বিএনএন ডেস্ক
টিআইবি’র নির্বাহী পরিচালক ইফতেখারুজ্জামান উল্লেখ করেছেন যে, বাংলাদেশে ব্যবসা ও রাজনীতির ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক সুশাসনকে ব্যাহত করার পাশাপাশি গণমাধ্যমের স্বাধীন কার্যক্রমেও নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে।
ইফতেখারুজ্জামান জোর দিয়ে বলেছেন যে, সংবাদমাধ্যমের স্বাধীনতা একটি বৃহত্তর রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক কাঠামোর অবিচ্ছেদ্য অংশ। তাঁর মতে, যখন গণতন্ত্র, স্বচ্ছতা, মত প্রকাশের অধিকার এবং জনসাধারণের স্বাধীনতা খর্ব হয়, তখন গণমাধ্যমও তীব্র চাপের সম্মুখীন হয়।
রাজধানীর এক হোটেলে অনুষ্ঠিত ‘বাংলাদেশ জার্নালিজম কনফারেন্স ২০২৬’-এর সমাপনী দিনে টিআইবি’র নির্বাহী পরিচালক সকালের অধিবেশনে মূল বক্তব্য রাখেন। ‘রাজনৈতিক-শাসনতান্ত্রিক পরিবেশ ও স্বাধীন গণমাধ্যম’ শীর্ষক এই আলোচনা পর্বটি পরিচালনা করেন বিজনেস স্ট্যান্ডার্ড-এর নির্বাহী সম্পাদক শাখাওয়াত লিটন। আন্তর্জাতিক এই দুই দিনব্যাপী সম্মেলনটির আয়োজক ছিল মিডিয়া রিসোর্সেস ডেভেলপমেন্ট ইনিশিয়েটিভ (এমআরডিআই)।
ইফতেখারুজ্জামান ব্যাখ্যা করেন যে, ব্যবসায়ীদের রাজনীতিতে যুক্ত হওয়া আপত্তিজনক নয়, কিন্তু সমস্যা শুরু হয় যখন ব্যবসা রাজনৈতিক ক্ষমতা অর্জনের হাতিয়ার হয় এবং রাজনীতি একটি বাণিজ্যিক বিনিয়োগে রূপান্তরিত হয়। তিনি সতর্ক করেন যে, ‘যদি রাজনীতি ব্যবসায়িক স্বার্থে পরিচালিত হয় এবং ব্যবসায়ীরা রাজনৈতিক ক্ষমতাকে নিজেদের কুক্ষিগত করে, তাহলে জবাবদিহিমূলক শাসনব্যবস্থার ভিত্তি দুর্বল হয়ে পড়ে।’
ইফতেখারুজ্জামান আরও জানান যে, অন্যান্য সরকারি প্রতিষ্ঠানের মতোই সংবাদমাধ্যমও স্বকীয়ভাবে কাজ করতে অক্ষম। তিনি এর কারণ হিসেবে উল্লেখ করেন যে, দেশের রাজনীতি ও প্রশাসনিক কাঠামো মূলত পুঁজি, অর্থ, ধর্ম, পিতৃতন্ত্র এবং সংখ্যাগরিষ্ঠতাবাদ দ্বারা প্রভাবিত। এর ফলস্বরূপ, সংবাদমাধ্যমও স্বাধীনভাবে পরিচালিত হতে পারছে না এবং এর মালিকানা, নীতি নির্ধারণ ও সংবাদ প্রচারে রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক স্বার্থের অনুপ্রবেশ বাড়ছে।

‘জিরো সাম গেম’-এর রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট
ইফতেখারুজ্জামান ব্যাখ্যা করেন যে, বাংলাদেশের রাজনীতিতে দীর্ঘকাল ধরে একদলীয় লাভ ও অন্য দলের ক্ষতির ‘জিরো সাম গেম’ নীতি প্রচলিত। এই পদ্ধতির কারণে রাজনৈতিক ক্ষমতার কেন্দ্রীকরণ, ভিন্ন মত দমন এবং তথ্যের অবাধ প্রবাহকে নিয়ন্ত্রণের প্রবণতা বৃদ্ধি পেয়েছে।
তিনি যোগ করেন যে, ক্ষমতার কেন্দ্রীভূতকরণ এবং মতবিরোধ দমনের কারণে বাংলাদেশে প্রায়শই তথ্য প্রকাশ ও সমালোচনামূলক মতামতকে হুমকি হিসেবে গণ্য করা হয়, যা গণমাধ্যমের ওপর বহুবিধ চাপ সৃষ্টি করে।
টিআইবি’র নির্বাহী পরিচালক আরও উল্লেখ করেন যে, গত দুই দশকে সরকারি ও পেশাদার প্রতিষ্ঠানগুলোতে রাজনৈতিক প্রভাব বৃদ্ধি পেয়েছে। এর পাশাপাশি, সরকার বদলের সাথে সাথে বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের নেতৃত্ব ও কার্যক্রমেও পরিবর্তন লক্ষ্য করা যায়।
ইফতেখারুজ্জামান জোর দেন যে, সংবাদমাধ্যমের স্বাধীনতা শুধু সাংবাদিকদের পেশাগত অধিকার নয়, বরং এটি মানবধিকার, মতপ্রকাশের স্বাধীনতা এবং গণতান্ত্রিক উত্তরদায়কতার একটি অপরিহার্য অংশ। তাঁর বক্তব্যে, তিনি বাংলাদেশের ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনের মতো কঠোর বিধিমালা সাংবাদিকদের বিরুদ্ধে অপব্যবহারের নিন্দা জানান এবং বলেন যে, এই আইনের অধীনে শত শত সাংবাদিকের বিরুদ্ধে মামলা হয়েছে, যার মধ্যে অনেকে কেবল তাদের পেশাগত কর্তব্য পালনের জন্য হয়রানির শিকার হয়েছেন।
টিআইবি’র নির্বাহী পরিচালক আরও মন্তব্য করেন যে, যদি রাজনৈতিক সংস্কৃতিতে প্রতিশোধের প্রবণতা ও দলীয় আধিপত্য বজায় থাকে, তবে সংবাদমাধ্যমের প্রকৃত স্বাধীনতা নিশ্চিত করা প্রায় অসম্ভব হয়ে উঠবে।
আলোচনা সভায় অন্যান্য বক্তাদের মধ্যে উপস্থিত ছিলেন ডেইলি স্টারের কনসাল্টিং এডিটর কামাল আহমেদ, পাকিস্তানের ডন-এর সম্পাদক জাফর আব্বাস, বিবিসির প্রাক্তন সাংবাদিক আনোয়ার শাকিল এবং সমকাল সম্পাদক শাহেদ মুহাম্মদ আলী।
সম্পাদক ও প্রকাশক : প্রিন্স সালেহ। প্রকাশক কর্তৃক ১২ বীর উত্তম সি আর দত্ত রোড, বাংলামোটর, ঢাকা ১২০৫ থেকে মুদ্রিত।
ফোন : +88 01919237299, +8801640754545, ই-মেইল: princesalehbd@gmail.com