১১ মে ২০২৬
preview
গর্ভস্থ শিশুর লিঙ্গ নির্ধারণ বৈষম্যকে উস্কে দেয়: হাইকোর্ট

বিএনএন ডেস্ক

গর্ভস্থ শিশুর লিঙ্গপরিচয় নির্ণয়ের প্রক্রিয়া সমাজে প্রাতিষ্ঠানিক বৈষম্যকে উৎসাহিত করে, যা কাঠামোগত অসমতা ও জনসংখ্যাগত ভারসাম্যহীনতা সৃষ্টি করে – এমন মন্তব্য করেছে হাইকোর্ট।

অনাগত শিশুর লিঙ্গপরিচয় শনাক্তকরণ নিষিদ্ধ চেয়ে করা একটি রিট আবেদনের নিষ্পত্তি করতে গিয়ে আদালত এই রায় দিয়েছেন। রায়ে, আগামী ছয় মাসের মধ্যে অনাগত শিশুর ডায়াগনস্টিক রিপোর্ট সংরক্ষণের জন্য একটি ডেটাবেস তৈরি ও নিয়মিত হালনাগাদ করার জন্য স্বাস্থ্য সচিবকে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।

রিট আবেদনকারী আইনজীবী ইশরাত হাসান জানিয়েছেন, এই ডেটাবেসটি অনাগত শিশুর লিঙ্গপরিচয় শনাক্তকরণ রোধে সহায়তা করবে।

সুপ্রিম কোর্টের এই আইনজীবী প্রায় ছয় বছর আগে রিট আবেদনটি দায়ের করেছিলেন। প্রাথমিক শুনানির পর ২০২০ সালের ৩ ফেব্রুয়ারি হাইকোর্ট একটি রুল জারি করেন। চূড়ান্ত শুনানির শেষে, বিচারপতি নাইমা হায়দার এবং বিচারপতি কাজী জিনাত হকের সমন্বয়ে গঠিত হাইকোর্ট বেঞ্চ গত ২৫ ফেব্রুয়ারি পর্যবেক্ষণ ও নির্দেশনাসহ রুল নিষ্পত্তি করে এই রায় প্রদান করেন। প্রায় এক বছরেরও বেশি সময় পর আজ সোমবার ৯ পৃষ্ঠার পূর্ণাঙ্গ রায়টি হাতে পেয়েছেন বলে জানিয়েছেন আইনজীবী ইশরাত হাসান।

রায়ে উল্লেখ করা হয়েছে যে, জন্মের পূর্বে শিশুর লিঙ্গপরিচয় নির্ধারণের চর্চা সামাজিক স্থিতিশীলতাকে ব্যাহত করে, লিঙ্গগত ভারসাম্যহীনতা বাড়ায় এবং নারীর প্রতি সহিংসতা ও বৈষম্যকে উস্কে দেয়। এই ধরণের চর্চা গর্ভবতী নারীর শারীরিক ও মানসিক স্বাস্থ্যের উপরও নেতিবাচক প্রভাব ফেলে। রাষ্ট্র সাংবিধানিকভাবে এই ধরনের সামাজিকভাবে ধ্বংসাত্মক কার্যকলাপ প্রতিরোধ ও নিষিদ্ধ করতে বাধ্য।

সংবিধানের ২৭ ও ২৮ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী আইনের দৃষ্টিতে সকলের সমান অধিকার নিশ্চিত করা এবং লিঙ্গভিত্তিক বৈষম্য নিষিদ্ধ করার কথা বলা হয়েছে। রায়ে বলা হয়েছে, জন্মের পূর্বে লিঙ্গ নির্ধারণের প্রক্রিয়া প্রাতিষ্ঠানিক বৈষম্যকে উৎসাহিত করে, যা কাঠামোগত অসমতা ও জনসংখ্যাগত ভারসাম্যহীনতা সৃষ্টি করে। এই ধরণের চর্চা সংবিধানের মূল নির্দেশনার পরিপন্থী, যেখানে লিঙ্গভিত্তিক বৈষম্য দূরীকরণ এবং দুর্বল ও ঝুঁকিপূর্ণ গোষ্ঠীর সুরক্ষা নিশ্চিত করার উপর জোর দেওয়া হয়েছে।

হাইকোর্ট আরও বলেছেন যে, জন্মের পূর্বে লিঙ্গপরিচয় শনাক্তকরণ সরাসরি লিঙ্গ-নির্বাচনী গর্ভপাত, কন্যাশিশুর প্রতি বৈষম্য, জনসংখ্যাগত ভারসাম্যহীনতা এবং নারীর প্রতি সহিংসতাকে উৎসাহিত করে। এই ধরণের চর্চা সংবিধানের ১৮, ২৭, ২৮, ৩১ ও ৩২ অনুচ্ছেদে বর্ণিত জীবন, সমতা ও বৈষম্যহীনতার মৌলিক অধিকারের পরিপন্থী।

