খবরের নতুন দিগন্ত উন্মোচন করতে এখনই ভিজিট করুন:www.bnnbreakingnews.com
সম্পাদক ও প্রকাশক : প্রিন্স সালেহ। প্রকাশক কর্তৃক ১২ বীর উত্তম সি আর দত্ত রোড, বাংলামোটর, ঢাকা ১২০৫ থেকে মুদ্রিত।
স্বত্ব © BNN Breaking News (2026)
ওয়েবসাইটের কোনো লেখা, ছবি, ভিডিও অনুমতি ছাড়া ব্যবহার বেআইনি।
বিএনএন ডেস্ক

পিতার অনুপস্থিতি আর অসুস্থতার মাঝে ছয় সন্তানকে নিয়ে সংসার সামলানোর কঠিন যুদ্ধ একাই লড়েছেন মা। এটি এক অদম্য ও সংগ্রামী নারীর জীবনের সত্য উপাখ্যান।
‘মা হলেন এমন এক ব্যক্তিত্ব, যিনি বিশ্বের সবার অভাব পূরণ করতে সক্ষম, কিন্তু তাঁর শূন্যস্থান অন্য কেউ কখনো পূরণ করতে পারে না’—ইংরেজি সাহিত্যের এই ধ্রুব সত্যটি প্রতিটি মানুষের জীবনের চরম বাস্তবতা।
জীবনের পথে হাঁটতে গিয়ে আমরা অসংখ্য মানুষের সংস্পর্শে আসি। শৈশবের সঙ্গী, কৈশোরের বন্ধু, বিশ্ববিদ্যালয়ের সহপাঠী কিংবা পেশাজীবনের সহকর্মী—সময়ের বিবর্তনে অনেক নতুন সম্পর্ক গড়ে ওঠে আবার পুরনো সম্পর্কগুলো রূপ বদলায়। কিন্তু একটি সম্পর্ক চিরকাল অটুট থাকে—তা হলো মায়ের সাথে সম্পর্ক। স্থান, কাল বা পরিস্থিতির পরিবর্তন হলেও মায়ের ভালোবাসা চিরকাল স্থির, গভীর ও নিঃস্বার্থ হয়ে থাকে। তাই জগতের সকল সম্পর্কের ভিড়েও আমরা আপন মনে বলে উঠি—‘আমার মা’।
অল্প আয়ের একটি পরিবারে বেড়ে ওঠার গল্পটা আমাদের কাছে সাধারণ হলেও এর ভেতরে লুকিয়ে ছিল অসাধারণ এক লড়াই। বাবার অসুস্থতা ও দীর্ঘ অনুপস্থিতিতে ছয় ভাইবোনের এই বড় পরিবারের পুরো দায়িত্ব ছিল মায়ের ওপর। এটি এক মহীয়সী নারীর বাস্তব সংগ্রামের ইতিহাস। যখন থেকে জীবনকে বুঝতে শিখেছি, তখন থেকেই দেখেছি সংসারের প্রতিটি বোঝা তিনি নিঃসংকোচে নিজের কাঁধে তুলে নিয়েছেন। একদিকে পক্ষাঘাতগ্রস্ত স্বামীর চিকিৎসা, অন্যদিকে সন্তানদের সুশিক্ষিত করার চ্যালেঞ্জ—এই দুই কঠিন পরিস্থিতির মাঝেও তিনি কখনো দমে যাননি।
আমরা চার ভাইবোন যখন একসাথে পড়াশোনা করতাম, তখন সংসারের কথা ভেবে বড় ভাই শিক্ষাজীবন থেকে বিদায় নিয়ে হাল ধরার চেষ্টা করেন। কিন্তু আমাদের পড়াশোনা মা একদিনের জন্যও থামতে দেননি। প্রয়োজনীয় বই-খাতা আর পরীক্ষার খরচ সময়মতো আমাদের হাতে চলে আসত। এর নেপথ্যে মূল কারিগর ছিলেন আমার মা। সীমিত সম্পদের সংসারে তিনি ছিলেন এক নিভৃত উদ্যোক্তা। বাড়ির আঙিনায় কৃষিকাজ করে যেমন পুষ্টির জোগান দিতেন, তেমনি বাড়তি ফসল বাজারে বিক্রি করে আয়ের ব্যবস্থা করতেন। তাঁর এই জীবনমুখী ব্যবস্থাপনা অনেক বড় অর্থনৈতিক তত্ত্বকেও হার মানায়।
