১১ মে ২০২৬
preview
লেবাননে ইসরায়েলি হত্যাযজ্ঞ বৃদ্ধি: যুদ্ধবিরতির অস্তিত্ব কি কেবলই লোক দেখানো?

বিএনএন ডেস্ক

গত ১৬ এপ্রিল শুরু হওয়া লেবাননের যুদ্ধবিরতি ক্রমাগত ভেঙে পড়ছে, কারণ ইসরায়েল এবং হিজবুল্লাহ উভয় পক্ষই একে অপরের ওপর হামলা জোরদার করেছে।
ছয় সপ্তাহের তীব্র যুদ্ধের পর এই যুদ্ধবিরতি কার্যকর হয়েছিল। কিন্তু এর পরের দিনই লেবাননের সেনাবাহিনী ইসরায়েলি বাহিনীর পক্ষ থেকে বেশ কিছু লঙ্ঘনের অভিযোগ আনে। সেই থেকে দুপক্ষই পালটাপালটি হামলা চালিয়ে যাচ্ছে।
যুদ্ধবিরতি কি কেবলই আনুষ্ঠানিকতা? ভবিষ্যতে কী ঘটতে পারে?
পরিস্থিতি সম্পর্কে যা জানা গেছে:
ইসরায়েলের সাম্প্রতিকতম হামলাগুলো কী?
২ মার্চ লেবাননে ইসরায়েলি সামরিক অভিযান শুরুর পর থেকে এখন পর্যন্ত অন্তত ২,৮৪৬ জন নিহত এবং দশ লাখের বেশি মানুষ ঘরবাড়ি ছেড়ে পালিয়েছে।
ইসরায়েল দক্ষিণ লেবাননে স্থল অভিযান চালাচ্ছে এবং এলাকাটি দখল করে রেখেছে। রবিবার লেবাননের স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, সারা দেশে ইসরায়েলি হামলায় দুই স্বাস্থ্যকর্মীসহ ৫১ জন নিহত হয়েছেন।
স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় এক বিবৃতিতে বলেছে, 'ইসরায়েলি শত্রু আন্তর্জাতিক আইন ও মানবিক নীতিমালা লঙ্ঘন অব্যাহত রেখেছে। তারা কায়লাউইয়া ও তিবনিন এলাকায় সরাসরি স্বাস্থ্যকর্মীদের লক্ষ্যবস্তু করে হামলা চালিয়েছে।'
জাতিসংঘের তথ্যমতে, ২ মার্চ থেকে এখন পর্যন্ত ১৩০টিরও বেশি ইসরায়েলি হামলায় অন্তত ১০৩ জন লেবানিজ স্বাস্থ্যকর্মী নিহত এবং ২৩০ জন আহত হয়েছেন।
দক্ষিণ লেবাননের টায়ারের সিভিল ডিফেন্স প্রধান আলী সাফিউদ্দিন বলেন, 'আমরা প্রতিদিন মৃত্যুর আশঙ্কার মধ্যে বাস করছি। স্বাস্থ্যসেবা দিতে গিয়ে আমরা নিজেরাই এখন ঝুঁকির মুখে।'
টায়ার থেকে প্রাপ্ত তথ্য অনুযায়ী, আন্তর্জাতিক আইন অনুসারে চিকিৎসা কর্মী ও উদ্ধারকারীদের সুরক্ষা নিশ্চিত করা বাধ্যতামূলক হওয়া সত্ত্বেও, বাস্তবে তাদের প্রাণ বাঁচানোই এখন বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
গাজা ও লেবাননে কাজ করা যুদ্ধকালীন শল্যচিকিৎসক ডা. তাহির মোহাম্মদ জানান, তিনি উভয় ক্ষেত্রেই ইসরায়েলি বাহিনীর আচরণের মধ্যে মিল খুঁজে পাচ্ছেন।
