১১ মে ২০২৬
preview
মব কি ‘চাপ সৃষ্টিকারী গোষ্ঠী’ নাকি কেবলই ‘জনগণের প্রতিক্রিয়া’?

বিএনএন ডেস্ক

একটি জিনিসের ভিন্ন ভিন্ন নাম থাকা স্বাভাবিক। যেমন জলাশয়কে কেউ পুষ্করিণী, পুকুর বা সরোবর বলে ডাকেন।

অভিধানে এসব শব্দের আনুষ্ঠানিক স্বীকৃতি থাকলেও স্থানীয় ভাষায় অনেকে অনেক শব্দ ব্যবহার করেন যা সচরাচর ডিকশনারিতে পাওয়া যায় না।

একইভাবে ‘মব’ বা উন্মত্ত জনতাকেও এখন নানা বিশেষণে সংজ্ঞায়িত করার চেষ্টা চলছে, যা অনেকটা নতুন নাম দেওয়ার মতো।

গত এক বছরে ‘মব’-এর জন্য অন্তত দুটি নতুন প্রতিশব্দ পাওয়া গেল। অথবা বলা যায়, এই শব্দের ব্যবহারিক পরিধি বাড়ানো হলো।

সাবেক অন্তর্বর্তী সরকারের প্রেস সচিব শফিকুল আলম মবকে ‘প্রেসার গ্রুপ’ বলেছিলেন, আর আইনমন্ত্রী মো. আসাদুজ্জামান একে ‘জনগণের প্রতিক্রিয়া’ হিসেবে অভিহিত করেছেন।

সাধারণ মানুষ হিসেবে প্রশ্ন জাগে, এই ‘চাপ সৃষ্টি’ বা ‘প্রতিক্রিয়া’ নিয়ে আমরা কতটা নিরাপদ? কারণ ইতিমধ্যে আমরা দেখেছি, মব সহিংসতার কারণে বিভিন্ন জাতীয় সংবাদপত্রের কার্যালয় আক্রান্ত হয়েছে। এছাড়া দেশের বিভিন্ন স্থানে সাংস্কৃতিক কেন্দ্র, মাজার এবং বাউলদের ওপর বর্বরোচিত হামলা চালানো হয়েছে। এমনকি ভাস্কর্য ভাঙচুরের মতো ঘটনাও ঘটেছে নিয়মিতভাবে।

এই পরিস্থিতিতে আমরা কি আর প্রতিবাদ জানাব না? অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনাল বা স্থানীয় মানবাধিকার সংস্থাগুলো যখন মব থামানোর দাবি জানাচ্ছে, তখন আমরা কি তাদের চুপ থাকতে বলব?

অপরাধবিজ্ঞানীরা বারবার সতর্ক করছেন যে এখনই মবের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা না নিলে সহিংসতা চরম আকার ধারণ করবে। মবের প্রকৃত অর্থ বুঝতে গিয়ে আমি অক্সফোর্ড ও কেমব্রিজ ডিকশনারির সাহায্য নিয়েছি।

আইনমন্ত্রীর দাবি: মব হলো জনগণের স্বতঃস্ফূর্ত প্রতিক্রিয়া

অক্সফোর্ড ডিকশনারি অনুযায়ী, ‘মব’ হলো বিশৃঙ্খল ও সহিংস জনতার ভিড় যারা প্রায়ই আক্রমণাত্মক আচরণ করে। একে ‘মব ভায়োলেন্স’ বলা হয়।

কেমব্রিজ ডিকশনারি বলছে, ‘মব ভায়োলেন্স’ এমন এক পরিস্থিতি যেখানে ক্রুদ্ধ জনতা শারীরিক আঘাত বা আক্রমণ করার জন্য শক্তি প্রয়োগ করে।

