১৩ মে ২০২৬
preview
যুক্তরাষ্ট্রে ইরান যুদ্ধের প্রভাব: তিন বছরে সর্বোচ্চ মূল্যস্ফীতির রেকর্ড

বিএনএন ডেস্ক

ইরান-ইসরায়েল যুদ্ধের সরাসরি নেতিবাচক প্রভাব পড়েছে মার্কিন অর্থনীতিতে। দেশটিতে গত তিন বছরের মধ্যে প্রথমবারের মতো মূল্যস্ফীতির হার মজুরি বৃদ্ধির হারকে ছাড়িয়ে গেছে।

মার্কিন শ্রম পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিএলএস) হালনাগাদ তথ্য অনুযায়ী, এপ্রিলে মাসিক মূল্যস্ফীতি ০.৬ শতাংশ বেড়েছে। এতে বার্ষিক মূল্যস্ফীতির হার ৩.৮ শতাংশে পৌঁছেছে, যা ২০২৩ সালের মে মাসের পর সর্বোচ্চ। সিএনএন এ তথ্য জানিয়েছে।

বিশ্লেষকদের পূর্বাভাসের চেয়ে এপ্রিলে মূল্যস্ফীতির হার কিছুটা বেশি ছিল, কারণ তারা বার্ষিক ৩.৭ শতাংশের আশঙ্কা করেছিলেন।

চলতি বছরের ফেব্রুয়ারি মাসের শেষদিকে ইরান-যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের মধ্যে উত্তেজনার শুরুতে মার্কিন মূল্যস্ফীতি ২.৪ শতাংশে নেমে এসেছিল। কিন্তু যুদ্ধের প্রভাবে জ্বালানি তেলের দাম বেড়ে যাওয়ায় সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রার ব্যয় আবারও অসহনীয় পর্যায়ে পৌঁছেছে।

লয়োলা মেরিমাউন্ট বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতি বিষয়ের অধ্যাপক সাং-ওন সন বলেন, 'ভোক্তাদের জন্য জীবনযাত্রার ব্যয় এখন বেশ উদ্বেগজনক। এই পরিস্থিতি ফেডারেল রিজার্ভের সুদহার কমানোর সিদ্ধান্তকে আরও বিলম্বিত করতে পারে।'

খাদ্য ও জ্বালানি পণ্যের আকাশচুম্বী দাম

২০২২ সালের গ্রীষ্মে মূল্যস্ফীতি ৯.১ শতাংশে পৌঁছানোর পর তা কিছুটা স্বাভাবিক হতে শুরু করেছিল। তবে গত মাস থেকে সেই ধারায় ছন্দপতন ঘটেছে। ২০২৩ সালের এপ্রিলের পর এবারই প্রথম মূল্যস্ফীতি সমন্বয় করলে গড় ঘণ্টাপ্রতি মজুরি প্রবৃদ্ধি ঋণাত্মক পর্যায়ে নেমেছে। গত বছর বেতনের তুলনায় মূল্যস্ফীতি বেশি হওয়ায় মানুষের ক্রয়ক্ষমতা কমেছে।

পিএনসি ফিন্যান্সিয়াল সার্ভিসেস গ্রুপের প্রধান অর্থনীতিবিদ অগাস্টিন ফশে জানান, সাধারণ মানুষ আগে থেকেই আর্থিক চাপে ছিল, এখন শ্রমবাজারের দুর্বলতা পরিস্থিতি আরও জটিল করে তুলেছে।

জ্বালানি তেলের দাম বাড়ার প্রভাব কেবল পরিবহনেই সীমাবদ্ধ নেই, বরং সার, অ্যালুমিনিয়াম ও হিলিয়ামের মতো প্রয়োজনীয় কাঁচামালের সরবরাহও বাধাগ্রস্ত হচ্ছে। মার্চে গ্যাসের দাম ২১.২ শতাংশ এবং এপ্রিলে ৫.৪ শতাংশ বেড়েছে, যা অর্থনীতিতে বড় ধাক্কা দিচ্ছে।

বিদ্যুতের চাহিদাও ক্রমাগত বাড়ছে, ফলে এপ্রিল মাসে বিদ্যুতের দাম বৃদ্ধি পেয়েছে ২.১ শতাংশ, যা গত চার বছরের মধ্যে সর্বোচ্চ।