তিনি বলেন, 'গাজার মতো লেবাননেও স্বাস্থ্যকর্মীদের পরিকল্পিতভাবে লক্ষ্যবস্তু করা হচ্ছে, যা অত্যন্ত উদ্বেগজনক।'
ডা. মোহাম্মদের ভাষ্যমতে, 'ইসরায়েল সুযোগ পেলে দক্ষিণ লেবানন পুরোপুরি দখল করে নেবে, তাদের মধ্যে মানবিক বোধের অভাব স্পষ্ট।'
সোমবারও ইসরায়েলি হামলা অব্যাহত ছিল।
লেবাননের ন্যাশনাল নিউজ এজেন্সির তথ্যমতে, আব্বা শহরে ইসরায়েলি বিমান হামলায় দুজন নিহত এবং পাঁচজন আহত হয়েছে। কাফার রম্মান শহরেও কয়েক ঘণ্টার ব্যবধানে দ্বিতীয়বার বিমান হামলা চালানো হয়েছে।
ইসরায়েলি সামরিক বাহিনী দক্ষিণ লেবাননের নয়টি এলাকার বাসিন্দাদের এলাকা ছাড়ার নতুন সতর্কতা জারি করেছে। এর মধ্যে রয়েছে আর-রিহান, জারজুয়া, কাফার রম্মান, আল-নুমেইরিয়াহ, আরব সেলিম, আল-জুমাইজিমা, মাশগারা, ক্লিয়া এবং হারুফ।
ইসরায়েল দাবি করে আসছে তারা শুধুমাত্র হিজবুল্লাহর অবকাঠামো লক্ষ্য করে হামলা চালাচ্ছে। তবে যুদ্ধবিরতি শুরুর পর এই প্রথম গত সপ্তাহে বৈরুতের দক্ষিণ উপকণ্ঠেও হামলা চালিয়েছে তারা।
হিজবুল্লাহ কী ধরনের পাল্টা হামলা চালাচ্ছে?
লেবানিজ সশস্ত্র গোষ্ঠীটি ইসরায়েলি বাহিনীর ওপর তাদের হামলা অব্যাহত রেখেছে।
সোমবার সকালের দিকে হিজবুল্লাহ জানায়, গত ২৪ ঘণ্টায় তারা দক্ষিণ লেবাননে ইসরায়েলি সামরিক অবস্থান ও যানবাহনের ওপর ২৪টি সফল হামলা চালিয়েছে।
খিয়াম, দেইর সিরিয়ান, তাইর হারফা, বায়াদ্দা, রাশাফ ও নাকুরা সীমান্তে ইসরায়েলি ট্যাংক, বুলডোজার এবং কমান্ড সেন্টার লক্ষ্য করে এই হামলা চালানো হয়।
এই অভিযানে বিস্ফোরক ড্রোন, রকেট এবং গাইডেড মিসাইল ব্যবহার করা হয়েছে, যেখানে হিজবুল্লাহ লক্ষ্যবস্তুতে সরাসরি আঘাত হানার দাবি করেছে।
ইসরায়েলি সেনাবাহিনী দক্ষিণ লেবানন থেকে ছোড়া একটি সন্দেহভাজন আকাশযান বা ড্রোন ধ্বংস করার কথা জানিয়েছে।
জেরুজালেম পোস্টের প্রতিবেদন অনুযায়ী, হিজবুল্লাহর ব্যবহার করা 'ফার্স্ট পারসন ভিউ' (FPV) ড্রোনের মোকাবিলা করতে হিমশিম খাচ্ছে ইসরায়েলি বাহিনী।
প্রতিবেদনে বলা হয়, হিজবুল্লাহ এখন ফাইবার অপটিক তার ব্যবহার করে ড্রোন নিয়ন্ত্রণ করছে, যার ফলে ইসরায়েলের জ্যামিং প্রযুক্তি কাজ করছে না।
এর আগে হিজবুল্লাহ একটি ভিডিও প্রকাশ করে, যেখানে দেখা যায় তাদের ড্রোন ইসরায়েলের একটি আয়রন ডোম ব্যাটারিতে আঘাত হানছে।
