অর্থাৎ, এই উদ্যোগটি বিচ্ছিন্ন কোনো বিচ্ছিন্ন কার্যক্রম নয়, বরং এটি একটি সমন্বিত, দায়বদ্ধ ও দীর্ঘমেয়াদি কমিউনিটিভিত্তিক কর্মপরিকল্পনার অংশ।

পরিচালক, বাংলাদেশ আবহাওয়া অধিদপ্তর
বাংলাদেশ আবহাওয়া অধিদপ্তর নিয়মিতভাবে বজ্রপাত সহ বিভিন্ন দুর্যোগের আগাম সতর্কবার্তা প্রদান করে থাকে। আমরা নিয়মিত পাঁচ দিনের পূর্বাভাস দিই, যা প্রায় ৯০ শতাংশ নির্ভুল। এর মাধ্যমে আমরা সম্ভাব্য বজ্রপাত ও কালবৈশাখী ঝড়ের বিষয়ে বেশ আগেই ইঙ্গিত দিতে পারি। কিন্তু দুর্ভাগ্যজনকভাবে, প্রতি বছর বজ্রপাতে প্রায় ৩০০ থেকে ৩৫০ জন মানুষ মারা যান। এতে প্রশ্ন ওঠে—তথ্য থাকা সত্ত্বেও তা মানুষের কাছে কতটা কার্যকরভাবে পৌঁছাচ্ছে?
আমাদের দুটি অত্যাধুনিক ডপলার রাডার রয়েছে, যার মাধ্যমে মেঘের গঠন শুরু হওয়ার মুহূর্ত থেকেই আমরা পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করতে পারি। এর ফলে আমরা দুই থেকে চার ঘণ্টা আগেও সতর্কবার্তা দিতে পারি। এই তথ্যগুলো আমরা আমাদের যাচাইকৃত ফেসবুক পেজেও প্রকাশ করি, যাতে সাধারণ মানুষ দ্রুত জানতে পারে। তবে বাস্তবতা হলো, অনেক মানুষই এই তথ্য সময়মতো পাচ্ছেন না বা এর গুরুত্ব দিচ্ছেন না।
শুধুমাত্র পূর্বাভাস দেওয়া যথেষ্ট নয়; এটিকে কার্যকর আগাম সতর্কবার্তায় রূপ দিতে হবে। অর্থাৎ, এই তথ্য তৃণমূল পর্যায়ে এমনভাবে পৌঁছাতে হবে যাতে একজন কৃষক, শ্রমিক বা সাধারণ মানুষ সময়মতো সিদ্ধান্ত নিতে পারেন—কিভাবে নিরাপদ থাকা যায়। এখানেই গণমাধ্যমের ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। ইলেকট্রনিক ও প্রিন্ট মিডিয়া তথ্য প্রচারের সবচেয়ে শক্তিশালী মাধ্যম। পাশাপাশি সরকারি-বেসরকারি সকল সংস্থা, উন্নয়ন সহযোগী এবং স্থানীয় পর্যায়ের নেটওয়ার্ককে
যুক্ত করতে হবে। আমরা ইতিমধ্যেই বিভিন্ন সংস্থার সাথে সহযোগিতা বৃদ্ধি করেছি, যাতে তথ্য আরও সহজ ও দ্রুত মানুষের কাছে পৌঁছায়।
আমরা যদি এই সতর্কবার্তাগুলোকে সত্যিকারের তৃণমূল পর্যায়ে পৌঁছে দিতে পারি, তাহলে বজ্রপাতজনিত প্রাণহানি ও ক্ষয়ক্ষতি উল্লেখযোগ্যভাবে কমানো সম্ভব হবে।

পরিচালক (এমআইএম), দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা অধিদপ্তর
আমাদের দেশে বজ্রপাতে মৃত্যুর সংখ্যা অত্যন্ত উদ্বেগজনক; ২০২০ সালে ৪২৭ জন, ২০২১ সালে ২৪৩ জন মারা গিয়েছিলেন, সেখানে এ বছর (পূর্বের তথ্য অনুযায়ী) ৩৮ জেলায় ৭১ জন প্রাণ হারিয়েছেন। আমাদের দেশে সচেতনতার অভাব এবং কিছু ভুল ধারণা বা ‘নেতিবাচক সচেতনতা’ মৃত্যুর ঝুঁকি বাড়ায়। অনেকে বজ্রপাত নিরোধক বা লাইটনিং অ্যারেস্টার বসানোর কথা বলেন, কিন্তু এর সীমাবদ্ধতা আমাদের বুঝতে হবে। একটি অ্যারেস্টারের গড় মূল্য প্রায় ৮ লক্ষ টাকা হলেও এটি মাত্র ৬০ মিটার ব্যাসার্ধের এলাকা সুরক্ষা দিতে পারে, যা আমাদের মতো ঘনবসতিপূর্ণ দেশের জন্য অত্যন্ত ব্যয়বহুল ও প্রায় অসম্ভব। অতীতে আমাদের সঠিক কারিগরি জ্ঞান ও দক্ষতার অভাবে কিছু অ্যারেস্টার সঠিক স্থানে বসানো সম্ভব হয়নি। তাই কেবল যন্ত্রপাতির ওপর নির্ভর না করে মানুষের মধ্যে সচেতনতা বৃদ্ধি করা অধিক জরুরি।