খাদ্যপণ্যের ক্ষেত্রেও একই চিত্র। চাল, ডাল থেকে শুরু করে গরুর মাংস, ফল ও সবজির দাম লাফিয়ে বাড়ছে। বিশেষ করে ডিজেলচালিত ট্রাকে পরিবহন করা শাকসবজির দাম এপ্রিলে ২.৩ শতাংশ বেড়েছে। আরএসএম ইউএসের প্রধান অর্থনীতিবিদ জো ব্রুসুয়েলাস মন্তব্য করেছেন, যুদ্ধের আঁচ এখন মার্কিনদের নিত্যপণ্যের বাজারের ব্যাগে স্পষ্ট।

জনসাধারণ ও কেন্দ্রীয় ব্যাংকের ওপর চাপ

এপ্রিলের মূল্যস্ফীতির প্রায় ৪০ শতাংশই হয়েছে জ্বালানি তেলের দাম বাড়ার কারণে। এছাড়া আবাসন খাতের অস্থিরতাও এতে বড় ভূমিকা রেখেছে। সরকারি দাপ্তরিক জটিলতার কারণে আবাসন খাতে আগের মাসের তথ্য সমন্বয় না হওয়ায় বর্তমান মূল্যস্ফীতি আরও বেশি মনে হচ্ছে।

সিপিআই সূচকের অন্যতম প্রধান উপাদান আবাসন খাতের ভাড়া এপ্রিলে ০.৬ শতাংশ বেড়েছে, যা মার্চের তুলনায় দ্বিগুণ।

অর্থনীতিবিদ অলিভার অ্যালেনের মতে, পরিসংখ্যানগত কিছু ত্রুটি বা বিকৃতির কারণেও মূল্যস্ফীতির হার একটু বেশি দেখাচ্ছে। এছাড়া বিমানভাড়া এবং বিভিন্ন ডিজিটাল সাবস্ক্রিপশন সেবার দাম বাড়াও এর পেছনে দায়ী।

তবে পরিস্থিতি এখনো সম্পূর্ণ নিয়ন্ত্রণহীন নয় বলে মনে করেন তিনি। তিনি আশা করছেন, আগামী কয়েক মাস বাজার কিছুটা অস্বস্তিকর থাকলেও ২০২১ বা ২০২২ সালের মতো লাগামহীন পরিস্থিতি আর তৈরি হবে না। যদিও এই উচ্চ মূল্যস্ফীতি ফেডারেল রিজার্ভের জন্য নতুন চ্যালেঞ্জ তৈরি করেছে।

অ্যালেন আরও বলেন, কোর মূল্যস্ফীতি যখন ৩ শতাংশের কাছাকাছি, তখন সুদহার কমানোর পক্ষে যুক্তি দেওয়া কঠিন হয়ে পড়ছে। এদিকে মূল্যস্ফীতি নিয়ে রাজনৈতিক অসন্তোষও বাড়ছে। সিএনএনের জরিপ অনুযায়ী, ৭৭ শতাংশ মার্কিন নাগরিক মনে করেন বর্তমান অর্থনৈতিক পরিস্থিতির জন্য প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের গৃহীত নীতি দায়ী।

বিশ্লেষকদের ধারণা, মধ্যবর্তী নির্বাচনে এই মূল্যস্ফীতির প্রভাব তীব্র হতে পারে। সম্পদবৈষম্য ও শিক্ষাঋণের বোঝা নিম্ন ও মধ্যম আয়ের পরিবারগুলোকে আরও কোণঠাসা করে ফেলছে, যার প্রমাণ পাওয়া গেছে নিউইয়র্ক ফেডারেল রিজার্ভের ঋণ খেলাপি সংক্রান্ত প্রতিবেদনে।


সম্পাদক ও প্রকাশক : প্রিন্স সালেহ। প্রকাশক কর্তৃক ১২ বীর উত্তম সি আর দত্ত রোড, বাংলামোটর, ঢাকা ১২০৫ থেকে মুদ্রিত।

ফোন : +88 01919237299, +8801640754545, ই-মেইল: princesalehbd@gmail.com