ইসরায়েলি কর্মকর্তারা এই ড্রোনগুলো শনাক্ত ও ভূপাতিত করার জন্য নতুন পাইলট প্রোগ্রাম হাতে নিলেও, প্রযুক্তির দিক থেকে হিজবুল্লাহর অগ্রগতির সাথে কুলিয়ে উঠতে পারছে না।
সোমবার হিজবুল্লাহ দাবি করে যে, তাইবেহ শহরে তারা একটি ইসরায়েলি সামরিক অবস্থানের ওপর তিনবার হামলা চালিয়ে তাদের পিছু হটতে বাধ্য করেছে। পরবর্তীতে ইসরায়েলি হেলিকপ্টার এসে আহতদের সরিয়ে নেয়।
ইসরায়েলি সেনাবাহিনী এখনো হামলার বিষয়ে আনুষ্ঠানিকভাবে কিছু জানায়নি, তবে দক্ষিণ লেবাননে ড্রোন বিস্ফোরণে তাদের তিনজন সৈন্য আহত হওয়ার কথা নিশ্চিত করেছে।
এর আগে সেনাবাহিনী জানায়, হিজবুল্লাহর ড্রোনের আঘাতে তাদের এক সৈন্য নিহত হয়েছে।
তাহলে যুদ্ধবিরতি কি কেবলই লোক দেখানো?
তাত্ত্বিকভাবে যুদ্ধবিরতি বিদ্যমান থাকলেও বাস্তবে দুপক্ষই তাদের সামরিক তৎপরতা বাড়িয়ে দিয়েছে।
গত ২৭ নভেম্বর, ২০২৪ সালের পর থেকে ১০ হাজারের বেশিবার যুদ্ধবিরতি লঙ্ঘনের ঘটনা ঘটেছে, যাতে প্রচুর বেসামরিক লেবানিজ নাগরিক প্রাণ হারিয়েছেন।
বিশ্লেষক ওরি গোল্ডবার্গের মতে, 'শান্তি চুক্তির ভান করলেও ইসরায়েল তার সামরিক আক্রমণ চালিয়ে যেতে দ্বিধা বোধ করছে না।'
গোল্ডবার্গ আরও বলেন, 'ইসরায়েলি বাহিনী এখন শক্তিমত্তা প্রদর্শনের সুযোগ খুঁজছে, কিন্তু পরিস্থিতির যেকোনো মুহূর্তেই পরিবর্তন হতে পারে।'
ইসরায়েল বারবার জোর দিয়ে বলছে যে যুদ্ধবিরতি স্থায়ী করতে হলে হিজবুল্লাহকে নিরস্ত্রীকরণ করতে হবে।
লেবাননের শিয়া সম্প্রদায়ের সমর্থনপুষ্ট হিজবুল্লাহকে দীর্ঘকাল ধরে দেশটির সবচেয়ে শক্তিশালী সামরিক শক্তি হিসেবে বিবেচনা করা হয়, যদিও যুদ্ধের কারণে এবং নেতৃত্বের মৃত্যুতে তারা কিছুটা দুর্বল হয়েছে।
হিজবুল্লাহ দাবি করেছে যে ২০২৪ সালের যুদ্ধবিরতি চুক্তি অনুযায়ী ইসরায়েলকে দক্ষিণ লেবানন থেকে সরে আসতে হবে। ২০২৩ সালের অক্টোবরে গাজার ফিলিস্তিনিদের সমর্থনে হিজবুল্লাহ রকেট হামলা চালালে সংঘাত নতুন করে দানা বাঁধে। সেই থেকে এখন পর্যন্ত ইসরায়েলি হামলায় লেবাননের অন্তত ৩,৭৬৮ জন নিহত এবং ১২ লাখ মানুষ বাস্তুচ্যুত হয়েছে।
বৈরুতের সরকার হিজবুল্লাহর প্রভাব নিয়ে চিন্তিত। গত ডিসেম্বরে সরকার জানিয়েছিল, লিটানি নদীর দক্ষিণে হিজবুল্লাহর নিরস্ত্রীকরণ সম্পন্ন করার প্রক্রিয়ার তারা কাছাকাছি পৌঁছেছে।