বজ্রপাত থেকে বাঁচতে কমিউনিটি-ভিত্তিক আগাম সতর্কবার্তা ব্যবস্থার কোনো বিকল্প নেই। আবহাওয়া অধিদপ্তর কেবল সতর্কবার্তা দেয়, কিন্তু সেই অনুযায়ী কাজ করার দায়িত্ব সরাসরি স্থানীয় জনগণের। প্রচারের ক্ষেত্রে গ্রামীণ জনগোষ্ঠীর জন্য এসএমএস খুব একটা কার্যকর নয়; বরং ভয়েস মেসেজ ও ১০৯০ নম্বরের আইভিআর (Interactive Voice Response) সিস্টেমকে আরও শক্তিশালী করা প্রয়োজন। বর্তমানে আমরা একটি কারিগরি ওয়ার্কিং গ্রুপের মাধ্যমে বজ্রপাতের জন্য স্ট্যান্ডার্ড অপারেটিং প্রসিডিউর (Standard Operating Procedure) এবং একটি নির্ভুল, বিজ্ঞানসম্মত ‘মেসেজ ব্যাংক’ তৈরির কাজ করছি। এছাড়াও, বজ্রপাতে প্রাণিসম্পদও মারা যায়। মানুষ ও প্রাণিসম্পদ সুরক্ষায় হাওর অঞ্চল সহ সারা দেশে বিশেষ ধরনের দুর্যোগ আশ্রয়কেন্দ্র বা ‘কিল্লা’ নির্মাণ করা হচ্ছে। একই সাথে, বজ্রপাতকে বিশেষ বিবেচনায় রেখে অধিক বজ্রপাতপ্রবণ ১৫টি জেলায় বাস্তবায়নের লক্ষ্যে একটি প্রকল্প গ্রহণ করেছি, যেখানে আশ্রয়কেন্দ্রের ওপরেই নিরোধক ব্যবস্থা থাকবে।

আবহাওয়াবিদ, বাংলাদেশ আবহাওয়া অধিদপ্তর
বাংলাদেশ আবহাওয়া অধিদপ্তর ২০০৪ সাল থেকেই বজ্রঝড়, কালবৈশাখী ও বজ্রপাত বিষয়ক আগাম সতর্কবার্তা ব্যবস্থা চালু করেছে। আমাদের সতর্কবার্তা অনেক ক্ষেত্রে পৌঁছালেও, তারপরও মানুষের জীবন রক্ষা পুরোপুরি সম্ভব হয় না। কারণ, শুধু আগাম সতর্কবার্তা যথেষ্ট নয়; এর সাথে প্রয়োজন সামাজিক সচেতনতা ও কমিউনিটিভিত্তিক কার্যকর প্রস্তুতি। বিশেষ করে, যেসব এলাকায় বজ্রপাত বেশি হয়, সেখানে মানুষকে কী করণীয় এবং কীভাবে আচরণ করতে হবে—এই জ্ঞানটি সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ।
বাংলাদেশ ভৌগোলিকভাবে অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ অবস্থানে রয়েছে। একদিকে হিমালয়ের প্রভাব, অন্যদিকে বঙ্গোপসাগরের আর্দ্র বাতাস—এই দুইয়ের সম্মিলনে বজ্রঝড় তৈরি হয়। বিশেষ করে সিলেট-সুনামগঞ্জ অঞ্চলে পাহাড়, হাওর ও জলাভূমির কারণে মেঘ তৈরি এবং বজ্রপাতের অনুকূল পরিবেশ সৃষ্টি হয়। এ জন্যই এই এলাকাগুলো বেশি ঝুঁকিপূর্ণ।
বজ্রঝড় সাধারণত ৩০ মিনিট থেকে ২ ঘণ্টা স্থায়ী হয়। এই সময়ে বাইরে থাকা সবচেয়ে ঝুঁকিপূর্ণ। আমরা আগাম সতর্কবার্তায় বলে থাকি—ঘরের বাইরে থাকা যাবে না, গাছের নিচে দাঁড়ানো যাবে না, জলাশয় থেকে দূরে থাকতে হবে। বজ্রধ্বনি শোনার পর ৩০ সেকেন্ডের মধ্যে গণনা করে যদি শব্দ শোনা যায়, তবে বুঝতে হবে ঝুঁকি আছে এবং নিরাপদ স্থানে যেতে হবে। সর্বশেষ বজ্রধ্বনি শোনার পর অন্তত ৩০ মিনিট ঘরে থাকা উচিত।
