৯ মে ২০২৬
preview
জাপানি ঋণের সুদের হার বৃদ্ধি, চাপের মুখে বাংলাদেশ

বিএনএন ডেস্ক

জাপান তাদের বৈদেশিক উন্নয়ন সহযোগিতার ক্ষেত্রে ঋণের সুদের হার বাড়িয়ে দিয়েছে। সহজ শর্তে ঋণ দেওয়ার জন্য পরিচিত এই দেশটির এমন সিদ্ধান্তে বিপাকে পড়েছে বাংলাদেশ। বাংলাদেশের বৈদেশিক ঋণের একটি বিশাল অংশ আসে জাপান থেকে, তাই এখন থেকে সেখান থেকে ঋণ নিতে হলে আগের চেয়ে বেশি ব্যয়ভার বহন করতে হবে।

গত ২৯ মার্চ ঢাকায় নিযুক্ত জাপানি দূতাবাস থেকে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়কে একটি পত্র পাঠানো হয়। সেখানে জানানো হয় যে, জাপান সরকার তাদের অফিশিয়াল ডেভেলপমেন্ট অ্যাসিস্ট্যান্স বা ওডিএ নীতিমালায় নিয়মিত পর্যালোচনার অংশ হিসেবে পরিবর্তন এনেছে। এই নতুন সুদের হার ও শর্তসমূহ ২০২৬ সালের ১ এপ্রিল থেকে কার্যকর হবে।

সাধারণ জাপানি ঋণের ক্ষেত্রে সুদের হার (স্থির) ২.৯ শতাংশ থেকে বেড়ে ৩.৬ শতাংশে দাঁড়িয়েছে। অর্থাৎ ঋণের খরচ ০.৭ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়েছে। স্থির সুদের ক্ষেত্রে আরও তিনটি বিকল্প ব্যবস্থা থাকলেও সবখানেই সমান হারে সুদ বেড়েছে। এর মধ্যে সর্বনিম্ন সুদের হার এখন ২.৭ শতাংশ, যা আগে ছিল মাত্র ২ শতাংশ। এ ছাড়া ঋণের অন্যান্য ধরনেও সুদের হার পরিবর্তন করা হয়েছে।

জাপানি বিশেষজ্ঞদের জন্য পরামর্শক ফি বাড়লেও ঋণ শোধের সময়সীমা এবং গ্রেস পিরিয়ড আগের মতোই রাখা হয়েছে। সাধারণ ঋণের জন্য এই সময়সীমা ১৫ থেকে ৪০ বছর এবং গ্রেস পিরিয়ড ৫ থেকে ১০ বছর পর্যন্ত নির্ধারিত রয়েছে।

সুদের হার বেড়ে যাওয়ায় ইআরডি প্রস্তাবিত তিনটি উন্নয়ন প্রকল্পের ফাইল ফেরত পাঠিয়েছে।

জাপানি নাগরিকদের পরামর্শক ফি বৃদ্ধি পেলেও ঋণ পরিশোধের গ্রেস পিরিয়ড ও মূল সময়সীমায় কোনো পরিবর্তন আসেনি। সাধারণ ও স্থির সুদের ঋণের ক্ষেত্রে কিস্তি পরিশোধের সময় ১৫ থেকে ৪০ বছর এবং গ্রেস পিরিয়ড ৫ থেকে ১০ বছর বহাল আছে।

প্রকল্প তিনটি ছিল—উপজেলা পরিচালন ও উন্নয়ন প্রকল্প (ইউজিডিপি), হাওর এলাকার উন্নয়ন প্রকল্প এবং চট্টগ্রাম-কক্সবাজার উন্নয়ন প্রকল্প। এগুলো ২০২৬-২৭ অর্থবছরের জন্য পরিকল্পিত ছিল।

ইআরডির কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, উচ্চ সুদে এই ধরণের প্রকল্পগুলো বাস্তবায়ন করা দেশের জন্য লাভজনক হবে না। তাই সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়গুলোতে এই প্রকল্পগুলো ফেরত পাঠানো হয়েছে।

