১১ মে ২০২৬
preview
আধুনিক ম্যানেজমেন্ট বা ব্যবস্থাপনার মূলে ইসলামের ‘অগ্রাধিকারের ফিকহ’

বিএনএন ডেস্ক

বর্তমান সময়ের ব্যবস্থাপনা বিশেষজ্ঞরা সফলতার জন্য কিছু সুনির্দিষ্ট মূলনীতির কথা বলেন। প্রখ্যাত লেখক স্টিফেন কোভে তার বিখ্যাত ‘দ্য সেভেন হ্যাবিটস’ গ্রন্থে একটি বিশেষ নিয়মের কথা উল্লেখ করেছেন, যা হলো—‘সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ কাজগুলো আগে সম্পন্ন করা’। আশ্চর্যের বিষয় হলো, এই প্রশাসনিক ধারণাটি ইসলামি শরিয়তে ‘ফিকহুল আওলাবিয়াত’ বা অগ্রাধিকারের ফিকহ হিসেবে এক হাজার বছরেরও বেশি সময় ধরে বিদ্যমান রয়েছে।

অগ্রাধিকারের ফিকহ বা ফিকহুল আওলাবিয়াত কী?

ইসলামি পরিভাষায় একে ‘ফিকহুত তারতিব’ বা আমলের ক্রমবিন্যাসের জ্ঞানও বলা হয়। এর মূল উদ্দেশ্য হলো, একাধিক কাজের মধ্য থেকে অধিকতর জরুরি ও গুরুত্বপূর্ণ কাজটি বেছে নেওয়া। সহজভাবে বলতে গেলে, কোনো পরিস্থিতিতে কোন কাজটি সবচেয়ে বেশি ফলপ্রসূ হবে তা অনুধাবন করা।

হজরত আবদুল্লাহ ইবনে মাসউদ (রা.) বর্ণিত একটি হাদিসে এর সুন্দর চিত্র ফুটে উঠেছে। তিনি রাসুল (সা.)-কে প্রশ্ন করেছিলেন, ‘সবচেয়ে উত্তম আমল কোনটি?’ আল্লাহর রাসুল (সা.) গুরুত্বের ক্রমানুসারে উত্তর দিলেন: ১. সময়মতো নামাজ আদায় করা, ২. মা-বাবার সেবা করা এবং ৩. আল্লাহর পথে সংগ্রাম করা। (সহিহ বুখারি, হাদিস: ৫২৭)

এই বর্ণনায় আমরা রাসুল (সা.)-এর কাজের অগ্রাধিকার নির্ধারণের চমৎকার কৌশল দেখতে পাই।

ইসলামি দৃষ্টিভঙ্গিতে ইতিবাচকতা

রাসুল (সা.)-এর দাওয়াত ও প্রশাসনিক ক্ষেত্রে অগ্রাধিকারের নীতি

নবীজি (সা.) যখন মুয়াজ ইবনে জাবাল (রা.)-কে প্রশাসনিক দায়িত্ব দিয়ে ইয়েমেনে পাঠান, তখন তিনি তাকে কর্মপদ্ধতির একটি অগ্রাধিকার তালিকা তৈরি করে দিয়েছিলেন।

তিনি নির্দেশ দিয়েছিলেন, “তুমি কিতাবধারীদের নিকট যাচ্ছ। তাই প্রথমেই তাদের একত্ববাদ ও আমার নবুয়তের প্রতি আহ্বান জানাবে। তারা যদি এটি গ্রহণ করে, তবে তাদের জানাবে যে প্রতিদিন পাঁচবার নামাজ পড়া বাধ্যতামূলক। যদি তারা এটিও মেনে নেয়, তবে জানাবে যে তাদের সম্পদের ওপর জাকাত ধার্য করা হয়েছে, যা ধনীদের থেকে নিয়ে দরিদ্রদের মাঝে বিলিয়ে দেওয়া হবে...।” (সহিহ বুখারি, হাদিস: ১৩৯৫)

এই নির্দেশনা প্রমাণ করে যে, নবীজি (সা.) বিশ্বাসের মূলভিত্তি স্থাপনের পর ইবাদত এবং তারপর সামাজিক অর্থনীতির গুরুত্ব নির্ধারণ করেছিলেন। এটিই হচ্ছে আধুনিক ব্যবস্থাপনার মূল চাবিকাঠি।

ফিকহুল আওলাবিয়াতের বিভিন্ন দিক

বিশিষ্ট ইসলামি চিন্তাবিদ ড. ইউসুফ আল কারাজাভি তাঁর রচিত ‘ফিকহুল আওলাবিয়াত’ বইতে এই বিষয়টি কয়েকটি স্তরে বিন্যস্ত করেছেন:

ফিকহ শাস্ত্রের স্বরূপ ও সংজ্ঞা
  • শরয়ি নির্দেশ পালনের ক্ষেত্রে: গৌণ বিষয়ের চেয়ে মূল বিষয়কে গুরুত্ব দেওয়া, নফল ইবাদতের চেয়ে ফরজ বা আবশ্যক কাজকে প্রাধান্য দেওয়া এবং ক্ষুদ্র ব্যক্তিস্বার্থের ঊর্ধ্বে উম্মাহ বা জাতির কল্যাণকে বড় করে দেখা।

  • সমাজ সংস্কারের ক্ষেত্রে: পারিপার্শ্বিক পরিবর্তনের আগে নিজের আত্মশুদ্ধিকে গুরুত্ব দেওয়া এবং সংঘাতের চেয়ে শিক্ষা ও প্রশিক্ষণমূলক কার্যক্রমকে অগ্রাধিকার দেওয়া।

আমাদের বর্তমান দায়িত্ব

স্টিফেন কোভে তাঁর বইতে এই ধারণাগুলোকে অত্যন্ত আধুনিক ও কাঠামোবদ্ধভাবে উপস্থাপন করেছেন, যা নিঃসন্দেহে প্রশংসনীয়। তবে আমাদের ভাবনার বিষয় হলো—ইসলামের এই সমৃদ্ধ জ্ঞানের উত্তরাধিকার থাকা সত্ত্বেও আমরা কেন এগুলোকে সমসাময়িক বিজ্ঞানের আদলে বিশ্বের কাছে তুলে ধরতে পারছি না?

মূল কথা হলো, অগ্রাধিকারের জ্ঞান আমাদের শেখায় কীভাবে বিশৃঙ্খলা এড়িয়ে সুশৃঙ্খলভাবে এগিয়ে যেতে হয়। আমরা যদি আমাদের এই বিশাল জ্ঞানভাণ্ডারকে আধুনিক কাঠামোর মাধ্যমে বিশ্বের দরবারে পৌঁছাতে পারি, তবে তা আন্তর্জাতিক ব্যবস্থাপনায় আমূল পরিবর্তন আনতে সক্ষম হবে।

সাহাবিদের যুগে ইসলামি ফিকহের চর্চা ও বিকাশ


সম্পাদক ও প্রকাশক : প্রিন্স সালেহ। প্রকাশক কর্তৃক ১২ বীর উত্তম সি আর দত্ত রোড, বাংলামোটর, ঢাকা ১২০৫ থেকে মুদ্রিত।

ফোন : +88 01919237299, +8801640754545, ই-মেইল: princesalehbd@gmail.com