এর আগে, হাইকোর্ট কর্তৃক জারি করা রুলে অনাগত শিশুর লিঙ্গপরিচয় শনাক্তকরণ রোধে নীতিমালা বা নির্দেশনা প্রণয়ন করা এবং নিবন্ধিত হাসপাতাল, ডায়াগনস্টিক সেন্টার ও অন্যান্য সরকারি-বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে পরিচালিত অনাগত শিশুদের প্রতিটি ডায়াগনস্টিক রিপোর্ট একটি ডেটাবেজে সংরক্ষণ ও নিয়মিত হালনাগাদ করার নির্দেশ কেন দেওয়া হবে না, তা জানতে চাওয়া হয়েছিল।

রুল শুনানিকালে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের পক্ষ থেকে হলফনামার মাধ্যমে জানানো হয় যে, ‘ন্যাশনাল গাইডলাইন রিগার্ডিং প্যারেন্টাল জেন্ডার সিলেকশন’ শীর্ষক একটি নীতিমালা তৈরি করা হয়েছে, যা ২০২৩ সালের ২০ ফেব্রুয়ারি সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ কর্তৃক অনুমোদিত হয়েছে।

তখন স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের আইনজীবী জানিয়েছিলেন যে, এই নীতিমালায় বলা হয়েছে যে কোনো ব্যক্তি বা চিকিৎসাসেবা প্রতিষ্ঠান আকার, ইঙ্গিতে, ছবি, চিহ্ন প্রকাশ বা বিজ্ঞাপনের মাধ্যমে গর্ভের শিশুর লিঙ্গ শনাক্তকরণ পরীক্ষা করার সক্ষমতা প্রকাশ করতে পারবে না। যেসব প্রতিষ্ঠান বা ব্যক্তির গর্ভের শিশুর লিঙ্গপরিচয় শনাক্তকরণ পরীক্ষার সক্ষমতা রয়েছে, তাদের এই সংক্রান্ত তথ্য ডেটাবেজে সংরক্ষণ করতে হবে বলেও নীতিমালায় উল্লেখ করা হয়েছে।

পূর্ণাঙ্গ রায়ে উল্লেখ করা হয়েছে যে, একটি কার্যকর ডেটাবেজ ব্যবস্থার অনুপস্থিতি জন্মের পূর্বে লিঙ্গপরিচয় শনাক্তকরণ নিয়ন্ত্রণের উদ্দেশ্যকে অকার্যকর ও বাস্তবায়ন-অযোগ্য করে তোলে। রায়ে বলা হয়েছে যে, শুধুমাত্র নির্দেশিকা বা নীতিমালা অনুমোদন করে ডিজিটাল বাস্তবায়ন ছাড়া মৌলিক অধিকার সুরক্ষিত করা সম্ভব নয়। আবেদনকারীর মূল অভিযোগ এই অবস্থায় অমীমাংসিতই রয়ে গেছে।

হাইকোর্ট নিবন্ধিত হাসপাতাল, ডায়াগনস্টিক সেন্টার এবং সরকারি-বেসরকারি অন্যান্য প্রতিষ্ঠানে পরিচালিত অনাগত শিশুর প্রতিটি ডায়াগনস্টিক রিপোর্ট সংরক্ষণের জন্য একটি ডেটাবেজ তৈরি করে তা নিয়মিত হালনাগাদ করার জন্য স্বাস্থ্য সচিবকে নির্দেশ দিয়েছেন। রায়ের অনুলিপি প্রাপ্তির তারিখ থেকে ছয় মাসের মধ্যে এই নির্দেশ কার্যকর করতে বলা হয়েছে।

আইনজীবী ইশরাত হাসান জানিয়েছেন, এই রায়ের ফলে কোনো হাসপাতাল, ডায়াগনস্টিক সেন্টার বা ল্যাবরেটরি কোনো মৌলিক, রিপোর্ট, চিহ্ন বা অন্য কোনো মাধ্যমে অনাগত শিশুর লিঙ্গপরিচয় প্রকাশ করতে পারবে না। রায়ে বলা হয়েছে যে, শুধু নীতিমালা যথেষ্ট নয়, এ বিষয়ে নজরদারি প্রয়োজন। শিশুর লিঙ্গপরিচয় প্রকাশ রোধে ডেটাবেজ তৈরি করে তা নিয়মিত হালনাগাদ করার জন্য স্বাস্থ্য সচিবকে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। এই বিষয়টি আদালতের চলমান তদারকির অধীনে থাকবে বলেও রায়ে উল্লেখ করা হয়েছে, যাতে ভবিষ্যতে নির্দেশনা বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে আদালতও বিষয়টি পর্যবেক্ষণ করতে পারেন।


সম্পাদক ও প্রকাশক : প্রিন্স সালেহ। প্রকাশক কর্তৃক ১২ বীর উত্তম সি আর দত্ত রোড, বাংলামোটর, ঢাকা ১২০৫ থেকে মুদ্রিত।

ফোন : +88 01919237299, +8801640754545, ই-মেইল: princesalehbd@gmail.com