ইআরডির অতিরিক্ত সচিব (জাপান অনুবিভাগ) মোহাম্মদ মিজানুর রহমান জানান, নতুন সুদের হারের পর জাপানি ঋণের বিষয়ে সরকার এখন অনেক বেশি সতর্ক। এখন থেকে কেবল এমন প্রকল্পকেই গুরুত্ব দেওয়া হবে যা থেকে অর্থনৈতিক সুফল এবং কর্মসংস্থানের সুযোগ বেশি পাওয়া যাবে।

জাপান তাদের উন্নয়ন সংস্থা জাইকার মাধ্যমে বর্তমানে মেট্রোরেল, মাতারবাড়ী বিদ্যুৎ প্রকল্প, শাহজালাল বিমানবন্দরের তৃতীয় টার্মিনাল এবং যমুনা রেল সেতুর মতো গুরুত্বপূর্ণ প্রকল্পে ঋণ সহায়তা দিচ্ছে।

শীর্ষ ঋণদাতা দেশ জাপান

বাংলাদেশের বৈদেশিক ঋণের অন্যতম বড় অংশীদার হলো জাপান। ২০২৪-২৫ সালের অর্থনৈতিক সম্পর্ক বিভাগের (ইআরডি) প্রতিবেদন অনুযায়ী, বাংলাদেশের মোট বৈদেশিক ঋণের প্রায় ১৮ শতাংশ জাপানের কাছ থেকে নেওয়া।

সবচেয়ে বেশি ঋণ এসেছে বিশ্বব্যাংকের আইডিএ শাখা থেকে (২৯ শতাংশ) এবং এরপরই এশীয় উন্নয়ন ব্যাংক বা এডিবির অবস্থান (২৩ শতাংশ)। জাপানের পর যথাক্রমে রাশিয়া (১১ শতাংশ), চীন (৭ শতাংশ) এবং ভারতের (২ শতাংশ) অবস্থান।

জাপান বর্তমানে তাদের উন্নয়ন সংস্থা জাইকার মাধ্যমে বাংলাদেশের বড় বড় অবকাঠামোগত প্রকল্পে বিনিয়োগ ও ঋণ সহায়তা প্রদান করছে।

গত বছরের জুনে জয়দেবপুর থেকে ঈশ্বরদী পর্যন্ত ডাবল লাইন রেলপথ নির্মাণে জাইকার সাথে প্রায় সাড়ে সাত হাজার কোটি টাকার ঋণ চুক্তি হয়, যার সুদের হার ছিল ২ শতাংশ। সেই ঋণের জন্য ১০ বছরের গ্রেস পিরিয়ডসহ ৩০ বছর সময় পাওয়া গিয়েছিল।

তবে বর্তমানে দুটি বড় প্রকল্প নিয়ে জাপানের সাথে বাংলাদেশের সম্পর্কে কিছুটা টানাপোড়েন লক্ষ করা যাচ্ছে। এর মধ্যে রয়েছে মেট্রোরেল-১ এবং শাহজালাল বিমানবন্দরের তৃতীয় টার্মিনালের পরিচালনা সংক্রান্ত বিষয়। জাইকার কিছু শর্তের কারণে প্রকল্প ব্যয় বৃদ্ধি পাওয়া এবং বিমানবন্দর ব্যবস্থাপনায় জাপানি আগ্রহের বিষয়টি আলোচনার কেন্দ্রে রয়েছে।

বৈদেশিক ঋণ ও সংশ্লিষ্ট সুদের হার

ঋণের ধরণ ও প্রকল্পের ভিন্নতার কারণে প্রতিটি দেশের সুদের হার ভিন্ন হয়ে থাকে। ইআরডির তথ্যমতে, বিশ্বব্যাংকের আইডিএ ঋণের সুদের হার বর্তমানে প্রায় ২ শতাংশের মতো। সাধারণত ৫ বছরের গ্রেস পিরিয়ডসহ ২৫ বছরে এই ঋণ শোধ করতে হয়। তবে বিশেষ প্রয়োজনে বিশ্বব্যাংক থেকে ৪ শতাংশের বেশি সুদেও ঋণ নিতে হয়।