আমরা সতর্কবার্তা দিচ্ছি, কিন্তু সেটিকে কার্যকর করতে হলে কমিউনিটির অংশগ্রহণ অপরিহার্য। সচেতনতা, দ্রুত প্রতিক্রিয়া এবং নিরাপদ আচরণ—এই তিনটি বিষয় সম্মিলিতভাবে বজ্রপাতজনিত ক্ষয়ক্ষতি অনেকাংশে কমাতে পারে।

সহযোগী অধ্যাপক, আবহাওয়া বিজ্ঞান বিভাগ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়
বজ্রপাত নিয়ে সুনামগঞ্জে প্ল্যান ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আবহাওয়া বিভাগ এবং বাংলাদেশ আবহাওয়া অধিদপ্তর যৌথভাবে একটি গবেষণা পরিচালনা করেছে। এর মূল উদ্দেশ্য ছিল বিজ্ঞানভিত্তিক ধারণা ও স্থানীয় কমিউনিটির বোঝাপড়ার মধ্যেকার ব্যবধান চিহ্নিত করা।
আমাদের আগাম সতর্কবার্তা ব্যবস্থা এখন অনেক উন্নত। স্যাটেলাইট ইমেজারি এবং জাতীয় পূর্বাভাস ব্যবস্থা বেশ নির্ভুলভাবে বজ্রপাতের আশঙ্কা আগেই জানাতে পারছে। তবে অনেক ক্ষেত্রেই আগাম সতর্কবার্তা পৌঁছালেও মানুষ তা সঠিকভাবে বোঝে না বা গুরুত্ব দেয় না। বিশেষ করে নারী, প্রবীণ এবং কম শিক্ষিত জনগোষ্ঠীর মধ্যে এই সমস্যা বেশি দেখা যায়। অনেক পরিবারের সদস্যদের বজ্রপাতের অভিজ্ঞতা রয়েছে, যার মধ্যে আঘাত ও মৃত্যুও অন্তর্ভুক্ত। কিন্তু তারপরেও আচরণ পরিবর্তনের হার খুব কম। অনেকে আগাম সতর্কবার্তা জানলেও সেটিকে বিশ্বাস করেন না বা গুরুত্ব দেন না। ফলে জানা ও মানার মধ্যে একটি বড় ব্যবধান তৈরি হয়েছে, যা এখন মূল চ্যালেঞ্জ। যোগাযোগের ভাষা ও উপস্থাপনাও গুরুত্বপূর্ণ। টেকনিক্যাল ভাষা সাধারণ মানুষ বুঝতে পারে না, তাই সহজ, স্থানীয় ভাষা এবং ভিজ্যুয়াল মাধ্যম ব্যবহার করা জরুরি। মানুষ সাধারণত মাইকিং, ভয়েস মেসেজ, ইন্টারঅ্যাকটিভ ভয়েস রেসপন্স (IVR) এবং সরাসরি যোগাযোগকে বেশি বিশ্বাস করে।
মানুষকে সচেতন করতে আমাদের পরিকল্পনায় চারটি ধাপ রয়েছে—প্রথমত সচেতনতা ও শিক্ষা, যেখানে স্কুল, পোস্টার, থিয়েটার ও তরুণদের সম্পৃক্ত করা হবে। দ্বিতীয়ত, প্রযুক্তি-নির্ভর কার্যকর সতর্কবার্তা ব্যবস্থা। তৃতীয়ত, আস্থা তৈরি, যাতে মানুষ বার্তাটিকে বিশ্বাস করে অনুসরণ করে। চতুর্থত, দীর্ঘমেয়াদি জাতীয় পরিকল্পনা, যাতে এই ব্যবস্থা আরও শক্তিশালী হয়।

ডিরেক্টর–আইসিসি, প্ল্যান ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ
বাংলাদেশে বজ্রপাত দীর্ঘদিন ধরে একটি ‘অপ্রতিরোধযোগ্য প্রাকৃতিক দুর্যোগ’ হিসেবে বিবেচিত হলেও, কার্যকর জনসচেতনতা এবং সমন্বিত উদ্যোগের মাধ্যমে এটিকে ‘ব্যবস্থাপনাযোগ্য জননিরাপত্তা ইস্যু’ হিসেবে প্রতিষ্ঠা করা সম্ভব। এই দৃষ্টিভঙ্গির পরিবর্তন একটি শক্তিশালী ও টেকসই প্রচারণার ভিত্তি হতে পারে।
