১০ মে ২০২৬
preview
মানুষের মাঝে থেকেও নিঃসঙ্গতা: কোরআনে এর প্রতিকার কী?

বিএনএন ডেস্ক

চারপাশে মানুষের ভিড়, হাসি-ঠাট্টা আর খাওয়া-দাওয়ার উৎসব। কিন্তু এত কিছুর মাঝেও আপনার মনে হতে পারে আপনি সম্পূর্ণ একা। কেউ আপনাকে সত্যিকার অর্থে বুঝতে পারছে না—এমন এক শূন্যতা কাজ করে যা কিছুতেই পূরণ হচ্ছে না।

এই বিচিত্র অনুভূতিই হলো একাকীত্ব। আশ্চর্যজনক বিষয় হলো, এটি শুধু নির্জনতায় নয়, বরং অনেক মানুষের মাঝেও তীব্রভাবে অনুভূত হতে পারে।

পবিত্র কোরআন বলছে, এই সমস্যার মূল কারণ পরিবেশ নয়, বরং সম্পর্কের গভীরতা। আর সেই আধ্যাত্মিক সংযোগ কোথায় মিলবে, তার সমাধান দেওয়া হয়েছে দেড় হাজার বছর আগেই।

বিজ্ঞানের দৃষ্টিতে

গবেষণা বলছে, দীর্ঘস্থায়ী একাকীত্ব শুধু মনকেই বিষণ্ন করে না, এটি শরীরেরও মারাত্মক ক্ষতি করে। এটি রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা কমিয়ে দেয় এবং হৃদরোগের ঝুঁকি বাড়ায়। বিজ্ঞানীদের মতে, এই মানসিক চাপ দিনে পনেরোটি সিগারেট খাওয়ার সমান ক্ষতিকর। (আমেরিকান সাইকোলজিক্যাল অ্যাসোসিয়েশন, ২০০৩)

আধুনিক মনোবিজ্ঞান মানুষের সাথে মেলামেশার পরামর্শ দিলেও দেখা যায়, ভিড়ের মাঝেও মানুষের ভেতরের শূন্যতা মেটে না। তাহলে এই সমস্যার মূল উৎস কোথায়?

কোরআনের ভাষ্য অনুযায়ী, সমস্যাটি আমাদের পারিপার্শ্বিকতায় নয় বরং আমাদের আত্মিক সংযোগে।

সৃষ্টিকর্তার পক্ষ থেকে মানুষের প্রতি বিশেষ আমানত

কোরআনের দিকনির্দেশনা

সুরা কাফ-এ আল্লাহ তায়ালা বলেন, 'আমি তার জীবন ধমনির চেয়েও অধিক নিকটবর্তী।' (সুরা কাফ, আয়াত: ১৬)

এই আয়াতটির গভীরতা অনুভব করার চেষ্টা করুন।

‘হাবলিল ওয়ারিদ’: অর্থাৎ গলার শিরা বা শাহরগ। এই শিরাটি আপনার দেহের এমন এক অবিচ্ছেদ্য অংশ যা আপনি দেখতে পান না, কিন্তু এটি বন্ধ হলে জীবন শেষ। আল্লাহ বলছেন, তিনি আপনার সেই প্রাণের শিরার চেয়েও বেশি কাছে আছেন।

‘নাহনু আকরাব’: এর অর্থ হলো—তিনি শুধু কাছেই নন, বরং আপনার আমিত্বের সাথে পরমভাবে মিশে আছেন।

যে অন্তর তার স্রষ্টাকে চেনে, সে কখনো প্রকৃত অর্থে নিঃসঙ্গ হয় না। আর যে অন্তর স্রষ্টাকে চেনে না, সে সহস্র মানুষের ভিড়েও একা।
ইমাম গাজ্জালি (রহ.)

প্রশ্ন হতে পারে, স্রষ্টা এত কাছে থাকার পরও আমরা কেন একাকীত্ব অনুভব করি? আল্লাহ সুরা ত্বহায় এর কারণ জানিয়েছেন—‘যে আমার স্মরণ থেকে মুখ ফিরিয়ে নেবে, তার জীবন হয়ে উঠবে সংকীর্ণ ও কষ্টদায়ক।’ (সুরা ত্বহা, আয়াত: ১২৪)

‘মাইশাতান দানকা’: অর্থাৎ এক ধরণের শ্বাসরুদ্ধকর জীবন। বাইরে থেকে হাসিখুশি মনে হলেও ভেতরে এক অদৃশ্য অস্থিরতা কাজ করে। ইমাম গাজ্জালি (রহ.) এই হাহাকারকে স্রষ্টার থেকে দূরত্বের ফলাফল হিসেবে ব্যাখ্যা করেছেন।

