৭ মে ২০২৬
preview
পশ্চিমবঙ্গে বিজেপির জয় ভারতীয় গণতন্ত্রের অবক্ষয়কে স্পষ্ট করেছে

বিএনএন ডেস্ক

ভারতের সাম্প্রতিক বিধানসভা নির্বাচন দেশটির সমসাময়িক রাজনৈতিক ইতিহাসে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ এক অধ্যায় হয়ে দাঁড়িয়েছে। বিশেষ করে সীমান্তবর্তী রাজ্য পশ্চিমবঙ্গ, যা দীর্ঘদিন ধরে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদীর দল বিজেপির আধিপত্যকে প্রতিহত করে আসছিল।
ইতিহাসে প্রথমবারের মতো বিজেপি পশ্চিমবঙ্গে ক্ষমতার দখল নিয়েছে। ঘোষিত ২৯৩টি আসনের মধ্যে দলটি ২০৭টিতে জয়লাভ করেছে এবং তৃণমূল কংগ্রেসের আসন সংখ্যা কমে দাঁড়িয়েছে ৮০টিতে। একটি আসনে পুনঃভোট হওয়ার কথা রয়েছে।
বিজেপির এই বিশাল জয় ভারতের রাজনৈতিক মানচিত্র বদলে দিয়েছে। তবে এই নির্বাচনী ফলাফল পুরো নির্বাচন প্রক্রিয়ার স্বচ্ছতা ও গ্রহণযোগ্যতা নিয়ে বড় ধরনের প্রশ্ন তুলে দিয়েছে।
নির্বাচন কমিশন কর্তৃক বিতর্কিত 'স্পেশাল ইনটেনসিভ রিভিশন' (SIR) প্রক্রিয়ার মাধ্যমেই মূলত এই নির্বাচন সম্পন্ন হয়। ভোটার তালিকা থেকে অযোগ্য বা মৃত ব্যক্তিদের নাম বাদ দেওয়ার কথা বলে পুরো পশ্চিমবঙ্গে প্রায় ৯ মিলিয়ন বা ৯০ লাখ ভোটারের নাম যাচাই-বাছাই বা বাদ দেওয়া হয়, যা মোট ভোটারের প্রায় ১২ শতাংশ।
এই প্রক্রিয়াটি মূলত মুসলিম, অভিবাসী শ্রমিক এবং বিজেপির দুর্বল এলাকাগুলোর গরিব ভোটারদের লক্ষ্য করে চালানো হয়েছে। বিজেপির জয়ী অনেক আসনেই বাদ পড়া বা বিতর্কিত ভোটারের সংখ্যা জয়ের ব্যবধানের চেয়েও বেশি।
এর ফলাফল অত্যন্ত উদ্বেগজনক। ভারত এখন নির্বাচনী কারচুপির পর্যায় পেরিয়ে গণহারে ভোটাধিকার হরণের দিকে ধাবিত হচ্ছে কি না, তা নিয়ে প্রশ্ন দেখা দিয়েছে।
পশ্চিমবঙ্গ কেবল ভারতের একটি রাজ্য নয়। ১৯৪৭ সালের দেশভাগের সময় এটি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছিল এবং এর ২,২০০ কিলোমিটার সীমান্ত রয়েছে বাংলাদেশের সাথে। রাজ্যের মোট জনসংখ্যার প্রায় ২৭ শতাংশ মুসলিম, যারা ঐতিহাসিকভাবে বিজেপির উত্থান রুখতে কৌশলী ভোট দিয়ে এসেছে।
ঠিক এই কারণেই মোদীর কাছে পশ্চিমবঙ্গের গুরুত্ব অপরিসীম ছিল।
বিজেপি গত এক দশকে রাজ্যে তাদের প্রভাব বাড়ালেও ২০২১ সালে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়কে ক্ষমতা থেকে সরাতে ব্যর্থ হয়েছিল। তাই ২০২৬ সালের এই নির্বাচনকে একদিকে যেমন মমতা সরকারের জনপ্রিয়তা যাচাইয়ের পরীক্ষা হিসেবে দেখা হচ্ছিল, অন্যদিকে এটি ভারতীয় নির্বাচনের প্রাতিষ্ঠানিক বিশ্বাসযোগ্যতারও অগ্নিপরীক্ষা ছিল।