বজ্রপাত-সংক্রান্ত সচেতনতা কার্যক্রমকে বিচ্ছিন্ন, এলাকাভিত্তিক বা ঋতুভিত্তিক সীমাবদ্ধতা থেকে বের করে এনে একটি সমন্বিত, সর্বজনীন, অন্তর্ভুক্তিমূলক এবং ধারাবাহিক প্রচারণায় রূপ দেওয়া জরুরি। এই প্রচারণা কেবল তথ্যভিত্তিক না হয়ে ব্যবহারভিত্তিক হওয়া উচিত। মানুষ যেন দৈনন্দিন জীবনে বজ্রপাত থেকে নিরাপদ থাকার অভ্যাস গড়ে তুলে জীবনযাপনের অংশ হিসেবে গ্রহণ করতে পারে।
জনসংযোগ ও বার্তা প্রণয়নের ক্ষেত্রে স্থানীয় সংস্কৃতি, ভাষা, বিশ্বাস ও সামাজিক রীতিনীতির সাথে সামঞ্জস্য রাখা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এতে বার্তাগুলো মানুষের কাছে সহজবোধ্য, প্রাসঙ্গিক ও গ্রহণযোগ্য হবে। একই সাথে, জাতীয় পর্যায়ের নির্দেশনা এবং স্থানীয় বাস্তবতার মধ্যে একটি কার্যকর সমন্বয় নিশ্চিত করতে হবে; যেন বার্তা প্রণয়ন ও প্রচার উভয়ই বাস্তবসম্মত ও প্রভাবশালী হয়।
স্থানীয় পর্যায়ে সচেতনতা ছড়িয়ে দিতে হলে, কোন ব্যক্তি বা মাধ্যমগুলো জনগণের কাছে সবচেয়ে বিশ্বাসযোগ্য; যেমন—স্থানীয় শিক্ষক, ধর্মীয় নেতা, জনপ্রতিনিধি বা কমিউনিটি সংগঠক—তাদের সম্পৃক্ত করা প্রয়োজন। এতে বার্তার গ্রহণযোগ্যতা ও প্রচার উভয়ই দ্রুত ও কার্যকরভাবে বৃদ্ধি পাবে। সর্বোপরি, বজ্রপাত বিষয়ক সচেতনতা জোরদার করতে সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয় এবং সরকারি-বেসরকারি প্রতিষ্ঠানগুলোর মধ্যে সমন্বয়ের ভিত্তিতে ‘জাতীয় কমিউনিকেশন স্ট্র্যাটেজি’ প্রণয়ন অপরিহার্য।

আবহাওয়াবিদ, বাংলাদেশ আবহাওয়া অধিদপ্তর
বাংলাদেশে আগামী ২৪ ঘণ্টার মধ্যে কোথাও বজ্রপাত হওয়ার সম্ভাবনা আছে কিনা তা আগাম জানানো সম্ভব। এরপর শূন্য থেকে চার ঘণ্টা বা ছয় ঘণ্টার মধ্যে আরও নির্দিষ্ট পূর্বাভাস দেওয়াও আমাদের পক্ষে সম্ভব।
কিন্তু আসল চ্যালেঞ্জ হলো—এই আগাম সতর্কবার্তাটি যাদের জন্য তৈরি করা হচ্ছে, তাদের কাছে তা পৌঁছানো। এ জন্য আমরা সকল ধরনের যোগাযোগমাধ্যম ব্যবহার করার কথা ভাবছি। বিশেষ করে কমিউনিটিভিত্তিক আগাম সতর্কবার্তা ব্যবস্থা খুব গুরুত্বপূর্ণ। এখানে কমিউনিটি নিজেরাই সিদ্ধান্ত নেবে যে বার্তা পাওয়ার পর তাদের কী করণীয়।
তার আগে সবচেয়ে জরুরি হলো কমিউনিটিকে বজ্রপাত সম্পর্কে শিক্ষা দেওয়া। আমরা স্কুলভিত্তিক কার্যক্রম এবং মেট ক্লাব (আবহাওয়াবিজ্ঞান ক্লাব) গঠনের মাধ্যমে শিশুদের মধ্যে সচেতনতা তৈরি করছি, যাতে তারা নিজেরা, পরিবারে এবং প্রতিবেশীদের মধ্যে এই সচেতনতা ছড়িয়ে দিতে পারে।
বজ্রনিরোধক বসানোর চেয়ে সেই অর্থ যদি সচেতনতা বৃদ্ধিতে ব্যয় করা হয়, তাহলে তা বেশি কার্যকর হবে।
আমরা প্রতিবন্ধীদের জন্য সহজবোধ্য সংকেত ব্যবহারের কথাও ভাবছি, যাতে তারা দেখে বুঝতে পারে কী ঝুঁকি রয়েছে ও কী করণীয়।

জেলা ত্রাণ ও পুনর্বাসন কর্মকর্তা, সিলেট
বজ্রপাতের দুই ঘণ্টা আগে যদি আমরা সতর্কবার্তা পাই, তাহলে উপজেলা পর্যায়ে দ্রুত সিদ্ধান্ত নিয়ে তা ছড়িয়ে দেওয়া সম্ভব। জেলা দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা কমিটির সদস্যসচিব হিসেবে তথ্য পেলে খুব অল্প সময়ে তা ইউনিয়ন পর্যায়ে পৌঁছে দেওয়া যায়।