এডিবি থেকেও বাংলাদেশ সাধারণত ২ শতাংশ হারে ঋণ নেয়, যা ২০ বছরে পরিশোধযোগ্য। অন্যদিকে, রাশিয়ার কাছ থেকে রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎ প্রকল্পের জন্য ৪ শতাংশ সুদে বিশাল অংকের ঋণ নেওয়া হয়েছে, যা ২৮ বছরে পরিশোধ করতে হবে।

চীনা ঋণের ক্ষেত্রে সুদের হার ২ থেকে ২.২৫ শতাংশের মধ্যে থাকলেও এটি পরিশোধের সময়সীমা বেশ কম, সাধারণত ১৫ বছরের মতো হয়ে থাকে।

সহজ শর্তে ঋণ পাওয়ার সুযোগ আগের চেয়ে অনেক কমে আসছে। এখন উন্নয়ন সহযোগীরা বাজারমূল্য অনুযায়ী সুদ নির্ধারণ করছে। এর প্রভাব এখনই অনুভূত হচ্ছে এবং ভবিষ্যতে এই চাপ আরও বাড়বে।
জাহিদ হোসেন, বিশ্বব্যাংকের ঢাকা কার্যালয়ের সাবেক মুখ্য অর্থনীতিবিদ

অনেক ক্ষেত্রে ঋণের সুদের হার কম থাকলেও ঋণদাতা দেশ থেকে পণ্য কেনাকাটার শর্ত থাকায় প্রকল্পের সামগ্রিক ব্যয় বেড়ে যায়।

২০১৫ সালে বাংলাদেশ নিম্নমধ্যম আয়ের দেশে উন্নীত হওয়ার পর থেকেই বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সংস্থার ঋণের সুদের হার বাড়তে শুরু করেছে। মূলত দেশের মাথাপিছু আয় বৃদ্ধির সাথে সাথে সহজ শর্তে ঋণ পাওয়ার সুযোগও সংকুচিত হয়ে আসছে।

ভবিষ্যতে বৈদেশিক ঋণের ক্ষেত্রে অত্যন্ত বিচার-বিশ্লেষণ করে প্রকল্প গ্রহণ করতে হবে। যেসব প্রকল্প সরাসরি কর্মসংস্থান তৈরি করবে এবং অর্থনীতিতে ইতিবাচক প্রভাব ফেলবে, কেবল সেগুলোতেই জোর দেওয়া উচিত।
সেলিম রায়হান, নির্বাহী পরিচালক, সানেম

সংসদে দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, বাংলাদেশের বর্তমান বৈদেশিক ঋণের পরিমাণ প্রায় ৭ হাজার ৮০০ কোটি মার্কিন ডলার। বাংলাদেশি মুদ্রায় যার পরিমাণ সাড়ে ৯ লাখ কোটি টাকারও বেশি।

প্রতি বছর এই ঋণের আসল ও সুদ পরিশোধে সরকারকে বিশাল অংকের অর্থ ব্যয় করতে হচ্ছে। ২০২৪-২৫ অর্থবছরেই প্রায় ৪০০ কোটি ডলার বা ৫০ হাজার কোটি টাকা ঋণ পরিশোধ বাবদ খরচ হয়েছে।

অর্থনীতিবিদদের মতে, ভবিষ্যতে ঋণ নেওয়ার ক্ষেত্রে প্রকল্পগুলোর অর্থনৈতিক উপযোগিতা যাচাই করা এখন সময়ের দাবি।


সম্পাদক ও প্রকাশক : প্রিন্স সালেহ। প্রকাশক কর্তৃক ১২ বীর উত্তম সি আর দত্ত রোড, বাংলামোটর, ঢাকা ১২০৫ থেকে মুদ্রিত।

ফোন : +88 01919237299, +8801640754545, ই-মেইল: princesalehbd@gmail.com