এই বিতর্কের মূল কেন্দ্রে ছিল এসআইআর (SIR) প্রক্রিয়া, যা ২০২৫ সালের জুন মাসে বিহারে শুরু হয়ে পরবর্তীতে পশ্চিমবঙ্গসহ নয়টি রাজ্য ও তিনটি কেন্দ্রশাসিত অঞ্চলে বিস্তৃত করা হয়।
এই প্রক্রিয়ায় বুথ পর্যায়ের কর্মকর্তারা বাড়ি বাড়ি গিয়ে ভোটারদের তথ্য যাচাই করেছেন। নাগরিকদের নির্দিষ্ট সময়সীমার মধ্যে নথিপত্র জমা দিয়ে ভোটার হওয়ার যোগ্যতা প্রমাণ করতে হয়েছে। ব্যর্থ হলে তাদের নাম তালিকা থেকে মুছে ফেলা হয়েছে।
১৯৫১-৫২ সালের প্রথম সাধারণ নির্বাচনের পর থেকে এই প্রথমবার ভারতের নাগরিকদের ওপর তাদের ভোটাধিকার প্রমাণের দায়ভার চাপিয়ে দেওয়া হয়েছে।
এটি গণতান্ত্রিক রীতির একটি বিপজ্জনক লঙ্ঘনের ঘটনা।
এই প্রক্রিয়াটি অভিবাসী শ্রমিকদের জন্য ছিল চরম বিপর্যয়কর। বিহার ও পশ্চিমবঙ্গ থেকে বড় সংখ্যক মানুষ কাজের সন্ধানে অন্য রাজ্যে থাকেন। তারা স্বল্প সময়ের নোটিশে বাড়ি ফিরে নথিপত্র প্রমাণ করতে হিমশিম খেয়েছেন। এছাড়া নামের বানান ভুল বা নথিপত্রের অমিলের কারণে অনেকের নাম বাদ পড়েছে।
মুসলিম ও দরিদ্র নারীদের ক্ষেত্রে এই সমস্যাগুলো ছিল সবচেয়ে প্রকট।
নির্বাচন কমিশন এটিকে প্রশাসনিক প্রয়োজন হিসেবে দাবি করলেও বিজেপি একে 'অনুপ্রবেশকারী' বা অবৈধ অভিবাসীদের বিতাড়ন হিসেবে প্রচার করেছে।
তবে পশ্চিমবঙ্গে এই প্রক্রিয়াটি দ্রুতই একটি রাজনৈতিক অস্ত্র হয়ে ওঠে।
মুসলিম অধ্যুষিত জেলাগুলোতে সবচেয়ে বেশি ভোটারের নাম বাদ দেওয়া হয়েছে। এছাড়া কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআই ব্যবহার করে নাম যাচাইয়ের ক্ষেত্রে বানানজনিত কারণে মুসলিম ভোটারদের নাম বেশি লক্ষ্যবস্তু করা হয়েছে।
তৃণমূল কংগ্রেস বারবার অভিযোগ করেছে যে, নির্বাচন কমিশন একটি স্বাধীন সাংবিধানিক সংস্থা হিসেবে নয়, বরং ক্ষমতাসীন দলের অনুগত শাখা হিসেবে কাজ করছে।
সুপ্রিম কোর্ট বেশ কয়েকবার হস্তক্ষেপ করলেও শেষ পর্যন্ত এই প্রক্রিয়া চালিয়ে যাওয়ার অনুমতি দেয়। লক্ষ লক্ষ ভোটার তাদের নাম বাদ পড়ার বিরুদ্ধে আবেদন করলেও নির্বাচনের আগে অর্ধেকের বেশি আবেদন অমীমাংসিত ছিল। আদালত জানায়, আবেদনের রায় না হওয়া পর্যন্ত সংশ্লিষ্টরা ভোট দিতে পারবেন না।
এই রায় কার্যকরভাবে ব্যাপক হারে ভোটাধিকার হরণকে বৈধতা দিয়েছে।
ব্যক্তিগত পর্যায়ে আমিও এই প্রক্রিয়ার শিকার হয়েছি।