এই সংজ্ঞাগুলো বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, মবকে ‘প্রেসার গ্রুপ’ বা ‘রিঅ্যাকশন’ বলা অনেকটা অপরাধীকে ‘দুষ্টু’ বলার শামিল। এতে অপরাধের গুরুত্ব কমে যায় এবং অপরাধীরা পার পেয়ে যাওয়ার সুযোগ পায়। এর ফলে আইনের যথাযথ প্রয়োগ ব্যাহত হয় এবং সাধারণ মানুষের নিরাপত্তা হুমকির মুখে পড়ে।

‘মব হলো জনগণের স্বতঃস্ফূর্ত প্রতিক্রিয়া’

গত সোমবার আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের সামনে ব্রিফিংকালে একজন সাংবাদিক আইনমন্ত্রী মো. আসাদুজ্জামানকে প্রশ্ন করেন, ‘মাননীয় মন্ত্রী, আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল আইনে বর্ণিত মানবতাবিরোধী অপরাধের সংজ্ঞায় পদ্ধতিগত ও পরিকল্পিত হত্যাকাণ্ডের কথা বলা হয়েছে। ৫ আগস্ট পর্যন্ত আপনারা দায়মুক্তি দিলেও এরপর থেকে ঘটে যাওয়া ব্যাপক মব সহিংসতাগুলোও অনেকটা পদ্ধতিগতভাবে হচ্ছে। এগুলোকে ভবিষ্যতে তদন্ত করে ট্রাইব্যুনালের আওতায় বিচার করা সম্ভব কি না?’

উত্তরে আইনমন্ত্রী জানান, ‘মব কখনও পদ্ধতিগত বা সুপরিকল্পিত হয় না। এটি মূলত সাধারণ মানুষের একটি তাৎক্ষণিক প্রতিক্রিয়া। যদি এটি কোনো সাধারণ অপরাধের পর্যায়ে পড়ে, তবে প্রচলিত আইনেই তার বিচার হবে। একে বড় কোনো সংজ্ঞায় বিচার করতে গেলে নানা প্রশ্ন উঠবে এবং এর ফলে গণ-অভ্যুত্থান বা বিপ্লবের চেতনাকে অবমাননা করা হতে পারে।’

তবে মব বা উচ্ছৃঙ্খল জনতার হামলাকে কেন গণ-অভ্যুত্থান বা স্বাধীনতাসংগ্রামের সঙ্গে তুলনা করা হলো, তা মন্ত্রীর বক্তব্যে স্পষ্ট হয়নি।

কুষ্টিয়ায় আস্তানায় হামলা চালিয়ে পীরকে পিটিয়ে হত্যা ও ভাঙচুর

এর আগে গত বছরের ২৬ জুন সাবেক অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের প্রধান উপদেষ্টার প্রেস সচিব শফিকুল আলম সাংবাদিকদের এক প্রশ্নের জবাবে ‘মব’-কে ‘চাপ সৃষ্টিকারী গোষ্ঠী’ (প্রেসার গ্রুপ) হিসেবে বর্ণনা করেছিলেন। সেন্টার ফর গভর্নেন্স স্টাডিজ (সিজিএস) আয়োজিত সংবাদপত্রের স্বাধীনতা ও সাংবাদিকদের সুরক্ষা সংক্রান্ত এক সেমিনারে তিনি বলেন, ‘আপনারা যাকে মব বলছেন, আমি তাকে বলছি প্রেসার গ্রুপ। মূলত বিগত সময়ের সাংবাদিকতার ব্যর্থতার কারণেই এই গোষ্ঠীর জন্ম হয়েছে। গত ১৫ বছর সাধারণ মানুষের নাগরিক অধিকার ক্ষুণ্ণ হওয়ায় তারা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে এবং সেই ক্ষোভ থেকেই এই পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে।’

শফিকুল আলম আরও বলেন, ‘এই গোষ্ঠীটি ভয় ও উদ্বেগ থেকে তৈরি হয়েছে। অতীতে শীর্ষ সাংবাদিকদের শেখ হাসিনাকে উসকানি দেওয়ার যে ভূমিকা ছিল, তার পুনরাবৃত্তি হতে পারে—এমন শঙ্কা থেকেই তারা সংগঠিত হচ্ছে।’

