বিএনএন ডেস্ক
মৌলভীবাজারের জুড়ী উপজেলার হাকালুকি হাওরপারের উত্তর জাঙ্গিরাই গ্রামে এক পাকা সড়কের পাশে বসে চুলায় বড় পাতিলে ভেজা ধান সেদ্ধ করছিলেন জমিলা খাতুন। তাঁর পাশে ভেজা ধানের স্তূপ দেখা যাচ্ছিল। জমিলার স্বামী ফুল মিয়া হাকালুকি হাওরে ১৫ বিঘা জমিতে বোরো ধানের চাষ করেছিলেন। সাম্প্রতিক ভারী বৃষ্টি ও পাহাড়ি ঢলে তাঁদের ১৫ বিঘা জমিও অন্যান্যদের মতো তলিয়ে গেছে। কিছু ধান কোনোমতে কাটা হলেও রোদের অভাবে সেগুলো শুকানো সম্ভব হচ্ছে না। প্রায় অর্ধেক ধান ইতিমধ্যেই অঙ্কুরিত হয়ে নষ্ট হওয়ার পথে। তাই জমিলা ভেজা ধান সেদ্ধ করে সেগুলোকে বাঁচানোর শেষ চেষ্টা করছেন।
চুলায় আগুন ধরাতে ধরাতে জমিলা বেগম বললেন, ‘প্রায় ছয়-সাত দিন ধরে কোনো রোদ নেই, কেবল বৃষ্টি হচ্ছে। ধান মাড়াই করার পর শুকানো যায়নি। ভেজা ধানগুলো অঙ্কুরিত হয়ে নষ্ট হয়ে যাচ্ছে। চোখের সামনে এমন করে ধান নষ্ট হয়ে যাওয়া দেখতে খুব কষ্ট হচ্ছে। এই ভেজা ধানগুলোকে বাঁচানোর জন্য আমি সেদ্ধ করছি, যদি এগুলোও না শুকাতে পারি, তবে সবই নষ্ট হয়ে যাবে।’
পরে জমিলার স্বামী ফুল মিয়া ঘটনাস্থলে আসেন। ফুল মিয়া জানান, তিনি হাওরে ১৫ বিঘা জমিতে বোরো ধানের চাষ করেছিলেন। কিন্তু আকস্মিক বন্যায় তার সমস্ত জমির ফসলই পানির নিচে তলিয়ে গেছে। এর মধ্যে ৩ বিঘা জমির ধান এতটাই গভীর পানিতে ছিল যে, সেগুলো কেটে আনাই সম্ভব হয়নি।
ঐ সড়ক দিয়ে হেঁটে যাওয়া স্থানীয় স্কুলশিক্ষক রফিকুল ইসলাম মন্তব্য করেন যে, এবারের মতো হাওরের ফসলের ক্ষতি গত কয়েক বছরে আর দেখা যায়নি।
উত্তর জাঙ্গিরাই গ্রাম থেকে হাকালুকি হাওরের পাশ দিয়ে নয়াগ্রাম খালেরমুখ বাজার সেতু পর্যন্ত একটি আরসিসি সড়ক তৈরি হয়েছে। গতকাল সোমবার বিকেলে সরেজমিনে গিয়ে দেখা যায়, আবহাওয়া আগের দিনের চেয়ে কিছুটা ভালো। দুপুরের দিকে কয়েক ঘণ্টা রোদ ছিল। পুরো সড়কের দুই পাশে নির্দিষ্ট দূরত্বে ভেজা ধানের স্তূপ দেখা যাচ্ছে। বাতাসে ভেজা এবং পচে যাওয়া ধানের তীব্র গন্ধ ছড়িয়ে পড়েছে। সেখানে কিছু কৃষক যন্ত্রের সাহায্যে ধান মাড়াই করছিলেন, আবার কেউ কেউ রাস্তায় ধান শুকাচ্ছিলেন।
নয়াগ্রাম বাজারের কাছে জুড়ী নদীতে ধানবোঝাই একটি নৌকা থেকে কয়েকজন শ্রমিক ভেজা ধানের আঁটি মাথায় করে সড়কের পাশে স্তূপ করছিলেন। সেখানে দাঁড়িয়ে থাকা সুফিয়া বেগম জানালেন, এই ধানগুলো তাদের নিজেদের জমির। তাদের বাড়ি পাশের বাছিরপুর গ্রামে। হাওরে তাদের তিন বিঘা জমির ধান পানির নিচে তলিয়ে যায়। শ্রমিক লাগিয়ে তারা এক বিঘা জমির ধান কোনোমতে কেটে আনতে পেরেছেন।
সুফিয়া খাতুন নামের এক গৃহিণী আক্ষেপ করে বলেন, ‘চারজন শ্রমিক লাগিয়েছি। আগে একজন শ্রমিকের দৈনিক মজুরি ছিল ৭০০-৮০০ টাকা, এখন ১০০০ টাকা লাগছে। ধান আনার জন্য নৌকার প্রয়োজন হয়। ছোট নৌকার ভাড়া ১০০০ টাকা, আর বড় নৌকার জন্য ২০০০ টাকা দিতে হচ্ছে। পানিতে থাকতে থাকতে ধান ভিজে গেছে। এখন মেশিনে মাড়াই করে শুকাতে হবে। এগুলো শেষ পর্যন্ত টিকবে কিনা, সেটাই এখন আমার সবচেয়ে বড় চিন্তা।’