উত্তরপ্রদেশে আমার পরিবারকেও ভোটাধিকার টিকিয়ে রাখতে দৌড়ঝাঁপ করতে হয়েছে। পশ্চিমবঙ্গের তুলনায় সেখানে প্রক্রিয়াটি কিছুটা কম কঠোর হলেও এটি ছিল হয়রানিমূলক। বয়স্ক, নারী ও দরিদ্রদের জন্য এই আমলাতান্ত্রিক জটিলতা পার করা দুঃসাধ্য ছিল।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একাধিক কর্মকর্তা জানিয়েছেন, হিন্দু ভোটারদের তুলনায় মুসলিম ভোটারদের নাম বাদ পড়ার ঝুঁকি বেশি ছিল।
পরিশেষে পশ্চিমবঙ্গে প্রায় ২৭ লাখ ভোটারের নাম তালিকা থেকে বাদ দেওয়া হয়। এছাড়া নির্বাচনের আগে লক্ষ লক্ষ মানুষ তাদের ভোটাধিকার সংক্রান্ত আইনি জটিলতায় আটকা পড়েন।
বিজেপি ২৯,২২৪,৮০৪টি ভোট পেয়েছে, যা তৃণমূলের চেয়ে মাত্র ৩২ লাখ বেশি। বিশ্লেষকদের মতে, বিজেপির জয়ী অনেক আসনে বাদ দেওয়া বা বিতর্কিত ভোটারের সংখ্যা জয়ের ব্যবধানের চেয়ে অনেক বেশি ছিল।
তাই এটি সন্দেহ করার যথেষ্ট কারণ রয়েছে যে, নির্বাচন কমিশনের সহায়তায় এই নির্বাচনী রায় 'ছিনতাই' করা হয়েছে, যদিও তাদের নিরপেক্ষ থাকার কথা ছিল।
বিজেপির এই জয়ে হিন্দুত্ববাদী প্রচারণা বড় ভূমিকা রেখেছে, যেখানে তৃণমূলের বিরুদ্ধে মুসলিম তোষণের অভিযোগ তুলে হিন্দু ভোটারদের মধ্যে নিরাপত্তাহীনতা তৈরি করা হয়েছে।
২০২৪ সালের সাধারণ নির্বাচনের পর, যেখানে মোদী একক সংখ্যাগরিষ্ঠতা হারিয়ে কোয়ালিশন সরকারের ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়েন, বিজেপি তাদের কৌশল পুনর্নির্ধারণ শুরু করে।
এর অন্যতম অংশ হলো নতুন ডিলিমিটেশন বা সীমানা পুনর্নির্ধারণ, যা উত্তরের হিন্দুপ্রধান এলাকাগুলোকে রাজনৈতিক সুবিধা দেবে। আসামে এই প্রক্রিয়া ইতিমধ্যে মুসলিমদের রাজনৈতিক প্রভাব কমিয়ে দিয়েছে।
দ্বিতীয় উদ্যোগ হলো এসআইআর (SIR) প্রক্রিয়া, যার রাজনৈতিক প্রভাব পশ্চিমবঙ্গে সবচেয়ে প্রকটভাবে দেখা গেছে।
তৃতীয়টি হলো 'এক দেশ, এক নির্বাচন', যার লক্ষ্য হলো রাজ্য ও জাতীয় নির্বাচনকে একীভূত করা। এটি প্রশাসনিক সংস্কার হিসেবে দেখানো হলেও, এর মূল উদ্দেশ্য হলো ক্ষমতার কেন্দ্রীকরণ এবং আঞ্চলিক দলগুলোর শক্তি খর্ব করা।
সব মিলিয়ে, এই পদক্ষেপগুলো ভারতীয় গণতন্ত্রের কাঠামোকে স্থায়ীভাবে বদলে ফেলার একটি সুপরিকল্পিত চেষ্টা।
ভারত আজ হিন্দুত্ববাদী আদর্শের কবলে বন্দি। গণতান্ত্রিক মূল্যবোধ ও নির্বাচনী স্বচ্ছতার অবক্ষয় দেশটির মূল পরিচিতিকে মুছে ফেলে সেখানে একটি কর্তৃত্ববাদী ও চরম হিন্দুত্ববাদী শাসনব্যবস্থা প্রতিষ্ঠার ইঙ্গিত দিচ্ছে।
এই নিবন্ধে প্রকাশিত মতামত লেখকের নিজস্ব।

তথ্যসূত্র: আল-জাজিরা


সম্পাদক ও প্রকাশক : প্রিন্স সালেহ। প্রকাশক কর্তৃক ১২ বীর উত্তম সি আর দত্ত রোড, বাংলামোটর, ঢাকা ১২০৫ থেকে মুদ্রিত।

ফোন : +88 01919237299, +8801640754545, ই-মেইল: princesalehbd@gmail.com