১১ মে ২০২৬
preview
গ্রীষ্মকালে পোষা প্রাণীর যত্নে জরুরি কিছু টিপস

বিএনএন ডেস্ক

প্রখর গ্রীষ্মে যখন মানুষের জীবনযাত্রা কঠিন হয়ে পড়ে, তখন আমাদের চারপাশের প্রিয় পোষা প্রাণীরাও একই রকম কষ্ট পায়। কেবল পার্থক্য এই যে, তারা তাদের কষ্ট বা অসুস্থতার কথা ভাষায় প্রকাশ করতে পারে না। ফলে, অনেক সময় সমস্যার গভীরতা বুঝতে দেরি হয়ে যায়, যা বিপদ ডেকে আনতে পারে।

কুকুর, বিড়াল, খরগোশ বা বিভিন্ন ধরণের পাখির মতো পোষা প্রাণীরা অতিরিক্ত গরম সহ্য করতে পারে না। হিটস্ট্রোক, পানিশূন্যতা বা হঠাৎ অসুস্থতাজনিত কারণে এই সময়ে তাদের জন্য ঝুঁকির মাত্রা অনেক বেড়ে যায়। তাই, গ্রীষ্মকালে তাদের যত্ন নেওয়া কেবল একটি দায়িত্বই নয়, বরং এটি একটি প্রয়োজনীয় সতর্কতামূলক ব্যবস্থা।

গ্রীষ্মকালে পোষা প্রাণীদের কেন ঝুঁকি বেশি

পোষা প্রাণীরা মানুষের মতো ঘামের মাধ্যমে শরীরের তাপমাত্রা নিয়ন্ত্রণ করতে পারে না। বিশেষ করে কুকুররা হাঁপানোর মাধ্যমে তাদের শরীরের তাপমাত্রা নিয়ন্ত্রণে রাখে। কিন্তু তীব্র গরমে এই পদ্ধতি যথেষ্ট কার্যকর না হলে তাদের শরীরের তাপমাত্রা দ্রুত বৃদ্ধি পায়। এর ফলে হিটস্ট্রোক হতে পারে, যা প্রায়শই প্রাণঘাতী প্রমাণিত হয়।

পোষা প্রাণীদের হিটস্ট্রোকের লক্ষণ

গ্রীষ্মকালে পোষা প্রাণীর আচরণে কিছু পরিবর্তন লক্ষ্য করলে সেগুলোকে গুরুত্ব সহকারে দেখা উচিত। যেমন, অতিরিক্ত দ্রুত শ্বাস নেওয়া, হাঁপানো, অস্বাভাবিক পরিমাণে লালা ঝরা, অস্থিরতা বা দুর্বলতা অনুভব করা, বমি বা ডায়রিয়া হওয়া, চোখ ও জিহ্বার রং লাল হয়ে যাওয়া ইত্যাদি। গুরুতর অবস্থায় প্রাণীটি জ্ঞান হারাতেও পারে।

এই ধরনের লক্ষণ দেখা দিলে দ্রুত তাকে একটি ঠান্ডা জায়গায় নিয়ে যান এবং দেরি না করে একজন পশুচিকিৎসকের পরামর্শ নিন।

পানির অভাব—একটি বড় সংকট

গ্রীষ্মকালে পোষা প্রাণীর জন্য পর্যাপ্ত পরিমাণে বিশুদ্ধ ও ঠান্ডা পানি সরবরাহ করা অত্যন্ত জরুরি। সব সময় পরিষ্কার ও ঠান্ডা পানি তাদের নাগালের মধ্যে রাখুন এবং নিয়মিত সেটি পরিবর্তন করুন। বাইরে বের হলে অবশ্যই সঙ্গে পানি নিন। পানিশূন্যতা খুব দ্রুতই মারাত্মক স্বাস্থ্যঝুঁকি তৈরি করতে পারে।

স্যালাইন ব্যবহারে ভুলের মারাত্মক পরিণতি

গ্রীষ্মকালে অনেক পোষ্যপ্রেমী তাদের পোষা প্রাণীদের পানিশূন্যতা দূর করার জন্য স্যালাইন (ওআরএস) পান করতে দেন। কিন্তু এক্ষেত্রে একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় প্রায়ই এড়িয়ে যাওয়া হয়—তা হলো স্যালাইন সঠিক অনুপাতে তৈরি না করলে তা উপকারের বদলে ক্ষতির কারণ হতে পারে। যদি কম পানিতে বেশি স্যালাইন মেশানো হয়, তবে শরীরে অতিরিক্ত লবণ প্রবেশ করে যা কিডনির উপর অতিরিক্ত চাপ সৃষ্টি করে। এটি গুরুতর ক্ষেত্রে কিডনি বিকল হওয়ার ঝুঁকি বাড়ায়। অন্যদিকে, বেশি পানিতে কম স্যালাইন মেশালে শরীরের ইলেকট্রোলাইটের ভারসাম্য নষ্ট হয়ে যেতে পারে। এর ফলে কোষের ক্ষতি হতে পারে এবং পানিশূন্যতা কমার বদলে বেড়ে যেতে পারে। তাই, স্যালাইন তৈরির ক্ষেত্রে প্যাকেটের নির্দেশিকা অনুসরণ করা আবশ্যক। আন্দাজে স্যালাইন তৈরি করা থেকে বিরত থাকুন। প্রয়োজনে অবশ্যই একজন পশুচিকিৎসকের পরামর্শ নিন।

