বিএনএন ডেস্ক
ডিজিএফআইয়ের জেআইসি সেলে বন্দি থাকাকালীন নাজিম উদ্দিনকে নিজের জীবনবৃত্তান্ত লেখার জন্য কাগজ-কলম দেওয়া হতো এবং নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে তা শেষ করার বাধ্যবাধকতা ছিল। এর ব্যত্যয় ঘটলে তাকে ঘুমাতে দেওয়া হতো না।
আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-১-এ সোমবার নাজিম উদ্দিন নামের এক সাক্ষী এই চাঞ্চল্যকর তথ্য প্রদান করেন। তিনি বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের সময় জেআইসিতে গুম করে রাখার ঘটনায় মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় পঞ্চম সাক্ষী হিসেবে সাক্ষ্য দেন।
যশোরের মনিরামপুর নিবাসী নাজিম উদ্দিন জানান, তিনি পেশায় একজন কম্পিউটার ব্যবসায়ী এবং স্থানীয় বিএনপি রাজনীতির সঙ্গে জড়িত। তিনি যুবদল মনিরামপুর পৌর শাখার দপ্তর সম্পাদক এবং মনিরামপুর উপজেলা স্বেচ্ছাসেবক দলের দপ্তর সম্পাদক হিসেবেও দায়িত্ব পালন করেছেন।
সাক্ষ্যে নাজিম উদ্দিন উল্লেখ করেন, ২০০৯ সাল থেকে তিনি আওয়ামী লীগ ও ভারতের বিরুদ্ধে ফেসবুকে সক্রিয় ছিলেন, যা তাকে অনেকের শত্রুতে পরিণত করে। এই পরিস্থিতি আঁচ করতে পেরে তিনি ব্যবসা সম্প্রসারণের উদ্দেশ্যে ঢাকায় আসেন এবং মিরপুর ডিওএইচএসের অভ্যন্তরে একটি অফিস ভাড়া নেন। ২০১৬ সালের ২৫শে মে সকালে মিরপুর-১২ বিআরটিএ বাসস্ট্যান্ডের বিপরীতে মোল্লা টাওয়ারের সামনে থেকে তাকে একটি কালো রঙের হাইস মাইক্রোবাসে তুলে নেওয়া হয়।
তাকে ৮ ফুট বাই ১১ ফুট একটি কক্ষে আটকে রাখা হয়েছিল। সেখানে একটি কাঠের চৌকি ও একটি প্লাস্টিকের পট ছাড়া অন্য কোনো আসবাব ছিল না। প্রথম দুই-তিন দিন তিনি ঘোরগ্রস্ত থাকায় কিছু বুঝতে পারেননি। যখন তিনি কিছুটা স্বাভাবিক হন, তখন লক্ষ্য করেন ঘরের দেয়ালে নানা লেখা। এর মধ্যে একটি লেখা থেকে তিনি জানতে পারেন, এটি ‘ডিজিএফআইয়ের হেডকোয়ার্টার জেআইসি সেল’। সেখানে তাকে জীবনী লেখার জন্য কাগজ-কলম দেওয়া হতো এবং একটি নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে লেখা শেষ করতে না পারলে তাকে ঘুমাতে দেওয়া হতো না।
নাজিম উদ্দিন আরও জানান, প্রথম দশ দিনে তাকে চারবার একটি কক্ষে নিয়ে জিজ্ঞাসাবাদ করা হয়। এরপর থেকে পনেরো থেকে বিশ দিন পরপর তাকে ডেকে নিয়ে এক দিন জিজ্ঞাসাবাদ করা হতো। কেন তিনি আওয়ামী লীগ ও ভারতের বিরুদ্ধে লিখছেন, এই প্রশ্ন করা হতো। তার সঙ্গে স্থানীয় রাজনীতিতে কারা জড়িত, সেটাও জানতে চাওয়া হতো। তিনি জড়িত থাকার কথা অস্বীকার করলে তার ওপর নির্যাতন চালানো হতো।