কোরআনিক জ্ঞান ও শিক্ষা

১. অন্তরের শূন্যতা কেবল স্রষ্টাকে দিয়েই পূর্ণ হয়। একাকীত্ব কাটাতে আমরা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম বা বিনোদনে মগ্ন হই, কিন্তু স্থায়ী প্রশান্তি মেলে না। কারণ সুরা রা’দে বলা হয়েছে, ‘জেনে রেখো, আল্লাহর জিকিরেই অন্তরসমূহ প্রশান্তি লাভ করে।’ (সুরা রাদ, আয়াত: ২৮)

এখানে ‘তাতমাইন্ন’ শব্দটির মানে হলো এমন এক চূড়ান্ত স্থিরতা যেখানে আর কোনো অস্থিরতা থাকে না। মানুষের কাছে এই নির্ভরতা পাওয়া অসম্ভব, কারণ মানুষ নিজেও অস্থির।

ইসলামি চিন্তাধারায় ওহির গুরুত্ব

ইবনুল কাইয়্যিম (রহ.) বলেছেন, 'হৃদয়ে এমন এক শূন্যস্থান থাকে যা আল্লাহর প্রেম ছাড়া অন্য কিছু দিয়ে পূরণ করা সম্ভব নয়।'

২. তিনি শুধু কাছেই নন, তিনি আমাদের ডাকে সাড়া দেন। সুরা বাকারায় আল্লাহ ইরশাদ করেছেন, ‘যখন আমার বান্দারা আমার সম্পর্কে জিজ্ঞেস করে, আমি তো তাদের একদম কাছেই আছি। কেউ ডাকলে আমি তার আহ্বানে সাড়া দিই।’ (সুরা বাকারা, আয়াত: ১৮৬)

এই আয়াতে আল্লাহ কোনো মাধ্যম ছাড়াই সরাসরি বান্দার সাথে নিজের নৈকট্য প্রকাশ করেছেন। হাদিসে কুদসিতে এসেছে, বান্দা যদি স্রষ্টার দিকে এক বিঘত এগিয়ে আসে, তিনি তার দিকে এক হাত এগিয়ে যান।

একাকীত্ব আসলে কোনো অভিশাপ নয়, বরং এটি আল্লাহর দিকে ফেরার একটি সংকেত। মানুষের ভিড়ে যে শূন্যতা অনুভূত হয়, তা কোনো মানুষ দিয়ে পূরণ হওয়ার নয়।

৩. মানুষ ছেড়ে গেলেও তিনি পাশেই থাকেন। সুরা হাদিদে আল্লাহ বলেন, ‘তোমরা যেখানেই থাকো না কেন, তিনি তোমাদের সাথেই আছেন।’ (সুরা হাদিদ, আয়াত: ৪)

প্রিয়জন বা বন্ধু দূরে চলে যেতে পারে, কিন্তু স্রষ্টার সাহচর্য চিরস্থায়ী।

৪. মনের গহীনের কথা তিনি জানেন। সুরা কাফ-এ আরও বলা হয়েছে, মানুষের মনে যে সূক্ষ্ম চিন্তার উদয় হয়, আল্লাহ সে সম্পর্কেও অবগত। তাঁর কাছে মনের অব্যক্ত কথাগুলো বলার জন্য কোনো বিশেষ ভাষার প্রয়োজন নেই।

খানিকটা সময় নিয়ে ভাবুন

রাতের শেষ প্রহরে যখন সব নিস্তব্ধ থাকে এবং নিজেকে খুব একা মনে হয়, তখন রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর একটি হাদিস স্মরণ করুন। তিনি বলেছেন, প্রতি রাতের শেষ তৃতীয়াংশে আল্লাহ দুনিয়ার আকাশে নেমে আসেন এবং ডাকতে থাকেন—কে আছো যে আমাকে ডাকবে আর আমি তার ডাকে সাড়া দেব?

সেই নিঃসঙ্গ মুহূর্তটিই আসলে তাঁর সবচেয়ে প্রিয় হওয়ার সুবর্ণ সুযোগ। একাকীত্বের এই হাহাকার মূলত স্রষ্টার দিকে ফিরে যাওয়ার একটি বিশেষ আমন্ত্রণ।

muhsin.du@gmail.com

  • মুহাম্মাদ মুহসিন মাশকুর: খণ্ডকালীন শিক্ষক, আধুনিক ভাষা ইনস্টিটিউট, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়।

ক্রোধ নিয়ন্ত্রণে পবিত্র কোরআনের সমাধান


সম্পাদক ও প্রকাশক : প্রিন্স সালেহ। প্রকাশক কর্তৃক ১২ বীর উত্তম সি আর দত্ত রোড, বাংলামোটর, ঢাকা ১২০৫ থেকে মুদ্রিত।

ফোন : +88 01919237299, +8801640754545, ই-মেইল: princesalehbd@gmail.com