সিলেটে মাজার ও বাউল আসরে সশস্ত্র হামলা

ক্রমাগত মব সহিংসতার চিত্র

২০২৪ সালের ৫ আগস্ট পরবর্তী সময়ে একের পর এক মব সহিংসতার ঘটনা দেশজুড়ে চাঞ্চল্য সৃষ্টি করেছে। মাজার ভাঙচুর থেকে শুরু করে পিটিয়ে হত্যার মতো ঘটনাগুলো নিয়মিত হয়ে দাঁড়িয়েছে।

গত ১৮ সেপ্টেম্বর ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ফজলুল হক মুসলিম হলে চোর সন্দেহে তোফাজ্জল হোসেন নামক এক ভারসাম্যহীন ব্যক্তিকে অমানবিক নির্যাতনে হত্যা করা হয়। হত্যার আগে তাকে ভাত খাওয়ানোর ভিডিওটি জনমনে ব্যাপক ক্ষোভের সৃষ্টি করেছিল। এর কিছুদিন আগে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়েও ছাত্রলীগের এক সাবেক নেতাকে পিটিয়ে মারা হয়।

এছাড়া রংপুরের তারাগঞ্জে ভ্যানচোর সন্দেহে দুজনকে এবং ময়মনসিংহের ভালুকায় ধর্ম অবমাননার অভিযোগে এক কারখানাকর্মীকে পিটিয়ে হত্যার পর মরদেহ গাছে ঝুলিয়ে দেওয়ার মতো নৃশংস ঘটনাও ঘটেছে।

মব কিলিংয়ের ঘটনায় আসামি গ্রেফতারের হার অত্যন্ত নগণ্য

মানবাধিকার সংস্থা আইন ও সালিশ কেন্দ্রের (আসক) তথ্যমতে, গত এক বছরে মব সন্ত্রাসের শিকার হয়ে প্রায় দুই শতাধিক মানুষ প্রাণ হারিয়েছেন। চলতি বছরের প্রথম তিন মাসেই দেশে ৪৩টি গণপিটুনির ঘটনা ঘটেছে, যার সিংহভাগ ঘটেছে ঢাকা ও চট্টগ্রামে।

বিভিন্ন অনুসন্ধানে দেখা গেছে, ৫ আগস্টের পর সারা দেশে প্রায় দেড় হাজার ভাস্কর্য ও ম্যুরাল ভাঙচুর বা অগ্নিসংযোগ করা হয়েছে। এর মধ্যে ঐতিহাসিক গুরুত্বসম্পন্ন ব্যক্তিদের প্রতিকৃতি এবং মুক্তিযুদ্ধের স্মারকও রয়েছে।

ভয় ও আশঙ্কায় গ্রামীণ সাংস্কৃতিক উৎসব বিলুপ্তির পথে

গবেষণা অনুযায়ী, গত দেড় বছরে দেশের প্রায় ৯৭টি মাজারে হামলা চালানো হয়েছে। লোকজ উৎসবে হামলার ঘটনাও বাড়ছে, যার ফলে অনেক ঐতিহ্যবাহী আয়োজন বন্ধ হয়ে যাচ্ছে। পুলিশের তথ্যমতে, সাম্প্রতিক সময়ে এ ধরনের শতাধিক হামলার ঘটনা ঘটেছে।

৫ আগস্টের পর দেশের বেশ কয়েকটি গণমাধ্যম কার্যালয়ও মব সহিংসতার শিকার হয়েছে। গত ১৮ ডিসেম্বর মধ্যরাতে রাজধানীর কারওয়ান বাজারে একটি জাতীয় দৈনিকের ভবনে উগ্রপন্থীরা ব্যাপক ভাঙচুর ও অগ্নিসংযোগ চালায়। একই রাতে ডেইলি স্টার ও ছায়ানট ভবনেও হামলা চালানো হয়।