এক পর্যায়ে জিজ্ঞাসাবাদের সময় তাকে জানানো হয় যে তার তদন্ত শেষ হয়েছে এবং তাকে ছেড়ে দেওয়ার সিদ্ধান্ত হয়েছে, তবে আরও কিছুদিন সেখানে থাকতে হবে।
২০১৬ সালের ৮ই ডিসেম্বর চট্টগ্রামের আকবর শাহ থানার কর্নেল হাট এলাকায় একটি মাইক্রোবাস থেকে তাকে নামিয়ে একটি স্থানে দাঁড় করানো হয়। সেখানে একটি কাপড় বিছিয়ে দুটি ব্যাগ, দুটি পিস্তল ও কিছু গুলি রাখা হয়। এগুলোর সামনে তার ও আরও দুই ব্যক্তির ছবি তোলা হয়। এরপর তাদের আবার গাড়িতে তুলে মুকিম তালুকদারের বাড়িতে নিয়ে যাওয়া হয়। সেখানে সাংবাদিকদের সামনে তাদের উপস্থাপন করা হয়। ওই দিন গভীর রাতে তাদের আকবর শাহ থানায় হস্তান্তর করা হয় এবং তার বিরুদ্ধে তিনটি মামলা দায়ের করা হয়। তিনি একটি মামলায় খালাস পেলেও বাকি দুটি মামলা এখনো বিচারাধীন। ১৮ মাস কারাভোগের পর ২০১৮ সালে তিনি জামিনে মুক্তি পান।
দেশে ফিরে আসার পর আওয়ামী লীগ নেতাদের হয়রানি ও প্রশাসনিক জটিলতার কারণে তিনি সৌদি আরবে চলে যান। ২০২৪ সালের ৮ই সেপ্টেম্বর তিনি দেশে ফেরেন। তিনি তার আটক, নির্যাতন, হয়রানি এবং মিথ্যা মামলার জন্য দায়ী ব্যক্তিদের বিচার দাবি করেন।
জেআইসি-তে গুমের এই মামলায় ১৩ জন অভিযুক্তের মধ্যে তিনজন বর্তমানে কারাগারে আছেন। তারা হলেন প্রতিরক্ষা গোয়েন্দা মহাপরিদপ্তরের (ডিজিএফআই) সাবেক তিন পরিচালক মেজর জেনারেল শেখ মো. সরওয়ার হোসেন, ব্রিগেডিয়ার জেনারেল মাহবুবুর রহমান সিদ্দিকী ও ব্রিগেডিয়ার জেনারেল আহমেদ তানভির মাজাহার সিদ্দিকী। তাদের আজ ট্রাইব্যুনালে হাজির করা হয়।
মামলার অন্য ১০ জন অভিযুক্ত পলাতক। পলাতকদের মধ্যে রয়েছেন ডিজিএফআইয়ের সাবেক পাঁচ মহাপরিচালক লেফটেন্যান্ট জেনারেল (অব.) আকবর হোসেন, মেজর জেনারেল (অব.) সাইফুল আবেদিন, লেফটেন্যান্ট জেনারেল (অব.) সাইফুল আলম, লেফটেন্যান্ট জেনারেল (অব.) আহমেদ তাবরেজ শামস চৌধুরী এবং মেজর জেনারেল (অব.) হামিদুল হক।
পলাতক অভিযুক্তদের মধ্যে আরও আছেন ডিজিএফআইয়ের সাবেক পরিচালক মেজর জেনারেল (অব.) মোহাম্মদ তৌহিদুল উল ইসলাম, মেজর জেনারেল কবীর আহাম্মদ এবং লেফটেন্যান্ট কর্নেল (অব.) মখছুরুল হক। এছাড়া, অভিযুক্তদের তালিকায় রয়েছেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা এবং তার প্রতিরক্ষাবিষয়ক উপদেষ্টা মেজর জেনারেল (অব.) তারিক আহমেদ সিদ্দিক।
সম্পাদক ও প্রকাশক : প্রিন্স সালেহ। প্রকাশক কর্তৃক ১২ বীর উত্তম সি আর দত্ত রোড, বাংলামোটর, ঢাকা ১২০৫ থেকে মুদ্রিত।
ফোন : +88 01919237299, +8801640754545, ই-মেইল: princesalehbd@gmail.com