ইউনিয়নে মসজিদের মাইকিং সবচেয়ে কার্যকর হতে পারে, কারণ ২০-৩০টি মসজিদ ও ইমামের মাধ্যমে চেয়ারম্যান ও মেম্বারদের সহযোগিতায় ২০-২৫ মিনিটের মধ্যে সতর্কবার্তা ছড়িয়ে দেওয়া সম্ভব। কমিউনিটি পর্যায়ে সচেতনতা গড়ে তুলতে ওয়ার্ড দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা কমিটি সক্রিয় করা ও কর্মশালা এবং প্রশিক্ষণ প্রদান অত্যন্ত জরুরি। বজ্রনিরোধকের চেয়ে ছোট ছোট আশ্রয়কেন্দ্র বেশি কার্যকর। এগুলো বন্যার সময়েও ব্যবহারযোগ্য হবে এবং মানুষের আশ্রয়ের জন্য নিরাপদ স্থান হিসেবে কাজ করবে। শিক্ষকদের দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা প্রশিক্ষণ পিটিআইতে (Primary Training Institute) অন্তর্ভুক্ত করা হলে শিক্ষার্থীদের মধ্যে দ্রুত সচেতনতা তৈরি সম্ভব।
এভাবে সরকারি সমন্বয়, স্থানীয় মসজিদভিত্তিক মাইকিং, কমিউনিটি প্রশিক্ষণ এবং সহজ আশ্রয়কেন্দ্র একসাথে কাজ করলে বজ্রপাতের ঝুঁকি অনেকটাই কমানো সম্ভব। এই সমন্বিত ব্যবস্থায় দ্রুত সতর্কতা পৌঁছে দেওয়া এবং মানুষকে নিরাপদ স্থানে নেওয়া সহজ হবে। এই উদ্যোগগুলোকে আরও সক্রিয় করার কথা ভাবা প্রয়োজন।

জেলা প্রাণিসম্পদ কর্মকর্তা, সুনামগঞ্জ
বজ্রপাত ও দুর্যোগের কথা এলে দেখা যায়, সবচেয়ে বড় সংকট হলো গবাদি পশু ও কৃষকের নিরাপদ আশ্রয়ের অভাব। হাওরে কৃষক যখন পশু চরাতে যান, তখন আকস্মিক বজ্রপাতে গবাদি পশু ও মানুষের বড় ধরনের ক্ষতি হয়। এই বাস্তবতা আমাদের জন্য নিয়মিত একটি ঝুঁকি হয়ে দাঁড়িয়েছে।
সবচেয়ে জরুরি কাজ হলো উচ্চ ও নিরাপদ স্থানে আশ্রয়কেন্দ্র তৈরি করা, যেখানে দুর্যোগের সময় মানুষ ও গবাদি পশু একসাথে আশ্রয় নিতে পারে। পাশাপাশি সেখানে খাদ্য ও পানির ব্যবস্থাও থাকতে হবে, কারণ দুর্যোগের সময় শুধু মানুষ নয়, প্রাণিসম্পদও সংকটে পড়ে।
সুনামগঞ্জে প্রাণিসম্পদ মানুষের জীবিকার অন্যতম ভিত্তি। হাঁস, গবাদি পশু, ভেড়া ও মহিষ লালন-পালনের মাধ্যমে এখানকার কৃষকেরা জীবিকার একটি বড় অংশ নির্বাহ করেন। বিশেষ করে হাঁসের ডিম উৎপাদন এখানে একটি বড় অর্থনৈতিক শক্তি, যা বহু পরিবারের আয়ের প্রধান উৎস। এজন্য বজ্রপাতপ্রবণ এ অঞ্চলে প্রাণীবিমা ব্যবস্থা চালু করা প্রয়োজন। যদি বজ্রপাত বা বন্যায় গবাদি পশুর ক্ষতি হয়, তাহলে বিমার মাধ্যমে কৃষককে সুরক্ষা দেওয়া গেলে তাদের বড় আর্থিক ক্ষতি অনেকটাই কমানো সম্ভব হবে।

প্রোগ্রাম ডিরেক্টর, ইরা, সুনামগঞ্জ
প্ল্যান ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশের আর্থিক সহযোগিতায় আমরা এখানে লাইট প্রকল্পটি বাস্তবায়ন করছি। আমাদের মূল লক্ষ্য কমিউনিটি পর্যায়ে আগাম সতর্কবার্তা পৌঁছে দেওয়া এবং মানুষকে বাস্তবভাবে প্রস্তুত করা।
