১১ মে ২০২৬
preview
যুক্তরাজ্যের স্থানীয় নির্বাচনে ফারাজের উত্থান কি রাজনৈতিক বিভেদ সৃষ্টি করবে?

বিএনএন ডেস্ক

যুক্তরাজ্যের সাম্প্রতিক স্থানীয় সরকার নির্বাচনে ক্ষমতাসীন লেবার পার্টির বড় ধরনের ধাক্কা রাজনৈতিক অঙ্গনে নতুন বিতর্কের জন্ম দিয়েছে। মাত্র দুই বছর আগে বিপুল বিজয়ের মাধ্যমে ক্ষমতায় আসা দলটি এখন স্থানীয় পর্যায়ে উল্লেখযোগ্য আসন হারিয়ে চাপের মুখে। একই সঙ্গে ডানপন্থী রাজনীতিবিদ নাইজেল ফারাজের নেতৃত্বাধীন রিফর্ম ইউকের উত্থান এবং গ্রিন পার্টির শক্তিশালী অবস্থান যুক্তরাজ্যের রাজনীতির দীর্ঘদিনের দ্বিদলীয় কাঠামোকে নতুন বাস্তবতার দিকে ঠেলে দিচ্ছে বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা। ইংল্যান্ডজুড়ে ১৩৬টি স্থানীয় কর্তৃপক্ষের নির্বাচনে লেবার পার্টির ব্যাপক পরাজয় হয়েছে। লন্ডনসহ অধিকাংশ কাউন্সিলে তারা আসন হারিয়েছে। বিশেষ করে উত্তর ইংল্যান্ড ও মিডল্যান্ডসের শ্রমিক-অধ্যুষিত এলাকাগুলোতে তাদের ফলাফল আশানুরূপ হয়নি।

অন্যদিকে, রিফর্ম ইউকে কয়েকটি এলাকায় উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি লাভ করেছে। রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, অভিবাসন, জীবনযাত্রার ব্যয় বৃদ্ধি, অর্থনৈতিক স্থবিরতা এবং সাংস্কৃতিক পরিচয়–রাজনীতিকে কেন্দ্র করে ডানপন্থীদের প্রতি সমর্থন ক্রমশ স্পষ্ট হয়ে উঠছে। ২০২২ সালের স্থানীয় নির্বাচনে লেবার পার্টি প্রায় ২ হাজার ২০০টির বেশি কাউন্সিল আসন জিতেছিল। ২০২৪ সালে দলটি আরও শক্তিশালী হয়ে উঠেছিল এবং বহু কাউন্সিলে রক্ষণশীলদের কাছ থেকে নিয়ন্ত্রণ কেড়ে নিয়েছিল। কিন্তু সাম্প্রতিক নির্বাচনে সেই ধারা ব্যাহত হয়েছে। বিভিন্ন কাউন্সিলে লেবার আসন হারিয়েছে, যেখানে রিফর্ম ইউকে এবং গ্রিন পার্টি তাদের ভোটের একটি অংশ কেটে নিয়েছে। একই সঙ্গে কনজারভেটিভ পার্টিও ব্যাপক ক্ষতির সম্মুখীন হয়েছে। দীর্ঘদিন ধরে যুক্তরাজ্যের রাজনীতিতে প্রচলিত ‘লেবার বনাম কনজারভেটিভ’ দ্বিদলীয় প্রতিযোগিতা এখন ভাঙনের মুখে, এমনটাই মনে করছেন পর্যবেক্ষকরা।

রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, বর্তমান ফলাফল প্রধানমন্ত্রী কিয়ার স্টারমারের নেতৃত্বের উপর সরাসরি চাপ সৃষ্টি করেছে। ২০২৪ সালের সাধারণ নির্বাচনে বড় বিজয়ের পর তার নেতৃত্ব স্থিতিশীল মনে হলেও মাত্র দুই বছরের মধ্যে এই ধাক্কা লেবার পার্টির অভ্যন্তরে প্রশ্ন তোলার সূচনা করেছে। দলের ভেতরে অসন্তোষ বাড়ছে বলে যুক্তরাজ্যের গণমাধ্যমে ইঙ্গিত পাওয়া যাচ্ছে, এবং কেউ কেউ প্রকাশ্যেও মুখ খুলেছেন। ইতোমধ্যে দলের একজন এমপি, ওয়েস্ট ক্যাথরিন, প্রধানমন্ত্রী স্টারমারকে নেতৃত্ব থেকে সরিয়ে দিতে মন্ত্রিসভার সদস্যদের প্রতি আহ্বান জানিয়েছেন। কনজারভেটিভ পার্টির ছায়া আবাসন বিষয়ক মন্ত্রী স্যার জেমস ক্লেভারলি বলেছেন, ‘স্থানীয় নির্বাচনে রিফর্ম ইউকের উত্থান হলেও কনজারভেটিভ পার্টিই এখনো যুক্তরাজ্যের রাজনীতির সবচেয়ে বড় ডানপন্থী দল। রিফর্ম কোনো মধ্য-ডানপন্থী দল নয়, এটি মূলত ব্যক্তিকেন্দ্রিক একটি গোষ্ঠী। নাইজেল ফারাজ নিজে কোনো নীতি নন। কেবল বিভিন্ন বিষয়ে বিরক্তি প্রকাশ করাই রাজনৈতিক নীতি হতে পারে না।’

