বিএনএন ডেস্ক
ফুটবল বিশ্বকাপ কেবলই মাঠের লড়াই নয়, বরং এর পরতে পরতে ছড়িয়ে আছে অনেক অজানাল রোমাঞ্চকর ইতিহাস ও বিতর্কিত অধ্যায়। তেমনি কিছু অজানা উপাখ্যান নিয়ে আমাদের এই বিশেষ আয়োজন।
এথেন্সের ফিলিস স্ট্রিট। অন্ধকার নামলেই নিয়ন আলোর ঝলকানি দেখা যায় এই রাস্তায়। শহরের কুখ্যাত রেড লাইট এলাকার এই পথটি দেখলে মনে হয় যেন পুরোনো ইউরোপের কোনো বিষণ্ন ইতিহাসের সাক্ষী। তবে এই রাস্তায় থাকা জীর্ণ এক বাড়িকে কেন্দ্র করে জড়িয়ে আছে ফুটবল বিশ্বকাপের ইতিহাসের অন্যতম রহস্যময় এক ঘটনা।
ঘটনাটি ১৯৩৪ সালের বিশ্বকাপ শুরুর আগের। ইতালিতে তখন বেনিতো মুসোলিনির একনায়কতন্ত্র চলছে। ফুটবলকে তিনি কেবল খেলা হিসেবে নয়, বরং নিজের রাষ্ট্রীয় শক্তি প্রদর্শনের মাধ্যম ও রাজনৈতিক হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করতে চেয়েছিলেন। বিশ্বকাপ আয়োজনের সুযোগ পেলেও মুসোলিনির লক্ষ্য ছিল যে কোনো উপায়ে ট্রফিটি জয় করা। সেই উদ্দেশ্যে ইতালিয়ান ফুটবল ফেডারেশনের প্রধান জর্জিও ভাক্কারোকে তিনি ডেকে পাঠান, যা নিয়ে পরে অনেক কিংবদন্তি প্রচলিত হয়।

মুসোলিনি ভাক্কারোকে সাফ জানিয়ে দিয়েছিলেন, ‘ইতালিকে বিশ্বকাপ জিততেই হবে।’ ভাক্কারো প্রথমে হালকা মেজাজে উত্তর দিলেও মুসোলিনি কঠোর কণ্ঠে পুনরাবৃত্তি করেন, ‘অ্যাডমিরাল, মনে হয় আমি বোঝাতে পারিনি। আমি বলেছি, জিততেই হবে।’ এই নির্দেশের আড়ালে লুকিয়ে থাকা ভয় ও চাপই ১৯৩৪ সালের বিশ্বকাপকে ইতিহাসের বিতর্কিত আসরে পরিণত করেছিল।
বিশ্বকাপ জেতার জন্য ইতালি সব ধরনের প্রভাব খাটাতে পিছপা হয়নি। তবে মূল প্রতিযোগিতায় নামার আগে একটি বড় বাধা ছিল বাছাইপর্ব। ১৯৩৪ সালের বিশ্বকাপে স্বাগতিক হওয়া সত্ত্বেও ইতালিকে বাছাইপর্ব খেলতে হয়েছিল গ্রিসের বিপক্ষে। ড্র হওয়ার পর অনেকেই ইতালির ভাগ্যকে প্রশংসা করেছিলেন, কারণ গ্রিসের সেই সময়কার রেকর্ড ছিল বেশ দুর্বল।

মিলানে অনুষ্ঠিত প্রথম লেগে ইতালি অনায়াসেই ৪-০ গোলে জয়লাভ করে। সবাই ধরে নিয়েছিল দ্বিতীয় লেগটি নিছক আনুষ্ঠানিকতা মাত্র। ইতালির জন্য এথেন্সে গিয়ে ম্যাচটি খেলে আসা ছিল সময়ের ব্যাপার। কিন্তু ঠিক সেই মুহূর্তে ঘটে গেল এক অদ্ভুত নাটক।
এথেন্সের ম্যাচে ২০ হাজার দর্শক টিকিট কাটলেও আচমকা গ্রিস ফুটবল দল প্রতিযোগিতা থেকে নিজেদের নাম প্রত্যাহার করে নিল। ফলে দীর্ঘ সফর ও ক্লান্তি থেকে বেঁচে গেল ইতালি। ফিফার ভাষ্য অনুযায়ী, প্রথম লেগে হারের হতাশায় গ্রিস সরে দাঁড়িয়েছিল। কিন্তু সত্যিই কি তাই? নাকি এর পেছনে ছিল অন্য কোনো গোপন আঁতাত?