সংঘাত শুরুর সময় লেবানিজ সরকার হিজবুল্লাহর সামরিক শাখাটিকে নিষিদ্ধ ঘোষণা করেছিল।
তবে জানুয়ারিতে ইসরায়েল অভিযোগ করে যে, হিজবুল্লাহ সীমান্তে তাদের উপস্থিতি বজায় রেখেছে এবং লেবাননের সেনাবাহিনীর আগেই তাদের সামরিক সক্ষমতা পুনর্গঠন করছে।
গোল্ডবার্গের ভাষ্যমতে, 'ইসরায়েল-লেবানন সংকটের সমাধান এখন যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপীয় ইউনিয়নের ওপর নির্ভর করছে। তারা চাইলে ইসরায়েলের ওপর চাপ প্রয়োগ করে শান্তি ফিরিয়ে আনতে পারে।'
তিনি যোগ করেন, 'সম্ভবত আলোচনার পাশাপাশি ইসরায়েল তাদের বোমাবর্ষণ অব্যাহত রাখবে, তবে আন্তর্জাতিক চাপের মুখে মাঝে মাঝে তা থামাতে বাধ্য হবে।'
এরপর কী হতে পারে?
যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্র দপ্তর আগামী ১৪ ও ১৫ মে ইসরায়েল এবং লেবাননের সরকারের মধ্যে উচ্চপর্যায়ের আলোচনার পরিকল্পনা করছে।
ওয়াশিংটনে অনুষ্ঠিতব্য এই বৈঠকে দুই দেশের মূল উদ্বেগগুলো নিরসনে একটি সমন্বিত শান্তি চুক্তি নিয়ে আলোচনা হবে বলে জানিয়েছে মার্কিন কর্তৃপক্ষ।
গত ৮ মে লেবাননের প্রেসিডেন্ট জোসেফ আউন আলোচনার জন্য প্রতিনিধি দলের প্রধান সাইমন কারামকে প্রয়োজনীয় নির্দেশনা দিয়েছেন।
আলোচনায় হিজবুল্লাহর অংশগ্রহণ থাকছে না এবং তারা এই উদ্যোগের প্রতিবাদ জানিয়েছে।
হিজবুল্লাহ নেতা আলী ফায়াদ জানিয়েছেন, তার গোষ্ঠী এই পরিস্থিতিকে সতর্কতার সাথে পর্যবেক্ষণ করছে এবং ইসরায়েলি বাহিনীর যেকোনো নতুন হামলা যুদ্ধবিরতি লঙ্ঘন হিসেবে গণ্য হবে।
ইন্টারন্যাশনাল ক্রাইসিস গ্রুপের বিশ্লেষক ডেভিড উড জানান, আসন্ন আলোচনায় কী সিদ্ধান্ত আসে তার ওপরই লেবাননের বর্তমান পরিস্থিতি অনেকটা নির্ভর করছে।
তিনি বলেন, 'এই আলোচনা যুদ্ধবিরতির মেয়াদ বাড়াতে এবং সংঘাত কিছুটা কমাতে সহায়ক হতে পারে।'
তবে তিনি আরও সতর্ক করেন যে, আলোচনা ব্যর্থ হলে যুদ্ধবিরতি পুরোপুরি ভেঙে পড়ার ঝুঁকিও প্রবল।
তার মতে, বর্তমান পরিস্থিতিতে ডোনাল্ড ট্রাম্পের মতো প্রভাবশালী নেতাদের হাতেই রয়েছে সংঘাত থামানোর চাবিকাঠি।

তথ্যসূত্র: আল-জাজিরা


সম্পাদক ও প্রকাশক : প্রিন্স সালেহ। প্রকাশক কর্তৃক ১২ বীর উত্তম সি আর দত্ত রোড, বাংলামোটর, ঢাকা ১২০৫ থেকে মুদ্রিত।

ফোন : +88 01919237299, +8801640754545, ই-মেইল: princesalehbd@gmail.com