বিএনএন ডেস্ক
প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের কার্যালয়ে পুলিশের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের নিয়ে আয়োজিত অনুষ্ঠানে প্রধানমন্ত্রীর কাছে বিভিন্ন দাবিদাওয়া তুলে ধরা হয়।
পাচারকৃত অর্থ উদ্ধার এবং প্রবাসী বাংলাদেশিদের সুরক্ষায় বিদেশের কয়েকটি দূতাবাসে পুলিশ নিয়োগের জোরালো দাবি উঠেছে। একই সাথে দেশের তিন শহরে মহানগর পুলিশের কার্যক্রম চালুরও আহ্বান জানানো হয়েছে। এছাড়া, পুড়ে যাওয়া যানবাহন এবং লজিস্টিক সংকটে তদন্ত কার্যক্রম থমকে যাওয়ার আশঙ্কায় পুলিশ বাহিনীর ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা প্রধানমন্ত্রীর হস্তক্ষেপ চেয়েছেন।
পুলিশ সপ্তাহ-২০২৬–এর দ্বিতীয় দিনে, সোমবার রাজধানীতে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের কার্যালয়ে পুলিশের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের নিয়ে আয়োজিত অনুষ্ঠানে প্রধানমন্ত্রীর কাছে এসব দাবি তুলে ধরা হয়। এই সময় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ উপস্থিত ছিলেন।
প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ে উপস্থিত থাকা পুলিশের একাধিক ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা দাবিদাওয়া তুলে ধরার বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন।
যোগাযোগ করা হলে পুলিশ সদর দপ্তরের মুখপাত্র ও সহকারী মহাপরিদর্শক (এআইজি গণমাধ্যম ও জনসংযোগ) এ এইচ এম শাহাদাত হোসাইন জানান, পুলিশের দাবিগুলো প্রধানমন্ত্রী ধৈর্য ধরে শুনেছেন। পরে পুলিশ বাহিনীর কিছু চাহিদা পূরণের আশ্বাস দিয়েছেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী।
পুলিশের সূত্রগুলো থেকে জানা যায়, অনুষ্ঠানে পুলিশ সদর দপ্তরের একজন ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের দৃষ্টি আকর্ষণ করে বলেন যে সৌদি আরব, কাতার, কুয়েত, দুবাই, ইতালি, সিঙ্গাপুর ও মালয়েশিয়ায় বিপুলসংখ্যক বাংলাদেশি কর্মরত আছেন। এসব দেশে বাংলাদেশ দূতাবাসে লিয়াজোঁ কর্মকর্তা ও লিগ্যাল অ্যাটাশে হিসেবে পুলিশ কর্মকর্তাদের নিয়োগ দেওয়া হলে প্রবাসীদের বিভিন্ন সমস্যায় তাৎক্ষণিক সহায়তা দেওয়া সম্ভব হবে। একই সঙ্গে দেশ থেকে পাচার হওয়া অর্থ উদ্ধারে আন্তর্জাতিক পুলিশ সংস্থার (ইন্টারপোল) মাধ্যমে কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া সহজ হবে।
ওই কর্মকর্তা আরও বলেন, মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তর, দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) ও পাসপোর্ট অধিদপ্তরের কার্যক্রমের সঙ্গে পুলিশের কাজের সরাসরি সম্পৃক্ততা রয়েছে। পূর্বে পাসপোর্ট অধিদপ্তরে পুলিশ সদস্য কর্মরত থাকলেও বর্তমানে সেখানে কোনো পুলিশ সদস্য নেই। তাই আবারও পাসপোর্ট অধিদপ্তরে পুলিশ কর্মকর্তা পদায়নের দাবি জানানো হয়। আগে অধিক সংখ্যক পদায়ন করা হলেও বর্তমানে মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরে মাত্র একজন কর্মকর্তা কর্মরত আছেন।