দুপুরে রোদ ওঠার কারণে নয়াগ্রামের আরসিসি রাস্তায় আশপাশের কৃষকদের ধান শুকানোর কাজ জোরেশোরে শুরু হয়। নারীরা পা দিয়ে নেড়েচেড়ে ধানগুলো শুকাচ্ছিলেন। মিনারা বেগম নামের এক নারী মন্তব্য করলেন, ‘মানুষের কষ্ট দেখে আল্লাহই হয়তো দিন ভালো করেছেন। এমন রোদ যদি আরও তিন-চার দিন থাকে, তাহলেই যথেষ্ট হবে।’

খালেরমুখ বাজারের পাশ দিয়ে জুড়ী নদীর সাথে সংযুক্ত একটি ছোট খাল হাকালুকি হাওরে গিয়ে মিশেছে। এই খাল ধরেই দক্ষিণ কালনীগড় গ্রামের তরুণ রাজু দাস একটি ধানবোঝাই নৌকা রশি দিয়ে টেনে নিয়ে আসছিলেন। টানা কয়েক দিনের বৃষ্টির কারণে খালের পাড়ের কাঁচা রাস্তা কাদায় ভরে একাকার হয়ে আছে। সেই রাস্তার দুই পাশেও ভেজা ধানের স্তূপ দেখা যাচ্ছে।
রাজু জানান, হাওরে তাদের মোট সাড়ে ১৪ বিঘা জমির মধ্যে ৯ বিঘা জমির ফসলই পানির নিচে চলে গেছে। প্রতিকূল আবহাওয়ার মধ্যেও তিনি চার দিন ধরে সাতজন শ্রমিক দিয়ে ৫ বিঘা জমির ধান কাটাতে সক্ষম হয়েছেন। রাজু বলেন, ‘অনেক পরিশ্রম করে জমি চাষ করেছি। এই ধানের ফসল দিয়ে আমাদের সারা বছরের খাবারের সংস্থান হয়। কিছু ধান বিক্রি করারও পরিকল্পনা ছিল। ধান রোপণ ও কাটার খরচ হিসেব করলে অনেক টাকা। এখন শুধু ধানগুলো যদি কোনোমতে ঘরে তুলতে পারি, তাহলেই শান্তি।’
হাওরের এই অংশে ফসলের ক্ষয়ক্ষতির মূল কারণ হিসেবে উত্তর জাঙ্গিরাই এলাকার গবাদিপশুর খামারি হাবিবুর রহমান সেচের অভাবে দেরিতে চাষাবাদ শুরু করাকে দায়ী করেন। তিনি উল্লেখ করেন যে, বোরো মৌসুমের শুরুতে উপজেলা সদরের উত্তর ভবানীপুর এলাকায় জুড়ী নদীতে একটি মাটির বাঁধ তৈরি করে কণ্ঠিনালা শাখা নদী দিয়ে পানি ছেড়ে দেওয়া হয়েছিল। এর ফলে হাওরের এক অংশের কৃষকরা সেচ সুবিধা পেয়ে সঠিক সময়ে চাষাবাদ করে ফসল ঘরে তুলতে পারেন। কিন্তু এই বাঁধ অপসারণে দেরি হওয়ায় তাদের এলাকায় ধান চাষ বিলম্বে শুরু হয় এবং ফসলও দেরিতে পাকে। আর এই বিলম্বের কারণেই প্রায় প্রতি বছর আগাম বন্যায় ফসলহানি ঘটে।
উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা মো. মাহমুদুল আলম খান গতকাল সোমবার বিকেলে হাওরের বিভিন্ন ক্ষতিগ্রস্ত এলাকা পরিদর্শন করেন। নয়াগ্রাম এলাকায় সাংবাদিকদের সাথে কথা বলার সময় তিনি জানান, উপজেলায় মোট ৬ হাজার ১৭০ হেক্টর জমিতে বোরো ধানের আবাদ হয়েছিল। কিন্তু সাম্প্রতিক অতিবৃষ্টি ও উজানের পাহাড়ি ঢলের কারণে হাকালুকি হাওরের প্রায় ২৫ থেকে ৩০ শতাংশ ধান পানির নিচে তলিয়ে গেছে। যেসব কৃষক ধান কেটে আনতে পেরেছেন, তারা রোদের অভাবে সেগুলো শুকাতে পারছেন না। প্রায় প্রতিদিন বৃষ্টি হওয়ার কারণে অনেক কৃষকের কাটা ধান অঙ্কুরিত হয়ে নষ্ট হয়ে যাচ্ছে। কৃষি বিভাগ বর্তমানে উপজেলায় প্রায় আড়াই হাজার ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকের একটি তালিকা তৈরির কাজ করছে। এই কৃষকদের সরকারি প্রণোদনা দেওয়ার জন্য ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের কাছে একটি প্রস্তাব পাঠানো হবে।
সম্পাদক ও প্রকাশক : প্রিন্স সালেহ। প্রকাশক কর্তৃক ১২ বীর উত্তম সি আর দত্ত রোড, বাংলামোটর, ঢাকা ১২০৫ থেকে মুদ্রিত।
ফোন : +88 01919237299, +8801640754545, ই-মেইল: princesalehbd@gmail.com