ঘটনার প্রায় ছয় দশক পর নতুন তথ্য বেরিয়ে আসে। ফুটবল ইতিহাস ও পরিসংখ্যান বিষয়ক আন্তর্জাতিক ফেডারেশনের (আইএফএফএইচএস) প্রতিবেদনে দাবি করা হয়, আর্থিক সংকটে থাকা গ্রিসকে ইতালি ঘুষ বা সুবিধা দিয়ে সরিয়ে দিয়েছিল। মুসোলিনির সম্মানের ঝুঁকি নিতে ইতালিয়ানরা কোনো সুযোগ রাখতে চায়নি। গ্রিকদের জন্য ম্যাচ বাতিল করাটা ছিল আর্থিক ক্ষতির কারণ, আর সেই ক্ষতি পুষিয়ে দিতেই ব্যবহার করা হয়েছিল একটি বাড়ি।
অভিযোগ ওঠে, গ্রিক ফেডারেশনকে ক্ষতিপূরণ হিসেবে এথেন্সে একটি বাড়ি কিনে দিয়েছিল ইতালি, যার বর্তমান বাজারমূল্য প্রায় ৬ লাখ ডলারের কাছাকাছি। ফিলিস স্ট্রিটের সেই বাড়িটিই পরবর্তীতে গ্রিক ফুটবল ফেডারেশনের প্রধান কার্যালয় হিসেবে ব্যবহৃত হয়।
নয় দশকের বেশি সময় পেরিয়ে গেছে। গ্রিসের সরে দাঁড়ানোর প্রকৃত কারণ আজও রহস্যময়। তবে মুসোলিনির ক্ষমতার দাপট ও সেই সময়ের পরিস্থিতি বিশ্লেষণ করলে সন্দেহের অবকাশ থেকেই যায়।
১৯৯৫ সালে ইতালিয়ান দৈনিক লা রিপাবলিকায় আইএফএফএইচএস সভাপতি আলফ্রেদো পোগে দাবি করেন যে, ১৯৩৪ সালের গ্রিক দলের কয়েকজন খেলোয়াড় ও তৎকালীন কোচের সাক্ষ্য অনুযায়ী—কেবল বাড়িই নয়, গ্রিক ফুটবলের কর্মকর্তাদের বড় অংকের অর্থও দেওয়া হয়েছিল যাতে তারা চুপ থাকে।
নয় দশক পার হয়ে গেলেও ১৯৩৪ সালের সেই বাছাইপর্বের ঘটনা আজও ধোঁয়াশাচ্ছন্ন। মুসোলিনির প্রভাব ও অর্থ যে এই নাটকের নেপথ্যে ছিল, তা নিয়ে ইতিহাসবিদদের যথেষ্ট সন্দেহ রয়েছে। তাৎপর্যপূর্ণ বিষয় হলো, আর্থিক টানাপোড়েনে থাকা গ্রিক ফেডারেশন সেই সময় হঠাৎই ফিলিস স্ট্রিটের নতুন অফিসে স্থানান্তর হয়, যা প্রায় বিশ বছর তাদের সদর দপ্তর ছিল।
সম্পাদক ও প্রকাশক : প্রিন্স সালেহ। প্রকাশক কর্তৃক ১২ বীর উত্তম সি আর দত্ত রোড, বাংলামোটর, ঢাকা ১২০৫ থেকে মুদ্রিত।
ফোন : +88 01919237299, +8801640754545, ই-মেইল: princesalehbd@gmail.com