বিএনএন ডেস্ক
আজ থেকে দুই দশক আগে, এক ভুল মানুষ, ভুল স্থান এবং অদম্য আত্মবিশ্বাসের মেলবন্ধনে ইন্টারনেটের ইতিহাসে এক অবিস্মরণীয় মুহূর্তের জন্ম হয়েছিল। ২০০৬ সালের ৮ মে বিবিসি নিউজ ২৪-এ ঘটে যাওয়া সেই ঘটনাটি আজও বিশ্বজুড়ে মানুষের স্মৃতিতে অমলিন। এই ঘটনার নায়ক হলেন কঙ্গো বংশোদ্ভূত ফরাসি নাগরিক গাই গোমা, যিনি 'ইন্টারনেটের প্রথম আকস্মিক তারকা' হিসেবে পরিচিতি লাভ করেন।
২০০৬ সালের ৮ মে, গাই গোমা পশ্চিম লন্ডনের বিবিসি টেলিভিশন সেন্টারের মূল অভ্যর্থনা কক্ষে অপেক্ষমাণ ছিলেন। তবে কোনো বিখ্যাত ব্যক্তিত্ব হিসেবে নয়, বরং বিবিসির আইটি বিভাগে ডেটা ক্লিনজার পদের সাধারণ চাকরির সাক্ষাৎকারের জন্য। একই সময়ে, অন্য একটি কক্ষে অপেক্ষমাণ ছিলেন প্রখ্যাত ব্রিটিশ প্রযুক্তি বিশেষজ্ঞ গাই কিউনি, যার অ্যাপল কর্পোরেশন বনাম অ্যাপল কম্পিউটারস-এর মধ্যকার আইনি লড়াই নিয়ে একটি লাইভ সাক্ষাৎকারের কথা ছিল।
বিবিসির এক প্রযোজক খবর পান যে প্রযুক্তি বিশেষজ্ঞ গাই কিউনি মূল অভ্যর্থনা কক্ষে উপস্থিত। প্রযোজক সেখানে গিয়ে অভ্যর্থনাকারীর কাছে কিউনির বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি গাই গোমার দিকে ইঙ্গিত করেন। হাতে মাত্র পাঁচ মিনিট সময় থাকায়, প্রযোজক গোমার কাছে গিয়ে জিজ্ঞেস করেন, 'আপনি কি গাই?' নিজের প্রথম নাম শুনে গোমা ইতিবাচক উত্তর দেন।
এরপর দ্রুত গোমাকে মেকআপ রুমে নিয়ে যাওয়া হয়। তিনি কিছুটা বিস্মিত হলেও ভেবেছিলেন, এই বুঝি ডিজিটাল যুগে চাকরির ইন্টারভিউ পদ্ধতি। তাকে স্টুডিওতে নিয়ে গিয়ে মাইক্রোফোন পরিয়ে দেওয়া হয়। সরাসরি সম্প্রচার শুরু হতেই উপস্থাপিকা কারেন বোয়ারম্যান তাকে প্রযুক্তি বিশেষজ্ঞ গাই কিউনি হিসেবে পরিচয় করিয়ে দেন। ঠিক সেই মুহূর্তে গাই গোমার চোখে-মুখে যে বিস্ময় ফুটে উঠেছিল, তা ইন্টারনেটের ইতিহাসে এক অবিস্মরণীয় দৃশ্য হয়ে আছে। তিনি মুহূর্তেই বুঝতে পারেন যে একটি ভুল বোঝাবুঝি হয়েছে। তবে লাইভ টেলিভিশনের গাম্ভীর্য বজায় রেখে, গাই গোমা একজন বিশেষজ্ঞের মতোই সব প্রশ্নের উত্তর দেওয়ার চেষ্টা করেন।
আশ্চর্যজনকভাবে, সেই সাক্ষাৎকারে গোমা এমন একটি ভবিষ্যদ্বাণী করেছিলেন যে মানুষ ভবিষ্যতে আরও বেশি করে ইন্টারনেট থেকে গান ও তথ্য ডাউনলোড করবে। আজ সেই কথা বাস্তবে পরিণত হয়েছে। টিভি সাক্ষাৎকার শেষ হওয়ার ২০ মিনিট পর, গোমা তার আসল চাকরির ইন্টারভিউতে অংশ নেন। মাত্র ১০ মিনিটের সেই সাক্ষাৎকারের পরও তিনি অবশ্য চাকরিটি পাননি।
পরবর্তীতে, তারকাখ্যাতি অর্জনের পর গোমা চ্যানেল ফোর নিউজ সহ বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমে অতিথি হিসেবে আমন্ত্রিত হন। এমনকি ২০০৬ সালের শেষের দিকে তাকে নিয়ে একটি চলচ্চিত্র তৈরির পরিকল্পনাও করা হয়েছিল। ২০২২ সালে বিবিসি ওয়ার্ল্ড সার্ভিস আউটলুক অনুষ্ঠানে তাকে আবার সাক্ষাৎকার দিতে দেখা যায়। ২০ বছর পরও মানুষ সেই 'ভুল গাই'-কে ভোলেনি। সম্প্রতি, এলিয়ট গটকিন এবং গাই গোমার লেখা একটি বই প্রকাশিত হয়েছে, যার শিরোনাম 'দ্য রং গাই: দ্য ইনসাইড স্টোরি অব টিভি’স গ্রেটেস্ট স্ক্রু–আপ'।
আজকের ভাইরাল সংস্কৃতির যুগে, যেখানে মানুষ বিখ্যাত হওয়ার জন্য নানা কৌশল অবলম্বন করে, সেখানে গাই গোমা প্রমাণ করেছেন যে মাঝে মাঝে ভাগ্য এবং একটি ভুল পরিচয়ও মানুষকে অমর করে দিতে পারে। গাই গোমা আজও সেই হাসিমুখ এবং বিস্ময়ে ভরা চোখের চাহনি নিয়ে ইন্টারনেটের পাতায় এক জীবন্ত কিংবদন্তি হয়ে আছেন।
সূত্র: বিবিসি
সম্পাদক ও প্রকাশক : প্রিন্স সালেহ। প্রকাশক কর্তৃক ১২ বীর উত্তম সি আর দত্ত রোড, বাংলামোটর, ঢাকা ১২০৫ থেকে মুদ্রিত।
ফোন : +88 01919237299, +8801640754545, ই-মেইল: princesalehbd@gmail.com