এ কাজের অংশ হিসেবে আমরা একটি সংগঠিত স্বেচ্ছাসেবক দল তৈরি করে তাদের বজ্রপাত বিষয়ে প্রশিক্ষণ দিয়েছি, স্থানীয় ইমাম-মুয়াজ্জিন ও অন্যান্য ধর্মীয় নেতাদের প্রশিক্ষিত করা হয়েছে। ইউনিয়ন ও উপজেলা পর্যায়ের দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা কমিটিকে ওয়ার্ড পর্যায়েও পুনরায় সক্রিয় করার চেষ্টা করছি আমরা। ছোট ছোট গ্রুপভিত্তিক আলোচনা, স্কুলভিত্তিক প্রশিক্ষণ ও শিক্ষার্থীদের মধ্যে সচেতনতা তৈরি করার পাশাপাশি পথনাটক ও গণসচেতনতামূলক কার্যক্রমও পরিচালনা করছি, যাতে মানুষ বাস্তব পরিস্থিতি সহজে বুঝতে পারে।
তথ্য দ্রুত ছড়ানোর জন্য আমি একটি হোয়াটসঅ্যাপ চ্যানেল ব্যবহার করছি, যেখানে আবহাওয়া অধিদপ্তরের তথ্য আমরা সঙ্গে সঙ্গে স্বেচ্ছাসেবকদের কাছে পৌঁছে দিই, আর তারা সেটি কমিউনিটিতে ছড়িয়ে দেয়। এছাড়াও, প্রতিটি পরিবারে সচেতনতামূলক ক্যালেন্ডারও বিতরণ করেছি, যেখানে সহজ ভাষায় বলা আছে—বজ্রধ্বনি শুনলেই ঘরে যেতে হবে।

প্রোগ্রাম ডিরেক্টর, নিরাপদ
বজ্রপাত ঝুঁকি হ্রাসে বেসরকারি সংস্থাগুলোর ভূমিকা আরও গুরুত্বপূর্ণ হতে পারে। ঘূর্ণিঝড় বা বন্যার মতো দুর্যোগে তারা যেভাবে সরকারের সহযোগী হিসেবে কাজ করেছে, বজ্রপাতের ক্ষেত্রেও সেই সুযোগ আরও বেশি। কারণ, এখানে ঘাটতি এখনো অনেক।
আগাম সতর্কবার্তা তৈরি থেকে শুরু করে তা কমিউনিটি পর্যায়ে পৌঁছানো পর্যন্ত তিনটি বড় ধাপ রয়েছে। আবহাওয়ার পূর্বাভাস তৈরি, সেটি মানুষের কাছে পৌঁছানো এবং সেই তথ্য অনুযায়ী মানুষকে অভ্যস্ত করা। সমস্যাটা হচ্ছে, আমরা প্রথম ধাপ ভালোভাবে করতে পারলেও শেষ দুই ধাপে দুর্বল। বড় চ্যালেঞ্জ হলো শেষ মাইল পর্যন্ত সতর্কবার্তা পৌঁছানো। হাওরে মোবাইল বা স্বেচ্ছাসেবক সবসময় কার্যকর নয়। সেখানে সাইরেনভিত্তিক ব্যবস্থা খুব কার্যকর হতে পারে, যা সবাই একসাথে শুনে দ্রুত সতর্ক হতে পারবে।
এই কাজটি করতে হলে জ্ঞান, মনোভাব ও বাস্তব অনুশীলন—তিনটি স্তরে কাজ করতে হবে। কিন্তু কৃষকের জীবিকা ও বাস্তব চাপের কারণে অনেক সময় সতর্কবার্তা উপেক্ষিত হয়। তাই ক্ষতিপূরণ বা প্রণোদনার ব্যবস্থাও ভাবা প্রয়োজন।

প্রকল্প সমন্বয়কারী, লাইট প্রকল্প, ইরা, সুনামগঞ্জ
কমিউনিটির সাথে কাজ করতে গিয়ে দেখেছি, বজ্রপাতের সতর্কবার্তা পাওয়া আর হাওরের প্রান্তিক মানুষের বাস্তব জীবনে তা কাজে লাগানোর মধ্যে একটি বড় ফাঁক থেকে যাচ্ছে। এই ফাঁক পূরণ করতে পারলে দুর্যোগের ক্ষয়ক্ষতি অনেকাংশে কমানো সম্ভব।
আমাদের দুর্যোগ ব্যবস্থাপনার যে দাপ্তরিক নির্দেশনা আছে, সেখানে এখনো বজ্রপাতকে আলাদাভাবে অন্তর্ভুক্ত করা হয়নি। অথচ বজ্রপাত ইতিমধ্যেই দুর্যোগ হিসেবে ঘোষিত। এই নীতিগত নথিতে বজ্রপাতের বিষয়টি আরও স্পষ্টভাবে যুক্ত হওয়া দরকার। হাওরের মানুষ অনেক দূরে থাকে, অনেক সময় স্মার্টফোন ব্যবহার করে না, নেটওয়ার্কও ঠিকমতো থাকে না। ফলে আগাম সতর্কবার্তা তাদের কাছে পৌঁছায় না বা পৌঁছালেও পুরোপুরি বোঝা যায় না। আবার যে বার্তা যায়, সেখানে কী করণীয় তা বলা থাকে, কিন্তু এরপর কী করতে হবে—এই অংশটি অনেক সময় অনুপস্থিত থাকে। এই জায়গাটিকেও আমি গুরুত্বপূর্ণ ঘাটতি হিসেবে দেখি।