পরিবেশে আরামদায়ক উষ্ণতা নিশ্চিত করা প্রয়োজন

পোষা প্রাণীকে সরাসরি প্রখর রোদে রাখা থেকে বিরত থাকুন। তাদের জন্য ছায়াযুক্ত এবং পর্যাপ্ত বাতাস চলাচল করে এমন জায়গা নির্বাচন করুন। ঘরের ভেতরে থাকলে ফ্যান বা এয়ার কন্ডিশনার (এসি) ব্যবহার করা যেতে পারে। মেঝেতে ভেজা কাপড় বা ঠান্ডা ম্যাট ব্যবহার করলে তারা কিছুটা আরাম পেতে পারে।

পোষা প্রাণীকে বাইরে নিয়ে যাওয়ার ক্ষেত্রে সতর্কতা

দুপুরের তীব্র রোদে পোষা প্রাণীকে বাইরে নিয়ে যাওয়া অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ। সকাল বা সন্ধ্যায় তাদের হাঁটানোর জন্য নিরাপদ। গরম রাস্তায় হাঁটালে তাদের পায়ের পাতা পুড়ে যাওয়ার সম্ভাবনা থাকে, যা প্রায়শই অবহেলিত একটি বিষয়।

গ্রীষ্মকালে পোষা প্রাণীর খাদ্যতালিকা কেমন হওয়া উচিত

গ্রীষ্মকালে প্রাণীদের খাবারের প্রতি আগ্রহ কমে যেতে পারে। এই সময়ে তাদের হালকা এবং সহজে হজমযোগ্য খাবার দেওয়া উচিত। খাবারের দ্রুত নষ্ট হয়ে যাওয়ার সম্ভাবনা থাকে, তাই খাবার বারবার পরিবর্তন করা জরুরি। সর্বদা তাজা খাবার নিশ্চিত করুন।

কুকুর ও বিড়ালের জন্য বিশেষ সতর্কতা

কখনো বন্ধ গাড়ির ভেতরে কুকুরকে রেখে যাবেন না—এটি খুব অল্প সময়ের মধ্যেই প্রাণঘাতী পরিস্থিতি তৈরি করতে পারে। বিড়ালের জন্য একটি ঠান্ডা ও নিরিবিলি পরিবেশ নিশ্চিত করুন। নিয়মিত তাদের লোম ব্রাশ করলে তা শরীরের তাপমাত্রা নিয়ন্ত্রণে সাহায্য করে।

পোষা প্রাণীর লোম কাটা নিয়ে প্রচলিত ভুল ধারণা

অনেকেরই ধারণা, গ্রীষ্মকালে লোম ছেঁটে দিলে পোষা প্রাণীরা আরাম পায়। কিন্তু প্রকৃতপক্ষে, লোম একটি প্রাকৃতিক সুরক্ষা স্তর হিসেবে কাজ করে। বিশেষ করে যাদের লোম দ্বিগুণ স্তরের (double coat) কুকুরের ক্ষেত্রে, লোম তাদের শরীরকে তাপ এবং সূর্যের ক্ষতিকর প্রভাব থেকে রক্ষা করে। সম্পূর্ণ লোম ছেঁটে দিলে তাদের ত্বক সরাসরি সূর্যের আলোয় উন্মুক্ত হয়, ফলে সানবার্ন বা ত্বকের অন্যান্য রোগের ঝুঁকি বেড়ে যায়। তাই, পুরো লোম না ছেঁটে হালকা ছাঁটাই করাই উত্তম।

গ্রীষ্মকালে পাখি ও ছোট প্রাণীদের যত্ন

পাখির খাঁচা কখনো সরাসরি রোদে রাখবেন না। তাদের পানি ও খাবার দ্রুত গরম হয়ে যেতে পারে, তাই নিয়মিত পরিবর্তন করা প্রয়োজন। খাঁচার চারপাশে বাতাস চলাচলের সুব্যবস্থা নিশ্চিত করা গুরুত্বপূর্ণ।

কখন পশুচিকিৎসকের শরণাপন্ন হবেন

যদি আপনার পোষা প্রাণী অচেতন হয়ে পড়ে, শ্বাস নিতে কষ্ট হয়, শরীরের তাপমাত্রা অস্বাভাবিকভাবে বেশি মনে হয় অথবা খাবার খাওয়া বন্ধ করে দেয়, তাহলে দেরি না করে তাকে পশুচিকিৎসকের কাছে নিয়ে যান।

গ্রীষ্মকালে পোষা প্রাণীর যত্ন নেওয়া শুধু খাবার ও আশ্রয় দেওয়াই নয়, বরং তাদের শারীরিক অবস্থার নিয়মিত পর্যবেক্ষণ করাও অত্যন্ত জরুরি। সামান্য সতর্কতা—যেমন পর্যাপ্ত পানি, সঠিক পরিবেশ, সুষম খাদ্য এবং সঠিক সময়ে চিকিৎসা—অনেক বড় বিপদ এড়াতে পারে।

• ড. এ কে এম হুমায়ুন কবির শিক্ষক, গবেষক ও লেখক, চট্টগ্রাম ভেটেরিনারি ও অ্যানিমেল সায়েন্সেস বিশ্ববিদ্যালয়, চট্টগ্রাম। akmhumayun@cvasu.ac.bd


সম্পাদক ও প্রকাশক : প্রিন্স সালেহ। প্রকাশক কর্তৃক ১২ বীর উত্তম সি আর দত্ত রোড, বাংলামোটর, ঢাকা ১২০৫ থেকে মুদ্রিত।

ফোন : +88 01919237299, +8801640754545, ই-মেইল: princesalehbd@gmail.com