স্টারমারের সমালোচকরা বলছেন, তিনি একদিকে বামপন্থী ঐতিহ্যবাহী লেবার ভোটারদের পুরোপুরি ধরে রাখতে পারেননি। অন্যদিকে মধ্যপন্থী ভোটারদের মধ্যেও প্রত্যাশিত আস্থা তৈরি করতে ব্যর্থ হচ্ছেন। বিশেষ করে গাজা যুদ্ধ, অভিবাসন নীতি, কর নীতি এবং জনসেবা খাতের সংকট নিয়ে তার অবস্থান দলের ভেতরে ও বাইরে সমালোচনার জন্ম দিয়েছে। অন্যদিকে, নাইজেল ফারাজের ডানপন্থার উত্থান যুক্তরাজ্যের রাজনীতিতে নতুন মাত্রা যোগ করেছে। ব্রেক্সিট আন্দোলনের অন্যতম প্রধান মুখ এই রাজনীতিবিদ এখন অভিবাসনবিরোধী, জাতীয়তাবাদী এবং এন্টি-এস্টাবলিশমেন্ট রাজনীতিকে সামনে এনে নতুন ভোটার গোষ্ঠী তৈরি করছেন। বিশ্লেষকদের মতে, কনজারভেটিভ পার্টির ডানপন্থী ভোটের একটি বড় অংশ এখন রিফর্ম ইউকের দিকে সরে যাচ্ছে। একই সঙ্গে গ্রিন পার্টির উত্থানও গুরুত্বপূর্ণ। তরুণ ভোটার, পরিবেশবাদী এবং প্রগতিশীল মধ্যবিত্তদের মধ্যে দলটির জনপ্রিয়তা বাড়ছে। ফলে লেবার পার্টি এখন দুই দিক থেকে চাপের মুখে রয়েছে: ডানদিকে রিফর্ম ইউকে এবং বামদিকে গ্রিন পার্টি।

বিশ্লেষকদের মতে, এই পরিবর্তন যুক্তরাজ্যের বহুজাতিক এবং বহুসাংস্কৃতিক রাজনৈতিক বাস্তবতার উপরও প্রভাব ফেলতে পারে। ডানপন্থী জাতীয়তাবাদী রাজনীতির উত্থান অভিবাসন এবং সংখ্যালঘু ইস্যুকে আরও তীব্রভাবে সামনে নিয়ে আসতে পারে। বিশেষ করে মুসলিম, দক্ষিণ এশীয় এবং অভিবাসী সম্প্রদায়কে কেন্দ্র করে রাজনৈতিক মেরুকরণ বৃদ্ধির আশঙ্কা করছেন অনেকে। তবে অন্য একটি অংশ মনে করে, যুক্তরাজ্যের রাজনৈতিক ব্যবস্থা এখন বহুদলীয় বাস্তবতার দিকে এগোচ্ছে। এখন কেবল লেবার ও কনজারভেটিভ নয়, বরং আঞ্চলিক দল, গ্রিন এবং রিফর্ম ইউকের মতো শক্তিগুলোও ভবিষ্যৎ ক্ষমতার সমীকরণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে। এই নির্বাচন হয়তো সরাসরি সরকার পরিবর্তন করবে না। তবে এটি একটি গুরুত্বপূর্ণ সতর্কবার্তা। কারণ, মাত্র দুই বছরের ব্যবধানে ক্ষমতাসীন দলের প্রতি ভোটারদের হতাশা দৃশ্যমান হওয়া ব্রিটিশ রাজনীতিতে অস্বাভাবিক ঘটনা হিসেবেই দেখা হচ্ছে।


সম্পাদক ও প্রকাশক : প্রিন্স সালেহ। প্রকাশক কর্তৃক ১২ বীর উত্তম সি আর দত্ত রোড, বাংলামোটর, ঢাকা ১২০৫ থেকে মুদ্রিত।

ফোন : +88 01919237299, +8801640754545, ই-মেইল: princesalehbd@gmail.com