আরেকটি বিষয় হলো, শিশু এবং প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের জন্য এসব টেকনিক্যাল বার্তা বোঝা আরও কঠিন। তাদের জন্য সহজ কোনো সংকেত তৈরি করা জরুরি।

চেয়ারম্যান, পাণ্ডারগাঁও ইউনিয়ন পরিষদ, দোয়ারাবাজার
হাওর আমাদের জীবিকার কেন্দ্র; ধান, মাছ—সবই এখান থেকে আসে। কিন্তু আগাম বন্যা, ঝড় বা বজ্রপাত এলে আমরা অসহায় হয়ে পড়ি। লাইট প্রজেক্টের সহযোগিতায় বজ্রপাতের সময় আমরা মাইকিং করি, মসজিদের ইমামদের মাধ্যমে বার্তা দিই, এমনকি তাদের প্রশিক্ষণও দিয়েছি যেন তারা সঠিক সময়ে মানুষকে সতর্ক করতে পারেন। কিন্তু সমস্যা হলো—যখন মানুষ হাওরে ধান কাটতে যায়, তখন সে আর কোনো সতর্কবার্তা মানতে চায় না। কারণ, তার জীবিকা তখন ওই ফসলের ওপর নির্ভরশীল। অনেক সময় নেটওয়ার্ক থাকে না, মাইকিংয়ের শব্দও হাওরের বিস্তীর্ণ এলাকায় ঠিকমতো পৌঁছায় না। মানুষ প্রতিদিন হাওরে যায়, ফিরে আসে, কিন্তু সেই ঝুঁকির মুহূর্তে তাদের কাছে বার্তা পৌঁছানো কঠিন হয়ে যায়।
শুধু বার্তা পাঠানো যথেষ্ট নয়—সবচেয়ে বেশি প্রয়োজন সচেতনতা তৈরি করা। স্কুলের শিশুদের মাধ্যমে, শিক্ষকদের মাধ্যমে এই সচেতনতা ছড়িয়ে দিতে হবে। পাশাপাশি হাওরের ভেতরে আশ্রয়কেন্দ্র তৈরি করা দরকার, যাতে মানুষ কয়েক মিনিটের মধ্যেই নিরাপদ অবস্থানে চলে যেতে পারে।

উপকারভোগী, লাইট প্রকল্প, ইরা, সুনামগঞ্জ
আগাম বজ্রপাতের খবর আমরা কখনো মোবাইলের মাধ্যমে পাই, কখনো মুখে মুখে শুনি। কিন্তু হাওরের ভেতরে অনেক সময় নেটওয়ার্ক থাকে না, আবার মানুষও দূরে থাকে। কেউ কেউ তিন-চার কিলোমিটার দূরে কাজ করে, ফলে দ্রুত নিরাপদ স্থানে আসা সম্ভব হয় না।
তবু আমরা চেষ্টা করি মানুষকে সচেতন করতে। মসজিদের মাইকিং করি, অ্যালার্মের মাধ্যমে জানাই, মোবাইলে বার্তা দিই। মাঝে মাঝে বৈঠকও করি, যাতে মানুষ বুঝতে পারে কী করণীয়। শিক্ষার্থীদের আমরা বলি—বাড়িতে গিয়ে যেন তারা বাবা-মাকে বাইরে যেতে নিষেধ করে। এভাবে যতটুকু সম্ভব আমরা সচেতনতা ছড়ানোর চেষ্টা করি।
কিন্তু বাস্তবতা হলো, আমাদের এখানে এখনো পর্যাপ্ত আশ্রয়কেন্দ্র নেই। যদি উন্নত মানের ছাউনি বা নিরাপদ আশ্রয়কেন্দ্র থাকত, তাহলে মানুষ দ্রুত সেখানে যেতে পারত। মানুষের জীবন রক্ষা অনেক সহজ হয়ে যেত।

যুব নারী স্বেচ্ছাসেবী, পাণ্ডারগাঁও ইউনিয়ন, দোয়ারাবাজার
কমিউনিটিতে বজ্রপাতের আগাম সতর্কবার্তা নিয়ে লাইট প্রজেক্টে কাজ করতে গিয়ে দেখেছি মানুষ সকল বার্তাকে একইভাবে গ্রহণ করে না। স্পষ্ট ভাষায় বলা হয়, যেমন—নিরাপদ আশ্রয়ে যান, খোলা জায়গায় থাকবেন না, পানি বা জলাশয় থেকে উঠে আসুন—এই ধরনের বার্তা মানুষ মনোযোগ দিয়ে শোনে ও অনেক সময় মেনে চলে।
