খবরের নতুন দিগন্ত উন্মোচন করতে এখনই ভিজিট করুন:www.bnnbreakingnews.com
সম্পাদক ও প্রকাশক : প্রিন্স সালেহ। প্রকাশক কর্তৃক ১২ বীর উত্তম সি আর দত্ত রোড, বাংলামোটর, ঢাকা ১২০৫ থেকে মুদ্রিত।
স্বত্ব © BNN Breaking News (2026)
ওয়েবসাইটের কোনো লেখা, ছবি, ভিডিও অনুমতি ছাড়া ব্যবহার বেআইনি।
বিএনএন ডেস্ক

তিনি শুধু একজন জননী ছিলেন না, তিনি ছিলেন এক নিরবচ্ছিন্ন সংগ্রাম ও পরিবর্তনের প্রতীক। গ্রামের সাধারণ উঠোন থেকেই তিনি মানুষের কল্যাণে আত্মনিয়োগ করেছিলেন, সকল প্রকার দারিদ্র্য, কুসংস্কার, দুর্নীতি ও অজ্ঞানতার বিরুদ্ধে সোচ্চার ছিলেন। ভয়, অভাব, অনিশ্চয়তা আর অবহেলার সময়গুলোতেই তিনি বুঝিয়েছিলেন মায়ের অসীম শক্তি কত বিশাল হতে পারে। তাঁর শিক্ষাই ছিল, 'সন্তানকে কেবল প্রতিপালন করলেই হবে না, সত্যিকারের মানুষ হিসেবে গড়ে তুলতে হবে।'
একাত্তরের অগ্নিগর্ভ দিনে তিনি একটি নতুন জাতির অভ্যুদয় প্রত্যক্ষ করেছিলেন, আর সেই অনুপ্রেরণায় নিজের সন্তানদের মাঝেও ভবিষ্যতের স্বপ্ন বুনেছিলেন। তাঁর দৃঢ় বিশ্বাস ছিল যে, গ্রামবাংলার সাধারণ মাটির ঘরেও জন্ম নিতে পারে বিজ্ঞানী, গবেষক, বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক এবং বিশ্বমানের নাগরিক। তিনি কোনো বৃহৎ বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ছিলেন না, কিংবা কোনো রাষ্ট্রীয় সম্মাননাও পাননি, কিন্তু তাঁর জীবন ছিল এক জীবন্ত পাঠশালা। গ্রামের মহিলাদের তিনি শিখিয়েছিলেন যে মাতৃত্ব কেবল সন্তান জন্ম দেওয়ার মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়, এটি চরিত্র নির্মাণ, সাহস সঞ্চার এবং মানুষকে আলোকিত করার এক মহৎ দায়িত্ব।
ব্রিটিশ শাসনের সময়ে জন্মে, পাকিস্তানি বৈষম্যের কাল অতিক্রম করে, তিনি স্বাধীন বাংলাদেশের স্বপ্নকে হৃদয়ে লালন করেছিলেন। তিনি গভীরভাবে উপলব্ধি করতেন যে একজন শিক্ষিত জননী একটি জাতির ভবিষ্যৎ পাল্টে দিতে পারেন। নয়টি সন্তানকে তিনি অক্লান্ত পরিশ্রমে, অপরিমেয় ধৈর্য ও অদম্য আত্মবিশ্বাসে বড় করে তুলেছিলেন। তিনি প্রমাণ করেছেন যে, বাংলার মায়েরা চাইলে বিশ্বের শ্রেষ্ঠ নাগরিক তৈরি করতে সক্ষম। একটি গ্রামীণ মাও পৃথিবীকে আলোকিত করার স্বপ্ন দেখাতে পারেন।
আমার ও মায়ের বন্ধন কেবল আজকের নয়, এটি বহু বছরের সঞ্চিত নীরব ভালোবাসার এক সুদীর্ঘ ইতিহাস। শৈশবে হাত ধরে চলা পথ থেকে শুরু করে জীবনের কঠিনতম সিদ্ধান্ত গ্রহণেও তিনি ছিলেন আমার অনুপ্রেরণা, আমার প্রথম শিক্ষা, আমার পৃথিবী দেখার জানালা। এরপর একদিন জীবনধারার প্রয়োজনে আমি সুদূর প্রবাসে পাড়ি জমাই। বাংলাদেশের মাটির ঘ্রাণ পেছনে ফেলে উত্তরের এক শীতল ভূখণ্ডে নতুন জীবন গড়ার সংগ্রাম শুরু হয়। তবে ভৌগোলিক দূরত্ব কখনও মা-সন্তানের অটুট সম্পর্ককে ছিন্ন করতে পারেনি। হাজার মাইল দূরে থেকেও ফোনের অন্য প্রান্তে তাঁর কণ্ঠস্বর শুনলেই মনে হতো, আমি এখনও সেই গ্রামীণ সন্তান, যার জন্য মা বিনিদ্র রজনী যাপন করে প্রার্থনা করেন।