মব জাস্টিস কী এবং কেন এটি বিপজ্জনক

চলতি বছরের ফেব্রুয়ারিতে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী দাবি করেছিলেন ‘মব কালচার শেষ’, কিন্তু বাস্তবতা ভিন্ন। শাহবাগে সাধারণ মানুষের ওপর হামলা এবং কুষ্টিয়ায় পীর খুনের ঘটনা প্রমাণ করে যে সহিংসতা থামেনি।

বিশিষ্ট শিক্ষাবিদ ও অপরাধবিজ্ঞানীরা মনে করেন, অতীতের মব সহিংসতার কোনো বিচার না হওয়ায় এই ধরনের অপরাধ বারবার ঘটছে এবং তা এখন একটি অভ্যাসে পরিণত হচ্ছে। এখনই কঠোর হাতে দমন না করলে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যাবে।

সরকারি প্রতিশ্রুতির পরও বন্ধ হচ্ছে না মব জাস্টিস

অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের সময়ে মব সহিংসতা বৃদ্ধির বিষয়ে বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, প্রশাসনের নিষ্ক্রিয়তা বা নমনীয়তা অনেক ক্ষেত্রে দায়ীদের উৎসাহিত করেছে। অপরাধের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি না হওয়ায় সমাজে এই প্রবণতা ডালপালা ছড়াচ্ছে।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অপরাধবিজ্ঞান বিভাগের শিক্ষকরা বলছেন, দ্রুত বিচারের আওতায় না আনলে মব জাস্টিস একটি সামাজিক ব্যাধি হয়ে দাঁড়াবে।

মব ভায়োলেন্স ভবিষ্যতে একটি মডেল হিসেবে দাঁড়িয়ে যেতে পারে

শব্দের চাতুরীতে অপরাধকে লঘু করা বন্ধ হোক

বিচারের অভাব থেকে ক্ষোভ জন্মানো স্বাভাবিক, কিন্তু সেই ক্ষোভ যখন মব সহিংসতার রূপ নেয়, তখন তা সবার জন্যই আশঙ্কার কারণ হয়। ব্যক্তিগত বা আদর্শগত বিরোধ মেটাতে মবকে হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করার সংস্কৃতি তৈরি হচ্ছে। শাসনের মসনদে বসে শব্দের প্যাঁচে অপরাধকে আড়াল করা মোটেই নিরাপদ নয়।

গত বছরের একটি ঘটনায় ডিএমপির সাবেক কমিশনার ‘ধর্ষণ’ শব্দের বদলে ‘নারী নির্যাতন’ ব্যবহারের পরামর্শ দিয়েছিলেন। তিনি বলেছিলেন এটি শুনতে ভালো লাগে। কিন্তু এতে কি অপরাধের ভয়াবহতা কমে?

মব কালচার কি নতুন রূপে ফিরছে?

মব সহিংসতাকে ‘চাপ সৃষ্টিকারী গোষ্ঠী’ বা ‘জনগণের প্রতিক্রিয়া’ বলে লঘু করার কোনো সুযোগ নেই। অপরাধকে তার নামেই ডাকা উচিত। মবকে মব হিসেবে চিহ্নিত করে আইনের শাসন নিশ্চিত করাই এখন একমাত্র পথ।

মব সন্ত্রাসকে মানবতাবিরোধী অপরাধ হিসেবে গণ্য করার আহ্বান


সম্পাদক ও প্রকাশক : প্রিন্স সালেহ। প্রকাশক কর্তৃক ১২ বীর উত্তম সি আর দত্ত রোড, বাংলামোটর, ঢাকা ১২০৫ থেকে মুদ্রিত।

ফোন : +88 01919237299, +8801640754545, ই-মেইল: princesalehbd@gmail.com