আরেকজন ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা উল্লেখ করেন, কুমিল্লা, নারায়ণগঞ্জ ও ময়মনসিংহে সিটি করপোরেশন চালু থাকলেও সেখানে এখনো মহানগর পুলিশ গঠন করা হয়নি। এতে আইনশৃঙ্খলা ব্যবস্থাপনায় বাড়তি চাপ তৈরি হচ্ছে। তাই তিনি দ্রুত এই তিন শহরে মহানগর পুলিশের কার্যক্রম চালুর দাবি জানান।
পুলিশের অপর একজন ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা বলেন, দেশে পুলিশের সদস্যসংখ্যা বাড়লেও প্রশিক্ষণকেন্দ্রের সংখ্যা বাড়েনি। এই অবস্থায় বরিশাল ও সিলেটে নতুন দুটি পুলিশ প্রশিক্ষণকেন্দ্র চালুর দাবি জানান তিনি।
প্রধানমন্ত্রীর দৃষ্টি আকর্ষণ করে পুলিশের একটি ইউনিটের শীর্ষ কর্মকর্তা বলেন, ২০২৪ সালের গণ–অভ্যুত্থানে পুলিশের অনেকগুলো গাড়ি পুড়িয়ে ফেলা হয়েছে। আবার অনেক দিন ধরে পুলিশের জন্য নতুন গাড়িও কেনা হচ্ছে না। এতে পুলিশের টহল ও তদন্তকাজে ব্যাঘাত ঘটছে। প্রধানমন্ত্রীর কাছে এসব গাড়ি কেনার দাবি তোলা হয়।
সকাল ১০টা থেকে দুপুর সাড়ে ১২টা পর্যন্ত অনুষ্ঠান হয়। অনুষ্ঠানের শুরুতে পুলিশের মহাপরিদর্শক (আইজিপি) মো. আলী হোসেন ফকির স্বাগত বক্তব্য রাখেন। এরপর ঊর্ধ্বতন পুলিশ কর্মকর্তারা তাঁদের দাবিদাওয়া তুলে ধরেন। এরপর পুলিশের অতিরিক্ত মহাপরিদর্শক (প্রশাসন) কে এম আওলাদ হোসেন বক্তব্য দেন। পরে স্বরাষ্ট্রসচিব, স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বক্তব্যের পর প্রধানমন্ত্রী পুলিশ কর্মকর্তাদের দিকনির্দেশনামূলক বক্তব্য দেন।
স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ পুলিশের জন্য নতুন প্রশিক্ষণ একাডেমি প্রতিষ্ঠার কথা জানিয়েছেন। পুলিশের প্রতিটি পর্যায়ে বডি-ওর্ন ক্যামেরা চালুর ওপর জোর দেন তিনি। তিনি বলেছেন, পুলিশের অপারেশনাল কার্যক্রম, ট্রাফিক ব্যবস্থাপনা ও মাঠপর্যায়ের বিভিন্ন দায়িত্বে স্বচ্ছতা বাড়াতে ভবিষ্যতে আরও বেশি বডি–ওর্ন ক্যামেরা ব্যবহার করা হবে। এসব ক্যামেরার মাধ্যমে কার্যক্রম রেকর্ড সংরক্ষণ করে জবাবদিহি নিশ্চিত করার কথাও তুলে ধরেন তিনি। মানবাধিকারের বিষয়টি এখন অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ উল্লেখ করে তিনি বলেন, অপরাধ দমন ও তদন্ত কার্যক্রম পরিচালনার সময় কৌশলী ও পেশাদারি আচরণ নিশ্চিত করতে হবে।
স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আরও বলেন, জাতিসংঘের মানদণ্ড অনুযায়ী ‘ন্যূনতম বলপ্রয়োগ’ নীতিতে পুলিশ সদস্যদের প্রশিক্ষণ দেওয়া হচ্ছে। সীমান্ত ও উপকূলীয় এলাকায় যৌথ অভিযান পরিচালনায় নতুন সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। সীমান্ত এলাকায় বিজিবি, নৌ পুলিশ ও কোস্টগার্ড এবং সমুদ্র এলাকায় নৌবাহিনী দায়িত্ব পালন করবে। পাশাপাশি পর্যটকদের নিরাপত্তা নিশ্চিতে ট্যুরিস্ট পুলিশের সক্ষমতা বাড়ানোর উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। পুলিশ ক্লিয়ারেন্স সার্টিফিকেট, অনলাইন জিডিসহ নাগরিক সেবা দ্রুত দেওয়ার কার্যক্রম চলছে। অতীতে পুলিশ ক্লিয়ারেন্স নিয়ে যে ভোগান্তির অভিযোগ ছিল, সে ধরনের কোনো অভিযোগ যেন আর না আসে, তা নিশ্চিত করার নির্দেশ দেন তিনি।
পুলিশ সদস্যদের উদ্দেশে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, বর্তমান বাস্তবতায় পুলিশিং কেবল অপরাধ দমনে সীমাবদ্ধ নয়; জনগণের সঙ্গে আস্থা ও বিশ্বাসের সম্পর্ক গড়ে তুলতে হবে। ‘পুলিশই জনতা, জনতাই পুলিশ’ স্লোগানকে বাস্তবে রূপ দিতে হবে বলেও মন্তব্য করেন তিনি।