প্রায় ৪৫ বছরের প্রবাসী জীবনে মায়ের স্নেহ-মমতাই ছিল আমার শিকড়ের সাথে আমার অবিচ্ছিন্ন বন্ধন। আর তাঁর জীবনের শেষ ১৫টি বছরে, বাংলাদেশ ও সুইডেনের মাঝে তিনি আমার দুটি ভিন্ন পৃথিবীর নীরব সংযোগকারী হয়ে উঠেছিলেন। আমার নতুন দেশের প্রতিটি পর্যায়ে ছিল তাঁর আশীর্বাদ, তাঁর আস্থা এবং তাঁর নীরব উপস্থিতি।
আজ তিনি আমাদের মাঝে সশরীরে নেই। ২০০৬ সালের ডিসেম্বরের এক শান্ত দিনে তিনি পৃথিবীর সকল দায়িত্ব সম্পন্ন করে অনন্তলোকে যাত্রা করেছেন। বর্তমানে তিনি সুইডেনের লিনশোপিং শহরের স্লাকা গ্রামের একটি শান্ত মুসলিম গোরস্থানে চিরনিদ্রায় শায়িত। তবুও আমি জানি, তিনি হারিয়ে যাননি। কারণ, সন্তানের হৃদয়ে মায়েরা কখনও মৃত হন না। সফলতার উচ্ছ্বাসে, নিঃসঙ্গ রাতের নিস্তব্ধতায়, অচেনা জনাকীর্ণ শহরে, আজও আমি তাঁর উপস্থিতি অনুভব করি। মনে হয় যেন দূর আকাশ থেকে তিনি এখনও বলছেন, ‘বৎস, তুমি মানুষের মাঝে মানুষ হয়েই জীবন যাপন করো।’
মা দিবস কেবল একটি নির্দিষ্ট তারিখ নয়, এটি সেই মহীয়সী নারীর প্রতি গভীর কৃতজ্ঞতা প্রকাশের দিন, যিনি নিজের জীবন উৎসর্গ করে সন্তানের ভবিষ্যৎ উজ্জ্বল করেন। বর্তমান বিশ্বে যখন মানুষ ক্ষমতা, সম্পদ ও বাহ্যিক সফলতার মাধ্যমে আত্মপরিচয় খুঁজে বেড়ায়, তখন আমি সগর্বে বলতে চাই, আমার জীবনের সবচেয়ে বড় পরিচয় হলো আমি একজন বাংলার মায়ের সন্তান। বিশ্ববাসী জানুক, বাংলার জননীরা কেবল সন্তান জন্ম দেন না, তাঁরা ইতিহাসও সৃষ্টি করেন। আমার মায়ের জীবনই ছিল এর এক জীবন্ত উদাহরণ। এবং পৃথিবীর অসংখ্য অজ্ঞাত সাফল্যের অন্তরালে নীরবে দাঁড়িয়ে থাকেন একজন বাংলার জননী। হয়তো তিনি কাঁচা মাটির ঘরে বসে সন্তানের মুখে ভাত তুলে দিচ্ছেন, হয়তো গভীর রাতে অন্ধকারে হাত তুলে প্রার্থনা করছেন, হয়তো নিজের সকল স্বপ্ন বিসর্জন দিয়ে সন্তানের ভবিষ্যৎকে উজ্জ্বল করছেন। পৃথিবী অনেক মহৎ ব্যক্তির নাম স্মরণ রাখে, কিন্তু তাদের সাফল্যের পেছনে থাকা মায়ের নীরব আত্মত্যাগের ইতিহাস খুব কম মানুষই লিপিবদ্ধ করে।
*লেখক: রহমান মৃধা, গবেষক ও সাহিত্যিক, প্রাক্তন পরিচালক, ফাইজার, সুইডেন। rahman.mridha@gmail.com
প্রবাসজীবনের গল্প, বিচিত্র আয়োজনের সংবাদ, ভিডিও, ছবি ও লেখা পাঠাতে পাঠকদের আমন্ত্রণ জানানো হচ্ছে। ই-মেইল: dp@example.com
প্রচ্ছদ নিয়ে আরও পড়ুন