মাইকিং বা মসজিদের মাইকে যখন ঘোষণা দেওয়া হয়, তখন মানুষ বেশি মনোযোগ দেয় ও সহজে মনে রাখে। আবার কোনো পরিচিত ব্যক্তি বা স্থানীয় নেতার মাধ্যমে সতর্কবার্তা এলে সেটাও তারা বিশ্বাস করে। কিন্তু কিছু মানুষ আবার বজ্রপাতকে স্বাভাবিক ঘটনা মনে করে অবহেলা করে, ভাবে কিছু হবে না। আমার ইউনিয়নে মেসেজিং, হ্যান্ডমাইক, ইউনিয়ন পরিষদের সাইরেন—এইসব মাধ্যমে আমি স্বেচ্ছাসেবী হিসেবে বার্তা দিই যে মানুষ যেন নিরাপদ আশ্রয়ে যায়, উঁচু গাছের নিচে না থাকে, ধাতব বস্তু এড়িয়ে চলে ও ঘরের ভেতরেই থাকে।
সকল স্তরে বজ্রপাত বিষয়ক সচেতনতা সমুন্নত রাখতে ‘জাতীয় কমিউনিকেশন স্ট্র্যাটেজি’ প্রণয়ন করা।
মসজিদের মাইক, হ্যান্ডমাইক ও সাইরেন ব্যবস্থা আরও শক্তিশালী করা।
ওয়ার্ড ও ইউনিয়ন দুর্যোগ কমিটিগুলো নিয়মিত সক্রিয় রাখা।
স্কুলে বজ্রপাত সচেতনতা শিক্ষা চালুর উদ্যোগ নেওয়া প্রয়োজন।
প্রতিবন্ধীদের জন্য সহজ সংকেত ও বার্তা তৈরি করা জরুরি।
হাওরে দ্রুত আশ্রয়কেন্দ্র ও ছাউনি নির্মাণের উদ্যোগ নেওয়া উচিত।
মো. সারওয়ার আলম, জেলা প্রশাসক, সিলেট।
কবিতা বোস, কান্ট্রি ডিরেক্টর, প্ল্যান ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ।
মমিনুল ইসলাম, পরিচালক, বাংলাদেশ আবহাওয়া অধিদপ্তর।
নিতাই চন্দ্র দে সরকার, পরিচালক (এমআইএম), দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা অধিদপ্তর।
আবুল কালাম মল্লিক, আবহাওয়াবিদ, বাংলাদেশ আবহাওয়া অধিদপ্তর।
ফাতিমা আক্তার, সহযোগী অধ্যাপক, আবহাওয়া বিজ্ঞান বিভাগ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়। নিশাত সুলতানা, ডিরেক্টর–আইসিসি, প্ল্যান ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ।
এস এম কামরুল হাসান, আবহাওয়াবিদ, বাংলাদেশ আবহাওয়া অধিদপ্তর।
মো. আব্দুল কুদ্দুস বুলবুল, জেলা ত্রাণ ও পুনর্বাসন কর্মকর্তা, সিলেট।
মো. রফিকুল ইসলাম, জেলা প্রাণিসম্পদ কর্মকর্তা, সুনামগঞ্জ।
মো. কামরুজ্জামান, প্রোগ্রাম ডিরেক্টর, ইরা, সুনামগঞ্জ।
রাশেদুল হাসান, প্রোগ্রাম ডিরেক্টর, নিরাপদ।
শেখ কামরুল হোসেন, প্রকল্প সমন্বয়কারী, লাইট প্রকল্প, ইরা, সুনামগঞ্জ।
মো. আব্দুল ওয়াহিদ, চেয়ারম্যান, পাণ্ডারগাঁও ইউনিয়ন পরিষদ, দোয়ারাবাজার।
জহুর উদ্দিন, উপকারভোগী, লাইট প্রকল্প, ইরা, সুনামগঞ্জ।
রেছনা বেগম, যুব নারী স্বেচ্ছাসেবী, পাণ্ডারগাঁও ইউনিয়ন, দোয়ারাবাজার।
সুমনকুমার দাশ, নিজস্ব প্রতিবেদক, সিলেট।
সঞ্চালক: ফিরোজ চৌধুরী, সহকারী সম্পাদক।
সম্পাদক ও প্রকাশক : প্রিন্স সালেহ। প্রকাশক কর্তৃক ১২ বীর উত্তম সি আর দত্ত রোড, বাংলামোটর, ঢাকা ১২০৫ থেকে মুদ্রিত।
ফোন : +88 01919237299, +8801640754545, ই-মেইল: princesalehbd@gmail.com