কালক্রমে দাদি এবং বাবাকে হারিয়ে আমাদের পরিবার যখন শোকে মুহ্যমান, তখনও মা ছিলেন অটল পাহাড়ের মতো। সেই চরম সংকটে তিনিই ছিলেন আমাদের একমাত্র আশার আলো। শৈশবে কোনোদিন পড়াশোনায় ব্যাঘাত ঘটেনি, উৎসবের আমেজও ম্লান হতে দেননি তিনি। অভাব থাকলেও তিনি এমন নিপুণভাবে সব সামলাতেন যে, আমরা টেরই পেতাম না জীবন কতটা কঠিন। উৎসব-পার্বণে সন্তানদের আনন্দ দিতে তিনি নানা পিঠা-পুলির আয়োজন করতেন। গাছের তাল বা নারকেল পাকার আগেই মা সেগুলোর সদ্ব্যবহারের পরিকল্পনা সেরে ফেলতেন।
কখনও ফলন কম হলে নিজের বাপের বাড়ি থেকে সন্তানদের জন্য ফল নিয়ে আসতেন মা। আমাদের খাবারের থালায় যেন কম না পড়ে, সেদিকেই ছিল তাঁর মূল নজর। আচার বানানো, ফল সংরক্ষণ, পুকুরের মাছ কিংবা গবাদি পশুর দুধ—সবকিছু দিয়েই তিনি আমাদের শৈশবকে অপূর্ণ রাখেননি। তবে শুধু অন্ন জোগানোই নয়, জীবনের নৈতিক বনিয়াদও তিনিই তৈরি করে দিয়েছেন। তাঁর শেখানো সততা, নিয়মাবর্তিতা আর মূল্যবোধ আজও আমাদের জীবন চলার পাথেয়। অন্যায়ের ব্যাপারে তিনি যেমন কঠোর ছিলেন, ন্যায়ের প্রশ্নে ছিলেন অবিচল।
আশি বছর বয়সে এসেও তাঁর ক্লান্তি নেই। নিজের স্বাচ্ছন্দ্যের চেয়ে এখনও তিনি অন্যের কষ্টের কথাই বেশি ভাবেন। নিজের জন্য তাঁর কোনো বিশেষ চাওয়া আছে কি না, তা আজও আমাদের অজানা। মায়ের সাথে সন্তানের টান কখনো ফিকে হয় না। বয়স বাড়লেও মায়ের প্রতি অনুভূতির কোনো পরিবর্তন হয় না। আজও যখন বাড়ি থেকে কর্মস্থলে ফিরি কিংবা মা শহর থেকে গ্রামে ফিরে যান, তখন মনের ভেতর এক অদ্ভুত টান অনুভব করি। এই মমতা কোনো সংজ্ঞায় বাঁধা যায় না, শুধু উপলব্ধি করা যায়।
প্রত্যেক সন্তানের মনেই মায়ের জন্য এমন কিছু গভীর আবেগ থাকে, যা হয়তো বিশ্বসাহিত্যের বড় বড় লেখকদের লেখায়ও পুরোপুরি ফুটে ওঠে না। কারণ নিজের মাকে নিয়ে অনুভূতিগুলো সবসময়ই একান্ত ব্যক্তিগত, অনন্য এবং শব্দ দিয়ে তা প্রকাশ করা অসম্ভব।
সহসভাপতি, বন্ধুসভা জাতীয় পরিচালনা পর্ষদ
প্রচ্ছদ নিয়ে আরও পড়ুন