স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, গতানুগতিক প্রতিক্রিয়াশীল পুলিশিংয়ের বাইরে এসে ‘প্রিভেন্টিভ পুলিশিং’ বা প্রতিরোধমূলক পুলিশিং-এ গুরুত্ব দিতে হবে। অপরাধ সংঘটিত হওয়ার পর ব্যবস্থা নেওয়ার পরিবর্তে গোয়েন্দা তথ্য বিশ্লেষণ ও প্রযুক্তিনির্ভর নজরদারির মাধ্যমে আগেই অপরাধ প্রতিরোধের ওপর জোর দেন তিনি।
সাইবার অপরাধ মোকাবিলায় বাংলাদেশ পুলিশে একটি পৃথক সাইবার ক্রাইম ইউনিট প্রতিষ্ঠার প্রস্তাবও দেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী। তিনি জানান, সাইবার অপরাধ, ভুয়া তথ্য ও অপপ্রচার মোকাবিলায় নতুন আইন প্রণয়নের জন্য উচ্চপর্যায়ের কমিটি কাজ করছে। নতুন ইউনিটে প্রয়োজনে অতিরিক্ত আইজিপি পদমর্যাদার কর্মকর্তা নেতৃত্ব দেবেন বলেও জানান তিনি।
স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আরও বলেন, অর্থ পাচার, ডিজিটাল প্রতারণা ও টেলিকমিউনিকেশনভিত্তিক অপরাধ মোকাবিলায় সমন্বিত আইন ও প্রতিষ্ঠান গড়ে তোলা জরুরি। এ লক্ষ্যে আন্তর্জাতিক মানের প্রশিক্ষণ ও প্রযুক্তিগত সক্ষমতা বাড়ানোর উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে।
পুলিশের জন্য নতুন প্রশিক্ষণ একাডেমি প্রতিষ্ঠার বিষয়েও কথা বলেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী। তিনি জানান, জঙ্গল সলিমপুর এলাকায় র্যাবের জন্য আলাদা একাডেমি এবং পুলিশের জন্য স্পোর্টস কমপ্লেক্স নির্মাণের পরিকল্পনা রয়েছে।
র্যাবের ভবিষ্যৎ কাঠামো নিয়েও কথা বলেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী। র্যাবকে পূর্ণাঙ্গ এলিট ফোর্স হিসেবে গড়ে তুলতে আলাদা আইন, জবাবদিহি, স্বচ্ছতা ও দায়বদ্ধতা নিশ্চিত করার ওপর গুরুত্বারোপ করেন তিনি।
পুলিশের চিকিৎসাসেবা উন্নয়নের বিষয়েও আশ্বাস দেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী। তিনি বলেন, বিদ্যমান পুলিশ হাসপাতালগুলো আধুনিকায়ন করা হবে এবং প্রয়োজনে বড় বেসরকারি হাসপাতালের সঙ্গেও চুক্তির মাধ্যমে চিকিৎসাসেবা নিশ্চিত করা হবে।
অ্যাভিয়েশন ইউনিট গঠনের প্রস্তাবের বিষয়ে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, এই মুহূর্তে পুলিশের জন্য আলাদা অ্যাভিয়েশন সার্ভিস প্রতিষ্ঠা বাস্তবসম্মত নয়। তবে বিদ্যমান হেলিকপ্টার ব্যবহারের সক্ষমতা বাড়ানো এবং অন্যান্য বাহিনীর সঙ্গে সমন্বয়ের মাধ্যমে প্রয়োজনীয় সেবা নেওয়ার পরিকল্পনা রয়েছে।
সবশেষে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, আধুনিক, সেবাবান্ধব ও জবাবদিহিমূলক পুলিশ বাহিনী গড়ে তুলতে স্বল্প, মধ্য ও দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা বাস্তবায়নে সরকার ও পুলিশ যৌথভাবে কাজ করবে। দেশের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি সমুন্নত রাখাই হবে পুলিশের প্রধান দায়িত্ব।
সম্পাদক ও প্রকাশক : প্রিন্স সালেহ। প্রকাশক কর্তৃক ১২ বীর উত্তম সি আর দত্ত রোড, বাংলামোটর, ঢাকা ১২০৫ থেকে মুদ্রিত।
ফোন : +88 01919237299, +8801640754545, ই-মেইল: princesalehbd@gmail.com